বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে ভাবতে হবে

প্রকাশ : ০৬ মে ২০১৮

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দেশে। একসময় বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি গবেষণার পর্যায়ে ছিল। তবে গবেষণাগুলোর সমন্বিত কোনো ফলাফল না থাকায় বায়ুবিদ্যুতের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া উচ্চমানের গবেষণার মাধ্যমে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগের বিষয়টি আগে সেভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে মানুষ ধরেই নিয়েছিল এর কোনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নেই। তবে এখন আবার এটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। কিন্তু সারাবিশ্বে বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলেছে। ২০০০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে বাতাসের গতিবেগকে ব্যবহার করে ১৭ হাজার মেগাওয়াট থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে চীন বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে নিজস্ব পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিভিন্ন অঞ্চলকে বিশ্নেষণ করে টারবাইন স্থাপনের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র যেহেতু পরিবেশবান্ধব, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চীন বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হয়ে এখন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে এই বায়ুশক্তিকে ব্যবহার করে। শিল্প বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দেন যে, যদি এই গতিবৃদ্ধি চলমান থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ চাহিদা বায়ুশক্তি দ্বারা পূর্ণ হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে অন্তত ৫ ভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হলেও এ সময় পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে ৪০৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে, যা ৮০০ মেগাওয়াট হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বায়ুশক্তি উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১.৯ মেগাওয়াট, যা তুলনামূলকভাবে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো থেকে অনেক কম।

সাম্প্রতিককালে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনার বিষয়টি যাচাই শেষে ৯টি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বায়ুবিদ্যুতের মানচিত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বায়ু মানচিত্র বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, এই নয়টি এলাকার বাতাসের গতিবেগ ৫ থেকে ৬ মিটার/সেকেন্ড। আমেরিকার ন্যাশনাল রেনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরি এই গবেষণাগুলো সর্বনিম্ন ২৪ থেকে ২৩ মাসের গড় বায়ুর গতিবেগের ফলাফল বিশ্নেষণ করে এই ধারণায় উপনীত হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো অঞ্চলের বায়ুর গড় গতি কমপক্ষে ৬-৮ মিটার/সেকেন্ড যদি বজায় রাখা যায়, তবে ছোট বায়ু টারবাইন ব্যবহার করলে তা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে। আবার কোনো কোনো গবেষণায় বলা হচ্ছে ২.৫ মিটার/সেকেন্ড গতিবেগের বায়ু ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের বায়ুর গতিবেগ এর থেকে বেশি। যদিও বায়ুর গতিবেগের বিষয়টি ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর কমবেশি হতে পারে। কোনো কোনো গবেষণায় বলা হচ্ছে, যদি বায়ুর গতিবেগ কোনো অঞ্চলে ১০ মিটার/সেকেন্ড থাকে তবে সেখানে একটি টারবাইন থেকে ১০ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু বিদেশিদের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের বায়ুশক্তিকে গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে আরও বেশি কার্যকর করা যায় সে ভূমিকা রাখতে হবে। বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে ভারত ও চীনের পরিকল্পনাকে এ জন্য অনুসরণ করা যেতে পারে। এই গবেষণায় শুধু ৯টি অঞ্চলের বায়ুর গতিবেগকে বিশ্নেষণ করে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই সম্ভাবনাগুলো সৃষ্টি করার লক্ষ্যে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ধরনের গবেষণায় আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো উচ্চতার সঙ্গে বায়ুর গতিবেগের একটি সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই কোন উচ্চতায় টারবাইনগুলো স্থাপন করতে হবে, সে বিষয়েও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সুবিধা হচ্ছে, এখানে ১২০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা রয়েছে। এই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বায়ুর গতিবেগ স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। কাজেই উপকূলীয় এলাকার বায়ুর গতিবেগকে গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহার করে বায়ুশক্তি উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বায়ুর গতিবেগ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে মার্চ থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বায়ুর প্রবাহ বেশি থাকে। আবার উত্তরাঞ্চলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বায়ুর প্রবাহ ভালো থাকে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে কোন ধরনের ম্যাটেরিয়ালের তৈরি টারবাইন বেশি উপযোগী হবে, সে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারী ম্যাটেরিয়ালের পরিবর্তে হালকা ম্যাটেরিয়াল ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। যদি হালকা ম্যাটেরিয়ালের গুণগতমান ও বিভিন্ন ধর্ম ভারী ম্যাটেরিয়ালের কাছাকাছি, সমান বা তার থেকে বেশি রাখা যায়, তবে স্বাভাবিক কারণেই মানুষ হালকা ম্যাটেরিয়ালের দিকে ঝুঁকবে। এ ধরনের উচ্চমানের হালকা ম্যাটেরিয়াল তৈরির বিভিন্ন গবেষণা বিশ্বব্যাপী চলছে। এ ক্ষেত্রেও দেশীয় কাঁচামালের ব্যবহার ও বিজ্ঞানীদের কাজে লাগানো উচিত।

বর্তমান সময়ে ফাংশনাল ম্যাটেরিয়ালের ধারণা অর্থাৎ কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী সে কাজের উপযোগী ম্যাটেরিয়াল প্রয়োগ করে প্রযুক্তিকে কোনো একটি বিশেষ কাজে ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। যেমন- শব্দদূষণের ক্ষেত্রে শব্দ নিরোধক ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আবার ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোন ধরনের ম্যাটেরিয়াল এ ধরনের বিপর্যয়কে রোধ করতে পারে, তা আবিস্কার করা গেছে। একইভাবে পেট্রোলিয়াম ও কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো কোন ধরনের ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি করলে এটি অগ্নি প্রতিরোধক ও যে কোনো বিস্টেম্ফারণ সহ্য করতে পারে, তাও আবিস্কৃত হয়েছে। এ ধরনের ধারণা আমরা বায়ুশক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- বায়ুর গতিবেগ কম থাকলেও কোনো একটি ম্যাটেরিয়াল তার নিজস্ব গুণাগুণের কারণে এই কম গতির বায়ুকে ব্যবহার করেও নিজের গতিবেগ বাড়িয়ে বেশি পরিমাণ বায়ু উৎপাদন করতে পারবে। অন্যান্য সম্পদের মতো বায়ুও জাতীয় সম্পদ। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে এই কাজে উদ্ভাবনমুখী তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করা যেতে পারে। তারা কীভাবে বায়ুশক্তিকে বাড়ানো যায় এবং এর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের বিষয়গুলো দেখবে। অনেক ধরনের নতুন ভাবনা বায়ুশক্তিকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। টারবাইন ব্লেডের চারপাশে স্টিয়ারিং এরোফয়েল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্লেডের ঘূর্ণমান গতির বেগ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এরোফয়েল হচ্ছে ব্লেডের পৃষ্ঠতলগুলো এমনভাবে বাঁকানো, যাতে তা অধিক পরিমাণে বায়ুকে গ্রহণ করতে পারে।

বৃষ্টির পানিকে ধরে রাখার মতো এটিও বায়ুকে ধরে রাখার প্রক্রিয়া, যা হার্ভেস্টিং পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কানাডায় নতুন একটি প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে, যেটির নাম তারা দিয়েছে ভ্যারিয়েবল ইনডাকশন ইলেকট্রিক জেনারেটর, যা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বায়ুশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। আমরা নদীভাঙনের কথা জানি, ব্লেড বা পাখাগুলোতেও এ ধরনের ক্ষয় হতে পারে। কিন্তু এই টারবাইন ব্লেডগুলো যখন বাতাসে ঘুরতে থাকে তখন বাতাসের বিভিন্ন উপাদান ও অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু বা প্রাণীর আঘাতে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জার্মানি এটি সমাধান করার জন্য এক ধরনের দড়ি দিয়ে ওঠা রোবট তৈরি করেছে। এই রোবটগুলোর সঙ্গে ক্যামেরা ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি লাগানো থাকে, ফলে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সেগুলো দ্রুত শনাক্ত করে সমাধান করা যায়। আমেরিকা ভাসমান বায়ু টারবাইন ব্যবহারের দিকে নজর দিচ্ছে এবং এ জন্য তারা পানিতে ভাসমান কাঠামোর বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। জাতীয় বায়ুবিদ্যুৎ নীতি প্রণয়ন করে এর আলোকে বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করে এর সফল বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব উইন্ড এনার্জি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ দেশের মেধাবী তরুণদের রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য স্কলারশিপের মাধ্যমে প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিকল্প  শক্তির উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্ব প্রদান করেছেন। যদি আমরা আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে বায়ুশক্তিকে ব্যবহার করতে পারি, তবে বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে এটি ব্যবহূত হয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
asadzmn2014@yahoo.com


মন্তব্য যোগ করুণ