মানবতা যেন লাঞ্ছিত না হয়

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৮

মানবতা যেন লাঞ্ছিত না হয়

  মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু

প্রতিহিংসার রাজনীতিতে মানবতা লাঞ্ছিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লণ্ডভণ্ড। মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনাবিরোধী শক্তি সমগ্র বাংলাদেশে শুরু করে নারকীয় তাণ্ডব। এদের দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ, সম্পদ লুণ্ঠন, জোর করে চাঁদা আদায়, শারীরিক নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মতো অসংখ্য ঘটনায় মানবতা ছিল ক্রন্দনরত। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর এসব দেখেছি আমরা।

বিজিত দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এদের নির্মম, পাশবিক, হিংস্র ও জান্তব আক্রোশের শিকার। প্রতিটি সহিংস ঘটনা যেন মথিত হৃদয়ের বেদনার্ত সমগ্রতা নিয়ে জীবন্ত অসহায় চিৎকারে বলেছে- এই কি আমাদের জন্মভূমি? অপরাধীদের কোনো জবাবদিহি ছিল না, নির্বিকার ছিল প্রশাসন।

পক্ষান্তরে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। বিজিত দল বিএনপি, জামায়াত। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নির্মমতার অভিজ্ঞতায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি অমূলক ছিল না। কিন্তু জাতি উৎকণ্ঠিত ও শঙ্কিত হলেও নির্বাচনে বিজয়ী প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতা, সহনশীল আচরণ ও প্রতিশোধ-বিবর্জিত মানসিকতার কারণে তার নির্দেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সংযত আচরণ ও পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব তৎসময়ে স্বস্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে। শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা, আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা ও সহনশীলতা গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য অনুকরণীয়।

নির্বাচন-পরবর্তী এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতার উৎস কী? এ প্রসঙ্গে নির্দি্বধায় বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অর্জন '৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনাকে ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক চেতনা-সমৃদ্ধ সংবিধানের প্রবর্তন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে ভিত্তি করে ১৯৭২ সালের সংবিধান রচিত হওয়ায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক চার নীতির অন্যতম নীতি হওয়ায় বাংলাদেশে চমৎকার এক উজ্জ্বল অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসের সূচনা হয়। বস্তুত এটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির জন্য বড় অর্জন, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যা ছিল অনন্য।

একটি রাষ্ট্র কতটুকু সভ্য, আধুনিক ও জনগণের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, তার পরিচয় পাওয়া যায় সে দেশের সংবিধানে। নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায় ও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের দায় নিশ্চিত করে সংবিধান। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রের দর্শন সম্পর্কে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয় উলেল্গখ থাকায় তা নিঃসন্দেহে আদি সংবিধানকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধানের মর্যাদা প্রদান করেছে।

১৯৭১ সালের পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে। এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের পর এই দেশ প্রগতির ধারার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ধারায় আবর্তিত হতে থাকে। স্বাধীনতার মূল চেতনাগুলোকে ভূলুণ্ঠিত ও বিকৃত করা হয়।

সদম্ভে আত্মপ্রকাশ ঘটে সামরিকতন্ত্রের। পশ্চাৎপদ নীতি অনুসৃত হতে থাকে নব্য পাকিস্তান সৃষ্টির দুঃস্বপ্নে। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী খুনি মোশতাক আহমদ ক্ষমতা দখলের পর ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান নেই এবং দেশ পরিচালিত হবে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে। উলেল্গখ্য, পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান ১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে গৃহীত হয়। ওই সংবিধানে দেশটি ইসলামী নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে মর্মে উলেল্গখ থাকায় এবং তা সংবিধানের মৌলিক চরিত্র হওয়ার কারণে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও বিভিন্ন আদিবাসী অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একই দেশের সমঅধিকার বঞ্চিত নাগরিক হিসেবে গণ্য করতেন। খুনি মোশতাকের ধর্মনিরপেক্ষতা-বিবর্জিত নীতি ও পাকিস্তানের সংবিধানের মৌলিক চরিত্র এক ও অভিন্ন। খুনি মোশতাক-পরবর্তী জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া সংবিধানে মৌলবাদী, ধর্মাশ্রয়ী মৌলিক অনুভূতিগুলোকে সর্বাত্মক জাগ্রত করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সৃষ্টি করেছিলেন। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও বেশি দৃশ্যমান হয়, যখন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, বিএনপি ক্ষমতার অংশীদার হয়। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতবিরোধী নীতি অনুসরণ করে তারা পাকিস্তানের আনুকূল্য পায়। এই নীতি-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু অর্থাৎ হিন্দুবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ইসলামের প্রকৃত চেতনায় নয় বরং বিকৃতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা নির্বাসিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় সাম্প্রদায়িকতার অশুভ বিষ ছড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উপরোক্ত দর্শনগত রাজনৈতিক অবস্থান ছিল বিধায় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্মাদ নির্যাতনকারীরা প্রকাশ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ভোট প্রদানের জন্য অভিযুক্ত করে নির্যাতনের তাণ্ডবলীলায় লিপ্ত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে তৎকালীন প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতায় সহিংসতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করে ভোট সংখ্যা হ্রাস এবং হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভোটদান থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে ভোটের ভারসাম্য বিনষ্ট করার অপচেষ্টাও করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে মানবাধিকার রক্ষা করার অঙ্গীকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা রোধ ও কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা নিপীড়ন রোধ করার বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৭-এ উলেল্গখ আছে যে, দেশের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮-এ বর্ণিত মতে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী, পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।

৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ব্যক্তিজীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন নাগরিককে বঞ্চিত করা যাইবে না মর্মে উলেল্গখ আছে।

সংবিধানের উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলোতে বর্ণিত নীতি অনুযায়ী সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতরূপে সংরক্ষিত হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাগত। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ভয়ভীতিমুক্ত নির্বাচন পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করাই স্বাভাবিক।

পুলিশ প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনপ্রশাসনের নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার বিষয়টি সাংবিধানিক দায়। কাজেই প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ও সময়োপযোগী আইনানুগ প্রশাসনিক উদ্যোগই জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সব ভোটারকে নিরাপদ, সহিংসতা ও শঙ্কামুক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে জাতি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও শঙ্কামুক্ত নির্বাচন প্রত্যাশা করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে দৃঢ় ও আন্তরিক। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখতে হলে জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িকতা সার্বজনীন ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে অন্তরায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক দুদক কমিশনার


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ