বাস চলাচলে শৃঙ্খলা শুধু আলোচনায়

ঢাকার পরিবহন

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

বাস চলাচলে শৃঙ্খলা শুধু আলোচনায়

   রাজীব আহাম্মদ

রাজধানীর অভ্যন্তরীণ পথের বাস চলাচলকে সুশৃঙ্খল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০০৪ সালে। ওই বছর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকার বাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে জোর সুপারিশ করা হয়। এরপর ১৫ বছর কেটে গেছে। অগ্রগতি সামান্যই। বাসের রুট পুনর্বিন্যাস কাজের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, আরও দু'বছর লাগবে এ কাজে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ঢাকায় বাস রুটের সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে। বেপরোয়া চলাচল বন্ধ করে বাসে বাসে প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা এড়াতে প্রতিটি রুটে একটি মাত্র কোম্পানির বাস চলবে। বিদ্যমান বাসের মালিকরা মিলে কোম্পানি গঠন করবেন। বাসের অনুপাতে মুনাফা পাবেন। পুরনো লক্কড়ঝক্কড় বাস তুলে দিয়ে নামানো হবে নতুন বাস।

বাস রুট পুনর্বিন্যাস ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা (বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি) পদ্ধতি চালু করতে গত সেপ্টেম্বরে যে কমিটি করেছে সরকার, তার প্রধান ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ঢাকার কয়েকটি সড়কে চক্রাকার বাস চালু করেছে কমিটি। আগামী দুই বছরে রুট পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ হবে। তখন থেকে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতেই চলবে।

গত ১৯ জুন ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব কথা বলেন মেয়র। তবে আগামী দু'বছরে কাজ শেষ হবে কি-না তা নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়েছেন তার নেতৃত্বাধীন কমিটির সদস্যরাই। মেয়র জানিয়েছেন, ঢাকায় বাস রুটের সংখ্যা ২২-এ নামিয়ে আনা হবে। কোম্পানির সংখ্যা হবে পাঁচ থেকে ছয়টি।

ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২৪৬টি কোম্পানির বাস চলে। বাসের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। মালিকের সংখ্যা তিন হাজার। বাস চলে ২৭৮টি রুটে। একটি রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলে। আবার একই কোম্পানির বাসের মালিক বহুজন। তাই যাত্রী পেতে বাসে বাসে চলে রেষারেষি, ব্যস্ত সড়কে চলে গতির প্রতিযোগিতা। মোড় বন্ধ করে যত্রতত্র যাত্রী তোলা হয়। এ কারণে নিত্য যানজট হয়। বাসে বাসে ফুটপাতের লেন দখলের 'লড়াইয়ে' প্রাণ যায় যাত্রীর।

মৃত্যুর তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ হলেও বাসকে সুশৃঙ্খল করার কাজ এগোয়নি। এসটিপি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাস চলাচল সুশৃঙ্খল করার পরিকল্পনাও এগোয়নি। পরিবহন খাত সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, কোম্পানিভিত্তিক চললে, যাত্রী পেতে বাসে বাসে প্রতিযোগিতা থাকবে না। লেন ভেঙে চলবে না বাস। বাস চলবে সুশৃঙ্খলভাবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসটিপিতে গণপরিবহন বান্ধব প্রকল্প মেট্রোরেল, বিআরটি (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) এবং বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর সুপারিশ ছিল। কিন্তু এসব সুপারিশ না মেনে প্রাইভেটকার-বান্ধব প্রকল্প ফ্লাইওভারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে যানজট বেড়েছে। গত এক যুগে ঢাকার গাড়ির গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে পাঁচ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

যানজট নিরসনে এসটিপি সংশোধন করে ২০১৬ সালে সংশোধিত এসটিপি (আরএসটিপি) করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আরএসটিপিতে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গণপরিবহন বান্ধব প্রকল্পের সুপারিশ করা হয়েছে। এসটিপির মতো আরএসটিপিতেও বাস ফ্র্যাঞ্চাইজির ওপর জোর দেওয়া হয়। উন্নত দেশগুলোর শহরাঞ্চলে এ পদ্ধতিতে বাস চলে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক সমকালকে বলেছেন, গণপরিবহনকে গুরুত্ব না দিয়ে ফ্লাইওভার করা হয়েছে। এতে ঢাকায় প্রাইভেটকারের সংখ্যা বেড়েছে। মানসম্পন্ন বাস সেবা না থাকায় মধ্যবিত্তরাও প্রাইভেটকারের দিকে ঝুঁকেছেন। বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি থাকলে, বাসে শৃঙ্খলা থাকত। মানসম্পন্ন সেবা থাকত। যাত্রীরা বাস ছেড়ে প্রাইভেটকারমুখী হতেন না।

সামছুল হক বলেন, বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি কোনো কঠিন কাজ নয়। এতে বড় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হয় না। শুধু ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে হবে। এ দেশে অনেকে বড় বড় রাস্তা, ফ্লাইওভার, ভবনের মতো অবকাঠামো নির্মাণকেই উন্নতি বোঝেন। সরকারে যারা থাকেন, তারাও তাই অবকাঠামোকে গুরুত্ব দেন। ব্যবস্থাপনায় জোর দেন না। এ কারণেই বাসকে শৃঙ্খলায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।

বাস রুট পুনর্বিন্যাস ও বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুতে ২০১৬ সালে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অসুস্থতা ও পরে মৃত্যুর কারণে দুই বছর কাজ থমকে ছিল বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, তারা অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিলেন। বাস মালিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদের রাজি করান। তাদের বোঝাতে সক্ষম হন, বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু হলে মালিকদের মুনাফা বাড়বে। যানজট কমবে।

বাস রুট পুনর্বিন্যাস ও বাস ফ্র্যাঞ্চাজি কমিটির সদস্য ডিটিসিএর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহ উদ্দিন সমকালকে বলেন, তারা দিনরাত কাজ করছেন বাসকে শৃঙ্খলায় আনতে। মেয়র যে দুই বছর সময়ের কথা বলেছেন, এর মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব কি-না তা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

সালেহ উদ্দিন বলেন, ডিপো নির্মাণ ছাড়া আর কোনো অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ নেই এ পরিকল্পনায়। বাকি সব কাজ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন সংক্রান্ত। বাস মালিকরা কীভাবে নতুন বাস কিনবেন, কে অর্থের জোগান দেবে, কত শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন এগুলো সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে কোন রুটে কতগুলো বাস প্রয়োজন, কোথায় বাস স্টপেজ প্রয়োজন, চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের উন্নয়ন, ছয়টি সিটি টার্মিনাল নির্মাণে জায়গা নির্ধারণসহ অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছেন তারা।

সালেহ উদ্দিন জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল-কাঁচপুর রুটে তারা একটি পাইলট প্রকল্প চালু করতে চান। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, ঢাকায় আসলে কতটা কার্যকর হবে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি। তিন হাজার মিনিবাস একদিনে তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। সময় লাগবে। সালেহ উদ্দিন জানিয়েছেন, বাস ফ্র্যাঞ্চাইজিতে মিনিবাস চলাচলের সুযোগ রাখা হবে না। শুধু বড় বাস চলবে। তবে পাঁচ বছরের বেশি পুরনো বাস চলবে না।

গত এপ্রিলের পর থেকে কমিটির সিদ্ধান্তে ধানমণ্ডি, উত্তরা ও মতিঝিলে চক্রাকার বাস সেবা চালু করা হয়েছে। সালেহ উদ্দিন জানিয়েছেন, এগুলো পরে সমন্বয় করা হবে। যদি প্রয়োজন হয় রাখা হবে। অথবা বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর পর বন্ধ করে দেওয়া হবে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিআরটিসিকেও অপারেটর হিসেবে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে রুট ও কোম্পানির সংখ্যা কত হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজির সমীক্ষা যাচাই করা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের প্রাক-উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়। তা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। পিডিপিপির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২০ সালের জুনে।

আরএসপিটি অনুযায়ী, আগামী ১৬ বছরে পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি হলে তাতে রাজধানীর ১৭ শতাংশ যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। বাকিদের বাসের যাত্রীই হতে হবে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই অভ্যন্তরীণ পথের বাসকে শৃঙ্খলায় আনতেই হবে।










মন্তব্য