হ্যালো, আমাকে চিনতে পারছেন?

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ৩০ আগষ্ট ২০১৯

হ্যালো, আমাকে চিনতে পারছেন?

ছবি ::এম এইচ তাশরিফ

  রাহাত খান

ছোটবেলায় মানে একটু বোধজ্ঞান হওয়ার বয়স থেকেই আমার যেখানে-সেখানে প্রেমে পড়ার একটা অভ্যাস ছিল। এটাকে আমি বিশ্নেষণ করতে পারিনি। তবে আমি জিনিসটাকে এভাবে বুঝতে চেষ্টা করি যে, হয়তো আমি খুব রোমান্টিক ছিলাম। প্রেমের যে একনিষ্ঠতা- এটা প্রাপ্তবয়স্ক সময়েও আসে। যখন মানুষ পরিণত হয়, তখন আসে। কিন্তু ছোটবেলায় তো সেটা ছিল না আমার।

ময়মনসিংহ শহরে আমি দীর্ঘকাল থেকেছি। স্কুলে পড়াশোনা করেছি, সেখানে আবার কলেজে শিক্ষকতাও করেছি। সব মিলিয়ে পনেরো-ষোলো বছর হবে। ময়মনসিংহে আমরা যে পাড়ায় থাকতাম- সেখান থেকে স্কুলে যাওয়ার পথ শর্টকাট করার জন্য আমি প্রায়ই একটা বাড়ির মাঠের ওপর দিয়ে যেতাম। ওখানে আমার একটা বন্ধু ছিল চন্দন। ও ভালো ফুটবল খেলত। ওর বোন মঞ্জু। মঞ্জু ভৌমিক।

একদিন আমি স্কুলে যাচ্ছি, দেখলাম যে দুটো মেয়ে সাইকেল চালানো শিখছে। একজন হচ্ছে মঞ্জু, তার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে। মঞ্জু এসে আমাকে বলল, সাইকেলটা একটু ধরো না, আমরা একটু জল খেয়ে আসি। তো, আমি কিছু না ভেবেই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু ওদের তো আর আসার নাম-গন্ধ নেই। ওদিকে আমার স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে। কী করব বুঝতে পারছি না! হঠাৎ দেখি জানালায় দুটো মেয়ে বসে হাসছে। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না ওরা যে আমাকে বোকা বানিয়েছে। আমাকে সাইকেল ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে দেখছে আর দু'জনে মিলে হাসছে। এ নিয়ে আমি অবশ্য পরে আমার দু-একটা উপন্যাসে বলেছি, যে মঞ্জু- আমি আর কতকাল সাইকেল ধরে থাকব! ওরা অবশ্য পরে এসে আমাকে বলেছিল, আমরা আসলে জল খেয়ে এসে দেখছিলাম, তুমি এখনও আছো কি-না?



দুই.

আমার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার পরে ওই পাড়া থেকে আমরা চলে আসি অন্য একটা পাড়ায়। বহুদিন চন্দনদের আর কোনো খবর জানতাম না। এর মধ্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছি। ধীরে ধীরে লেখালেখি শুরু করছি।

একদিন আমার কলেজে আমি ক্লাস নিচ্ছি। হঠাৎ পিয়ন এসে বলল- স্যার, আপনার টেলিফোন। তখনকার দিনে অ্যানালগের যুগ। আমার মনে হয়, ময়মনসিংহ শহরে তখন সব মিলিয়ে দশটা টেলিফোনও বোধ হয় ছিল না। আর সরকারি গাড়ি বাদে গাড়ি ছিল মোটে তিন-চারটা। সে যা-ই হোক, পিওনের কথায় আমি তো অবাক! এই মফস্বল শহরে আমাকে টেলিফোন করার মতো কে আছে!

আমি টেলিফোন ধরতে গেলাম। কলেজের একমাত্র টেলিফোনটা ছিল প্রিন্সিপাল স্যারের ঘরে। সৌভাগ্যক্রমে প্রিন্সিপাল স্যার ছিলেন না। টেলিফোনের আরেক প্রান্ত থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো। বলল, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি বললাম যে না, আমি ঠিক চিনতে পারছি না। আর সাধারণত কলেজে আমাকে কেউ টেলিফোন করার মতো নেই। আর কোনো মেয়ে তো দূরের কথা। তো, কথা শুনে ওপাশ থেকে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, আমি মঞ্জু। আমি ভাবলাম, মঞ্জু! এত দিন পর!

মঞ্জু বলল, আমাদের এখানে একটা বসন্ত উৎসব করব আমরা। তো, আমার ওপর ভার পড়েছে আপনাকে জানানো যে স্ট্ক্রিপ্টটা আপনাকে লিখতে হবে। আজকে বিকেল বেলা প্রেস ক্লাবে আমরা বসব। আপনি যদি আসতেন। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি আসব।

ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব তখন ছিল বেশ জমজমাট। আমাদের আড্ডা দেওয়ার, সময় কাটানোর জায়গা ছিল সেই প্রেস ক্লাব। সন্ধ্যাবেলা যেতাম, রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত থাকতাম। ফেরার সময় তখন সুনসান চারপাশ। আসতে আসতে ভাবতাম- একটা ভূতও আমার সঙ্গে বোধ হয় হাঁটছে। এই ভূত মানে জিন-ভূত না, জীবনের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার একটা ভূত তখন ভর করত। ভাবতাম, এই শহর কবে ছাড়ব; কবে ভালো করে লিখতে পারব!



গেলাম বিকেল বেলা। মঞ্জু খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। দেখতে-শুনতেও ছিল ভালো। ঘাড় পর্যন্ত কাটা চুল, যাকে বলে বপকাট। তো, রিহার্সেলে মঞ্জুর গলা শুনে আমি তো স্তব্ধ হয়ে রইলাম। আমি প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। এত সুন্দর কণ্ঠ আর এত সুন্দর করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে মঞ্জু, আমি তাকিয়েই রইলাম অসাধারণ মুগ্ধতায়। রিহার্সেল শেষে আমাকে বলা হলো, আপনি স্ট্ক্রিপ্টটা লিখবেন। কী লিখবেন, আপনিই জানেন। আমি বললাম, মঞ্জু, আপনার গান শোনার জন্য কি বাসায় যাওয়া যাবে? মঞ্জু অবাক হয়ে বলল, ওমা! আসেন না; আমি তো বিকেল বেলা গানই করি। আর তো কোথাও যাই না। যখন খুশি চলে আসবেন।

আমি বেশ কিছুদিন বাসায় গিয়ে মঞ্জুর গান শুনলাম। এর মধ্যে বসন্ত উৎসবের স্ট্ক্রিপ্টটাও লেখা শেষ হলো। স্ট্ক্রিপ্টটা ছিল এ রকম- তখন দিলিপ কুমার আর নার্গিসের একটা সিনেমা বের হয়েছিল, সম্ভবত 'মেলা' নাম ছিল সিনেমাটার। তার মধ্যে একটা কথা ছিল, 'ধারতি কো আকাশ পুকারে, আজা আজা, আনাহি পারা।' মানে- আকাশ ডাকছে মাটিকে, আসো আসো, আসতেই হবে। এই থিমটার ওপরেই আমি লিখলাম, কেননা পৃথিবীতে প্রতিবছর বসন্ত আসে, আবার চলে যায়। পৃথিবীও যেন বসন্তকে ডাকে, বসন্তের জন্য অপেক্ষা করে। আমি লিখলাম পৃথিবী ও বসন্ত দুটি চরিত্র। এবং এটা অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিল।

আমি প্রায় বিকেলে মঞ্জুর ওখানে গান শুনতে যাই। মঞ্জু বেশ অর্থপূর্ণ গান গায়। কিন্তু আমার কোনো সাহস হয় না যে ওকে বলি, তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। তবু দু'জনের ভেতর একটা হৃদ্যতা তৈরি হয়েছে। সে মাঝেমধ্যে আমাকে বলে, স্যার, আসুন না। তখন তো আমি কলেজে পড়াই। মঞ্জুও বিদ্যাময়ী স্কুলে সঙ্গীতের শিক্ষক ছিল। যা-ই হোক, ওর বুঝতে কোনো সমস্যা হয়নি যে স্ট্ক্রিপ্টটা আসলে আমি ওকে নিয়েই লিখেছি। এর মাঝেই একদিন প্রেস ক্লাবে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। বললাম, বলেন। মঞ্জু বলল, একটু এদিকে আসেন। বলল, স্ট্ক্রিপ্টটা আমার চাই। আমাকে দিতে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে, আপনি নেন না। সমস্যা কী আছে! মঞ্জু বলল, আপনাকে একটা কপি করে দেব? আমি বললাম, না, দরকার নেই। কারণ, আমি তখন সবেমাত্র লিখতে শুরু করেছি। এ ধরনের লেখা সংগ্রহে রাখার কোনো ইচ্ছাই তখন আমার ছিল না। তো, লেখাটা মঞ্জু নিয়ে গেল।

তিন.

মঞ্জুদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানদের পরিবারের খুব বন্ধুত্ব ছিল। আইয়ুব খানের আমলে ওই বাড়ির একটি মেয়ে রেডিওতে খবর পড়ত। শামীম ওসমানদের ফুফু। ঢাকায় যখন জগন্নাথ কলেজে পড়াতে আসলাম ১৯৬৫ সালে, ওসমান পরিবারের সেই মহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আমরা একই কলোনিতে থাকতাম। মাঝে মাঝে দেখা হতো।

সেই ভদ্রমহিলা আমাকে একদিন বলে বসলেন, আচ্ছা, আপনি এত ভীতু কেন! আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন, কী হয়েছে? তিনি বললেন, চিন্তা করে দেখেন।

আসলে মঞ্জু চেয়েছিল, যাতে আমি তাকে প্রস্তাবটা করি। কিন্তু তখন আমার সাহসে কুলোয়নি। কিন্তু একদিন-দু'দিন গান শুনতে না গেলে অন্য কাউকে দিয়ে মঞ্জু বলে পাঠাত, স্যারকে বলো আসতে। কলকাতা থেকে ফিরলে সে বলত, আমি যে নতুন গান শিখে এসেছি আপনাকে শোনাব। সত্যিই অপূর্ব এক গানের গলা ছিল মঞ্জুর।

১৯৬৪ সালে একদিন আমাকে সরাসরি ডেকেই পাঠাল মঞ্জু। আমার এক বন্ধু ছিল আলোকময় নাহা। নায়কের মতো চেহারা। নাহা বলল যে, রাহাত তুই একটু মঞ্জুর বাসায় যাইস। তো, গেলাম আমি।

মঞ্জু সেদিনও আমাকে দু-একটা গান শোনাল। শুনিয়ে হাঁটুর ওপরে হাত রেখে তার ওপর চিবুক রেখে বসে আছে। চুপচাপ। কিছু বলছে না। আমি বললাম, মঞ্জু, কী হলো! গাবেন না? তবু মঞ্জু কোনো কথা বলছে না। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি একটু আসেন আমার সঙ্গে। বলে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল আমাকে।

চৌষট্টি সালে হিন্দু-মুসলিম একটা দাঙ্গা হয়েছিল। আমরা তখন হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য অনেক পাড়া পাহারা দিয়েছি।

তো, আমাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে মঞ্জু বলল, আমরা কাল সকালে চলে যাচ্ছি। বাঁধাছাদা সব শেষ। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। খানিকক্ষণ দু'জনেই চুপ করে রইলাম। তারপর মঞ্জু বলল, আমাদের তো আর দেখা হবে না।

ওর চোখে পানি। আমারও তাই।

আমি আসলে ভেবেছিলাম, এ আর এমন কী। এটা তো স্বাভাবিক। ঘনিষ্ঠ কারও বিদায়ে এমন কষ্ট হতেই পারে। কিন্তু মনের ভেতরে কোন কথা বাজছিল, তা হয়তো নিজের কাছেই নিজে প্রকাশ করতে সাহস পাইনি তখন।

চার.

তারপর কেটে গেল বেশ কিছু বছর। দেশ স্বাধীন হয়েছে। হঠাৎ আরেকটা টেলিফোন এলো একদিন-

কী, চিনতে পারছেন আমাকে?

এইবার ঠিক চিনতে পারলাম। সেই মঞ্জু।

ওরা বসতি করেছিল ঝাড়খন্ডে। সেখানেই বিয়ে হয়েছে। ময়মনসিংহের ইতিহাসের ওপর একটা বই পড়ে সেখানে আমার নাম পেয়েছে, যে আমি বেশ নাম করেছি। লেখক হিসেবে, সাংবাদিক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছি কিছু। তাই পড়ে আমাকে ফোন করল। পরে চিঠিও লিখেছিল আমাকে। আমি আবার একটা বোকামি করে চিঠির উত্তরে কিছুটা আবেগ প্রকাশ করে ফেলেছিলাম। তারপর যা হওয়ার তাই হলো। আমাদের যোগাযোগ আবার বন্ধ হয়ে গেল।



তারপর আরও অনেকগুলো বছর চলে গেল। আবার সেই ফোন- আমাকে চিনতে পারছেন?

আমি বললাম, এই কণ্ঠ কি আর ভোলা যায়?

ও বলল, আমরা কি এখনও আপনি আপনিই বলব! বললাম, না, তুমি তুমিই বলি। ও একদিন কথা প্রসঙ্গে বলল, আমি কতবার তোমার অনুষ্ঠান দেখতে গেছি, শুধু তোমার জন্যই। তুমি আমাকে একদিন মুখ ফুটে বললে না! কেন বললে না!

আমি বললাম, আমি তো গ্রামের ছেলে। আমার তখন আসলে ভয় করত।

আরেকদিন ওকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, তোমার চারপাশে তো তখন সমস্ত হিরোরা ঘুরে বেড়াত। আমার মতো পাতলা একটা ছেলেকে কেন ভালো লাগল তোমার।

মঞ্জু বলল, দেখ তোমাকে একটা কথা বলি। মেয়েরা রোগা-পাতলা এসব দেখে না। মেয়েরা দেখে আচরণ, চোখ, ব্যক্তিত্ব এসব।



এরপর মাঝেমধ্যে কথা হতো। মন খুলেই কথা হতো তখন। মঞ্জু বলেছিল, তুমি যদি একটা বার আমাকে বলতে। আমার বান্ধবীকে আমি বলেছি। মানে শামীম ওসমানের সেই ফুফুকে। আমি বললাম, এখন আর বলে কী হবে মঞ্জু।

মাঝখানে বেশ কিছুদিন মঞ্জুর অসুস্থতার জন্য আমাদের কথা হয়নি। সুস্থ হয়ে আমাকে আবার টেলিফোন করেছে। আমরা কথা বলেছি এভাবে আরও দু-তিন বছর।

হঠাৎ একদিন ওর মেয়ে ফোন করে বলল, আঙ্কেল, মা তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

সেদিন সারাটা দিন আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি।



মঞ্জু জীবীত থাকা অবস্থায় আমি বুঝতে পারিনি- যে মঞ্জুকে হারানো আমার জন্য এক দুর্বিসহ যন্ত্রণার।


মন্তব্য