ইতিহাস ও বাস্তবতার 'অসুখী দিন'

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ইতিহাস ও বাস্তবতার 'অসুখী দিন'

অসুখী দিন, লেখক -শাহীন আখতার, প্রকাশনা-প্রথমা প্রকাশন, মূল্য-৫০০ টাকা

  গোলাম কিবরিয়া

ট্রেন ছাড়তে তখনও মিনিট দশেক দেরি। একশ টাকায় সানগ্লাস কিনে সাবিনা যখন আরও সস্তার জিনিস খুঁজছে, তখন পাশের বুকস্ট্যান্ডের সংকীর্ণ তাকে অনিতা সেনের স্মৃতিকথা নজরে পড়ে। লেখক শাহীন আখতারের লেখা সুখী দিন বইটির গল্পের শুরুটা এভাবেই বাদামি মলাটের সাদামাটা ছাপার, ট্রেনে পড়ার উপযোগী সেকেন্ডহ্যান্ড বইটিকে দিয়ে গল্প এগোতে থাকে। দুই ভূগোলের দুই সময়ের দু'জন মানুষ সাধনা আর অনিতা সেনের মধ্যে অভিনব এক সংযোগ ঘটায় এই বই। অনিতা সেন বিশ শতকের চল্লিশের দশকের কমিউনিস্ট। বরাক আর আসাম ভ্যালির। ব্রহ্মপুত্রের ভেজা পলি মাটিতে তার কচি পায়ের চিহ্ন আঁকা রয়েছে- যুদ্ধে, আন্দোলনে, মনন্তরে। অনিতা সেনের 'স্মৃতিকথা' পড়তে পড়তে সাবিনার মনে হয় বইটা এরচেয়ে বেশি কিছু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার হারিয়ে যাওয়া ভাই নীরদচন্দ্র সেনের হদিস পাওয়ার উপায় নিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।

অনিতা সেনের স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে সাবিনার সামনে ভেসে উঠল তার বাবার জীবন। বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ। সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বাংলা আর বাংলার সীমান্তের ওপারের দুই মানুষের জীবনে একই ইতিহাস এগিয়ে চলল ভিন্নতর দুই গল্পে। 'অসুখী দিন' পড়ে মুখোমুখি হতে হলো অজানা এক বাস্তবতার। বইটি পড়ে জানা যায় দেশভাগের প্রাক্কালে শিলং অঞ্চলে বাঙালি-খাসিয়ার দ্বন্দ্ব। কিছু কিছু উপন্যাস পড়া উচিত অখণ্ড অবসর এবং নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগের সুযোগ থাকলেই। শাহীন আখতারের 'অসুখী দিন' তেমন একটি বই। উপন্যাসটির কাঠামো নির্মিত হয়েছে দুটি স্মৃতিকথা এবং ছোট্ট একটি ডায়েরির যোগফল দিয়ে। পাঠক যাত্রা শুরু করবেন দুই স্মৃতিচারণের সমান্তরাল প্রবাহ দিয়ে। একই উপন্যাসে দুটি সমান্তরাল চরিত্রের বিবরণ যখন অব্যাহতভাবে চলতে থাকে, তখন তার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য পাঠকের পক্ষে একটা প্রবল তাগিদ থাকে। উপন্যাসটিতে মোয়াজ্জেম হকের চরিত্রের মাধ্যমে দেশভাগের চেনা বেদনার অচেনা কিছু চিত্র আমরা পেয়ে যাই। আছে কিছু মর্মান্তিক সত্য, অপ্রিয় বাস্তবতা। চল্লিশের দশকে যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন সুভাষ বসুর নেতৃত্বে, সেই স্বপ্নবাজদের একদল ছিল ভারতীয়, আর ছোট্ট একটা দল ছিল অভারতীয়; সাবিনার বাবা মোয়াজ্জেম হক ছিলেন অভারতীয় দলে। যার স্বপ্ন সফল কিংবা ব্যর্থ হয়েছিল কি-না সেটা ভাবার জন্য পাঠককে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হবে। ইংরেজদের হাত থেকে দেশ স্বাধীন হয়েছিল ঠিক, কিন্তু সেই দেশটি পাকিস্তান, যার সূচনাতেই হোঁচট খেয়ে পড়তে হয়েছিল মোয়াজ্জেম হককে। কেননা তার নেতা পাকিস্তানের কেউ নন, পাকিস্তানে তিনি অবাঞ্ছিত।

যে সব মানুষ স্বাধীন ভারতবর্ষ চেয়ে পাকিস্তানের নাগরিক হতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাদের সেই স্বপ্নগুলো বুদবুদের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল। সেই মানুষগুলোকে আমাদের কারও মনে নেই। কেননা ওই স্বপ্নভঙ্গের পরপরই বাংলাদেশ পাকিস্তানের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে শুরু করে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন দিয়ে যাত্রা করে যার সমাপ্তি ঘটে আরও অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী চেতনাসমৃদ্ধ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্বাপ্নিকদের সামনে অপাঙক্তেয় হয়ে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্বাধীনতা সৈনিক মোয়াজ্জেম হক। তিনি এই প্রজন্মের কাছে অচেনা। এই অচেনা মানুষকে 'অসুখী দিনে'র মাধ্যমে আমাদের সামনে হাজির করেছেন শাহীন আখতার।

পাঠক বইটি পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করবেন, শাহীন আখতার ইতিহাস সচেতন লেখক। যিনি ইতিহাস সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রাখেন। গল্পের গভীরে গেলে পাওয়া যায় অন্যতম চরিত্র সাধনার ভাই নীরদচন্দ্র সেন সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দে যোগ দিতে রেঙ্গুন পাড়ি দিয়েছিলেন। যৌবনে একই কাজ করেছেন সাবিনার চাচা মোয়াজ্জেম হক। তিনি যে নিশান উড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে মৃত্যু উপত্যকা ইস্ম্ফলের দিকে মার্চ করে গিয়েছিলেন, তার উত্তরাধিকারী হননি। কুঁচকিতে বুলেটের দাগ নিয়ে দেশভাগের পরের বছর বাড়ি ফিরেছিলেন। তারপর ছিটকে পড়েন এই ইতিহাস থেকে। তার জীবনে আজাদ হিন্দের বছরগুলোতে যেন জলের ওপর বুদবুদ। কোনো চিহ্ন না রেখেই মিলিয়ে গেছে। তাই জীবনের এপার-ওপার জুড়তে পারেননি। যার কাছে অতীত একটা বেড়াভাঙা বাড়িতে ক্রমে বদলে যাওয়া। সে তার বাঁচার জীবনের এপার-ওপার টুকরো টুকরো গল্প গাথতে বসে। কেননা, ইতিহাস পুরনো হয়ে গেলেও সত্য যা, তা জেনে নিতে হয়। নীরদচন্দ্র সেনের মৃত্যুরহস্যের কিনারাও হয় সাবিনার হাত দিয়ে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছেন লেখক শাহীন আখতার। তার গল্পের গাথুনি বেশ জমাট মনে হয়েছে। বর্ণনায় পাঠক গল্পের সঙ্গে মিশে গিয়ে কল্পনা করতে থাকবে নিশ্চিত। সর্বোপরি শাহীন আখতারের 'অসুখী দিন' পাঠককে ভিন্ন স্বাদ দেবে- এটা নিশ্চিত।


মন্তব্য