সংবাদপত্রপ্রেমী মোসলেম

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

সংবাদপত্রপ্রেমী মোসলেম

১৯৬৯ সালে মার্কিন পরিক্রমা পত্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীদের চন্দ্রাভিযানের খবর দেখাচ্ছেন মোসলেহ উদ্দিন মোসলেম - সমকাল

   মোস্তাফিজুর রহমান, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)

সংবাদপত্রের প্রতি মোসলেহ উদ্দিন মোসলেমের ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। সেই যে শুরু, এরপর দারিদ্র্যের আঘাত এলেও সংবাদত্রের প্রতি তার ভালোবাসা এক ফোঁটাও কমাতে পারেনি। জীবনযুদ্ধে পরাজিত হলেও এক্ষেত্রে তিনি ঠিকই অপরাজেয়। এখনও বুকের ধনের মতোই আগলে রাখার চেষ্টা করছেন নিজের সংগ্রহে থাকা সংবাদপত্রগুলোকে।

পঞ্চাশের দশক থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ শুরু করেন মোসলেম। তার ভাণ্ডারে রয়েছে সেই দশক থেকে স্বাধীনতা ও তার পরবর্তী সময়ের গুরত্বপূর্ণ সংবাদপত্র। যাতে রয়েছে, ঐতিহাসিক সব তথ্য। কিন্তু জরাজীর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে ঘরে নষ্ট হচ্ছে মোসলেমের সংগৃহীত সংবাদপত্রগুলো। সংবাদপত্রগুলো যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য পরম যত্নে কিছুদিন পরপর রোদে দিয়ে শুকিয়ে নেন তিনি। ৭২ বছর বয়সী এই মানুষটির বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায়। তার ভাগ্যে জোটেনি বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু করে সরকারি বা কোনো সামাজিক সহযোগিতা।

উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের বেকারকান্দা গ্রামের মৃত রহিম উদ্দিনের ছেলে মোসলেম চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার সংগ্রহশালায় রয়েছে ১৯৫৬ সালে তখনকার পাকিস্তান সংসদে দেওয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধকালীন পত্রিকা, বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম মিটিংয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ (২১ জুন, ১৯৭৫), আদিবাসী কারা, শেখ হাসিনার বিভিন্ন কথা ও ট্রানজিট- এমন তথ্যসমৃদ্ধ অনেক দৈনিক। এ ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ষাট ও সত্তর দশকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইংরেজি 'মস্কো নিউজ' ও মার্কিন পরিক্রমাসহ অনেক পত্রিকা। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীদের চাঁদে

অবতরণ বিষয়ে লেখা তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাক ও পাকিস্তান আমলের কয়েকটি দৈনিক দেশ পত্রিকাও রয়েছে সেই ভাণ্ডারে। কিন্তু সংবাদত্রগুলো রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আলমারি কিংবা সেলফ না থাকায় এই তথ্য ভাণ্ডারে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাই ক'দিন পরপর বাড়ির উঠানে পলিথিন বিছিয়ে এগুলো পরিষ্কার করেন মোসলেম।

জীবনটা বলতে গেলে পাড়ি দিয়েছেন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করা মোসলেমকে অভাবের তাড়নায় ৫ বছর পড়ালেখা বন্ধ রাখতে হয়। পরে ১৯৭২ সালে ৩৪ টাকায় একটি ছাগল বিক্রি করে কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পাস করেন ১৯৭৪ সালে। ১৯৮৪ সালে একটি স্কুলে চাকরির জন্য ১৭ শতাংশ জমি বিক্রি করে ৫ হাজার দক্ষিণা দেন। জটিলতার কারণে চাকরিটা হারাতে হয় তাকে। ১৯৯৩ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তার চাকরি হয়নি। ফলে আর সংসারও পাতা হয়নি। নিজের জীবন চালিয়েছেন টিউশনি করে।

মোসলেম জানান, ছেলেবেলা থেকেই সংবাদপত্রের প্রতি ভালোবাসা। সেই থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এখন অভাবের কারণে সংবাদপত্র রাখতে পারেন না। তাই তিন মাইল হেঁটে বাজারে গিয়ে পত্রিকা পড়েন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক কষ্টে ভাঙা ঘরে থাকি। তাতে পত্রিকাগুলো নষ্ট হচ্ছে। গেল বছর একটি ঘরের জন্য আবেদন করেও পাইনি। বয়স্ক ভাতাও ভাগ্যে জোটেনি। মোসলেম আরও বলেন, বয়স্ক ভাতার কিছু টাকা পেলে তা দিয়েই আমৃত্যু সংবাদপত্রগুলো পরম যত্নে রাখার ব্যবস্থা করতেন। আর তার সংগ্রহের সংবাদপত্রগুলোতে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য থাকায় উপকৃত হবে তরুণ সমাজ।

বিষয়টি নিয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানা করিমের সঙ্গে কথা বলার জন্য বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।






মন্তব্য যোগ করুণ