তাইরে নাইরে না!

রম্য

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

  ডা. সাইফুল আলম

দূর থেকে আমার বন্ধু কিসমিস আলীকে দেখা যাচ্ছিল। জাদুঘরটার প্রধান ফটকের সামনে হাতে যেন কিছু একটা নিয়ে কিসমিস দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে জিনিসটা আবিস্কার করা যাচ্ছিল না। তবে লক্ষ্য করলাম, দুপুরের এ সময়টায় সূর্যের দুর্দান্ত উত্তাপে ওর কপালের লবণাক্ত ঘাম বারবার ও অন্য হাতের একটি টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেলছিল। আমি কাছাকাছি যেতেই ও আমার পানে দৃষ্টি ফেলে কিছুটা ভেজাল মেশানো হাসি উপহার দিল। আমি লক্ষ্য করলাম, কিসমিস একটি ছোট সাদা কাচের বয়ামে একটা পাকা লাল টসটসে মাল্টা ভরে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, সদ্য গাছ থেকে সংগ্রহ করা তাজা ফল। ছোট একটা কাগজে ছোট করে কিছু লিখে বয়ামটার গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। আমি কোনো প্রশ্ন নিক্ষেপের আগেই ও হাতের বয়ামটাকে আমার চোখ দুটির সামনে কিঞ্চিৎ নাচিয়ে বলল :দোস্ত, অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে আজ থেকে ছয় মাস দু'দিন আর পৌনে চার ঘণ্টা আগে আমি আমার মহলল্গার একজন ফল বিক্রেতার কাছ থেকে এক কেজি দুইশ' গ্রাম পরিমাণ পাকা মাল্টা ক্রয় করি। কৌতূহলবশত দুটি তথাকথিত পাকা ফল গৃহজাত করে রাখি। কিন্তু আশ্চর্য, ফল দুটি অদ্যাবধি পচেও নাই, গলেও নাই; এমনকি কোনোরূপ সৌন্দর্যহানিও হয়নি।

-হুম এটা নিশ্চয়ই ফরমানিল বা কার্বাইডের কারসাজি। আমি যেন মুহূর্তেই অভিজ্ঞতাপূর্ণ মন্তব্যটি পেশ করলাম।

-তা তুমি দেখছি একজন অভিজ্ঞ ভেজাল বিশেষজ্ঞ দোস্ত! কিসমিস ওর মুখের কাঁচা-পাকা দাঁতগুলো উন্মুক্ত করে ছটাকখানেক উলল্গাস প্রকাশ করল। আমি ওর উলল্গাসে উলল্গসিত না হয়ে শুধালাম, কিন্তু দোস্ত, তোমার হাতের মাল্টাবন্দি বয়ামটি এখানে কেন?

-এ আশ্চর্যজনক ফলটি জাদুঘরে সমর্পণ করার জন্য এনেছিলাম। কিন্তু আজ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সম্ভব হলো না। ভেবেছিলাম এ ফলটির দীর্ঘায়ু গণনা করে আমাদের কয়েকটি আগামী প্রজন্ম বিস্ময়ে গড়াগড়ি দেবে। তাই বয়ামের গায়ে ক্রয়ের তারিখ আর সময়টিও উলেল্গখ করে দিয়েছি। হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ... কথাগুলো মেট্রোরেল স্পিডে বলে কিসমিস যেন মিহি সুরে দু'বার হাসির হুইসেল বাজাল।

-কিন্তু দোস্ত, তুমি ইচ্ছা করলেই তো আর তোমার আশ্চর্যজনক বস্তুটি জাদুঘরে ঠাঁই পাবে না। সেখানেও তো নানা বিবিধমালা আছে।

-তা ঠিক। তবে বস্তুটির স্থান এখন জাদুঘরেই ভালো বলে আমার মনে হয়; তাই এ প্রচেষ্টা। কিসমিস তার মন্তব্যটি ব্যক্ত করে যেন জিজ্ঞাসু নয়নে আমার পানে চেয়ে রইল। আমি এবার কিছুটা বিব্রত বোধ করে প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম- দোস্ত, এ গরমে আমাদের দু'জনেরই শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে বেশ খানিকটা সোডিয়াম আর পটাশিয়ামের ক্ষয় হয়েছে। চলো, আমরা বরং সামনের দিকে এগিয়ে কোনো ডাব বিক্রেতার খোঁজ করি। আমার প্রস্তাবটা কিসমিস যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও জাপটে ধরে বলল, তা মন্দ বলনি। কিসমিসকে তার বাল্যসুলভ সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা কক্ষচ্যুত করতে পেরে আমি মনে মনে স্বস্তি অনুভব করে দ্রুত ওর খালি হাতটা ধরে সামনের দিকে পা বাড়াতে উদ্যত হলাম। কিন্তু কিসমিস কালক্ষেপণ না করে বলে উঠল- তবে এ বয়ামবন্দি ফলটির কী হবে?

আমি বললাম- ওটি বরং তোমার বাড়ির কোনো স্থানে শোপিস হিসেবে রেখে দিও। কিসমিস এবার কোনো আপত্তি না জানিয়ে আমার সঙ্গে এগোতে লাগল। আমি বললাম- দোস্ত, বাজারের ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ-মাংস বা নানা খাদ্যদ্রব্যেই শুধু নয়, আজকাল নাকি নানা ধরনের প্রসাধন সামগ্রীতে পর্যন্ত বিষাক্ত ভেজালের সন্ধান পাওয়া গেছে।

-তাছাড়া কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করে রোগীদের জীবন নিয়ে কানামাছি খেলছে বলেও অভিযানে ধরা পড়েছে। কিসমিস কথাগুলো বলে সামনের একজন ডাব বিক্রেতার দিকে আমাকে নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে আবার বলল- দোস্ত, তবে পাকা ডাবের চেয়ে কাঁচা ডাবের চাহিদা বেশি হওয়ায় অকালে ডাব পাকানোর কোনো কুব্যবস্থা আছে বলে তেমন শোনা যায় না।

-আমি বললাম- ডাবের পানি বিশুদ্ধ হলেও বাজারের কিছু কিছু বোতলজাত খাবার পানিতে অসংখ্য ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে দল বেঁধে জলকেলি করার দৃশ্য গবেষণাগারে প্রমাণিত হয়েছে, তা নিশ্চয় জানো।

-হাঃ হাঃ হাঃ... তা জানি বৈকি। কিসমিস সহাস্যে জবাবটা দিয়ে আমাকে সঙ্গে নিয়ে এবার ডাব বিক্রেতার সামনে হাজির হলো।

-যা হোক, আমরা দু'জনে প্রায় পৌনে এক গল্গাস করে পানিভর্তি দুটি ডাবের পাকস্থলী শূন্য করে সামনের রাস্তার ধারের একটি কাঁচা-পাকা বাজারে ঢুকে পড়লাম। শুরুতেই লক্ষ্য করলাম, মৌসুমি-আধা মৌসুমি আর অমৌসুমির নানা তথাকথিত টাটকা ফলের পসরা সাজিয়ে ব্যবসায়ীরা বসে আছেন। আরও ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম নানা শাক-সবজির সমারোহ। অকালেই লাল টকটকে টমেটোগুলো যেন আমাদের দেখে খিলখিলিয়ে হাসছে। বিভিন্ন প্রজাতির শাক-সবজিতে ব্যবসায়ীরা কিছুক্ষণ পরপর দমকল বাহিনীর কর্মীদের মতো পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। আমরা নাট্যশালার নীরব দর্শকের মতো আরও ভেতরে প্রবেশ করে মাছের মজলিসে হাজির হলাম। লক্ষ্য করলাম, হাইব্রিডে উৎপাদিত বিশাল আকৃতির কৈ আর মাগুর মাছগুলো গামলার পানিতে মনের আনন্দে যেন বেলিনৃত্য প্রদর্শন করে চলেছে। আমি বললাম-

-দোস্ত উচ্চ ফলনের প্যানাল্টি শটে নিম্ন ফলন আজকাল যেন নিম্নজাতে পরিণত হয়েছে। কিসমিস আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওর হাতের বয়ামটি শূন্যে তুলে খানিকটা পরখ করে নিয়ে সামনের একটি দৃশ্য লক্ষ্য করতে ইঙ্গিত দিল। আমি লক্ষ্য করলাম, একজন মৎস্য ব্যবসায়ী কাটা মাছের টুকরোর লাল রক্ত মুঠোয় ভরে পাশের আস্ত মাছগুলোর মুখে ও গায়ে মালিশ করে দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে কিসমিসের দুই ঠোঁটের কোণে সদ্য উদিত চাঁদের মতো এক ফালি হাসি দেখা দিয়ে মুহূর্তেই তা যেন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেল। আমি বললাম-

-দোস্ত এবার চল মাংসের অবস্থাটা অবলোকন করি।

- তাই চলো। কিসমিসের ত্বরিত সম্মতিতে আমি উদ্বেলিত হয়ে আরও খানিকটা ভেতরে গিয়ে লক্ষ্য করলাম- গরু, খাসি, ভেড়ার নানা সাইজের ঝুলন্ত মাংসপিণ্ড। সেখানেও জল ছিটানোর সূক্ষ্ণ কার্যকলাপ আমাদের চোখে পড়ল। কিসমিস বলল-

-দোস্ত, দেশে গরু-ছাগল মোটাতাজাকরণের বিষাক্ত ওষুধ ভোক্তাদের শরীরে যে মারাত্মক ক্ষতি করে, তা তো নিশ্চয় জানো। কিন্তু দেখার কেউ নেই। সংশ্লিষ্টজনরা নিজেদের পকেট মোটাতাজাকরণের ধান্দায় মশগুল।

-আমি বললাম- শুধু তাই নয়। হাইব্রিডের নাদুস-নুদুস আর অলস মোরগ-মুরগিগুলোও যে স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়, তাও প্রমাণিত হয়েছে।

-কিসমিস বলল- অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফলমূলে কার্বাইড, মুড়িতে ইউরিয়া, রঙিন মিষ্টিতে কাপড়ের রঙ, নিম্নমানের বেকারিপণ্যে পচা ডিম আর পশুর চর্বি, ফুটপাতের খাবারে পোড়া তেল, আর মবিল, তাছাড়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক নানা ফলমূলকে বিষাক্ত কেমিক্যাল গ্যাস চেম্বারে রিমান্ডে এনে মুহূর্তে পাকনা করা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি আহা রে। চারদিকে যেন ...

-তাইরে নাইরে না! তাইরে নাইরে না অবস্থা। কিসমিস তার বাদ্যযন্ত্রহীন সুরেলা সংলাপটির ইতি টানতে টানতে আমাকে নিয়ে বাজার থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। আমি বললাম- দোস্ত এসব ভেজাল মিশ্রিত পণ্য থেকে নিজেদের রক্ষা করার কোনো চিন্তা কি তোমার অতিপ্রবীণ মগজে কোনো ঢেউ তুলেছে?

-হুম, সচেতনতা আর সততা। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতা আর ভোক্তা উভয়কেই ভূমিকা নিতে হবে। পরামর্শটা পরিবেশন করে কিসমিস আরও একবার হাতের বয়ামটি শূন্যে দুলিয়ে বলল-

-দোস্ত অনেক বেলা হয়েছে। চলো, এবার ঘরে ফেরা যাক। আমি কিছু না বলে নিঃশব্দে ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

সাবেক ডেন্টাল সার্জন, বিডিআর হাসপাতাল, ঢাকা


মন্তব্য যোগ করুণ