পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা সভা

গুলিস্তান ও মালিবাগের বোমা জঙ্গিদের 'টেস্ট কেস'

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯

গুলিস্তান ও মালিবাগের বোমা জঙ্গিদের 'টেস্ট কেস'

  সাহাদাত হোসেন পরশ

পরপর দুই দফায় রাজধানীর পৃথক দুটি এলাকায় পুলিশের গাড়ি টার্গেট করে বোমা বিস্ম্ফোরণের ঘটনা কিসের আলামত? এটা কি জঙ্গিদের নতুন স্টাইল, নাকি উগ্রপন্থিদের 'টেস্ট কেস'? শ্রীলংকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার আগে-পরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা গুলিস্তান ও মালিবাগে বোমা বিস্ম্ফোরণের ঘটনাটি 'হালকাভাবে' নিতে নারাজ। শ্রীলংকায় জঙ্গিরা বড় ধরনের হামলার আগে ছোটখাটো কিছু হামলা চালিয়েছে। সেখানে মন্দিরও ভাংচুর করা হয়। টেস্ট কেস হিসেবে শ্রীলংকায় তা করা হয়েছিল। বাংলাদেশেও জঙ্গিরা সেই পথ অনুসরণ করছে কি-না তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গতকাল বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে দিনব্যাপী ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় গুলিস্তান ও মালিবাগে বোমা বিস্ম্ফোরণের ঘটনাকে এভাবে বিশ্নেষণ করে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে বলা হয়। উগ্রপন্থিদের রিক্রুটমেন্ট বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়। ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। এতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ছাড়াও সব ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে পুলিশকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এ তথ্য জানায়।

গত ২৬ মে রাত পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর মালিবাগ পুলিশের বিশেষ শাখার একটি পিকআপ ভ্যানে বোমা বিস্ম্ফোরিত হয়। এতে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক রাশেদা আক্তারসহ তিনজন আহত হন। এর আগে ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে একটি ট্রাফিক বক্সের পাশে হাতে তৈরি বোমা বিস্ম্ফোরিত হয়। এতে ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য ও একজন কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আহত হন।

জানা গেছে, ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় একজন কর্মকর্তা বলেন, গুলিস্তান ও মালিবাগে ছোট হামলা চালিয়ে হয়ত উগ্রপন্থিরা দেখতে চেয়েছে, এটার প্রতিক্রিয়া কী হয়। এটা ছোটখাটো খোঁচা দেওয়ার মতো ঘটনা। ওরা হয় টেস্ট করল। তাই কোনোভাবে বিষয়টি গুরুত্বহীন ভাবা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে তিনি শ্রীলংকার জঙ্গিদের টেস্ট কেসের উদাহরণ দেন। এমনও হতে পারে খুব শিগগিরই হয়ত বড় ধরনের হামলার কোনো লক্ষ্য বা শক্তি জঙ্গিদের নেই। কিন্তু তারা যদি ভবিষ্যতে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকে তবে এটা রোধ করাও জরুরি। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা সেখানে বলা হয়।

পরে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, জঙ্গি তৎপরতা রোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন ও ব্লক রেইড পরিচালনা করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করে আগন্তুক সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও জঙ্গিদের সম্পর্কে গোয়েন্দা নজর বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

বৈঠক সূত্র জানায়, ফেনীর নুসরাতের ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি এবং সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের বিষয়টি সেখানে উঠে আসে। নুসরাতের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার কারণে জনমনে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবনা তৈরি হয়েছে। পুলিশের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ ধরনের দু-একটি ঘটনা পুলিশের অনেক ভালো কাজকে ম্লান করে দেয়। ওসি মোয়াজ্জেমের ব্যাপারে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন পুলিশপ্রধান। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া ওসি মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারি পরোয়ানা সঠিকভাবে ফেনী থেকে রংপুরে না পাঠানোয় উষ্ফ্মা প্রকাশ করা হয়।

বৈঠকে বলা হয়, ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ, বুদ্ধপূর্ণিমা, রমজানে দেশে আইন-শৃঙ্খলাজনিত বড় ধরনের কোনো অবনতি হয়নি। পুলিশ সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়। সম্প্রতি বড় ইভেন্টে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেটা বৈঠকে উল্লেখ করেন পুলিশপ্রধান।

ত্রৈমাসিক বৈঠকে আরও বলা হয়- এখন দেশে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। তাই পুলিশ তাদের সেবার মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে আরও আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। মাঠ পর্যায়ে যাতে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে যাতে কোনো লুকোচুরি করা না হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেসব এলাকায় চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটছে তার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের কথাও বলা হয়। এছাড়া শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে আমলে নিয়ে তা যথাযথভাবে তদন্ত করার পরামর্শ আসে। খুন ও ডাকাতির মামলা নিবিড়ভাবে তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি পুলিশের এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কথাও বলা হয়।

সভা সূত্র জানায়, দেশের কিছু এলাকায় আলেম-ওলামাদের কেউ কেউ উস্কানিমূলক ওয়াজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসবের অডিও এবং ভিডিও রয়েছে। সমাজে বিভেদ তৈরি করতে এ ধরনের ওয়াজ যারা করছেন তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া ভুল ধারায় মামলা নেওয়ায় তিন জেলার এসপিকে সতর্ক করা হয়েছে। একটি জেলায় পুলিশের এক সদস্য কোনো একটি অনুষ্ঠানে এক এমপির স্ত্রীর মাথায় ছাতা ধরে ছিলেন। এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি। মাদকের বিস্তার রোধে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব মেগা প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।








মন্তব্য