ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৮

ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি

  সুভাষ দে

আমি আমার এক হাতে অলিভ গুচ্ছ, আরেক হাতে মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র নিয়ে এসেছি। দয়া করে আমার হাত থেকে অলিভ গুচ্ছ পড়ে যেতে দেবেন না।-ইয়াসির আরাফাত

মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম এবং শান্তির জন্য প্রবল তৃষ্ণা- এই দুটি একই সঙ্গে অর্জনের জন্য দশকের পর দশক লড়েছেন ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা যোদ্ধা ইয়াসির আরাফাত। তার নেতৃত্বে ফিলিস্তিনের ছোট-বড় অনেক গেরিলা গ্রুপ পিএলও গঠন করে মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করেছে।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপনের প্রস্তাব নেয়। কিন্তু ইসরায়েল তাতে কর্ণপাত না করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তার দখলদারিত্ব কায়েম করে। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। বিগত শতকের ষাটের দশক থেকেই ফিলিস্তিনিরা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধ সংগ্রামে ফিলিস্তিনের মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং নানা গোত্রের মানুষ অংশ নেয়।

ইয়াসির আরাফাত জাতিসংঘে এক ভাষণে বলেছিলেন, 'আমার ফিলিস্তিন হবে সেক্যুলার রাষ্ট্র। এখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি- সবাই সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে।' ফিলিস্তিনের দ্বিতীয় বৃহত্তম গেরিলা সংগঠন ছিল ড. জর্জ হাবাশ পরিচালিত PFLP (Popular Front for Liberation of Palestine).  এ দলের গেরিলা যোদ্ধা লায়লা খালেদ এক বিমান ছিনতাই করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

আজ ফিলিস্তিনে প্রতিদিন নারী-শিশুসহ অগণিত মানুষ ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে বলি হচ্ছে। জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে গৃহীত প্রস্তাবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে। কিন্তু ইসরায়েল ক্রমাগত ফিলিস্তিনিদের আবাস গাজা ও পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ফিলিস্তিনিরা। তবে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৯৩ সালে অসলোতে প্রথম দফা এবং ওয়াশিংটনে দ্বিতীয়বার ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ফিলিস্তিনের স্বশাসন এবং পর্যায়ক্রমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। ফিলিস্তিন 'ইসরায়েল' রাষ্ট্র স্বীকার করে নেয়। বিগত ৬ দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। অসলো শান্তিচুক্তির পর ফিলিস্তিনে স্বশাসন প্রতিষ্ঠায় ইয়াসির আরাফাত সীমিত পরিসরে হলেও সফল হয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ইসরায়েলের দখলদারিত্ব, ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন বৃদ্ধি পায়।

কিন্তু শান্তিচুক্তির ২৫ বছর পরও শান্তি অধরা। বরং ইসরায়েল ও তার আন্তর্জাতিক দোসররা নতুন নতুন চক্রান্ত শুরু করে। বিশেষ করে ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চরম আগ্রাসী মনোভাব নেয়। আমেরিকা জেরুজালেমে তার দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার কথা বলে। এতে 'জেরুজালেম' নগরীর বিশেষ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। এই নগরীকে জাতিসংঘ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এই নগরীটি তিন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকায় ফিলিস্তিন দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তারা জাতিসংঘের ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা তহবিলে চাঁদা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফিলিস্তিনিরা তিনটি 'ইন্তিফাদা' সংগঠিত করেছে; এখনও তাদের সংগ্রাম চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফিলিস্তিনিরা এখন বিভক্ত। গাজা ও রামাল্লায় দুই ধরনের প্রশাসন রয়েছে। ইয়াসির আরাফাতের আদর্শ থেকে সরে গেছেন ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। তবে এটা আজ প্রমাণিত, আরাফাতের মতো মধ্যপন্থার জাতীয়তাবাদী নেতাকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সহ্য করেনি। তারা আরাফাত ও ফিলিস্তিনকে দুর্বল করতে উগ্র জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয় উগ্রপন্থার শক্তিকে মদদ দিয়েছে এবং কালক্রমে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে অনেক রাষ্ট্র খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে।

এখন এটা পরিস্কার- হামাস ও ফাতাহ্‌কে ঐক্যবদ্ধ থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে হবে। দু'পক্ষকেই উদার, গণতান্ত্রিক, সহিষ্ণু সমাজ ও রাজনীতির প্রতি আস্থাবান থেকে বিশ্বসমাজের সহানুভূতি পেতে হবে।

শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে জাতিসংঘকে দৃঢ় উদ্যোগ নিতে হবে। কেন ওআইসি দৃঢ়ভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াতে পারছে না? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে উগ্রপন্থা ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে নতজানু হওয়ার নীতি পরিহার করতে ওই দেশগুলোতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশ সব সময় ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য সংগ্রামে সমর্থন দিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের শান্তিকামী জনগণের দাবি-

১. ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বর হামলা বন্ধ করতে হবে। ২. জাতিসংঘ ঘোষিত 'জেরুজালেম' নগরীর বিশেষ মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

৩. অবিলম্বে জাতিসংঘের উদ্যোগে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে।

৪. ফিলিস্তিনি জনগণকে ধর্ম-গোত্র-মতবাদ নির্বিশেষে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

৫. বিশ্ববাসীকে ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দিতে হবে।

আমি শেষ করব ফিলিস্তিনি এক কবির মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকুতির কথা বলে।

'কবি বসে আছেন, ভূমধ্য সাগরের তীরে লেবাননে শরণার্থী শিবিরের কাছে।

তিনি বলছেন, এখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সব পাখি নীড়ে ফিরে যাবে, শিশুরা খেলা সাঙ্গ করে মায়ের কোলে ফিরে যাবে। কিন্তু আমার তো নীড় নেই। আমি কোথায়, কার কাছে ফিরব?'

কবির এই তীব্র আকুতি আমাদেরও।

বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত ফিলিস্তিনবাসীর এই ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানো।

সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ