জোট রাজনীতির ইতিবৃত্ত

সাম্প্রতিক

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৮

জোট রাজনীতির ইতিবৃত্ত

  মহিউদ্দিন খান মোহন

নির্বাচন কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে বহুমত ও পথের রাজনৈতিক দল মিলে জোট গঠনের ইতিহাস নতুন নয়। আমাদের এ উপমহাদেশে তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক স্বার্থে ফ্রন্ট বা জোট গঠনের কথা ইতিহাসের পাতা উল্টালেই পাওয়া যায়। বিশেষ কোনো আন্দোলনের ইস্যুতে যেমন রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে জোট বা মোর্চা গঠন করে, তেমনি নির্বাচনকেন্দ্রিক জোটও গঠিত হতে দেখা যায়। তবে ইতিহাস বলে যে, এ ধরনের জোট খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ইস্যুর সমাপ্তি কিংবা অংশীদার দলগুলোর মধ্যে স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট মতবিরোধের কারণে একসময় তা ভেঙে যায়।

আমাদের দেশে প্রথম রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্য মুক্তি পেয়ে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অল্পদিনের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করে ইচ্ছামতো রাষ্ট্র পরিচালনার কারণে সৃষ্টি হয় গণক্ষোভের। পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার জনগণ নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়। এ ঐক্যের রূপকার ছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে তারা প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তফ্রন্ট। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি আর মওলানা ভাসানী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। শেরেবাংলা ছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ দুটি দল ছাড়াও নেজামে ইসলাম পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও খেলাফতে রাব্বানী পার্টি যুক্তফ্রন্টের শরিক দল হিসেবে ছিল। তবে যুক্তফ্রন্ট হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট নামেই মূলত পরিচিতি পেয়েছিল। সে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের ৩০৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছিল ১৪৩টি আসন। শেরেবাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টি ৪৮, নেজামে ইসলাম পার্টি ১৯ এবং গণতন্ত্রী পার্টি পেয়েছিল ১৩টি আসন। অন্যদিকে মুসলিম লীগ পেয়েছিল মাত্র ৯টি আসন।

আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ রকম একটি রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে ঠেকানোর পরিকল্পনা থেকেই সে জোট গঠিত হয়েছিল। মূলত ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ইন্দিরা সরকার কর্তৃক ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিবাদেই ওই রাজনৈতিক মোর্চার আবির্ভাব ঘটেছিল। মূলত চারটি রাজনৈতিক দল মিলে সে জোট গঠিত হয়েছিল। দলগুলো ছিল ইন্দিরা মন্ত্রিসভার সদস্য জগজীবন রামের নেতৃত্বে বেরিয়ে আসা কংগ্রেসের একটি অংশ, ভারতীয় জনসংঘ, ভারতীয় লোকদল এবং সমাজতান্ত্রিক পার্টি। জোটটির নাম দেওয়া হয়েছিল জনতা পার্টি। এ জোট গঠনের নেতৃত্বে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, বিজ পটনায়েক, রাজনারায়ণ, সত্যেন্দ্র নারায়ণ সিনহা, জেবুতি রাম কৃপালিনী ও মোরারজি দেশাই। ১৯৭৭ সালের ১৬ থেকে ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনতা পাটি (জেএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ইন্দিরা গান্ধী ও তার পুত্র সঞ্জয় গান্ধী উভয়েই পরাজয় বরণ করেন। মোরারজি দেশাই হন ভারতের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। সে সরকারও মেয়াদপূর্ণ করতে পারেনি। শরিকদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ, কোন্দল, সরকার পরিচালনায় দেশাইয়ের ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে দুই বছরের মধ্যে সে সরকারের পতন ঘটে। পরের নির্বাচনেই ক্ষমতায় ফিরে আসেন ইন্দিরা গান্ধী।

আবার দেশের দিকে তাকাই। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, অধ্যাপক মেজাফ্‌ফর আহমদের ন্যাপ ও মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির একটি জোট হয়েছিল। সে জোটের শেষ পরিণতি ছিল ১৯৭৫ সালে গঠিত বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশালে বিলীন হওয়া। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুটি জোট গঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাগদল, মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ন্যাপ (ভাসানী), কাজী জাফর আহমেদের ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, শাহ আজিজুর রহমানের মুসলিম লীগ, মাওলানা মতিনের লেবার পার্টি ও রসরাজ মণ্ডলের তফসিলি জাতি ফেডারেশন সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো গঠন করেছিল গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট, যা সংক্ষেপে 'গজ' নামে পরিচিত ছিল। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন জিয়াউর রহমান আর গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট মনোনীত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীকে (অব.)। নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটাধিক্যে জয়ী হন। পরে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টকে জাতীয়তাবাদী দলে পরিণত করেন।

নির্বাচন ছাড়াও রাজনৈতিক ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে জোট বা মোর্চা গঠনের নজির রয়েছে। এর মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ১৫ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত ৭ দলীয় জোট উল্লেখযোগ্য। অবশ্য ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে ১৫ দলীয় জোট ভেঙে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তখন ৮টি দল থাকে। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৫ ও ৭ দলীয় জোটেরও অবসান ঘটে। ওই দুই জোটের দুই প্রধান দল নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়। ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট সমন্বয়ে গঠিত হয় চারদলীয় জোট। এক পর্যায়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি জোট ছেড়ে গেলেও নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে একটি অংশ জোটে থেকে যাওয়ায় চারদলীয় জোটের অবয়ব অক্ষুণ্ণ থাকে। এ চারদলীয় জোট ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভ করে। বিএনপি জোটের শরিকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সরকার গঠন করে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বোধ করি চারদলীয় জোটই সবচেয়ে দীর্ঘজীবী জোট। ২০১০ সালে এসে এ জোট আরও দলকে সংযুক্ত করে প্রথমে ১৮ দলীয় জোট এবং পরে ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়, যা এখনও আছে।

অন্যপক্ষে আওয়ামী লীগও জোটের রাজনীতির দিকে এখন বেশ ঝুঁকেছে। প্রথমে তারা সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ১৪ দলীয় জোট গঠন করে, পরে সেটাকে রূপ দেয় মহাজোটে। মহাজোট নির্বাচনী জোট। যে জোটের অংশীদার হিসেবে জাতীয় পার্টি সরকারের ভাগ পেয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বামপন্থি দলগুলো মিলে বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা করেছে, ইসলামী দলগুলোও ভিন্ন ভিন্ন নামে জোট করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

বড় দলগুলো জোট তথা ছোট দলগুলোর ওপর কেন এমন নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তা নিয়ে মতান্তর থাকতেই পারে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, বড়রা তাদের শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে, ছোট দলগুলোর সমর্থন-সহযোগিতা ছাড়া বড় দলগুলো যেন পা ফেলতেও ভয় পায়। আর তাই শক্তির দিক থেকে নগণ্য হলেও ওই নামসর্বস্ব দলগুলো বড় দলগুলোর কাছে গণ্যমান্য হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। এতে জোটের নেতৃত্বদানকারী দলের কতটুকু লাভ হচ্ছে, তা বোঝা না গেলেও শরিক দলগুলোর নেতাদের লাভটা খালি চোখেই দেখা যায়। তারা বিনা পুঁজিতে ব্যবসাটা বেশ ভালোই করে। নিজের দল থেকে নির্বাচন করলে যার জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা, জোটের ভাগীদার হওয়ার কারণে সে সংসদ সদস্য, এমনকি মন্ত্রীর পদেও আসীন হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও বেশ আলোড়ন তুলেছে। ইতিমধ্যে তারা সিলেট ও চট্টগ্রামে বড় ধরনের সমাবেশ করেছে। তারা সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তাদের দাবি মেনে নিতে। না হলে তারা সর্বাত্মক আন্দোলনে যাবে। সরকার যদি তাদের দাবি মেনে নাও নেয়, তবু তারা নির্বাচনে যাবে- এমন ধারণা করছেন অনেকেই। আর নির্বাচনে গেলে তারা যে জোটবদ্ধভাবেই যাবে, সেটা না বললেও চলে। তাহলে দেশবাসী আবার একটি জোটবদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখতে পাবে। সে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে চলমান জোট রাজনীতির সবশেষ পরিণতি।

জোটবদ্ধ রাজনীতির বর্তমান হাল-হকিকত থেকে এটা অনুমান করা যায়, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটি নিজেদের শক্তির ওপর বোধ করি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। সে জন্য তারা নামগোত্রহীন দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হচ্ছে। আওয়ামী লীগ অবশ্য জোট-মহাজোট করলেও রাশটা তাদের হাতেই রেখেছে। আর তার ফলে শরিকরা আছে নট নড়ন-চড়ন অবস্থায়। কিন্তু বিএনপির অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অংশীদার হতে গিয়ে তারা তাদের দৈন্যদশাকেই প্রকটভাবে প্রকাশ করেছে। দলটির এ অবস্থা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। দলটির শুভানুধ্যায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন, তারা কি এতটাই হীনবল হয়ে পড়েছে যে, ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সরদারদের সেনাপতি মানতেও তারা দ্বিধা করছে না!

আমাদের এই উপমহাদেশের জোটভিত্তিক রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত রয়েছে, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কি আছে? কারণ কার সুতোয় কখন যে টান পড়ে, কেউ জানে না। আর এখন তো চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। একদিকে জোট গড়ে উঠছে, অন্যদিকে ভাঙছে। জন্ম নিচ্ছে নতুন জোট। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এ খেলা বোধ করি চলতেই থাকবে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক


মন্তব্য যোগ করুণ