আমার বাবার কথা

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ : ৩০ আগষ্ট ২০১৯

আমার বাবার কথা

আবদুল মান্নান সৈয়দ [জন্ম :৩ আগস্ট ১৯৪৩-মৃত্যু :৫ সেপ্টেম্বর ২০১০]

  জিনান সৈয়দ

আমার শৈশবে আমি যখন রাতে ঘুমাতাম, তখন ঘুম ভাঙলেই দেখতাম আব্বু লিখছেন। শীতের ভোরে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার সময় বা তার কিছুদিন আগে থেকেই আব্বু আমাকে জাগিয়ে দিতেন। লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে অথবা বসে আব্বু আমাকে পড়াতেন এবং নিজে লিখতেন। একটু বেলা হলে আম্মু ছাদে কাঁথা বিছিয়ে দিয়ে যেতেন, বালিশে উপুড় হয়ে শুয়ে লিখতেন আব্বু। দিনশেষে বিকেল বেলার দিকে পাড়ার রেস্টুরেন্টগুলোতে আড্ডা দিতে যেতেন আব্বু। ওখানেই আসত আব্বুর বিখ্যাত সব লেখক বন্ধু। সন্ধ্যায় আব্বু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যেতেন। রাত করে বাড়ি ফিরতেন। তখন তার সাহিত্যিক বন্ধু ছিল অগণিত- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বেলাল চৌধুরী, আনোয়ার আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, আল মুজাহিদী, শাহাবুদ্দীন আহমেদ, বারেক আবদুল্লাহ, সৈয়দ ইকবাল, আহমদ মাযহার, লুৎফুর রহমান রিটন, বুলবুল চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম বেদু, শাহজাহান হাফিজ, শহীদুর রহমান, মোহাম্মদ রফিক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মফিজুল আলম, আবদুস সেলিম, সিকদার আমিনুল হক, আবুল হাসান, সেলিম সারোয়ার, মুহম্মদ নুরুল হুদা, নুরুল করিম নাসিম, ওমর শামস, তাসীম সাহা, রফিক আজাদ, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ফরহাদ মজহার, সায্‌যাদ কাদির, শহীদ কাদরী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, হায়াৎ মামুদ, আবদুস সাত্তার, নাজমুল আলম, কাজী রব, রণজিৎ পাল চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দীন, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ আরও আরও অজস্র। ছোটবেলার ঈদ আমাদের যৌথ পরিবারের আনন্দময় উৎসব। তাতে আব্বুর তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। শুধু আমাকে আর আম্মুকে নিয়ে আব্বু অনেক শপিং করতেন, ঘুরতে নিয়ে যেতেন। ভোগ ফ্যাশন, পিয়ারসন্স এসব দোকান থেকে আমাকে এক্সক্লুসিভ জামা আর স্টেডিয়াম, নিউমার্কেট থেকে আম্মুর জন্য দামি শাড়ি এসব আব্বু নিজের পছন্দে কিনে দিতেন। মার্কেটে যেদিন আমরা যেতাম, সারাদিন বাইরেই থাকতাম।

আমি একটু বড় হওয়ার পর থেকে দেখেছি- আব্বু রোজার মাস পুরোটাই ঈদ সংখ্যার লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতেন। বিশেষত উপন্যাস লিখতেন তিনি পত্রিকা অফিসে গিয়ে। অনেক রাতে ফিরতেন এবং ঈদের দিন ঈদসংখ্যাগুলোয় নিজের এবং অন্যদের লেখা পড়তেন। আমাদের পড়ে শোনাতেন মজার কিছু অংশ এবং অভিনয় করে দেখাতেন। আব্বুর মজার মজার কমেন্ট শুনে আমার চাচি, চাচাতো ভাইবোনেরা খুব হাসত। আমার কৈশোরে আমরা চলে এলাম আব্বুর সরকারি চাকরিসূত্রে আজিমপুর কলোনিতে। আব্বু তখন ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার নামের সরকারি অফিসে সকাল ৭-২টা পর্যন্ত অফিস করতেন। আজিমপুর কলোনিতে থাকাকালীন আমাদের জীবনটা ছিল খুবই আনন্দময়। যৌথ পরিবার থেকে আলাদা সংসারের দিকে আমার আম্মুর আগ্রহ বেশি ছিল। এটাই সম্ভবত স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক।

সব নারীই নিজস্ব অঙ্গন চায়। এবং স্ত্রীকে তা দিতে পেরে আব্বুকেও খুব আত্মতৃপ্ত মনে হতো। আমরা তিনজন, প্রায় সম্পূর্ণ খালি বাড়ি, খাট, খাবার টেবিল-চেয়ার, টিভি, শোকেস, ড্রেসিং টেবিল, বইয়ের একটা শেলফ, বেতের চেয়ার, আবিদ চাচা [কবি আবিদ আজাদ] বাসায় এসে বিস্মিত। 'মান্নান ভাই, আপনার ফ্রিজ, সোফা সেট এসব নেই!' আব্বু কিছুটা লজ্জিত, কিছুটা বিব্রত। আসলে যৌথ পরিবারে আমাদের এর বেশি প্রয়োজন কখনও হয়নি। আব্বু 'চারণ পুরস্কার' পেয়ে একটা 'হিটাচি' ফ্রিজ কিনলেন। আস্তে আস্তে রঙিন টেলিভিশন, সোফা সেট, বুক সেলফ, আব্বুর পড়ার টেবিল, ভিসিআর, ওয়ারড্রোব, আমার পড়ার টেবিল সব কেনা হলো। আব্বু তখন তিনটি চাকরিও করেছেন। পত্রিকা সম্পাদনার চাকরি। তখন আজিমপুরের বাসায়ও আসতেন প্রচুর বন্ধু-বান্ধব- সেই সময়টাতে আব্বু অনেক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। শিল্পতরু, এখন, নজরুল একাডেমী পত্রিকা... আব্বুর এই চূড়ান্ত সাহিত্য ব্যস্ততার সঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্যানুষ্ঠান তো ছিলই, ছিল টিভি অনুষ্ঠানও। আজিমপুরের আমাদের ১৩/এম ফ্ল্যাটে শীতকালে গোসলে যাওয়ার আগে নাচতেন আব্বু। খালি গায়ে ফর্সা, স্লিম শরীরে আব্বুর নাচে আমি আর আম্মু মজা পেতাম খুব। ব্যায়ামের মতো গা গরম করে তারপর আব্বু গোসলে ঢুকতেন। আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, আনন্দময়, সুখী একটা সময়।

প্রেম ও আবদুল মান্নান সৈয়দ

প্রেম ছাড়া কেউ কবি হয়- আব্বু অন্তত তা বিশ্বাস করেন না। নারী, রাত্রি, বৃষ্টি, প্রেম এবং কবিতা সব সমার্থক শব্দ আব্বুর ডায়রিতে। তার কাছে জীবন মানে সাহিত্য। আর সাহিত্যের প্রাণ যদি কবিতা হয়, তাহলে কবিতার প্রাণ হচ্ছে প্রেম। তা দেশপ্রেমই হোক, প্রকৃতিপ্রেমই হোক- মাতৃপ্রেমও হতে পারে। এবং নর-নারীর শাশ্বত প্রেম তো আছেই। বিদ্রোহও তো প্রেমেরই আরেক রূপ।

তিনি লিখেছিলেন, "আমার জীবনের শেষে এসে প্রেমে পড়ার প্রথম সময়টা এত মাতাল ছিল। 'প্রেমের কবিতা' বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলাম...

'একটা ঝড়ের মতো এসে পড়েছিল সে... আমার জীবনে। তছনছ করে দিয়ে গেছে সব। অসম্ভব বেদনা দিয়েছে। অসম্ভব আনন্দ। জীবন ভরে দিয়েছে। শূন্য করে দিয়েছে জীবন। ফেটে পড়েছি উল্লাসে। ক্রন্দনে ভেঙে পড়েছি। আমার সাধ্য আর কতটুকু?



আর প্রেম ... অবাস্তব প্রেমই শুধু ঘোর তৈরি করতে পারে। তৈরি করে ভেতর থেকে সৃষ্টির অফুরন্ত প্রেরণা। শুধুমাত্র প্রেমই মানুষকে সৃষ্টিশীল করে দেয়, হয়তো প্রেমের ক্ষেত্র আলাদা হয় ক্ষেত্রবিশেষে, যেমন মানবপ্রেম মানুষকে সমাজসেবী করে তোলে, প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ করে তোলে প্রকৃতিপ্রেমিক। ঠিক তেমনি সবচেয়ে আদি প্রেম নর-নারীর প্রেম। আব্বু ভেতর থেকে অনুভব করেছেন- প্রেম তাকে সজীব, প্রাণবন্ত করে তুলছে। তিনি প্রেমকে লালন করেছেন সাহিত্য সাধনার অংশ হিসেবে। রানু তার সহধর্মিণী, তার ছায়ার মতো। ছায়া ছাড়া মানুষ হয় কি! রানুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা নিবিড় ছায়ার মতোই। তার মতামতই রানুর মত। যে যা চায় তা-ই রানু করে। তাকে রানু যতটা বোঝেন, তার প্রয়োজন রানুর মতো করে সে নিজেও সবসময় বোঝেন না।

শুধু এই একটা ব্যাপারে রানু এত অবুঝ! বুঝতেই চান না এই ষাটোর্ধ্ব বয়সে যে প্রেম তাতে রানুর অধিকার বিন্দুমাত্র হরণ হয় না। রানু যখন সাজগোজ করে লিপস্টিক, টিপ, কাজল দিয়ে তার সঙ্গে বের হন, সব বয়সের, শ্রেণীর মানুষ রানুর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। তাঁর অসহ্য লাগে, ঈর্ষা হয়। এও তো প্রেমই, ঈর্ষা ছাড়া প্রেম কই! একবার এক প্রকাশক তো বলেই ফেললেন 'মান্নান ভাই, আপনার পার্মানেন্ট বান্ধবীটিই কিন্তু সবচেয়ে সুন্দরী'। সে জন্য রানুকে নিয়ে একটু কমই বের হওয়া হয়। তা নিয়ে তার একমাত্র মেয়ের অনুযোগও কম নয়। কিন্তু অন্য কোনো নারী পাশে থাকলে নিজেকে বেশ যুবক মনে হয়, কেউ সেই নারীর দিকে তাকালে গর্ববোধ হয়, বেশ একটা আত্মতৃপ্তি ... যেমন ... আমিও পারি আর কী... আজকাল ফাস্টফুড শপগুলোতে, আজিজ সুপার মার্কেটে, অলিয়ঁস ফ্রঁসেসে ছেলেগুলোর ভাব দেখ ... যেন মনে হয় দুনিয়াটা তার! তার এই যুবক বয়সটাতে তিনি সম্পূর্ণ লাজুক ছিলেন। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা তো দূরে থাক, কারও দিকে চোখ তুলে তাকাতেও বেশ সাহস সঞ্চয় করতে হতো। অথচ আজকালকার ছোকরাগুলোকে দেখ, সমানে ছেলেমেয়ে একে, তাকে তুই তোকারি করছে, ধাক্কাধাক্কি করছে, হাসছে, কথা বলছে, লাফাচ্ছে, যেন নাচছে। ঈর্ষা হয় আব্বুর! আহা, বয়স কেন বেড়ে যায় তার! প্রায়ই গল্প করতে বসতেন তিনি আমার সঙ্গে :তিনি সফল নাকি অসফল... বলতেন- 'আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যা হয়েছি, যা হতে চেয়েছিলাম... আমাকে বারবার ডাকেন, না হলে নিজেই ছুটে যায়... আয় জিনান, একটু বোস... আমার কাছে... কিন্তু মেয়েটাও তারই মতো বড্ড অস্থির... কিন্তু তার মতো লেগে থাকতে পারে না কিছু নিয়ে... মেয়েটাকে নিয়ে তার দুশ্চিন্তা হয়। কারণ মেয়েটা যে তারই মতো বড্ড আবেগপ্রবণ। এই দুনিয়াটা শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদীদের জন্যই। তার পরছায়া মেয়ের মধ্যে দেখলে তাই বড্ড রেগে যায়, আমাকে নিয়ে আব্বুর লেখা সেই কবিতা...

জিনানকে

এই তো সেদিন তুই ছিলি একফোঁটা জুঁই,
আজ পত্র-পবে বিস্তৃত।
আজ তোর দিনভোর কর্মব্যস্ততার ঘোর।
হয়েছিস নিজস্ব-চিহ্নিত
খোলা পৃষ্ঠা উল্টে যায় সূর্যাভায় চন্দ্রাভায়,
বয়েই সে চলেছে জীবন।
শুধু আমি তারই মধ্যে লিখে যাই গদ্যে-পদ্যে
অনুভূত দৃষ্টি ও মনন।
সে তো একফোঁটা মাত্র। জীবনের ভরা পাত্র-
আজ বুঝি- পূর্ণই রয়েছে।
থেকে যায় শূন্যই। পূর্ণ : অতল, অথই।
পাইনি কিছুই সিন্ধু সেঁচে।
জ্যৈষ্ঠ আজো ঝড় বয়। অন্তরালে সময়
তারো আগে কোথায় হারায়।
নাকি সে-ই স্থির বসে? প্রতি প্রত্যুষে-প্রদোষে
আমাদেরি দিনরাত্রি যায়?
তবু তো শ্রাবণ মাসে কালো মেঘ করে আসে
এর চেয়ে আশ্চর্য দেখিনি।
ঠিকই ঘুরে যাচ্ছে ঋতু। এমনই নিঃশব্দ, মৃদু-
চাকা যেন, যেনবা হরিণী।
সকালে বা সন্ধ্যায় দক্ষিণের বারান্দায়
একা বসে এই কথা ভাবি :
আমি কি জানতাম আছে আমারি নিজের কাছে
লুকানো-সে স্বর্গের চাবি?-
সে তো আর-কিছু নয় : ঘাস-মৃত্তিকার জয়,
পাখি-পতঙ্গের কলধ্বনি,
দিনরাত্রি সারা বেলা রৌদ্র-জ্যোৎস্নার খেলা :
প্রাত্যহিক- সে-ই তো অরণি।
স্বপ্নে তোকে আজো দেখি সেই ছোট্টটি- সে কী!
বাস্তবে তো বিস্মিত পঁচিশ!
সময়, স্রোতের মতো, চলে যায় অতিদ্রুত,
বুঝিস বা না-বুঝিস!
কিছু বোঝা যায় না রে! জীবনের পারাবারে
কাগজের নৌকো বেয়ে যাওয়া-
এছাড়া করবার নেই। কিছুই জানি না খেই।
কেবলি বিচ্ছিন্ন বোধ : হাওয়া!
তাই বলি, শান্ত থাক। নদীতীরে চক্রবাক
কেঁদে তুই মরিসনে খামোখা।
যেটুকু করবার কর। নদীজল তরতর
লিখে যাক তার লেখাজোখা।
ঢেউয়ে লুটোপুটি খাবি- তবে-না জীবনে পাবি,
কাকে বলে আস্বাদ-আঘ্রাণ।
জীবন এক বিস্ময়! ধুলো এরও মধুময়!-
এ কথাই জানিস, জিনান।


মন্তব্য