পূর্ব বাংলার নদীসংকুল অশোক মিত্র

  প্রতিম বসু

২০১২ সাল। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষ উদযাপন চলছে। ভারতে সরকারি উদ্যোগে, দেশে-বিদেশে নানা ভাষাভাষীর ভেতর রবীন্দ্র-চেতনা প্রসারের কাজ চলছে পুরো দমে। গান, কবিতা, নাটক, ভাষণ, যা যা হওয়ার কথা সবই হচ্ছে। এমন সময় 'ফ্রন্টলাইন' পত্রিকায় অশোক মিত্রের একটি লেখা বেরোল- যার মূল কথা, এই সমারোহের ফল হবে একটি অশ্বডিম্ব। লেখকের মতে, রবীন্দ্র-দর্শন একালের পশ্চিমকে আর তেমন আকর্ষণ করে না। কিছু ছোটগল্পের আবেদন থাকতে পারে; কিন্তু উপন্যাস প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। আর বাংলা না জানলে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মর্মোদ্ধার সম্ভব নয়। কারণ বাংলা ভাষার চরিত্রগত কারণে অনুবাদে তার রস হারিয়ে যায়।

অন্য কেউ এ কথা বললে কী হতো জানি না। কিন্তু অশোক মিত্রের বয়স তখন প্রায় ৮৪। স্রোতের বিরুদ্ধে তার কথা বলা ততদিনে বোধ হয় সবাই মেনে নিতে শিখেছিল। এটাও মানতে শিখেছিল যে, অশোক মিত্রকে কোনো নিয়ম দিয়ে বাঁধা যায় না। তিনি নিজেই একটা নিয়ম। ঠোঁট কাটা, একাকী ও একবগগা। যাকে আমরা 'ভদ্রতা' বলি অর্থাৎ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কথা গিলে নেওয়া, তাতে সরব আপত্তি। তার নিজের কথায়, 'আমি ভদ্রলোক নই।' ৯০ বছর বয়সে মে দিবসে প্রয়াণের দিন অবধি তাই ছিলেন। কথা বলবেন বলেই ১৯৮৭ সালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রীর পদ দুই-ই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ইংরেজি ও বাংলা দুটি ভাষাতেই সুলেখক, কবি, শিল্প সমঝদার, ক্রিকেট উৎসাহী এবং অবশ্যই 'কমিউনিস্ট' ইত্যাদি বহুবিধ পরিচয়ের বাইরে অশোক মিত্রের অনন্যতা বোধ হয় লুকিয়ে আছে তার এই স্বাধীন চেতনায়, যার হুলের হাত থেকে কারও রেহাই নেই। একই সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর অনুরাগী, স্নেহধন্য এবং কড়া সমালোচক।

বড় হয়েছেন পূর্ববঙ্গে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৪৮ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে কলকাতায় আগমন। নিজের অদম্য ব্যক্তিসত্তাকে গড়ে দেওয়ার জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন ওপার বাংলার 'নদীসংকুল, হাওয়াতে দীর্ণ, বৃক্ষরাজিতে পর্যুদস্ত' প্রকৃতিকে। একই সঙ্গে জানিয়েছেন ঢাকা শহরের জন্য 'কোনো আলাদা কাতরতা' বোধ করেন না (আপিলা-চাপিলা)। একবারও ভাবেননি সে শহরে তার অগণিত অনুরাগী কী ভাববে। আবার ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা থাকাকালীন ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা দুই অর্থনীতিবিদকে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত সচিব পি এন হাকসারের কাছে। তার কথায় 'সেই সন্ধ্যা থেকেই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে সহায়তায় ভারত সরকারের সংগোপন প্রত্যক্ষ ভূমিকার শুরু।'

চাকরি জীবন

ইতিহাস বলে, বেশিদিন কোথাও থিতু হননি। পদ ও প্রতিষ্ঠা ছেড়েছেন হেলায় এবং তার মাঝেই রচনা করেছেন নতুন ইতিহাসের। কলকাতার বিদ্বৎসমাজে অশোক মিত্রের মতো উদাহরণ কমই আছে, যিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েননি। কোনো অজানা কারণে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। এরপর বছর দুয়েক দিলিল্গ স্কুল অব ইকোনমিক্স ও লক্ষেষ্টৗ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা সেরে হল্যান্ডে রট্যারডাম ইউনিভার্সিটি থেকে, অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার জয়ী, টিম্বারগেনের অধীনে ডক্টরেট। এরপর দেশ-বিদেশে নানা চাকরি। কখনও দিলিল্গর অর্থ মন্ত্রণালয়ে অস্থায়ী আমলা, ব্যাংককে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে যোগ, ওয়াশিংটন ডিসিতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক স্থাপিত (চালিত না) ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা, সেখান থেকে কলকাতায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ঘুরে নবগঠিত এগ্রিকালচারাল প্রাইসেস কমিশনের চেয়ারম্যান। কমিশনের একটা বড় কাজ ছিল, চাল ও গমের ওপর নূ্যনতম সহায়ক মূল্য ঠিক করা, ভারতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যার গুরুত্ব অপরিসীম। এখান থেকেই ১৯৭০ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ।

আপাতদৃষ্টিতে মোহভঙ্গের দুটি মূল কারণ, সে সময়ে ইন্দিরার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ও তাকে কেন্দ্র করে দিলিল্গর আমলাতন্ত্রের তল্পিবাহক মানসিকতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং অর্থনীতির রূপরেখা নিয়ে মতানৈক্য। ১৯৬৯ সালে ভারতে ব্যাংক জাতীয়করণ হয়। আজকের উদার অর্থনীতির যুগে অস্বাভাবিক মনে হলেও অশোক মিত্র চেয়েছিলেন বড় ব্যবসাদার ও কৃষকের ওপর ব্যাংক ২৫-৩০ শতাংশ হারে সুদ আদায় করুক আর ছোট ও ভূমিহীন চাষি ইত্যাদিকে কম সুদে ঋণ দিক। এ ব্যবস্থা চালু হলে ভারতের অর্থনীতি কী দাঁড়াত, সে নিয়ে আজ আর আলোচনার সুযোগ নেই। তবে তার নিজের কথায়, ব্যাংকের কর্তাদের চোখ কপালে উঠেছিল। সন্দেহ হয়, তার মতের ব্যবহারিক অসুবিধা হয়তো নিজেও বুঝতেন। নইলে পরে আত্মজীবনীতে রসিয়ে বলবেন কেন, বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রী, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকারদের নামমাত্র সুদে ঋণ দিতে চেয়েছিলেন।

মন্ত্রী জীবন

দিলিল্গতে আমলাতন্ত্রের চাপে অশোক মিত্র যা করতে পারেননি, ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসু সরকারের অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর কিন্তু সেটা অনেকটাই পুষিয়ে নিয়েছিলেন। বস্তুত বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছর শাসনকালের মূল অর্থনৈতিক রূপরেখা তার হাতেই তৈরি। এর মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল, রাজ্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি, যার সুফল পেয়েছে সারাদেশ। ১৯৭৭ সাল অবধি দেশে কংগ্রেসের একচেটিয়া প্রভাব ছিল। ফলে অঙ্গরাজ্যগুলো মূলত কেন্দ্রের সুরে সুর মেলাত। জরুরি অবস্থার পরে, ইন্দিরা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। অশোক মিত্র এই সময়ে তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যের প্রাদেশিক শক্তিদের সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে জোরালো সওয়াল শুরু করেন। এ সওয়ালে কাজ হয়েছিল। ১৯৮০-র দশকের শেষে এসে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস হয়।

এ ছাড়া রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কর আদায় বাড়ানো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের বেতন কমিশন তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে অশোক মিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। নিজে একসময় আমলা ছিলেন বলেই বোধ হয় রাজনৈতিক প্রভুত্বের দর্শনকে পুরোপুরি স্বীকার করতেন না। বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার যে রাজ্যে ছোট জেলা তৈরি করছে, এটা তারই সুপারিশ ছিল। সব সুপারিশ বামপন্থি সরকার মেনেছে, তা নয়। ভিআইপি সংস্কৃতি তুলে দিতে চেয়েছিল। কেউ মানেনি। মন্ত্রিসভার সব থেকে কড়া বামপন্থিরাই লালবাতিওয়ালা গাড়ির জন্য সব থেকে বেশি সওয়াল করেছিল। 'চিট ফান্ডে'র লোক ঠকানো ব্যবসার বিরুদ্ধেও তিনিই প্রথম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ফলে সে সময়ের রমরমিয়ে চলা 'সঞ্চয়িতা ইনভেস্টমেন্ট' কোম্পানিতে তালা ঝুলেছিল। নিশ্চিত করেই বলা যায়, এতে কিছু তাৎক্ষণিক ক্ষতি হলেও ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতি এড়ানো গিয়েছিল এবং এর পরে দুই দশক জ্যোতি বাবুর শাসনকালে, রাজ্যে চিট ফান্ড আর মাথা তুলতে পারেনি। মুশকিলের মধ্যে সে সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা টাকা খুইয়েছিল, তারা অশোক মিত্রকেই দোষী ঠাউরেছিলেন। ফলে ১৯৮২ সালে রাসবিহারী কেন্দ্রে হার। কিছুদিন পরে অবশ্য যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে আবার মন্ত্রিসভায় আসেন। তবে নিজের মতামতের প্রতি এতটাই বিশ্বাস ছিল যে, অনেক সময় তা গোঁড়ামির পর্যায়ে চলে যেত। 'আপিলা-চাপিলা'র সূত্র টেনে বললে ওটাই হয়তো তার 'ফ্যাচাং' (ফ্যাশন) ছিল। মন্ত্রী থাকাকালীন একবার দুই মাসের জন্য পড়াশোনার কাজে নরওয়ে যেতে চান। মুখ্যমন্ত্রী ছুটি দিতে রাজি। কিন্তু অশোক মিত্র মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন। কারণ সরকারি নিয়মে এই প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সই চাই। আর অশোক মিত্র মনে করেন রাজীব নিরক্ষর; তাই সই নেবেন না। বিদেশ থেকে ফিরে আবার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। স্ববিরোধিতাও ছিল। একই মানুষ যিনি, জ্যোতি বাবুর আমলাদের সম্পর্কে 'যা বলব তাই শুনবে' মনোভাবের সমালোচনা করেছেন; তিনিই বিভাগীয় সচিবের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন। কট্টর মতামতের কারণেই শেষ পর্যন্ত সরকার ও পার্টি ছেড়ে যান। অর্থনীতির স্বার্থে সে সময়ে জ্যোতি বাবু পুঁজি সম্পর্কে নরম মনোভাব নিচ্ছেন, যা অশোক মিত্রের না পছন্দ। এর মাঝেই তিনি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষদের রোষে পড়লেন। সেখানে আবার পার্টির রমরমা। মিত্রের ইচ্ছা, গুণগত মানের তফাতের জন্য সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও বলিষ্ঠ অধ্যাপককে বেশি মাইনে দেওয়া। শেষ অবধি সরকার বেসরকারি কলেজের পক্ষেই রায় দেয়। অশোক মিত্র সরকার ও পার্টি থেকে বিদায় নেন। তবে সদস্যপদ ছাড়লেও দলে তার গুরুত্ব ছিল বহু বছর। শিক্ষার বেহাল ব্যবস্থা নিয়ে রিপোর্ট দিয়েছিলেন ১৯৯২ সালে। পরের বছর ১৯৯৩ সালে রাজ্যসভার জন্য মনোনীত হন। বিতর্ক পিছু ছাড়েনি কোনোদিন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকার ২০০৫ সালে 'ভ্যাট' কর ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানালে মিত্র এর বিরোধিতা করে হাইকোর্টে মামলা ঠুকে দেন। পেছনে ছিল দলের গোঁড়া অংশের সমর্থন। বক্তব্য : এই কর দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার পরিপন্থী, এতে রাজ্যের ক্ষমতা কমবে। তার মতে চললে আজ দেশে জিএসটি নামক এক কর ব্যবস্থা হতো না।

লেখক অশোক মিত্র

চাকরি, রাজনীতি, ঝগড়া-বিবাদ এসবের মাঝেই ছিলেন আরেক অশোক মিত্র। যিনি দলগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে একজন সংবেদনশীল লেখক। কত বই লিখেছেন, তার সঠিক হিসাব আমার কাছে নেই। ১৯৮৩ সালে বেরোনো 'ছবি কাকে বলে' বইয়ের মুখবন্ধে একক কৃতিত্বে লেখা ২৩টি বইয়ের নাম আছে। ২০১৪ সালের একটি হিসাবে দেখলাম, শুধু বাংলা বই আছে ২০টি। এর মধ্যে মেরেকেটে কয়েকটিই পড়েছি, আর চমৎকৃত হয়েছি লেখার মুনশিয়ানায়। ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের শুরু, যখন তিনি দিলিল্গতে গুরুগম্ভীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, তখন কিছু ছোট ছোট লেখা লিখেছেন, যা কয়েক বছর পরে 'ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি'তে 'ক্যালকাটা ডায়েরি' শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয় এবং পরে বই হিসেবেও প্রকাশ হয়। ১৯৭২ সালের একটা লেখার অংশবিশেষ তর্জমা করার চেষ্টা করলাম :'গরিবগুরবো মানুষের কাছে মিটিং মানে দিনগত পাপক্ষয় থেকে ঘণ্টাকয়েকের মুক্তির আনন্দ। ওরা আসে, বারবার আসবে। অপরিস্কার মাঠে, নোংরা রুমাল কিংবা কাগজ পেতে বসবে। নেতারা যখন মঞ্চ থেকে কিউবার অভাবনীয় উন্নতির কথা বলবে, ওরা কুড়মুড়ে কিংবা বাদাম কিনে গপগপিয়ে খাবে।'

ভারতীয় সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ