নিতু পাগলির অন্তর্ধান

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নিতু পাগলির অন্তর্ধান

  আহমেদ বাসার

সেই সকাল থেকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভাব্য প্রায় সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো হদিস নাই। আশ্চর্য, একটা আস্ত মানুষ হাওয়া হয়ে গেল নাকি! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার তল্লাশির কাজে মনোযোগ দেয় মুকিত।

-আরে, একটা পাগলিরে আর কত খুঁজবি? চল, কিছু খাইয়্যা ল।

মুনাফের কথায় কিছুটা বিরক্ত হলেও সেদিকে কান না দিয়ে লাইতুলির দিকে ধাবমান রাস্তার দিকে মনোযোগ দিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর সে কাতর চাহনির আলো ফেলে দেখে। কিন্তু কোথাও তার ছায়াটিও নাই।

নিতু পাগলি আসলে তার আপন কেউ নয়। দূরসম্পর্কেরও কেউ না। কিন্তু তার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক টের পায় মুকিত। মাটিকান্দি গ্রামে তার আগমনও বেশ রহস্যময়। নতুন বাজারের পাশ ঘেঁষে অজ্ঞাত সাধকের কবরের ঘাস বছর বিশেক আগে হঠাৎ সরে গিয়ে মাজারের আবহ জেগে উঠেছিল। যদ্দুর জানা যায়, আমিন হুজুরই এই মাজার নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা। বছর পাঁচেক আগে তিনি গত হয়েছেন। এখন তার বড় ছেলে মালিক মোল্লাই মূলত মাজারের তত্ত্বাবধানে। তিনিই একদিন ফজরের নামাজ পড়ে মাজারের কাছে পা রাখতেই চমকে ওঠেন। একি! অষ্টাদশী এক তরুণী প্রায় মাজারের দেয়াল ঘেঁষে ঘুমিয়ে। তার পা মাজার শরিফ ছুঁই ছুঁই করছে। মালিক হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। একি স্বপ্ন, না বাস্তব তা বুঝতে তার কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়। এগিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে উঁচু স্বরে ডাকতে থাকেন- এই বেটি, ওঠ। এখানে হুইয়া আছোস ক্যান? ওঠ।

কিন্তু মেয়েটির কোনো সাড়াশব্দ নাই। আশ্চর্য, মইরা আছে নিকি?

ভাবতে ভাবতে মালিক একবার মেয়েটির নাকের কাছে হাত রাখে। না, জীবিতই। কিন্তু কী করা যায়?

মেয়েটির গায়ে হাত দিয়ে ডাকাও তো মুশকিল। কোনো কেলেঙ্কারি হয়ে যায় তার কোনো ঠিক নাই।

এদিকে লোকজনও তেমন নাই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে লোকজন জমলে একটা ব্যবস্থা করা যাবে- এই ভেবে মালিক কিছুটা সরে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। এমন সময় একটি পাখি তার গায়ে প্রাতঃকৃত্য সারে। চমকে উঠে তিনি দেখেন, পাঞ্জাবি নাপাক হয়ে গেছে।

-হায়রে পক্ষী! আর সময় পাইলি না?

রাগে গজগজ করতে করতে তিনি জামগাছের তলা থেকে সরে দাঁড়ান।

আইজ কার মুখ দেইখ্যা যে ঘুম থিকা উঠছিলাম! সব আজগুবি কাণ্ডকারখানা।

সূর্যোদয়ের পর মাজার এলাকা ঘিরে তীব্র ভিড় জমতে শুরু করে। অগণিত কৌতূহলী চোখ মেয়েটির দিকে তাক করা। একেকজন একেক ধরনের প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটির কোনো ভাবান্তর নেই। মাটিতে পা লেপ্টে বসে কিছুক্ষণ পরপর উশকোখুশকো চুলে হাত চালিয়ে উকুন বের করে এনে টাশ টাশ শব্দ করে মারে।

তার কাণ্ড দেখে কেউ কেউ শব্দ করে হেসে ওঠে। মালিক উচ্চ স্বরে ধমক দিলে সবার হাসি থেমে যায়। কেউ একজন দয়াপরবশ হয়ে কলা-রুটি এগিয়ে দিয়ে বলে- খা বেটি। কখন থিকা না খাইয়্যা আছোস, কেডা জানে।

মেয়েটি উদাস চোখে কিছুক্ষণ লোকটির দিকে তাকিয়ে প্রায় ছোবল দিয়ে তার হাত থেকে কলা-রুটি ছিনিয়ে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে।

-তোর নাম কী, বেটি?

যে লোকটি কলা-রুটি দিয়েছিল, তার প্রশ্নে এবার মাথা তুলে তাকায় মেয়েটি। আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফ্যাসফ্যাসা গলায় চিৎকার করে বলতে থাকে- অ্যাই, এত নাম জিগাস ক্যান? আমারে নিকা করবি? অ্যাঁ?

বলেই উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে। লজ্জা পেয়ে লোকটি পেছনে সরে আসে।

-নাউজুবিল্লাহ!

মালিক মোল্লা ধমক দিয়ে বলে- এভাবে হাসবি না। খবরদার। থাম, থাম কইলাম।

-ক্যান? কী করবি? মারবি? মার, মার...

বলতে বলতে মেয়েটি মালিকের দিকে তেড়ে আসে। অবস্থা বেগতিক দেখে মালিক কিছুটা পিছু হটে।

-কী করা যায় কন তো এই পাগলিরে নিয়া?

আলতু মুনসির দিকে তাকিয়ে চিন্তিত স্বরে বলেন মালিক।

-জোয়ান মাইয়্যা। তার উপরে পাগলি-ছাগলি। কার কাছে রাখলে কোন সর্বনাশ কইরা দেয়, কওন তো যায় না।

আলতুর কথায় কিছুটা বিরক্ত মালিক। দাড়িতে দুইবার হাত বুলিয়ে কড়া স্বরে বলেন- হের লাইগাই তো আপনেরে জিগাইলাম।

কিছুক্ষণ ভেবে আলতু মাথা চুলকিয়ে বলে- কিছু তো ভাইবা পাই না।

-আরে, আপনের বাসায় রাখেন না।

আয়াত আলি দৃঢ় স্বরে পেছন থেকে বলে- আপনের বাসায় ইসতিরি আর এক আন্ধা মাইয়্যা ছাড়া তো কেউ নাই। আপনের কাছেই মাইয়্যাডা নিরাপদ থাকব।

আয়াতের কথায় আরও কয়েকজন জোর সমর্থন জানায়। মালিক কিছুটা দ্বিধান্বিত স্বরে বলেন- আমি একটু ভাইব্যা দেখি।

শেষ পর্যন্ত মালিকের পরিত্যক্ত গোয়ালঘরের এক কোণে মেয়েটির জায়গা হয়। শুধু রাতটা সে গোয়ালঘরে কাটায়। ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি মাজারের আশপাশেই পড়ে থাকে। মাঝেমধ্যে উচ্চ স্বরে গান গায়। আবার কারণে-অকারণে বিলাপ জুড়ে দেয়। একবার বিলাপ শুরু হলে ঘণ্টাখানেক একনাগাড়ে চলতে থাকে। এ সময় কেউ সামনে এলে তাকে মারার জন্য মুষ্টি শক্ত করে তেড়ে আসে। কয়েক দিন আগে ভুট্টা মিয়া সামনে গেলে ঘুষি মেরে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। এর পর থেকে ভয়ে এমন সময়ে কেউ তার ধারেকাছে থাকে না।

বেশ কয়েক দিন পর জানা যায়, মেয়েটির নাম নিতু। তবে কে এটি আবিস্কার করেছে, তা কেউ বলতে পারে না। তবে নিতু পাগলি নামে এলাকায় সে পরিচিতি লাভ করে।

নিতু পাগলির কথা মুকিত লোকজনের মুখে শুনলেও তখনও চোখে দেখার অবকাশ পায়নি। অফিসের কাজে তাকে ভোর থেকে রাত অবধি ছুটতে হয়। একদিন ভোরে মাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মুকিত পায়ে আলতা, চোখে কড়া সুরমা মাখা একটি মেয়েকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে হাত তুলে মেয়েটি প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটিও ছলছলে মনে হলো। বুঝতে বাকি রইল না, এই সেই নিতু পাগলি।

কিন্তু প্রথম দেখায় মেয়েটিকে পাগলি বলে মনে হলো না। মনে হলো, হতাশাগ্রস্ত প্রার্থনামগ্ন কোনো কুমারী। ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। মুকিতকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাগলি মাথা চুলকাতে চুলকাতে এগিয়ে আসে। মুকিত দ্বিধান্বিত পায়ে কিছুটা পেছনে সরে আসে। মাথা ঝাঁকিয়ে মুকিতকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলে ওঠে- আমার খাওন কই? অ্যাঁ?

মুকিত কিছুটা বিব্রতস্বরে বলে- খাওনের দোকান তো এখনও খোলে নাই।

-খাওন দিবি না?

পেটে হাত বুলাতে বুলাতে পাগলি বলে চলে।

মুকিত পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে নিতুর হাতে গুঁজে দেয়।

চকচকে নোটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে পাগলি বলে- এইডা খামু?

-এইটা দোকানে দিলে খাওন দিবো।

টাকাটা হাতের মুঠোয় পুরে নিতু পাগলি মালিক মোল্লার বাড়ির দিকে ভোঁ দৌড় দেয়।

মুকিত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে- আহা জীবন! মানুষের জীবন এত কষ্টের ক্যান?

মুকিতের হঠাৎ মনে পড়ে যায় ছোট বোন মারিয়ার কথা। মানসিক ভারসাম্যহীন মারিয়া আট বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিল। মেয়েকে হারিয়ে তার মা কেমন যেন নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন। সারা পাড়া তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। নিতুকে দেখে মারিয়ার দুঃসহ স্মৃতি আবার তার ভেতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বেঁচে থাকলে মারিয়াও হয়তো নিতুর মতো কোথাও না কোথাও পশুর জীবনযাপন করে যাচ্ছে হয়তো।

এর পর থেকে প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে নিতু পাগলিকে খাবারদাবার দিয়ে যেত মুকিত। নিতুও যেন খাবারের জন্য অপেক্ষা করত। যেদিন নিতু একটু দেরিতে বের হতো, সেদিন মুকিত তার দেখা পেত না। দেখা না পেলেও মুকিত মাজারের পাশে এক কোণে খাবারের প্যাকেট রেখে যেত। এমন দিনগুলোতে নানা ধরনের দুশ্চিন্তা হতো তার। পাগলি খেতে পেয়েছে কি-না, কোনো সমস্যা হলো কি-না এসব ভাবনায় সারাদিন সে মশগুল থাকত। কাজকর্মেও তেমন মন বসত না সেদিন। পরের দিন ভোরে তার দেখা পেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত।

কাল খাবার পেয়েছিলি? জিজ্ঞেস করলে নিতু এমনভাবে মাথা নাড়াত যে হ্যাঁ-না কিছুই বোঝা যেত না।

মাস তিনেক পরে হঠাৎ পরপর তিন দিন নিতু পাগলির দেখা না পেয়ে মুকিত রীতিমতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ব্যাপার কী? এমন তো হয়নি কখনও। পরের দিন শুক্রবার। মুকিত সকালে নাশতার প্যাকেট হাতে নিয়ে মালিক মোল্লার বাড়িতে হাজির। মালিক মুকিতকে চিনতে না পেরে পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। মুকিত আসলে চাকরির সুবাদে এই এলাকায় একটি মেসে থাকে। মালিক মোল্লার সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলেও পরিচয় হয়নি।

মুকিত তার পরিচয় দিয়ে নিতু পাগলির খবর জিজ্ঞেস করতেই মালিকের চেহারায় বিষণ্ণতার ছায়া দেখা যায়।

-কোনো সমস্যা, চাচা?

মুকিত উদ্বিগ্নস্বরে জিজ্ঞেস করে।

-পাগলিটার শরীর ভালা না। কয়েক দিন ধইরা ঘরে হুইয়্যা আছে।

-কন কী? ডাক্তার দেখাইছেন?

মুকিত চিন্তিতস্বরে বলে।

-রহমান হুজুর পানিপড়া দিয়া গেছে। ঝাড়ফুঁকও চলতেছে। ভালা অইয়্যা যাইব আল্লার রহমতে।

-কিন্তু একজন ডাক্তার না দেখাইলে কী চলব?

মুকিত দরদভরা কণ্ঠে বলে।

-আর দুয়েকদিন দেহি...

মুকিত নিতুকে দেখতে চাইলে মালিককে কিছুটা বিব্রত দেখায়। যেন কিছু লুকোচ্ছেন এ রকম ভঙ্গিতে বলেন- পাগলি আইজ ঘুমাইয়া আছে। আরেক দিন দেইখেন।

মুকিত জোরাজুরি না করে নিতুর জন্য আনা খাবারের প্যাকেট মালিকের হাতে দিয়ে বিদায় নেয়। অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় কয়েক দিনের মধ্যে মালিকের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এর মধ্যে এক দিন মুকিত তার রুমমেট মুনাফের কাছে একটি কথা শুনে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ে। এলাকায় একটি গুজব বাতাসের বেগে ছড়াচ্ছে- নিতু পাগলি গর্ভবতী।

কস কী? কেডা করল এই কাম?

মুকিত রাগে-ক্ষোভে কাঁপতে থাকে থরথর করে।

-সবাই মালিক মোল্লার দিকে আঙুল তুলছে। কিন্তু জয়নাল মাতব্বরকেও অনেকে নাকি মোল্লার গোয়ালঘরের আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখছে।

মুনাফের গলায় উত্তেজনা খেলা করে।

-দুইজনরে একলগে সালিশে মুখোমুখি করলেই তো মূল দাগি বেরিয়ে আসবে।

-মুখোমুখি করবেটা কে? এরাই তো সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

মুকিতকে হঠাৎ কিছুটা চিন্তিত দেখায়। কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলে- এ ক্ষেত্রে আমাদের খুব জোরালো ভূমিকা নিতে হইব।

-চেষ্টা কইরা দেখতে পারি। কতটা সফল হমু, বলা যায় না।

মুনাফ নিষ্প্রভ স্বরে বলে।

শেষ পর্যন্ত এলাকার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বড়সড় একটি সালিশ বসেছিল। মুকিত ও মুনাফের তৎপরতা এ ক্ষেত্রে কাজে লেগেছিল। অবশ্য এলাকায় আমজনতার একটা অদৃশ্য চাপও যে ছিল না, সেটা বলা যাবে না। সবাই মালিক মোল্লা অথবা জয়নাল মাতব্বরের কালিমাখা মুখ দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু তার চেয়ে বড় নাটকীয়তা যে অপেক্ষা করছে, তা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

সালিশের মাঝখানে হঠাৎ আঠারো-উনিশ বছর বয়সী একটি ছেলেকে এনে দাঁড় করায় জয়নাল মাতব্বর। ছেলেটিকে দেখে রোগাপটকা ও হাড় হা-ভাতে মনে হচ্ছিল। দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছিল। গলা চড়িয়ে জয়নাল মাতব্বর বলেন- এই সেই কালপ্রিট, যে নিতু পাগলির সব্বনাশ করছে।

ছেলেটি অবনত মস্তকে সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। মালিক মোল্লা ধমকের স্বরে বলেন- এই বদমাশ, কথা কছ না ক্যান?

ছেলেটি মাথা না তুলে নিচু স্বরে বলে- কী কমু?

জয়নাল মাতব্বর তার দিকে দড়িছেঁড়া গরুর মতো তেড়ে এসে বলেন- হারামি, আবার কয় কী কমু। পাগলির লগে কী কাম করছোস?

ছেলেটি এবার কিছুটা ভড়কে যায়। চারদিকে অসহায় ভঙ্গিতে একবার তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে বলে- নিতু পাগলির ঘরে গেছিলাম।

-পাগলির সব্বনাশ করছে কেডা?

মালিক মোল্লা উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করেন।

-আমি করিছি।

ছেলেটি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে।

সবাই বুঝতে পারে ঘটনাটি সাজানো। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলতে পারে না। মুকিত বলতে গেলে চেয়ারম্যান সাহেব তাকে থামিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত দোষ স্বীকার করা ছেলেটিকেই অমানবিক শাস্তির মুখোমুখি করা হয়।

মুকিত ও মুনাফ সভা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। এর কয়েক দিন পর নিতু পাগলির পেট খালাস করে তাকে গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধা আমেনার ঘরে রাখা হয়। নিতুকে ঘিরে এলাকায় বেশ তিক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সবাই সবার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। মুকিতও নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে। পাগলির সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ পারতপক্ষে কমিয়ে দিয়েছে। এক দিন ছুটির সকালে ঘুম ভাঙে মুনাফের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠের তীব্রতায়- নিতু পাগলিরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাইতেছে না।

রীতিমতো লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসে মুকিত। কস কী?

-হ্যাঁ। গত রাতে ঘর ছেড়ে কখন পালাইছে, আমেনা বুড়ি টের পায়নি।

সকাল থেকে মোল্লা আর মাতব্বর মিলে পুরো তল্লাট খুঁজে হয়রান।

-চল এক্ষুনি। পাগলিরে খুঁজে পাইতেই হইব।

মুকিত ক্ষিপ্রস্বরে বলে।

মুনাফকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে সে বাইরে নিয়ে আসে।

গ্রামের চারপাশের যত অলিগলি আর নালা-নর্দমা আছে, এসব জায়গায় আগে সে খোঁজ করে। তারপর পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দেয়। খুঁজে না পেয়ে ছুট দেয় পাশের গ্রামের সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে। পাগলের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে সে যাকে সামনে পায়, তাকেই পাগলির বিবরণ দিয়ে কোথাও দেখেছে কি-না জিজ্ঞেস করতে থাকে। কিন্তু কেউ কোনো হদিস দিতে পারে না।

সারাদিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। কিন্তু মুকিতের খোঁজার কোনো বিরাম নাই। মুনাফ তাকে বাসায় ফেরার জন্য কয়েকবার তাগাদা দিয়েও ব্যর্থ হয়। শেষে বিরক্ত হয়ে নিজেই বাসায় ফিরে যায়। কিন্তু মুকিত উন্মাদের মতো ছুটছে তো ছুটছেই। ইয়ারপুর থেকে ছমিরমুন্সির দিকে মূল সড়ক ধরে যতটা গতিতে সে ছুটছে, তার চেয়ে অধিক গতিতে ধেয়ে আসা একটি ট্রাক তার ওপর দিয়ে দানবের মতো চিৎকার করতে করতে চলে যায়। রক্তে লাল হয়ে ওঠে কালো পিচঢালা। মুকিত রক্তের সমুদ্র হতে একবার বহুকষ্টে মাথা তুলে তাকায়। মনে হয়, নিতু পাগলি যেন তার হাত ধরে টানছে। আর চিৎকার করে বলছে- হুইয়্যা আছো ক্যান? ওঠো ভাই, ওঠো।

মুকিতের রক্তাক্ত মুখ কিছুক্ষণের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হঠাৎ নিতু পাগলির মুখ সরে গিয়ে সেখানে মারিয়ার মুখরেখা জেগে ওঠে। মুকিত সমস্ত শক্তি দিয়ে একবার উঠে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু এ তো মারিয়ার সেই ছোটবেলার কচি মুখ। ওকি একটুও বড় হয়নি! ভাবতে ভাবতে মুকিত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোতে চায়। কিন্তু শরীর সাড়া দেয় না। সামনে তাকিয়ে দেখতে পায় রক্তের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে নিতু পাগলি কিংবা মারিয়ার মায়াবী মুখ।


মন্তব্য