হাওরের দুশ্চিন্তা শ্রমিক ও বৈরী প্রকৃতি

  কাসমির রেজা

দুই বছর পর সোনার ধানের দেখা পেলেন হাওরের কৃষক। এখন হাওরজুড়ে সোনালি ধানের ঢেউ। আবারও স্বপ্ন দেখছেন হাওরবাসী। গোলায় তুলতে শুরু করেছেন শুকনো ধান। কিন্তু শ্রমিক সংকট, বজ্রাতঙ্ক ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্নায়বিক চাপে রয়েছেন হাওরবাসী। এত ধানের দেখা পেয়েও তাদের মনে যেন স্বস্তি নেই।

বৈশাখ মাস শেষ হতে চলল; এখনও অনেক ধান কাটা বাকি। ক্ষেতে পাকা ধান থাকলেও তা কাটার শ্রমিক নেই। মাটি নরম থাকা এবং মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় হার্ভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না। যা কিছু শ্রমিক পাওয়া গেছে তারা আবার বজ্রপাতের আতঙ্কে হাওরে ধান কাটতে যাচ্ছেন না। কাটতে গেলেও সামান্য বৃষ্টি হলেই দৌড়ে চলে আসছেন। কারণ গত কয় দিনে বজ্রপাতে মারা গেছেন হাওর এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক। আর যে ধান কাটা হলো, তা শুকানো যাচ্ছে না। এসব সমস্যা যেন কেড়ে নিয়েছে হাওরের কৃষকদের স্বস্তি।

একসময় হাওরে শ্রমিক সংকট ছিল না। বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা ধান কাটতে হাওরে আসতেন। এখন ওইসব এলাকার শ্রমিকরা হাওরাঞ্চলে আসছেন না। পাশাপাশি হাওরেও শ্রমিকরা থাকছেন না। তারা বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে কাজ করছেন। কেউ কেউ ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে গেছেন কাজের খেঁাঁজে। এতে কয়েক বছর ধরেই ধান কাটার শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।

শ্রমিকের বিকল্প হলো মেশিন। অধিক হারে হার্ভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু বর্তমানে বাজারে যেসব হার্ভেস্টার মেশিন পাওয়া যায় তা হাওরের উপযোগী নয়। কিছু উঁচু জায়গায় হয়তো ব্যবহার করা যেতে পারে। হাওরে ধান কাটার সময় মাটি ভেজা ও নরম থাকে। এতে মেশিন চলতে সমস্যা হয়। তবে এর সমাধান খুব কঠিন নয়। শুধু মেশিনের চাকাগুলো হাওরে চলার উপযোগী করলেই হবে। এ জন্য কিছু উদ্যোগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দরকার।

বজ্রপাত হাওরে এক নতুন আতঙ্ক। এতে এর আগেও মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তা এত বেশি ছিল না। গত এক সপ্তাহেই বজ্রপাতে মারা গেছেন প্রায় ৫০ জন কৃষক। মৃত্যুর এই হারই বলে দিচ্ছে এর তীব্রতা কতটুকু। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এক যৌথ গবেষণায় দুই বছর আগেই বলেছিল, মার্চ থেকে মে মাসে বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক বজ্রপাত হয় বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে। বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তারা হাওরে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিল। বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছে তারা সমাজের পুঁজিপতি নন; দরিদ্র কৃষক। তারা প্রায়ই মাঠে কাজ করতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজেন। এ সময় বজ্রপাত হলে কাছে কোনো বড় গাছ না থাকায় কৃষকের ওপরে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। গত বছরও বজ্রপাতে হাওরে বেশ কয়জন মারা যান। তখন এ নিয়ে অনেক আলোচনা হলো। এর পর আমরা ভুলে গেলাম। এ বছর আবার যখন হাওরে বজ্রপাতে মারা গেলেন দুর্ভাগা ক'জন, আবারও আমরা বলাবলি করছি। ক'দিন পর হয়তো আবার ভুলে যাব। এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে আমাদের কি কিছুই করার নেই?

বজ্রপাত এমন একটি দুর্যোগ, যাকে কোনোভাবেই মানুষের পক্ষে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে একে মোকাবেলা করা যায়। তাই প্রতিটা হাওরে অধিক সংখ্যক তালগাছ লাগানোর পাশাপাশি হাওরে বজ্রনিরোধক টাওয়ার নির্মাণ করা প্রয়োজন। হাওরের মাঝখানে কিছু আশ্রয়কেন্দ্রও নির্মাণ করতে হবে।

ধান কাটার মৌসুমের শুরুতে কয়েকদিন বৃষ্টিপাত না হলেও সপ্তাহখানেক ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর কারণে ধান কাটা হলেও শুকানো যাচ্ছে না। এতে স্তূপ করে রাখা ধান ভিজে ওই ধানে অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে। ধান পচে যাচ্ছে। তাই ধান কেটে নষ্ট করার চেয়ে কৃষকরা ধান জমিতে রাখাই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। কিন্তু জমিতে ধান থাকলে সংকট আরও বেশি। তার ওপর শিলাবৃষ্টির ভয় তো আছেই। তাই তাদের অবস্থা এখন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। ধান কাটা ভালো, না ক্ষেতে রাখাই ভালো, এ সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে হাওরের মাঝ থেকে মাড়াই খলা পর্যন্ত ধান আনতে তাদের অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। হাওরের মাঝ থেকে ধান পরিবহনের রাস্তা (স্থানীয় ভাষায় জাংগাল) কর্দমাক্ত থাকায় গরু-মহিষের গাড়ি, লরি বা শ্রমিক চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এতে কৃষকদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এসব জাংগাল পাকা বা সাবমার্জেবল রাস্তার মতো করলে ভোগান্তিটা কমত। এতে কৃষকের গোলায় ফসল তোলার নিশ্চয়তা আরও বাড়ত।

এ বছর হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ অন্যান্য বছরের চেয়ে ভালো হয়েছে- এটা সংশ্লিষ্ট সবাই স্বীকার করছেন; কিন্তু বন্যার মুখোমুখি না হওয়ায় এসব বাঁধকে কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি। তাই বাঁধের মান নিয়ে নিশ্চিত হয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তারপরও এ বছর হাওরবাসী আশাবাদী, হাওরের ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে তোলা যাবে। ইতিমধ্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বন্যা সতর্কীকরণ দেওয়া হয়েছে। বেড়েছে বৃষ্টিপাতও। যে কোনো মুহূর্তে অকাল বন্যা আসার ভয় রয়েছে। তাই আকাশ মেঘলা হলেই কৃষকের মনে ভয় ঢুকে যায়। এ যেন ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাওয়ার অবস্থা!

টাঙ্গুয়ার হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছিল। বাঁধটি প্রশাসন ও এলাকার লোকজন মিলে সংস্কার করেছেন। শুধু প্রকৃতিকেই ভয় নয়, ভয় স্বার্থলোভী এক ধরনের দুস্কৃৃতকারীর জন্যও। সামান্য ক'টি মাছ ধরার জন্য তারা হাওরের বাঁধ কেটে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। এবার টাঙ্গুয়ার হাওরে তাই হয়েছে। এর আগেও এমনটি ঘটেছে। তাই হাওরবাসীর ফসল সুরক্ষা চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আছে। এজন্য সোনারাঙা হাওর কৃষকের মনে ততটা স্বস্তি দিতে পারছে না।

গত বছর ফসলহানির পর সরকার যেভাবে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে, তা নজিরবিহীন। ফসলহানির পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল ও নগদ পাঁচশ' টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও ছয় লাখ কৃষককে সার, বীজ ও নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর প্রতি আন্তরিক। কিন্তু তার কাছে হাওরবাসীর দাবিগুলো কি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে? শুধু স্বল্পমেয়াদি সহযোগিতা দিয়েই হাওরবাসীর চোখের জল মুছা যাবে না। হাওরবাসী ত্রাণ নয়; পরিত্রাণ চায়। হাওরের কৃষকদের সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা। সরকার ২০১২ সালে হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনাও যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই এটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি হাওরের নদীগুলোকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় এনে খনন করতে হবে। হাওর এলাকার মানুষকে শুধু এক ফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল থাকলে হবে না। এদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

হাওরে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রতিটি হাওরে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি হাওরে মৎস্য গবেষণাগার ও পোনা উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ জনশক্তি। কৃষিকাজের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। জোর দিতে হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও। এই সবকিছুর জন্য দরকার রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন।

হাওরাঞ্চলে বড় বড় রাজনীতিবিদ, আমলার জন্ম হয়েছে। তারা দেশ গঠনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বা রাখছেন; কিন্তু হাওর এলাকার উন্নয়নে তারা কতটুকু সচেষ্ট? দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, হাওরবাসী কি সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে? জীবনমান উন্নয়নের সব সূচকে হাওরবাসী আর কতদিন পিছিয়ে থাকবে? পিছিয়ে থাকাই কি তাদের নিয়তি?

kashmirreza@gmail.com

সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা


মন্তব্য যোগ করুণ