সুইট সিডনি, ফানি সিডনি

ভ্রমণ

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮

সুইট সিডনি, ফানি সিডনি

সিডনির মেট্রোরেল

  অরুণ কুমার বিশ্বাস

সিডনি শহর সত্যিই সুইট। বেড়ানোর জন্য জুতসই এক জায়গা অস্ট্রেলিয়ার কোস্টাল সিটি সিডনি। কিন্তু ভুলেও ভাববেন না, হাসতে হাসতে সিডনি যাওয়া যায়। সিডনি যেতে গেলে রীতিমতো কিডনি বন্ধক রাখতে হয়। তামাম বিশ্বের মধ্যে এটি খরুচে শহরের একটি। বোধ করি টোকিও বা সিঙ্গাপুরের পরেই এর স্থান।

প্রায় দুই সপ্তাহ ভ্রমণে একটা জিনিস খুব লক্ষ্য করেছি, সিডনি মানেই আইনের বড্ড বেশি কড়াকড়ি। আমি এর নাম দিয়েছি 'সিটি অব সি-গাল'। গাঙচিলে ভরপুর এই শহর যেন পাখপাখালির অভয়ারণ্য। একরকম পাখি আছে, নাম তার লায়ারবার্ড। অর্থাৎ এই মিথ্যুক পাখি দেখতে দৃষ্টিনন্দন হলেও এরা খুব বেহায়া। ভয়ডর বলে কিছু নেই, ওরা শুধু পর্যটকদের পিছু নেয়। যদি কিছু খাদ্যখানা মেলে।

সিডনি ট্রান্সপোর্ট বিশ্বখ্যাত। মেট্রোরেলের কারগুলো এমন অত্যাধুনিক যে, ট্রেনে চড়লে আপনি উড়োযানের আমেজ পাবেন। হুট করে একদিন আমরা সদলবলে রেলে উঠে বসি। ও মা! উঠে দেখি সবাই স্পিকটি নট। পরে খেয়াল করে দেখি ট্রেনের গায়ে লেখা, 'সাইলেন্ট ক্যারেজ'। তার মানে এই বিশেষ কূপে উঠলে কথা বলা বারণ। যেন নৈঃশব্দ্য হিরণ্ময়। এসব কারে বুড়ো হাবড়া আর অসুস্থরা ওঠেন। এখানে জীবনের আস্টম্ফালন লুপ্তপ্রায়।

পোশাকাদির কথা বলছেন! উঁহু, কোনোরকম বাছবিচার নেই। কারণ এই দেশটা আদতে কারও নয়- উদ্বাস্তুর। জেমস কুক নামের এক নাবিক আঠারো শতকের শেষভাগে ভাগ্যান্বেষণে এলেন। তারপর ব্রিটেন থেকে এলো কিছু কনভিক্ট মানে অপরাধী। ক্রমশ আদিবাসীর কাছ থেকে পুরো দ্বীপদেশটি কেড়ে নিল ব্রিটেনসহ তামাম বিশ্বের কিছু উচ্চাভিলাষী মানুষ। ফরমাল পোশাক একটা আছে বটে; তবে ঠ্যাঙ দেখানো পোশাকেরই (বিশেষত নারীকুল) জয়জয়কার এখানে। আবহাওয়া আমাদের ঠিক উল্টো। নভেম্বর থেকে সিডনিতে সামার শুরু আর আমাদের শীতকাল। লন্ডন শহর ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সেই তুলনায় সিডনিকে আমি এগিয়ে রাখব। কারণ এরা বড্ড নিয়মতান্ত্রিক। যথেষ্ট ভদ্র ও মার্জিত। গাড়ি চালাতে গিয়ে অকারণ ঘাম মুছলেও দুইশ' ডলার জরিমানা গুনতে হয়।

বাসে চেপে ওয়াটসন'স বে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি বাসের গায়ে লেখা, ব্রেক ওপেন দ্য গ্লাস ইন এমারজেন্সি! কেসটা কী! প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে দেখি বাসের শার্সির গায়ে একটা করে গ্লাস কাটার সাঁটা আছে। কোনো কারণে আটকা পড়লে বা বাসে আগুন ধরলে তুমি এই গ্লাস কাটার দিয়ে কাচ কেটে বেরিয়ে যাবে। তোফা বুদ্ধি বটে! আহা, ফানি সিডনি!

এখানে তরিতরকারি খুব মহার্ঘ্য বস্তু। আলুর কেজি অন্তত দুইশ' টাকা (অর্থাৎ আলুর দোষ)। শাকসবজি, কদু-কুমড়া-জালি লোকে পালা-পার্বণে খায়। পেঁপের বড্ড পায়াভারি, কাঁচকলা-কাঁকরোলের মুখ দেখা যায় না। তবে মাংসাশি যারা, তাদের জন্য সিডনি সত্যি ফানি সিটি। মাত্র ছয়শ' ডলারে ভেড়ার মাংস মেলে। আরেকটু বেশি দিয়ে জলখাসি পাবেন। আর মাছ! বাঁ হাতকা খেল। সবচেয়ে সস্তা বিকোয় সি-ফিশ। আমাদের দেশি ভেটকি বা কোরালের মতো একরকম মাছ আছে- নাম বারামুন্ডি। কইয়ের মতো দেখতে আছে গ্রোপার। খেতে পারেন বেলেমাছের স্বাদযুক্ত হোয়াইটিং ফিশ। নামকা ওয়াস্তে দাম। আহা, সুইট সিডনি।

একদিন দেখি আমার এক পরিচিত ভাইয়ের ডান হাতের কড়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ। কেসটা কী খুলে বলবেন? সিডনিতে রক্তপাত! প্রথমে বলতে চাননি। পরে মেলা চাপাচাপিতে চোপা খুললেন তিনি। লাজুক হেসে বললেন, বারবার হর্ন দিচ্ছে দেখে তিনি একজনকে রাগের বশে কড়ে আঙুল উঁচু করে দেখালেন। সেই চীনে ছোকরা মাঝ রাস্তায় গাড়ি রেখে তেড়ে এসে তার আঙুলের মাথায় কামড় বসিয়ে দিল। বদলে অবশ্য তাকে বেজায়গায় গাড়ি রাখার অপরাধে চারশ' ডলার ফাইন গুনতে হয়েছে। তা হোক, তবু সে শত্রুর কড়ে আঙুল কামড়ে বেজায় সুখ পেয়েছে নিশ্চয়ই।

পুলিশের কাছে যাবেন না? চীনেম্যানকে চিনিয়ে দেবেন না আপনি কে! আপনি তো শের-ই বেঙ্গল! আমি তাকে উস্কাই। আরে নাহ! পুলিশ তাহলে হাসবে। বলবে, তুমিই-বা বাপু কেন কড়ে আঙুল দেখাতে গেলে! ওটা তো পটি করার জায়গা নয়! যাও যাও, একটু সাবধানে থেকো। এই অপরাধের বিচার হয় না। আমি হাসি। আহা, মজার শহর সিডনি।

যারা নতুন আসে, এসেই তারা স্টিয়ারিং ধরে, মানে ট্যাক্সি চালায়। কিন্তু কেন, আর কোনো কাজ কি নেই! আছে, তবে তাতে কামাই কম। সরকার ট্যাক্স কেটে নেয়। ট্যাক্সি চালালে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া সহজ। কারণ বেশিরভাগ পেমেন্ট ক্যাশে হয়। টুক করে টাকাটা গাপ করে দিলেই হয়! কিন্তু ভুলেও কেউ উবার চালাবে না, সেখানে কার্ডে পেমেন্ট। তার মানে চোট্টামি এখানেও আছে। আহা, ফানি সিডনি! 

জায়গার নাম ডারলিঙ হারবার। সিটি সেন্টারের খুব কাছে। উঁহু, কলকাতার অদূরে আছে ডায়মন্ড হারবার, তার সঙ্গে গুলোবেন না যেন। ছোট্ট নদী, প্রচুর জাহাজ নোঙর ফেলে আছে। এখানেও গাঙচিলের প্রগলভ ওড়াউড়ি। পেটে খিদে খিদে ভাব। বন্ধু বলল, চল কেএফসি খাই। অমনি আমার মনে পড়ে, দেশি কেএফসিতে তেলাপোকা পাওয়া গেছে। আমি বলি, নাহ, সাবওয়ে খাব। এখানে ডাবল মজা। একবার এক গ্লাস কোক নাও তিন ডলার দিয়ে। তারপর যত খুশি গ্লাস ভরো আর গলায় ঢালো। কাগজের গ্লাস যতক্ষণ অটুট আছে, ততক্ষণ তুমি কোক গিলতে পারবে, উইদ নো পেমেন্ট। ফানি ব্যাপার না!

গেলাম একদিন কক্যাটু দ্বীপে, আমার ভাষায় কাকাতুয়া। সার্কুলার কি (অপেরা হাউস) থেকে ফেরিতে যেতে হয়। ওপাল ঘষে যাওয়া যায়। ও মা! গিয়ে দেখি সেখানে তেমন কিছু নেই, কবে কোন খুনে-ডাকুর নির্বাসন দণ্ড হয়েছিল, এই সেই দ্বীপ। যেন আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ! নিজেকে স্রেফ বেকুব মনে হলো। তখন রাগের মাথায় ভরপেট ফ্রি পানি পান করে এলাম। কারণ এখানে পানি খুব দামি। কোক আর পানি সমানে বিকোয়। নাহ, সিডনি মোটেও ফানি নয়, দামি! 

আপেল খাবেন, আপেল! একদম মোম-ডলা বা ওষুধ মেশানো নেই। কড়মড়িয়ে খাবেন, শিয়াল যেমন করে বালুর চড়ায় কাঁকড়া চিবোয়। সত্যি, এমন সুস্বাদু, ভার্জিন ও সুদর্শন আপেল আপনি আর পাবেন না। ডাঁসা পেয়ারার মতো শাঁসালো ও রুচিকর। কোলস স্টোরের পিনাট বাটার খেতে পারেন, এক ডলারে বড় এক ডিব্বা। নেড়েচেড়ে দেখি, ও মোর খোদা, মেড ইন ইন্ডিয়া! মনে মনে ভাবি, আহা, ওখানে যদি বাংলাদেশ লেখা থাকত! নিজের মায়ের গুনগান কে না শুনতে চায়!

সিডনি ইউনিভার্সিটি দেখতে গেছি। এর খুব নাম। ভালো র‌্যাংকিং। আরে ব্বাস! কী বিশাল ক্যাম্পাস! ঢুকতেই দেখি বিশাল একখানা ক্যাফে বার। বসে গেলাম টুপ করে। কফির দাম আর কত হবে! মুফতে একখানা ফটো খিঁচতে পারি। এখানে অবশ্য লাইন। পোলাপান সব নরমাল ড্রেসে। আমার পেছনে একজন, তিনি শুধু ফরমাল, সুট-টাই- ব্ল্যাক শু। সন্দেহ হলো। কেসটা কী, কে তিনি? একটু পরে জানলাম, তিনি এই বিশাল বিদ্যায়তনের ভাইস চ্যান্সেলর। গা শিউরে উঠল। খাইছে আমারে! ভিসি এমন নির্দোষ হন, লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছেন! তিনি কি জাফর ইকবাল স্যারের 'মহব্বত আলীর' মতো নন! এই মর্মে নিশ্চিত হই যে, ভিসি সাহেব লাল-নীল দলে নেই, তিনি পলিটিকস করেন না। তারপরও তিনি ভিসি। ভাবা যায়! সত্যি, এটা কেবল সুইট সিডনিতেই সম্ভব। 

কথাসাহিত্যিক ও অতিরিক্ত কমিশনার
বাংলাদেশ কাস্টমস 


মন্তব্য যোগ করুণ