বিরোধী দলের জন্য কোনো স্পেস রাখছে না সরকার

  শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুই দফা সংলাপ হয়েছে। কিন্তু এসব সংলাপে দেশের উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তার কোনো সমাধান হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশও তৈরি হয়নি। সরকারের মানসিকতা এবং বিভিন্ন পদক্ষেপে সেটার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এভাবে সরকার বিরোধী দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা রাখছে না, তাদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

সমঝোতার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু সরকারের দিক থেকে আন্তরিকতার বড়ই অভাব। একাদশ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে সাত দফা দিয়েছে, কার্যত তার একটিও সরকার শোনেনি, মানার মানসিকতা দেখায়নি। এসব দফা নিয়ে তারা আন্তরিকভাবে আলোচনা করলে একটা সমাধান আসত। কিন্তু তাদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো লক্ষণই ছিল না এবং নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যে সমঝোতার দরকার, তা এখনও হয়ে ওঠেনি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি কতটা উন্নত হবে, সেটা নিয়ে কেবল আমাদের নয়, জনগণের মনেও প্রবল সংশয়। এরপরও আমরা আশাবাদী, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আশা করছি, তিন-চার দিনের মধ্যে সরকার বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে একটি সমাধানের পথে আসবে। এ জন্য আমাদের দিক থেকে আলোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছে। যদি সরকার এ পথে অগ্রসর না হয় তাহলে বুঝতে হবে, তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বাধ্য করতে চাচ্ছে রাজপথের আন্দোলনের জন্য। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিকল্প আছে বলেও মনে করি না। আন্দোলন বলে-কয়ে হয় না। সে তার গতিতে, আপন শক্তিতে জেগে ওঠে। জনগণ সবকিছু বুঝতে পারছে। তাদের ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। আর সেই আন্দোলনে কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনবে না। তাই এখনও প্রত্যাশা করছি- সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে না দিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করবে। দেশকে সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করবে।

দেশে এখন কোনোভাবেই নির্বাচনী পরিবেশ নেই। সারাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসক, উপজেলা পর্যায় এমনকি নির্বাচনী কর্মকর্তাদেরও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মূলত আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচন কীভাবে করা যায়, সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এর ওপর মামলা-হামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী মাঠছাড়া করা হয়েছে। তারা এখন এলাকা তো দূরের কথা, অন্য জেলাতে গিয়েও রক্ষা পাচ্ছে না। সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদার পরও তাদের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রথম সংলাপেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এখন থেকে কোনো হয়রানিমূলক মামলা হবে না। রাজনৈতিক মামলায় কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হয়রানি করা হবে না। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় আসা ও যাওয়ার পথে তাদের কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। দ্বিতীয় সংলাপেও প্রধানমন্ত্রী এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং তা তিনি জোর দিয়েই বলেছিলেন। কিন্তু ওইদিন রাতে চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতিসহ কয়েকশ' নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। প্রত্যেক নেতাকর্মীর বাড়িতে হানা দিয়েছে। নির্বাচন করার মতো কোনো নেতাকর্মীই অবশিষ্ট রাখতে চাইছে না তারা। তাহলে বিরোধী দল নির্বাচনটা করবে কীভাবে? সভা-সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হবে না বলার পরও তাদের পূর্বনির্ধারিত ইনডোর কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হয়নি। ৭ নভেম্বর উপলক্ষে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে তাদের আলোচনা সভা ভণ্ডুল করে দেওয়া হয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হঠাৎ করেই হাসপাতাল থেকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। এসব কোনো সমঝোতার লক্ষণ নয়।

সরকার সমঝোতা না করে তফসিল ঘোষণা করে দেশকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু এর কারণে যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়, বিঘ্নিত হয়, তবে তা সরকারের কারণেই ঘটবে। কারণ বল এখন সরকারের কোর্টে। সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সংবিধানের মধ্যে থেকেও কীভাবে নির্বাচন করা যায়, তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এতে কোনো কর্ণপাত করছে না। তারা তাদের মতো করে সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সব দাবি নাকচ করে দিয়েছে। কোনো যুক্তিতেই তারা তাদের কঠোর অবস্থান থেকে এক চুল সরে আসেনি। বিরোধী দলগুলোর জন্য কোনো স্পেস রাখেনি। সরকারের এমন কঠোর মনোভাবের কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা পরে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নেতাকর্মীরা পালন করবেন। তাদের ভোট করার কোনো পরিবেশ নেই, তা তারা জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন। এরপর তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন, কী করা উচিত।

প্রচার সম্পাদক, বিএনপি


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ