প্রধানমন্ত্রীকে যদি কষ্টের কথা খুলে বলতে পারতাম

পারভেজ রবের স্ত্রী রুমার আক্ষেপ

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রধানমন্ত্রীকে যদি কষ্টের কথা খুলে বলতে পারতাম

পারভেজ রবের সুর করা গানে কণ্ঠ দিচ্ছেন শিল্পী আপেল মাহমুদ সংগৃহীত

   সাহাদাত হোসেন পরশ

'গিন্নি, আজ আমার জীবন সার্থক। একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হলো। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল আমার সুর করা একটি গানে কণ্ঠ দেবেন আপেল ভাই। আজ সেটা হলো। আপেল ভাই আমার গান গেয়েছেন। রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোরসহ অনেকেই আমার সুর করা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। কেবল বাকি ছিল আপেল ভাই।' কণ্ঠশিল্পী পারভেজ রবের স্ত্রী রুমা সুলতানা গতকাল বুধবার সমকালের সঙ্গে আলাপকালে স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ ছিলেন পারভেজ রবের আপন চাচাতো ভাই। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার দিন কয়েক আগে পারভেজের সুর করা একটি গানের রেকর্ডিং সম্পন্ন হওয়ার পর বাসায় ফিরে স্ত্রীর কাছে ওই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি।

পারভেজ রবের ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর কয়েকটি ছবি পোস্ট করেন তিনি। একটি ছবিতে কী-বোর্ডে হাত রাখা তার। পাশেই বসে আছেন আপেল মাহমুদ। সাদা কাগজে কলম দিয়ে লিখে পারভেজকে কিছু একটা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, গানের রেকর্ডিং চলছে। ছবির ক্যাপশনে পারভেজ রব লিখেছেন- "বিখ্যাত আপেল মাহমুদ আমার সুর করা গানে কণ্ঠ দিলেন। 'বাঙালি আমি, গর্বিত আমি' শিরোনামে গানটি লিখেছেন মো. আশরাফ কামাল। মাইটিভির স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করা হয়েছে।" ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'দৃষ্টিপাত'-এর জন্য গানটি রেকর্ড করা হয়।

মো. নাসির উদ্দিন নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন- 'মাইটিভিতে রেকর্ডিং করা শিল্পী আপেল মাহমুদ স্যারের গাওয়া বাঙালি আমি, গর্বিত আমি, বাংলা অহংকার এবং আমার গাওয়া বধূ মোর কলসি কাঁখে নদীর বাঁকে জল আনিতে যায় দুইটি গানের লেখক আশরাফ কামাল। সুর করেছেন পারভেজ রব। জীবনে কজনারই-বা সৌভাগ্য হয় বড় মাপের শিল্পী ও সুরকারদের ছায়ায় গান গাওয়ার। হয়তো অনেক আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল বলে আল্লাহ পূরণ করে দিলেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি আমার গানের লেখক আশরাফ কামাল ভাইয়ের প্রতি। সেইসঙ্গে আপেল মাহমুদ স্যারের ভালোবাসা ও সুরকার পারভেজ রব ওস্তাদের সুরে গান গাওয়া, সত্যি মনটা ভরে গেল।'

রুমা সুলতানা জানান, আপেল ভাইয়ের অল্পদিনের মধ্যে আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। তাই রব দ্রুত গানটি রেকর্ড করতে চেয়েছিল। প্রথমে গানের কথা ও সুর পছন্দ হয়নি আপেল ভাইয়ের।

অনেকবার পরিবর্তন করার পর তার পছন্দ হয়। এই গান নিয়ে অনেক উচ্ছ্বাস ছিল পারভেজের। ৬৪টি বাংলা সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টর ছিল সে। কিন্তু জীবনের বড় স্বপ্ন ছিল ভাইকে দিয়ে নিজের গান গাওয়ানো। সেই স্বপ্ন পূরণের পর নিজেই আর বাঁচতে পারল না। সুরকার নেই, নিজের প্রিয় সুর রয়ে গেছে।

রুমা সুলতানা আরও বলেন, 'যাত্রাবাড়ীতে একটি একাডেমিতে গান শেখাত পারভেজ। সেখান থেকে প্রতি মাসে ভালোই টাকা পেত। যেদিন দুর্ঘটনায় মারা গেল, সেই দিন যাত্রাবাড়ীর একাডেমি থেকে বেতন পাওয়ার কথা ছিল। বাসা থেকে যাওয়ার সময় বলছিল, গিন্নি আজ বেতন পাব। বাসায় ফেরার সময় ভালো কিছু আনতে চাই। কী খাবে বলো। বাসা থেকে বের হওয়ার কিছু সময় পরই খবর পেলাম দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। দৌড়ে উত্তরার ইস্ট ওয়েস্ট গেলাম। গিয়ে দেখি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। মনে করেছি হয়তো হাত-পা ভেঙে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানালেন, আগেই মারা গেছে। বিশ্বাস করতে পারলাম না। এরপর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিলাম। সবাই বলছিল, পারভেজ বেঁচে নেই। এমন নিষ্ঠুর কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। হাত-পা লুলা হয়েও যদি বেঁচে থাকত, মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।'

পারভেজের স্ত্রী আরও বলেন, আমার স্বামীর একটি প্রাইভেটকার কেনার কথা ছিল। আর সেই প্রাইভেটকার চালাব আমি। বিদেশে ৫ বছর ছিলাম। সেখানেও আমি গাড়ি চালিয়েছি। একটা ছোট্ট সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেল।

রুমা সুলতানা বলেন, শত্রু হলেও তো সান্ত্বনা দেয়। স্বামীকে হারালাম। ছেলে পঙ্গু। এখন পর্যন্ত বাসের মালিক পক্ষ একবার খোঁজও নিল না। আমাদের ফোন নম্বর ছিল। একবার ফোন করেও তো বলতে পারত, তারা পাশে আছে। এ কেমন দুনিয়া! একটা পরিবার পথে বসে গেল। আর যারা এর জন্য দায়ী তারা কি-না এখনও সব কিছুর ঊর্ধ্বে। স্বামীকে হারানোর পর বাসমালিকদের হয়ে তৃতীয় পক্ষের কয়েকজন লোক এসে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছে। স্বামীর জীবনের মূল্য কি এক লাখ টাকা! জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে এদের। প্রধানমন্ত্রীকে যদি মনের কষ্টের কথা খুলে বলতে পারতাম!

পারভেজের স্ত্রী বলেন, ছেলেকে বুধবার বাসায় নিয়ে এসেছি। চার সপ্তাহ পর আবার হাসপাতালে নিতে বলেছে। ছেলের সারা শরীরে ব্যথা। ঠিকমতো খেতে পারছে না। তথ্যমন্ত্রী এসে খোঁজ নিয়েছেন। ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। হাসপাতালের মালিক ১২ হাজার টাকা মওকুফ করেছেন। তারা ছাড়া আর কেউ খোঁজ নেয়নি। শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকেও কেউ আসেনি।

এদিকে পুলিশের উত্তরা বিভাগের ডিসি শৈবাল কুমার জানান, যে বাস পারভেজ রবের ছেলেকে চাপা দিয়েছে, সেটির রুট পারমিট ছিল না। চালকের সহকারী ও কন্ডাক্টরকে খোঁজা হচ্ছে। আর যে বাসটি পারভেজ রবকে চাপা দিয়ে হত্যা করেছে, তার চালককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ওই বাসের মালিক অন্য একটি মামলায় কারাগারে রয়েছে।

তুরাগ থানার ওসি নুরুল মোত্তাকিন বলেন, পারভেজ রবকে হত্যা করা চালককে ধরতে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে সে ধরা পড়বে।






মন্তব্য