স্বপ্নের ঘোরে সৃষ্টি যত...

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্বপ্নের ঘোরে সৃষ্টি যত...

  আহমাদ শামীম

স্বপ্ন দেখতে কে না ভালোবাসে! কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি হয় উন্নতি, উৎকর্ষ আর উদ্ভাবনের সোপান, তাহলে তো কথাই নেই। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্ন হলো আমাদের 'মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল'। বিখ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী, লেখক, উদ্ভাবক আর শিল্পীর জীবনের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির প্রেরণা হচ্ছে স্বপ্ন। এ কথা সত্য বৈ মিথ্যা নয়। জেনে নেব এমন কয়েকটি স্বপ্নতাড়িত সৃষ্টির কথা।

ম্যারি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন

পৃথিবীর প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস হিসেবে ধরা হয় ম্যারি শেলির 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন', প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালে। এই উপন্যাসের চিন্তাটি লেখক পেয়েছিলেন ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে। ১৮১৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তার স্বামী কবি পি.বি. শেলি ও কয়েকজন লেখকের সঙ্গে লর্ড বায়রনের সে সময়কার নিবাস সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভায় ঘুরতে যান। ওই বছর ছিল দারুণ ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে একদিন বায়রন সবাইকে বললেন, চলো আমরা ভূতের গল্প লিখি! কিন্তু ম্যারি শেলি লিখতে পারছিলেন না। কয়েক দিন এভাবে চলে যাওয়ার পর এক রাতে যখন তিনি ঘুমাতে গেলেন, রাতে দেখলেন দারুণ ভয়ঙ্কর এক স্বপ্ন। যন্ত্রের মাধ্যমে এক মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠছে; কিন্তু সে আসলে এক দানব, যে সব মানুষকে মেরে ফেলতে চায়। এমন অদ্ভুতুড়ে স্বপ্নই আসলে ম্যারি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসের প্রেরণা। বলা চলে, তিনি স্বপ্নেই পেয়েছিলেন এই উপন্যাসের রসদ।

জেমস ক্যামেরুনের টার্মিনেটর

পরিচালক জেমস ক্যামেরুনের নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তার সিনেমা মানেই নতুন এক জগতের সন্ধান। ৯০ দশকের মাঝামাঝি 'দ্য টার্মিনেটর' সিনেমাটি আলোড়ন তোলে বিশ্বব্যাপী। আরনল্ড শোয়ার্জনেগার অভিনীত এই সিনেমার মূল বিষয় ছিল পৃথিবীর মানুষ নিয়ে ভিনগ্রহের সাইবর্গদের দ্বন্দ্ব। সায়েন্স ফিকশন ঘরানার সিনেমাটির ভাবনাও কিন্তু এসেছে দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে। একবার ১০২ ডিগ্রি জ্বরের ঘোরে তিনি দেখতে পান, একটি রোবট ছুরি হাতে তার দিকে ধেয়ে আসছে তাকে মেরে ফেলার জন্য। স্বপ্নের ঘোরে দেখতে পাওয়া সেই রোবট তাকে টার্মিনেটর চলচ্চিত্রের গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করে।

সেলাই মেশিনের সুঁই!

আমেরিকান উদ্ভাবক এলায়াস হাও, সেলাই মেশিন উদ্ভাবনের জন্য ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। ১৮৪৫ সালে সেলাই মেশিন সৃষ্টির পেছনেও আছে স্বপ্নের দারুণ প্রভাব। সেটা কীভাবে? হাও যখন সেলাই মেশিনটির নকশা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছেন, কিন্তু সুঁইয়ের ব্যবহার নিয়ে ছিলেন বেশ সমস্যায়। কিছুতেই সেটা বশে আসছিল না। এমনি এক রাতে ঘুমের মধ্যে হাও স্বপ্ন দেখেন, তিনি আজব এক দেশের আজব এক রাজার জন্য সেলাই মেশিন তৈরি করছেন। রাজা তাকে সময় দিয়েছেন মাত্র ২৪ ঘণ্টা, নইলে নিশ্চিত মৃত্যু। প্রাণান্ত চেষ্টা করেও যখন পারছিলেন না, তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মৃত্যুর মঞ্চে, সেখানে বন্য মানুষেরা বর্শা হাতে তাকে মারতে আসছিল। মজার কথা হলো, ওই বর্শাগুলোর মাথায় ছিদ্র ছিল! এমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে ভোরে ঘুম ভাঙে তার এবং বুঝতে পারেন, সুঁইয়ের মাথায় চোখ বা ছিদ্র করে সেলাই মেশিনের সমস্যার সমাধান সম্ভব! তখনই ছুটে যান ওয়ার্কশপে আর শেষ করেন তার কাজ।

স্বপ্নে পাওয়া তিন অধ্যায়!

স্কটিশ কথাসাহিত্যিক রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডা. জ্যাকেল অ্যান্ড মি. হাইড'। এই উপন্যাসের প্রধান তিনটি অধ্যায় স্টিভেনসন মূলত স্বপ্নেই পেয়েছেন। শুনতে আশ্চর্য হলেও বিষয়টি কিন্তু মিথ্যা নয়। গল্পের প্লট নিয়ে যখন ভাবছিলেন, তখন একদিন ঘুমের ভেতর দেখেন জ্যাকেল আর হাইডের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। ঘুম ভেঙেই তিনি লিখতে বসেন আর পরবর্তী তিন দিনে লেখেন প্রায় ৩০ হাজার শব্দ। কিন্তু সেটা পছন্দ না হওয়ায় সেই পাণ্ডুলিপি আগুনে ছুড়ে ফেলেন। তার পর ছয় দিনে ৬৪ হাজার শব্দে তৈরি করেন উপন্যাসের প্রথম খসড়া। স্টিভেনসন চরমভাবে মাদকাসক্ত ছিলেন। অনেক সমালোচক এটা তার আফিমের প্রভাব হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।

বিটলস-এর গান ইয়েস্টার ডে

চার পাণ্ডবের ব্রিটিশ রক ব্যান্ড বিটলসের খ্যাতি জগৎজোড়া। বিটলসের একটি বিখ্যাত গান ইয়েস্টার ডে। এই গানটি পল ম্যাকার্টনি পেয়েছিলেন অনেকটা স্বপ্নে। ১৯৬৫ সালে একদিন ঘুমের ভেতর স্বপ্নের ঘোরে একটি গানের সুর বেজে যায় তার মনে। ঘুম ভেঙে পিয়ানোতে সেই সুরও তুলে ফেলেন তিনি। এই সুরটি অন্য কারও গানের প্রভাব কি-না বা অন্য গানের সুর কি-না, এটা ভেবে এবং নানান জনকে জিজ্ঞেস করে কাটে তার এক মাস। অবশেষে জন লেলন আর ম্যাকার্টনি মিলে গানের কথাও লিখে ফেলেন, যা বিটলসের অ্যালবাম 'হেল্প'-এ স্থান পায়। অ্যাকুয়েস্টিক গিটারের সুরে ধীর লয়ের গানটি বেশ জনপ্রিয়তাও পায়। চার সপ্তাহ ধরে টপ চার্টের শীর্ষে অবস্থান করে। পরবর্তী সময়ে বব ডিলান, এলভিস প্রিসলি, রে চার্লস, বিলি ডিন, কেটি পেরিসহ অনেকেই গেয়েছেন 'ইয়েস্টার ডে' এবং এ পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি কাভার ভার্সন হয়েছে গানটির।


সাপের স্বপ্ন থেকে বেনজিন অণুর সহাবস্থান

ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃত্রিম রাবার, রঞ্জকসহ আধুনিক সময়ের বিভিন্ন জিনিস তৈরিতে ব্যবহূত মূল দ্রাবকের নাম বেনজিন। হাইড্রোজেন ও কার্বনের ছয়টি করে মোট ১২ অণুর সাহায্যে গঠিত বেনজিনের গঠন প্রণালি আবিস্কার করেন জৈব রসায়নের প্রাণপুরুষ ফ্রেডরিখ অগাস্ট কেকুলে; সেটাও স্বপ্নের মাধ্যমে! বেনজিন নিয়ে যখন কাজ করছিলেন, তখন নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন এর গঠন নিয়ে। কিন্তু সফলতা ধরা দিচ্ছিল না। এক সন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে যখন ঝিমুচ্ছিলেন, কেকুলে তখন স্বপ্নে দেখেন একটি সাপ। সাপটি তার লেজ মুখ দিয়ে ধরে আছে, সাপটিকে দেখতে ষড়ভুজের মতো দেখাচ্ছিল। ঘুম ভেঙে বুঝতে পারেন এটাই তিনি চাইছিলেন- হাইড্রোজেন ও কার্বনের ১২টি অণুর সহাবস্থান!


অ্যাটমের গঠন প্রণালি ভাবনা

আধুনিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ডেনিশ পদার্থবিদ্যাবিদ নিলস বোর। তাকে বলা হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক। পদার্থবিদ্যার একক ক্ষুদ্রাংশ বা অ্যাটমের শক্তি নিয়ে তিনি কাজ করেন। অ্যাটমের থিওরি নিয়ে তার গবেষণা যখন প্রায় শেষ, কিন্তু সমস্যা হলো অ্যাটমের গঠন প্রণালি নিয়ে। কোনো ভাবনাই তাকে সমাধান দিতে পারেনি। বোর এক রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন, সূর্যের চারপাশে যেমন গ্রহগুলো ঘুরতে থাকে, তেমনি অ্যাটমের নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনও অ্যাটমকে ঘিরে থাকে। ঘুম থেকে জেগে উঠে তিনি ভাবনার সুরাহা করতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞান তো আর স্বপ্নে পাওয়া বিষয় বিশ্বাস করে না। সুতরাং সে অনুযায়ী অ্যাটমের গঠন প্রণালি তৈরি করে তিনি সফলতা লাভ করেন। তার অনবদ্য সৃষ্টির জন্য তিনি ১৯২২ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।


এভাবে বললে, স্বপ্নের ঘোরে হাজারো সৃষ্টির কথাই বলা যাবে। যেমন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের কথাই বলি। তার প্রায় প্রত্যেকটি বৈজ্ঞানিক ধারণার পেছনে আছে স্বপ্নের দারুণ ভূমিকা। ইনসুলিন আবিস্কারে কানাডিয়ান ডাক্তার ফ্রেডরিখ বেন্টিংয়ের সাফল্যের মূলেও রয়েছে স্বপ্নের হাত। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজান। যিনি গণিতের হাজারো জটিল বিষয়ের সমাধান করেছেন, দিয়েছেন নানান তত্ত্ব। তার কাজের পেছনেও আছে স্বপ্নের অবদান। সৃষ্টিশীলদের কাজের ক্ষেত্রে স্বপ্ন কখনও কখনও অনুপ্রেরণা হয়ে আসে। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটা তাদের ক্রিয়াশীল মনের অবচেতন অবস্থার ফলাফল। মানব সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী, লেখক, উদ্ভাবক আর শিল্পীদের এমনতর স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়!


মন্তব্য