ডেঙ্গুতে চার দিনে ১৭ জনের মৃত্যু

ঢাকায় কমেছে বেড়েছে গ্রামে

প্রকাশ : ১৫ আগষ্ট ২০১৯

ডেঙ্গুতে চার দিনে ১৭ জনের মৃত্যু

   সমকাল প্রতিবেদক

ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকায় কমলেও ঢাকার বাইরে বেড়েছে। গত চার দিনে সারাদেশে সাত হাজার ৫০৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে চার হাজার ২৩০ জন এবং রাজধানীতে তিন হাজার ২৭৭ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঈদের ছুটিতে গত চার দিনে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ১২৪। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগের দিন ১১ আগস্ট সারাদেশে দুই হাজার ৩৩৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৮১ জন ঢাকায় এবং বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় এক হাজার ৩৫৩ জন আক্রান্ত হন।

১২ আগস্ট ঈদের দিন আক্রান্ত দুই হাজার ৯৩ জনের মধ্যে ঢাকায় ৮৪২ জন এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে এক হাজার ২৫১ জন ভর্তি হয়েছেন। ঈদের পর দিন ১৩ আগস্ট গত কয়েক দিনের তুলনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা কমেছিল। ওইদিন আক্রান্ত এক হাজার ২০০ রোগীর মধ্যে ঢাকায় ৫৯৯ জন এবং বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় ৬০১ জন ভর্তি হন। তবে গতকাল বুধবার আবার রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আক্রান্ত এক হাজার ৮৮০ জনের মধ্যে ঢাকায় ৭৫৫ এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে এক হাজার ২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৩৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৮ হাজার ৪৪২ জন চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন এবং সাত হাজার ৮৬৯ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ঢাকায় চার হাজার ১৪৩ জন এবং ঢাকার বাইরে তিন হাজার ৭২৬ জন রয়েছেন।

১৭ জনের মৃত্যু :ঈদের আগের দিন রোববার রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত হোসাইন নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। রিফাতের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় প্রথমে তাকে গাজীপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে শুক্রবার অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই দিন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফাতেমা আক্তার সোনিয়া নামে এক স্কুল শিক্ষিকার মৃত্যু হয়। তিনি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। একই দিন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আমির হোসেন নামে একজনের মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জের দত্তপাড়া এলাকায়। ওই দিনই রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মনিরুল ইসলাম নামে একজনের মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নে।

ঈদের দিন সোমবার ঢাকা শিশু হাসপাতালে সামিয়া নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। ৭ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। একই দিন মিটফোর্ড হাসপাতালে সুফিয়া বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। তার বাড়ি পুরান ঢাকায়। লক্ষ্মীপুর জেনারেল হাসপাতালে পরশ নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি কমলনগর উপজেলার চর জাঙ্গালিয়া দাসপাড়া এলাকায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আবদুল মালেক নামে একজনের মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। অ্যাপোলো হাসপাতালে সিআইডি সদস্য জামাল আহমেদের মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের মনিপুরঘাট এলাকায়। রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অভিজিৎ সাহা নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া এলাকায়।

মঙ্গলবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সামিয়া নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সামিয়া পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকায় থাকত। একই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের প্রকৌশলী মাহবুল্লাহ হকের মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশায়। ঈদের দিন বিকেল ৪টায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নাজমুল করিম জানান, তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মোহাম্মদ রাসেল নামে একজনের মৃত্যু হয়। তিনি ঢাকার রমনা পার্কের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার নারিকেলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাসেল অসুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়।

মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে মুছাব্বির হোসেন মাহফুজ নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। তার গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার চক রামানন্দপুর গ্রামে। তার বাবার নাম গোলাম মোস্তফা। মাহফুজ এবার এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় হাজি আবদুল মজিদ নামে একজনের মৃত্যু হয়। তিনি এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১১ আগস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়ি ফেরেন। বাড়িতেই রাত ১টার দিকে অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তানজিদ মোল্লা নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মাঝকান্দি এলাকায়।

গতকাল বুধবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফরহাদ হোসেন নামে এক কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বড়বাড়িতে।

ঈদের ছুটিতে এবার স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি আগেই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। এ কারণে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউই ঈদের ছুটি কাটাতে পারেননি। সরেজমিন রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অন্যান্য সময়ের মতো ছুটির দিনেও চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে যেসব ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি, সেসব ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও নার্স সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন। এসব হাসপাতালের পরিচালকরাও বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম তদারকি করেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, চিকিৎসক, নার্সসহ সবাই রোগীর চিকিৎসার বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। ছুটি বাতিল হলেও তারা হাসিমুখে রোগীর সেবা দিয়েছেন। এজন্য রোগীর চিকিৎসা নির্বিঘ্নে চলেছে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ূয়া সমকালকে বলেন, দেশে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ এবার ঈদের ছুটি পায়নি। বিশেষ করে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাতদিন রোগীর সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। এ কারণে ঈদের ছুটিতেও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি।

রোগী কমছে, বলার সময় এখনও আসেনি- পরিচালক : গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এক হাজার ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কম। তবে রোগীর এই কমে যাওয়া ঈদের ছুটির কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে তা বলার সময় এখনও আসেনি। এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য কিংবা আশাবাদ ব্যক্ত করলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক হবে না।




মন্তব্য

শেষের পাতা বিভাগের অন্যান্য সংবাদ