রাজশাহীতে বড় ভাইয়ের হয়ে সাজা খাটা সজলকে মুক্তির নির্দেশ

  রাজশাহী ব্যুরো

অবশেষে মুক্তি পেলেন বড় ভাইয়ের বদলে গ্রেফতার হয়ে সাজা খাটা ডাব বিক্রেতা ছোট ভাই সজল মিয়া। বুধবার বিকেলে রাজশাহী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মনসুর আলম মামলার দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে মুক্তির নির্দেশ দেন।

রায় শুনে সজল মিয়া হাসিমুখে বেরিয়ে আসেন। একই সঙ্গে আসামি না হয়েও কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল- তার জবাব দিতে আদালত রাজশাহী মহানগর পুলিশের শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজকে শোকজ করেছেন বলে জানিয়েছেন সজলের আইনজীবী মোহন কুমার সাহা।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় ২০০৯ সালে সজলের বড় ভাই ফজলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রায় ঘোষণার আগ থেকেই পলাতক ছিলেন তিনি। গত ৩০ এপ্রিল শাহমখদুম থানা পুলিশ সজলকে গ্রেফতার করে। এরপর ফজল হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে।

সজলের আইনজীবী মোহন কুমার সাহা বলেন, 'অপরাধী না হয়েও সজল কয়েদি হিসেবে সাজা ভোগ করেছেন। অন্যায় হয়েছে তার সঙ্গে। ওসির শোকজের জবাব পাওয়ার পর আদালত এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটির জন্য অপেক্ষা করব আমরা। তারপর প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী সজলের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি করে আবেদন করব আদালতে।'

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোজাফফর হোসেন বলেন, 'নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর জন্য ওসির শাস্তির বিধান রয়েছে; কিন্তু এখানে দু'জন সাক্ষী ওসিকে এফিডেভিট করে দিয়ে বলেছিলেন, এটাই আসামি। তাই ওসির জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আদালতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন।'

এদিকে বিনা দোষে গ্রেফতার করায় শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজের শাস্তি দাবি করেছেন সজলের ভাই মো. বাবু। তিনি বলেন. 'সজলকে গ্রেফতারের পর আমরা অনেক বুঝিয়েছি। ওসি কোনো কথা শোনেননি। ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাসের আমাদের সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছিলেন থানায়। তারপর সকালে আসতে বলেন। আমরা আবার ভোর ৬টায় থানায় যাই। দুপুর পর্যন্ত বসিয়ে রেখে সজলকে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেড় মাস ধরে আমরা হয়রানির শিকার হলাম। তাই ওসির শাস্তি দাবি করছি।'

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সজলকে

যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয়, তখন তার নাম ফজল বলেই পুলিশের গ্রেফতারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। দু'জন সাক্ষী এ ব্যাপারে এফিডেভিট করে দেওয়ায় সেদিন কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু গত ২৬ মে আসামি নন দাবি করে আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের মুক্তির জন্য আবেদন করেন সজল। এরপর গত মঙ্গলবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন আদালত না বসায় গতকাল বুধবার শুনানি হয়। প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর অব্যাহতি পান সজল।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে আসামি ফজলের বয়স ছিল ২৭ বছর। বর্তমানে তার বয়স হবে ৪৫ বছর। কিন্তু সজলের জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ৩৫ বছর। এ ছাড়া আসামি ফজল মামলার রায়ের আগে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তখন তার শারীরিক গঠন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এখন আবার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গ্রেফতার সজলের সঙ্গে সেই বর্ণনার উল্লেখযোগ্য তারতম্য রয়েছে। পুলিশ ভুল করে ফজল ভেবে গ্রেফতার করেছে তাকে।

এ দিন সজলের ছয় ভাই-বোন আদালতে এফিডেভিট করে জানান যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফজল দীর্ঘদিন ধরেই নিখোঁজ রয়েছেন। তারা ফজলের কোনো খোঁজ জানেন না। তিনি বেঁচে আছেন কি-না, সেটিও জানেন না তারা। আর ফজল হিসেবে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি আসলে সবার ছোট ভাই সজল। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সজলকে দায় হতে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।

তবে আদালতের আদেশের পর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। আদালত থেকে আদেশের অনুলিপি সেখানে পাঠানো হবে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কি-না। তা না থাকলে সজলকে মুক্তি দেওয়া হবে। এ দিন আদালত থেকে সজল হাসিমুখেই কারাগারে গেছেন। তবে পুলিশ তার সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কথা বলতে দেয়নি।

অবশ্য আগের দিন শুনানির জন্য আদালতে আনা হলে হাজতে ঢোকানোর সময় সজল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ওই দিন তিনি বলেন, কোনো দোষ করিনি। আমি আসামি না। তারপরেও আমি কয়েদি!' সজল বলেন, 'পুলিশ আমাকে বিনা দোষে জেলে পাঠিয়েছে। জেলে কয়েদি হিসেবে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে হয়। বিনাদোষে এসব সহ্য করতে হচ্ছে।'


মন্তব্য