নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের চাওয়া-পাওয়া

  মোহাম্মদ আনিসুর রহমান

একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উৎসবমুখর আমেজ দেশজুড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুতি, প্রকাশ ও প্রচারের জন্য ভাবছে। নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের কৌশলগত ঘোষণাপত্র, যার মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটে দলের রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থান, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভোটারদের আকর্ষণের কর্মপদ্ধতি, সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ও আইনগত দায়বদ্ধতা। ইশতেহারে যেন জনগণের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটে এবং বাস্তবায়নযোগ্য হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর। তবে ইশতেহারে অনেক গঠনমূলক বিষয় থাকলেও তার সবকিছু সব সময় পূরণ হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিল্ফেম্নাক্ত সমাজবান্ধব ও মানবিক সুপারিশমালা বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা করতে পারে। যেমন- ১. 'একটি বাড়ি, একটি সরকারি চাকরি' ব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে যে পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই বা সরকারি চাকরিজীবী নেই, তা যথাযথ উপায়ে চিহ্নিত করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুষমভাবে চাকরির মানবিক সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। নারী সদস্য মা-বাবার দেখাশোনা ও পরিবারের জন্য অধিক উপযোগী হওয়ায়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপযুক্ত নারীকে অধিক বিবেচনায় আনা যেতে পারে; ২. জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এবং ভবিষ্যতে যারা কাজ করতে ইচ্ছুক, বাহিনীগুলো থেকে এমন সদস্যের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে; ৩. সন্তানসম্ভবা দরিদ্র মা ও তার শিশুসন্তানের লালন-পালনে 'মা ও শিশু উপহার ভাতা' এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর পর দাফন বা সৎকারের জন্য বিশেষ অর্থ প্রদান করা যেতে পারে; ৪. বাংলাদেশ সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ যেসব সেক্টর সরাসরি দেশরক্ষা ও দেশসেবায় সম্পৃক্ত, সেই সেক্টরগুলোতে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপযুক্ত সদস্যদের যোগ্যতা-দক্ষতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে; ৫. প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, গ্রামীণ অনগ্রসর নারী, হতদরিদ্র প্রান্তিক কৃষক, কুমার-কামার, তাঁতি-জেলে, সুইপার, সমুদ্র-তীরবর্তী ও ছিটমহলের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবীর সন্তানদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-বীমা, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় চাকরির বিশেষ ব্যবস্থা করা যেতে পারে; ৬. চাকরিরত অবস্থায় মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, ভাইবোনসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য, অসহায় প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনকে সহযোগিতা করে কিনা, তার দ্বারা মানবতার উপকার হয় কিনা, তা প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীর পদোন্নতি এবং পদায়নের জন্য বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে; ৭. সেনাবাহিনীর মতো কমিশন ব্যবস্থা চালু করে সীমান্ত রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) ভারতের বিএসএফ কিংবা মিয়ানমারের নাসাকা (৫ বাহিনীর সমন্বয়ে গড়া) বা লুনথিন বাহিনীর চেয়েও আধুনিক, উন্নত, দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে; ৮. সুন্দরবনের আশপাশে জেগে ওঠা চর এবং গাছ কেটে নেওয়ার ফলে বনের মধ্যে যে বিরান ভূমির সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে নতুন করে ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টির জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সুন্দরবন সংলগ্ন নদী, খাল দিয়ে তৈলাক্ত-দাহ্য পদার্থ, কয়লা প্রভৃতি নিয়ে জলযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যেতে পারে; ৯. প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক নাগরিকদের জন্য নগর পরিবহন সম্পূর্ণ ফ্রি এবং দূরযাত্রার ক্ষেত্রে অর্ধেক ভাড়া ধার্য করার বিধান করা যেতে পারে। একইভাবে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নগর পরিবহনের ক্ষেত্রে অর্ধেক ভাড়া ধার্য করার বিধান করা যেতে পারে; ১০. বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যাদের সক্ষম, কর্মঠ ও কর্মজীবী সন্তান আছে, সেসব সন্তানকে আইনের আওতায় আনা যেতে পারে। কেননা, তারা কখনোই রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না; ১১. একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক) স্তর (প্রথম-অষ্টম), মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর (নবম-দ্বাদশ) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্তরের (অনার্স-মাস্টার্স) পাশাপাশি এমফিল, পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ব্যবস্থা করা যেতে পারে; ১২. মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে 'মুজিবনগর স্বাধীন বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়', ইডেন মহিলা কলেজকে দেশের প্রথম নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং বাংলাদেশ পুলিশের জীবনমান উন্নয়নে 'বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়' স্থাপন করা যেতে পারে; ১৩. বর্তমান পদ্ধতি প্রচলনের পাশাপাশি প্রত্যেক বিভাগের তুলনামূলক অনুন্নত ও অনগ্রসর জেলায় (উন্নত করার জন্য) 'বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়'-এর বিভাগীয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একজন উপ-উপাচার্যের মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে; ১৪. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত বা গুচ্ছভাবে ভর্তি পরীক্ষা সংঘটিত হওয়া সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের অজুহাতে কোনোভাবেই যেন আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদাসীনতা, অমানবিকতা ও মনুষ্যত্বহীনতা প্রকাশ না পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে; ১৫. শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির কারণে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় এবং উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী ও বহুমাত্রিক ধারায় বিকশিত করার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্নিষ্ট অধ্যাদেশগুলো পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধন; অভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন; 'উচ্চশিক্ষা কমিশন' গঠন এবং শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোসহ যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে; ১৬. শিল্প হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা (হলুদ সাংবাদিকতামুক্ত) সংরক্ষণের পাশাপাশি সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে উন্নয়নের মাইলফলক স্থাপনের ইতিহাস তৈরির হাতছানি। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুর সঙ্গে রেল সংযোগ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রুটে চার লেনের মহাসড়ক ও দুই লেনের রেললাইন বাস্তবায়ন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সুন্দরবনের স্বার্থ সংরক্ষণ সংবলিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও মোংলা বন্দরকে গতিশীল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন, কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে চালু ও গতিশীল। দেশের মুক্তিকামী মানুষের উন্নয়নের জন্য দল হিসেবে তারাই সরকার গঠন করুক, যারা তাদের কর্ম, চিন্তা, শিক্ষা ও আদর্শ দিয়ে দেশসেবার মননে ব্রতী হতে পারে।

শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
anisrahaman01@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ