গণশুনানিতে বাম জোটের দাবি

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দিতে হবে

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দিতে হবে

জাতীয় প্রেস ক্লাবে শুক্রবার গণশুনানি অনুষ্ঠানে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা - সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কলঙ্কিত দাবি করে বাম জোটের নেতারা বলেছেন, নির্বাচনের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তারা বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনকে ভুয়া দাবি করে নিজেদের জামানত ফেরত চেয়েছেন জোটের প্রার্থীরা।

গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত 'ভোট ডাকাতি, জবরদখল ও অনিয়মের নানা চিত্র' শীর্ষক গণশুনানিতে এসব কথা বলেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া জোটের প্রার্থীরা।

বাম জোটের দাবি, এমন কলঙ্কজনক নির্বাচন দেশের ইতিহাসে আর হয়নি। তফসিলের পর থেকেই বিরোধী প্রার্থী ও তাদের সমর্থক-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলার মাধ্যমে প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে। পোস্টার ব্যানার লাগাতে দেওয়া হয়নি, কোথাও লাগালেও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আগের রাত থেকেই ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকে সিল মারা শুরু করে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। অধিকাংশ কেন্দ্রে সকাল ১১টার মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হয়। যারা কেন্দ্রে প্রবেশ করে তাদের প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়। পোলিং এজেন্ট দিতে বাধা দেওয়া হয়। অনেক ভোটারের আঙুলে কালি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। প্রচারণার শুরু থেকে নির্বাচনের দিন প্রশাসন এসব অনিয়ম ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এবারের নির্বাচনে ১৩১টি আসনে বাম জোটের ১৪৭ জন প্রার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে ৮২ প্রার্থী গতকালের দিনব্যাপী গণশুনানিতে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

সকাল ১০টায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের বক্তৃতার মাধ্যমে শুনানি শুরু হয়। এরপর একে একে প্রার্থীরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সন্ধ্যা ৬টায় সমাপনী বক্তৃতায় শাহ আলম বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে বহু অভিযোগ আছে। এটি নজিরবিহীন একটি ভুয়া ভোটের নির্বাচন। আমাদের প্রার্থীদের বর্ণনায় ভোটচুরির চিত্র ফুটে উঠেছে। তারা এসব নিয়ে জনগণের কাছে যাবেন। সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এর মাধ্যমে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় করা হবে।

ঢাকা-১২ আসন থেকে কোদাল মার্কায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, নির্বাচনের আগের দিন রাতেই কেন্দ্রভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। সকালে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে তারা দেখেছেন কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি না থাকলেও ৯টা বা সাড়ে ৯টার মধ্যেই ব্যালট বাক্স ভরে গেছে। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এর মতো কলঙ্কজনক নির্বাচন আর হয়নি। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে একটা নির্বাচন হলো, তাতে জনগণকে অংশ নিতে দেওয়া হলো না। সাকি বলেন, তফসিলের পর থেকেই বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা-মামলা-গ্রেফতার করে নির্বাচনের আগে একটা একতরফা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। মানুষ যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারে, ভয় পায় এটাই তাদের লক্ষ্য ছিল।

নরসিংদী-৪ আসনের বাম জোটের প্রার্থী সিপিবির কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনী এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্রের এক প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তার কাছে স্বীকার করেন, প্রশাসনের নির্দেশ ছিল ৩৫ শতাংশ ব্যালটে যেন নির্বাচনের আগের রাতেই সিল দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের চাপে পরে তা ৪৫ শতাংশ হয়ে যায়। ঢাকা-৮ আসনের মই মার্কার প্রার্থী শম্পা বসু বলেন, সকালে সেগুনবাগিচা হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেন কেন্দ্রে কোনো ভোটার নেই। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, মাত্র ১০০টি ভোট পড়েছে। অথচ ব্যালটে বাক্স ভরা।

দিনাজপুর-৪ আসনের বাম জোটের প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ভোটের আগের রাতে প্রত্যেক কেন্দ্রে আধামণ থেকে একমণ মাংস রান্না করে ভোজের আয়োজন করা হয়। পুলিশ, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। এরপর রাত ৩টা পর্যন্ত ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা হয়। তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রে তার এক আত্মীয় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ছিলেন। সেই কেন্দ্রে গেলে ওই কর্মকর্তা বলেন, সব ব্যালট বই আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে গেছে। তার (বাম জোটের প্রার্থীর) জন্য চারটা বই (৪০০ ব্যালট) রেখেছেন। এখানে তিনি নিজের প্রতীকে ভোট দিতে পারেন।

ময়মনসিংহ, খুলনা, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাম জোটের প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ জিতেছে ২৯ তারিখ রাতের নির্বাচনে। এক প্রার্থী বলেন, তার নিজের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তার এমপিকে শতভাগ ভোট 'উপহার' দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সাতক্ষীরার একটি আসনের প্রার্থী বলেন, তার এক কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কমকর্তা রাতে ব্যালট দিতে রাজি না হওয়ায় পুলিশের এক কর্মকর্তা তাকে চড় মারেন। গাজীপুর-৪ আসনের সিপিবির মানবেন্দ্র দেব বলেন, এবার সরকারি দলের জন্য কোনো আচরণবিধি ছিল না।

গণশুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাসদ মার্ক্সবাদীর মবিনুল হায়দার চৌধুরী, সিপিবির কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, মোশরেফা মিশু প্রমুখ।




মন্তব্য যোগ করুণ