সংযমের মাসে উৎকট অসংযম

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮

সংযমের মাসে উৎকট অসংযম

  আমিরুল আলম খান

শুক্রবার, ছুটির দিন। সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি আমার। যদিও বাংলাদেশে সরকারিভাবেই দু'দিন ছুটি থাকার কথা। তাই ছুটির দিনটি কাটে ঘর-সংসারের কাজ ও সাপ্তাহিক সামাজিক ব্যস্ততায়। সকালে উঠেই নাশতা-পানি মুখে দিয়ে ছুটতে হয় বাজারে। তরিতরকারি, মাছ-মাংস, মসলাপাতিসহ হরেক সওদাপাতি নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে ঘরে ফেরা। শুক্রবার জুমার নামাজ আর নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দিনটি ব্যস্তই কাটে অনেকের। ব্যস্ততা না থাকলে জীবনটা কেমন যেন ঝিমিয়ে যায়। ভালো লাগে না। আলস্য ভর করে। দীর্ঘতর হয় সময়। এক ধরনের অবসাদ গাঢ় হয়ে ভর করে মনের ওপর।

সপ্তাহের বাকি দিনগুলো কাটবে ভীষণ ব্যস্ততায়; যতটা কাজের চাপে, তার চেয়ে ঢের বেশি রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক থেকে। বৃহস্পতিবার বিকেলে অফিস থেকে বেরোতেই এক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো অফিস প্রাঙ্গণে। এমনই নট নড়নচড়ন জট বেঁধে গেল হরেক রকম যানের আগে যাওয়ার কসরতে। তেজগাঁও এলাকায় জ্যাম অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু যত না এই এলাকায় নিত্যচলা গাড়ি-রিকশা-ভ্যান-লেগুনার চাপে, তার চেয়ে ঢের বেশি মহাখালী-মগবাজার সড়কের ভীমজটে ছড়িয়ে পড়া রেশে। প্রধান সড়কের জট ছোট রাস্তাগুলো গিলে খায়। তার ওপর লাভ রোডে আহ্‌ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় জমে যায় বৃষ্টির ঢেউ খেলানো পানি। নাকাল হয়ে ওঠে জীবন।

সম্প্রতি আবার আকাশ ভেঙে কেয়ামতের আঁধার নামল রাজধানীতে। ভরদুপুরে নেমে আসা ঘনঘোর অন্ধকারে ঢেকে গেল রাজধানী ঢাকা। মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে অনেক পরীক্ষার্থীকে। অনলাইনে তা জেনে গেছে তামাম দুনিয়া।  এবারের বৈশাখে মাত্র দু'সপ্তাহে দু'বার এমন ঘনঘোর অমাবস্যা কেন ভরদুপুরে নেমে এলো, জানি না। কিন্তু আতঙ্কিত সারাদেশের মানুষ। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা মানেই স্বয়ং যম নেমে আসছে বজ্রবিদ্যুতের করাল মূর্তি ধরে। প্রতিদিনই মানুষ মরছে অপঘাতে। বজ্রাঘাতে মৃত্যু অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এই কেয়ামতি আঁধার নামা খেয়ালি আবহাওয়ায় বজ্রের শুধু গর্জন নয়; ২১ জন মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। মরছে গ্রামের খেটে খাওয়া কৃষক-মজুর বেশি। অনেকের আশঙ্কা, দেশে বায়ুদূষণের মাত্রাছাড়া বৃদ্ধিই নাকি এই দুর্যোগের প্রধান কারণ। তবে আমরা যে বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করেছি আর জমির সীমানা পিলার চুরি করে বিক্রি করে খেয়েছি; সেসবেরও নাকি হাত আছে এই মৃত্যুদূতকে মাটির পৃথিবীতে ডেকে আনায়।

শুক্রবার সকাল ৯টা বাজতেই ছুটলাম বাজারে। রিং রোডে কৃষিবাজারে গিয়ে আক্কেল গুড়ূম। বাজারে যেন আগুন লেগেছে। মাছ-মাংস, সবজি- সবকিছুই চড়া। সবচেয়ে টেক্কা দিয়ে বেড়েছে কুচি চিংড়ি। চারশ' টাকার এই ছোট চিংড়ির কেজি বেড়ে হয়েছে ৯শ' টাকা! আমার মাথায় বাজ পড়ল না তো? বাগদা, গলদার দাম জিজ্ঞেস করার সাহস নেই। আমরা যারা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ, ভেটকি (ঢাকা-চট্টগ্রামে কোরাল) তাদের পছন্দের। হলে কী হবে? যা দাম হাঁকে, নামই ভুলে গেছি। ভুলে গেছি পারশে মাছের স্বাদও। রূপচাঁদা হাজারের ওপরে চড়ে নামার নাম নেই। চুনোপুঁটিই এখন সাতশ'! ঢাকার বাজারে বোয়াল মেলে প্রচুর; আইড় কিংবা শোলও। ঢাকায় এখন সস্তা মাছের নাম পুকুরের কই, পাঙাশ আর মিয়ানমারের বড় বড় রুই। পুকুরের পাবদা, পাঙাশ, শিং, টেংরা, মাগুর, কই আলকাতরার রঙ পাওয়া দূষিত শীতলক্ষ্যা বা কোন লেগুনার কে জানে!

মাছের দোকানি দরাজ হলেন। স্বর নিচু করে বললেন, 'স্যার, মলা দেব তিনশ'তে, শুধু আপনাকেই।' আমি মুচকি হাসলাম। বাজারে 'শুধু আপনের জন্য এই দাম'- শোনেনি এমন হাটুরে গোটা বাংলায় নেই। ওটা ব্যবসার পয়লা পাঠ। মুরগির বাজার চড়েছে। তিনশ' টাকার মুরগি এখন চারশ'। কলার বাজারে আগুন লেগেছে। সবরি কলার হালি ৪০; ক'দিন আগেও পেতাম ২০ থেকে ২৫ টাকায়। পেঁয়াজু, বেগুনি ছাড়া ইফতার যেন জমেই না। তাহলে পহেলা রোজায় পেঁয়াজ, বেগুন কতোয় বিকোবে, খোদা মালুম।

আমার চিরচেনা দোকানিরা জানালেন, দাম বেড়ে গেছে স্যার। আগের দামে দিলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলবে। কিরে-কসম খেয়ে বলছি। তো রিকশাওয়ালাই-বা বসে থাকবেন কেন? তিনিও ১৫ টাকার ভাড়া হাঁকলেন ২০ টাকা। ভাবলাম, ৩৩ শতাংশ দাম বাড়াচ্ছেন। একবার বাড়াতে পারলে আর কমবে না কস্মিনকালেও। আমি বললাম, আমরা যে বিশের বিষে জ্বলে মরব, তার কী হবে? রসিক বাঙালির রঙ্গ ফুরায় না। বললেন, 'আপনেরাও রেট চড়িয়ে দিবেন, স্যার' বলে চোখ মেরে ফোকলা হাসলেন।

এই এক অবিশ্বাসের সমাজ আমাদের। সবাই নিজেকে সাধু বলে চালান দেয়, অন্যকে ভাবে বাটপার। খরিদ্দার চোর-বাটপার, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ না হয়েই পারে না। মুখে যতই স্যার, স্যার করুক, বুকের মধ্যে তার চোর-বাটপারের ছবি। তাই তাদের পকেটে ছুরি চালাও। অফিস-আদালত, হাট-বাজার- সবখানে খরিদ্দারের এ পরিচয়, সন্দেহের তিরে তিরে সে পাঁড় ক্রিমিনাল।

বুঝলাম, বেশি বুঝতে গিয়ে লাভ নেই। এ আগুন যে জ্বলবে, তা সবার আগে জানে সরকার বাহাদুর। তাই তারা হুঙ্কার ছাড়ছে আগে থেকেই। আগাম শুনিয়ে দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী, দক্ষিণ মেয়র। বাজার এবার মাল-সামানে ভরা। দাম বাড়ালেই বাজারি নীতির পাল্লায় নিজেকেই পথে বসতে হবে। না যদি শোনো কথা, তবে শুনে রাখো- দাম বাড়ালেই ভীষণ ভীষণ শাস্তি নিয়ে হাকিম সাহেবরা তৈরি হয়ে আছেন। কিন্তু কে শোনে কার সাবধানী! ওসব হুঙ্কার আগেও দেখেছি। রোজার মাসে আগেভাগেই মাল-সামানের দাম বাড়াও। তারপর তা জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েই যাও। এই এক মাসে যে ব্যবসা করব, তাই খাবো বাকি ১১ মাস। এই হলো বাংলার ব্যবসানীতি, আবহমান বাংলায় এটাই বঙ্গীয় বাণিজ্যের তরিকা।

রোজা বা সিয়াম সংযমের। সে তো ধর্মের আহ্বান। ব্যবসায়ী শোনাচ্ছেন- আমি তো ব্যবসা করতে বসেছি; ধর্ম নয়। দু'পয়সা কামাই করতে। তোমাদের মতো রাজকোষ কিংবা ব্যাংক ডাকাতি তো করছি না? মোক্ষম সওয়াল। দেশের খাজাঞ্চির খবর নাকি ভালো না। রক্ত পানি করা রোজগার যারা জমিয়ে রাখে ভবিষ্যতের জন্য; বিশ্বাস করে ব্যাংকে রাখে, তারা এখন সে আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। খেয়ানতের খাঁ সাহেবরা তা পকেটে পুরে, বিদেশে পাঠিয়ে জাবর কাটছেন। বিশেষ করে চাষাদের নামের ব্যাংক আর দখল করে নেওয়া ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা নাকি খুবই খারাপ। চেক দিলে ক্রিকেট বলের মতো বাউন্স খাচ্ছে। যত বাউন্স, তত অবিশ্বাস। খাজাঞ্চিকর্তা আবার দিলখোশ মানুষ। পাবলিকের কর আর ভ্যাটের টাকা দিয়ে চোর-ডাকাত পোষণে নাকি তার প্রমিজ-বাউন্ড। শিক্ষা গোল্লায় যাক, ভেঙে পড়ূক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা; দলের চোর-বাটপারের জন্য রাজভাণ্ডার উজাড় করে দেবেন তিনি।

সিয়াম হলো দেহ-মনের সংযম পালন। নফস, লোভকে বশে আনা তার প্রথম টার্গেট। রিপু দমন রাখো, ইন্দ্রিয় বশে রাখো; মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে শেখো- এই হলো রোজা বা সিয়াম সাধনার আসল শিক্ষা। কিন্তু আমাদের বাজারি নীতি হলো- এ মাসেই বেশি বেশি কামাও, পারলে লুটে নাও। ভোগের সাগরে ভাসতে যেন বারণই নেই এ মাসে। আর জানান দাও তোমার ধনের দাপট। এটা হলো প্রদর্শন বাতিক। দামি রেস্তোরাঁ, হোটেল সব বুক হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো আগেভাগেই বুক করে রেখেছে দামি দামি হোটেল, উত্তর বা দক্ষিণ প্লাজায় কবে কোথায় কাদের নিয়ে ইফতারের রাজনীতি হবে, তার লম্বা ফিরিস্তি ঘেঁটে। অথচ রোজাই শুরু হয়নি।

শপিং মলে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হবে গাড়ির জটে নগর সচল রাখতে। সুযোগ তাই ভালোই মিলবে, যারা সকাল থেকে বুকের ধন সন্তানদের স্কুল-কলেজে আনা-নেওয়া-পাহারার দায়িত্বে থাকেন। কাজেই চলো, দল বেঁধে মলে। আগেভাগেই কিনে ঘর ভরে ফেল। আর টিকিট কেটে রাখো দেশ-বিদেশে ফুর্তি করতে। ব্যাংকক, পাতায়া, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, পেনাং, বালিতেও হাজারে হাজারে বাঙালি ছুটছে রোজায় ঈদের শপিংয়ে। সবখানেই সীমা ছাড়ানো অসংযমীর ভিড়। যাদের দূরে যাওয়ার তাকত কম, তারা ছুটছেন কলকাতা, দিল্লি। বেনাপোলে হররোজ ১০ হাজার ভারতযাত্রীর ভিড়; লম্বা লাইন। কোনো এয়ারলাইন্সেই টিকিট নেই! মৈত্রী এক্সপ্রেস তো এক মাস আগেই বুকিং শেষ। মার্কুইস স্ট্রিট, নিউ মার্কেটে যেন এখন শুধু বাংলাদেশিদের এক ছোট 'বাংলাদেশ'।

আমরা এখন গরিব নই। মুৎসুদ্দি নাম কাটিয়ে পাতি ধনীর কাতারে উঠব উঠব করছি। আর মোটে বছর বিশেক। ধনী হবো আমরাও। আর ততদিনে ধনী মার্কিন মুলুকের শ্যামচাচারা এ দেশেই নকরি খুঁজতে হুমড়ে পড়বে। মিথ্যা বলছি? কেন বিলেতি সাদারা আসেনি বাংলায় সেই কবে?

ভাবতেই আমি রোমান্সে নেচে নেচে উঠছি।

amirulkhan7@gmail.com

যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য যোগ করুণ