লেটস্‌ টক...

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৮

লেটস্‌ টক...

  রাহাত মিনহাজ

দেশে এখন নির্বাচনী মৌসুম। চলছে নানা সমীকরণ। ক্ষমতার পালাবদল বা ধারাবাহিকতা নিয়ে নানা আলোচনা। হিসাবনিকাশ। এমন বাস্তবতায় একটি দলের প্রধানকে নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কিছু একটা লেখা সত্যিই কঠিন। ২৩ নভেম্বর শুক্রবার গণভবনে অসাধারণ এক বিকেল-সন্ধ্যা কাটিয়ে ফেরার পথেই ভাবছিলাম, কিছু একটা লেখা দরকার। কিন্তু কীভাবে লেখা যায়, কী লেখা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করেই কেটে গেল কয়েকটা দিন। তবে গণভবনের ওই হলরুমে প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে কাটানোর স্মৃতি তাগাদা দিচ্ছিল বারবার। কারণ ওই বিকেলটা ছিল অন্য রকম। যে বিকেলে 'লেটস টক উইথ শেখ হাসিনা' শিরোনামের অনুষ্ঠানে ১৫০ জন তরুণ-যুবার সামনে নিজের সম্পর্কে অনেক অজানা কথা তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, যা রীতিমতো শিহরণ জাগায়।

আমরা সবাই শেখ হাসিনাকে জানি, যিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। ওই অনুষ্ঠানের শুরুতেই মনে উঁকি দিচ্ছিল একটি প্রশ্ন। এই মানুষটি নিজে কী হতে চেয়েছিলেন? তিনি কি প্রধানমন্ত্রী বা দলের সভানেত্রী হতে চেয়েছিলেন, নাকি অন্য কিছু? একটু পরেই জবাব পাওয়া গেল। একজনের জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বললেন, একজন কিশোরী শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখতেন চিকিৎসক হওয়ার। আলোচনায় উঠে আসে শেখ হাসিনার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানা স্মৃতিকথা। যার মধ্যে বিশেষ করে আগ্রহ তৈরি করে ১৯৭৫ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি। ১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর যাওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসে ছিল সাজসাজ রব। এরই মধ্যে জার্মানিতে বৃত্তিতে গবেষণায় নিয়োজিত শেখ হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়া শেখ হাসিনা ও সন্তানদের নিয়ে জার্মানি যাওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। জার্মানি যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা দেখা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আব্দুল মতিন চৌধুরীর (১৪তম উপাচার্য) সঙ্গে। পদার্থবিদ আব্দুল মতিন চৌধুরী ছিলেন শেখ হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সরাসরি শিক্ষক। আব্দুল মতিন সাহেব শেখ হাসিনাকে ওই সময় জার্মানি যেতে দিতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, 'তোমার বাবা ক্যাম্পাসে আসবেন, আর তুমি থাকবে না, তা কী করে হয়!' তিনি অন্তত ১৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনাকে জার্মানি যেতে অনুরোধ করেছিলেন। যাই হোক, পরে জার্মানি যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ৩০ জুলাই জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের উদ্দেশে রওনা দেন শেখ হাসিনা। ওই যাত্রায় তার সঙ্গী ছোট বোন শেখ রেহানা ও দুই সন্তান। কেমন ছিল পরিবার থেকে বিদায়ের শেষ দিনটি? এমন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা জানিয়েছেন তার জীবনের গভীরতর বেদনার উপাখ্যান। ওই সময় ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ছিল একেবারেই পরিপূর্ণ। বাড়িতে নতুন দুই বউ। তখনও বিয়ের আমেজ। ৩২ নম্বর থেকে বের হওয়ার সময় বেগম মুজিব অনেক কেঁদেছিলেন। কী অর্থ ছিল সেই কান্নার, তা ভেবে আজও আলোড়িত হন শেখ হাসিনা। ঢাকা ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে শেখ হাসিনা ও রেহানাকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন ভাই শেখ কামাল ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। যাদের সঙ্গে সেখানেই তার শেষ দেখা। ছয় বছর পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে এই বিমানবন্দরে ফিরে শেখ কামালসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের খুঁজেছিল শেখ হাসিনার আর্দ্র চোখ; কিন্তু ছিল শুধুই স্মৃতি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ছিলেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। রাষ্ট্রদূত সানাউল হক সাহেবের বাসায়। জার্মানির বন থেকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফোন করে ঢাকায় 'ক্যু' হওয়ার খবর জানান। পরে তাদের প্রস্তাবিত প্যারিস সফর বাতিল করে বনে ফিরে যেতে বলা হয়। এরপর নিরাপত্তার স্বার্থে সেখান থেকে তারা যান দিল্লিতে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনাকে জানান, ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই। এরপর শুরু হয় কঠিন এক জীবন। ১৯৭১ সালের বন্দিজীবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা অন্য একটি বাড়িতে গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন। বাইরে যাওয়া মানা, যোগাযোগ নিষিদ্ধ। ওই অবস্থায় বাড়ি থেকেই পালিয়ে যুদ্ধ যোগ দেন শেখ জামাল। তরুণ-যুবাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার গল্প-আলাপ শুধু দুঃখগাথাতেই থেমে থাকেনি। তিনি বলেছেন তার সন্তানদের কথা, নাতি-নাতনিদের কথা। পরিবার নিয়ে তার ভালোলাগা আর ভালোবাসার গল্প। যাতে উঠে আসে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির প্রতি তার প্রবল স্নেহের কথা। উঠে আসে ববির দুই সন্তানের আবদারের খণ্ডচিত্র। একজন দাদি-নানি শেখ হাসিনা জানান, নানি শেখ হাসিনার কাছে ববির সন্তান কাইয়ুসের আবদারই বেশি থাকে। কাইয়ুস প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন, 'তুমি (শেখ হাসিনা) রান্না কর! আমরা খাব।' 'লেটস্‌ টক উইথ শেখ হাসিনা' শিরোনামের ওই অনুষ্ঠানে কথা হয় আরও নানা বিষয়ে। তিনি তরুণদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেন। আবার তিনি জানতে চান, তারা প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের জন্য কী করবেন। কেউ জানান ইনোভেনশ ল্যাব তৈরির কথা, কেউ যে কোনো মূল্যে দূর করতে চান দুর্নীতি আর অনিয়ম। তরুণদের এই ভাবনাগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনেন। মন্তব্য করেন মাঝেমধ্যে। আবার প্রশ্নের জবাবও দেন।

প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল গণভবনের হলরুমের দক্ষিণ পাশের লনে। সেই আয়োজনে অতিথিরা যখন খাবার খেতে ব্যস্ত, তখন সেখানে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পর্বে তিনি সবার সঙ্গে আবার কথা বলেন। সবারই খোঁজখবর নেন। অনেকের স্বপ্নের কথা শোনেন। শেষ দিকে শেখ রেহানা যোগ দেন এই আনুষ্ঠানিকতায়। একেবারে শেষ পর্যায়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে চলে যান দুই বোন। কিন্তু আগত অতিথিদের মধ্যে শেখ পরিবারের আন্তরিক আতিথেয়তার রেশ রয়ে যায় আরও অনেকক্ষণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিবকে দেখিনি। বই, পুস্তক, তথ্যচিত্রে জেনেছি শেখ মুজিবকে। শুনেছি শেখ মুজিব ছিলেন জনতার নেতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন একজন জননেতা। এক ব্যক্তির সম্মোহনী শক্তি আসলে কী, তা শেখ হাসিনার মতো ব্যক্তির সঙ্গে কথা না বললে বোঝা সম্ভব নয়। বাড়ির বড় মেয়ে শেখ হাসিনা, বড় বোন শেখ হাসিনা, মা শেখ হাসিনা, দাদি-নানি শেখ হাসিনা সত্যিই অনন্য, অসাধারণ।

প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ