নিঃশ্বাসের শব্দের ধারে-কাছে

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ৩০ আগষ্ট ২০১৯

নিঃশ্বাসের শব্দের ধারে-কাছে

অলঙ্করণ ::আনিসুজ্জামান সোহেল

  সরকার আমিন

মন কালো করে বসে আছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে।

সাল? ১৯৮৮।

'আমার কেহ নাই ভাব' মনে। চারপাশে ফুর্তির শব্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। নানা অনুষ্ঠান। তুমি এলে। খুব সাদামাটা একটা জামা তোমার পরনে। চোখে খানিকটা কাজল। হাতে গোলাপি কালারের রং-জ্বলা ব্যাগ। সহজ একটা মানুষ আমার সামনে। তোমাকে দেখে আমার ভেতর ভূমিকম্পের সংক্রমণ! এই অনাত্মীয় শহরে, এই অতিবেশি স্মার্ট নগরে, কেউ কাহারে না চিনে মর্মে মর্মে; ক্যাম্পাস জুড়ে, কে তুমি সহজিয়া হরিণী? আমার ভেতরে পটাপট ফুটতে লাগল শত লাল গোলাপ! সাইনোসাইটিস, থাইরয়েড আর অচিকিৎসপ্রায় বিষণ্ণতায় আমি ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যাচ্ছি। কবিতা লিখে লিখে যেন আত্মহত্যা ঠেকিয়ে রাখছি। এমনই ভীষণ বিষণ্ণ এক দিনে তোমার আগমন।

আমার ক্লাসমেট নীলু বলল, 'এ হচ্ছে শাহনাজ মুন্নী, কবিতা লেখে, তোমার সাথে পরিচিত হতে চায় আমিন।' আমি তোমাকে খুব একটা পাত্তা দিলাম না। 'ও' বলে একটু কি হেসেছিলাম! মনে পড়ে না। তুমি সোশিওলজিতে পড়ো। তোমাকে বললাম, 'আসো একদিন বাংলা বিভাগে। কথা হবে।' যথারীতি তুমি বাংলা বিভাগে এলে। আমি নাকি সেদিনও তোমাকে এড়িয়ে গেছি। তুমি কঠিন রাগ করে নীলুর কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলে। আমি নাকি অহংকারী। তুমি যদি জানতে মুন্নী, আমি তখন তোমাতে ডুবে আছি। আমার কল্পনাজুড়ে এক সহজ নারী। তুমি। আমাদের প্রথম পরিচয়ের দিনগুলোতে খানিকটা বাংলা সিনেমা হয়ে গেল।

সন্দেহ-টন্দেহ তোমাকে মানায় না। আঠারো বছর আমাদের বিয়ের। একসাথে থাকলাম ২৩ বছর। তুমি কখনো জটিলতা করোনি। চুম্বক, আমি লোহা। বেশি দূরে যেতে পারি না।

বন্ধু তো হলে তুমি। বিয়ে কি করবে আমাকে? জানা দরকার। একদিন সন্ধ্যায় বললাম, খুব জরুরি কথা আছে তোমার সাথে আমার।

বলো'। এখন না কাল বলব। তুমি পরের দিন উদ্বেগ নিয়ে আমার সাথে দেখা করলে। কী কথা আমার?

একটা রিকশায় চড়ে বসলাম তোমাকে নিয়ে। তুমি অবাক। কোথায় যাচ্ছ? বললাম, অপেক্ষা করো। রিকশা গিয়ে থামল লালবাগের কেল্লায়। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। দাঁড়ালাম গিয়ে কেল্লার ভেতরের বিশাল পুকুরটার পাড়ে। তুমি হতবাক। বুঝতে পারছ না- জরুরি কথা বলতে কেন লালবাগের দুর্গে আসতে হলো।

পুকুরের পাড়ে ছোটো রেলিং। আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বললাম... 'মুন্নী, তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার জানা খুব দরকার, তুমি কি আমার সাথে সারাটা জীবন কাটাতে রাজি আছ?'

বিহ্বল তুমি। অস্পষ্ট একটু হাসি। খুব লাজুক ভঙ্গিতে বললে, 'হ্যাঁ'।

আমি বললাম, ও.কে। আমার জরুরি কথা শেষ। চলো ক্যাম্পাসে ফিরে যাই। রিকশায় করে ফিরে এলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরবর্তী জীবনে।



যোগ্য বর পাওয়া গেছে

১৯৯৩। মুন্নী জানাল, একজন অতীব যোগ্য বর পাওয়া গেছে ওর জন্য। সব দিক থেকে উত্তম। দেখতে শুনতে রাজপুত্র; আর বেতন? গাড়ি-বাড়ি সবই আছে। আমি বললাম, মাশাল্লাহ। এরকম বর দশে একটা মিলে। পরিবারে শুভ-উত্তেজনা। ওই লোককে নিয়ে ছোটো মামা শীঘ্রই আসছেন কনে দেখার জন্য।

'এখন উপায়?'

আমি বললাম, উপায় একটাই। চলো এক রুমের একটা ঘর ভাড়া করে বিয়ে করে ফেলি। আমি তখন মাসে ২৩০০ টাকার চাকরি করি উস প্রেসে। আঙুলে গুনে হিসাব করলাম- ১০০০ টাকা ঘর ভাড়া, ৭০০ টাকা চাল-ডাল। আরো বাকি থাকে ৬০০। সো, ভয় কী? ফরহাদ (ফরহাদ মজহার) ভাইকে বলব তোমাকে একটা চাকরি দিয়ে দিতে উবিনিগে। তাহলে তো আমরা রাজার হালতে চলতে পারব। ফরহাদ ভাই বললেন, আমিন, পাগলামি করবেন না। পারিবারিকভাবে চেষ্টা চালান। হুটহাট বিয়ে করবেন না।

কে এই চেষ্টাটা চালাবেন? আর কে, 'স্যার'। স্যার মানে প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। তখন তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। এক বাক্যে বললেন, তিনি আমার ভারপ্রাপ্ত পিতা। মুন্নীকে বললাম, কঠিন কাজটা তুমি করো। স্যারকে ক্রাইসিসের কথাটা তুমিই জানাও। স্যার ব্যবস্থা একটা করে ফেলবেন ঠিক।

মুন্নী গেল কলাবাগানে হারুন স্যারের বাসায়। সব শুনে স্যার হাসলেন আর বললেন, 'মুন্নী, আমি জানতাম, তুই একদিন আমার কাছেই আসবি।' মুন্নীর কাছ থেকে ওদের বাসার ঠিকানা রাখলেন স্যার। বিরাট সাহসী একটা কাজ করল মুন্নী। স্যার যখন আমাদের বিয়ের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন, তো আমার আর চিন্তা কী?

কয়েক দিন পরের ঘটনা।

একদিন ভোরে স্যার গিয়ে হাজির হলেন মুন্নীদের বাসায়। গুলশানের শাহজাদপুরে। কলিং বেল টিপলেন। দরজা খুললেন মুন্নীর বাবা। 'স্লামালাইকুম, আমি হারুন -উর-রশিদ, বাংলা একাডেমির ডিজি। একটু ভেতরে আসতে পারি?'

মুন্নীর বাবা হতভম্ব। বিটিভির কল্যাণে হারুন স্যার পরিচিত মুখ। বইমেলার সময় তো তিনি প্রতিদিন টিভিতে আসেন। সেই অতিবিখ্যাত ব্যক্তি কেন সাতসকালে আমার বাসায়? ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত মোফাজ্জল হোসেন সাহেব দরজা খুলে ড্রইং রুমে বসতে দিলেন হারুন স্যারকে। 'তা বিয়াই সাহেব, আমি আপনার মেয়ে মুন্নীর জন্য এক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।' মোফাজ্জল হোসেন ঢোক গিলেন। 'আমার ছেলের জন্য'। ওর নাম সরকার আমিন। বড়ো কবি হবে একদিন। আপাতত বড়ো কোনো চাকরি করে না। একদিন করবে। আশা করি, বাংলা একাডেমির ডিজির ছেলেকে আপনার পছন্দ হয়েছে। ও আমার ঠিক আপন ছেলে না, ধর্মপুত্র।

মুন্নীর মা সরকার আমিন সম্পর্কে মোটামুটি সব জানতেন। কিন্তু সম্ভাব্য নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে স্বামীকে আগাম কিছুই বলেননি। এবার তিনি রঙ্গমঞ্চে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেন। চা-নাস্তা এলো। হারুন স্যার তার জাদুময়ী নাটকীয়তা দিয়ে ওই দিনই মুন্নীর বাবাকে সম্মোহিত করে বিয়ের তারিখ প্রায় ঠিক করে ফেললেন। ঠিক হলো, খুব অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়ে শীঘ্রই মিয়া-বিবির আক্‌দ সম্পন্ন করে ফেলা হবে। পরে অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান হতে পারে। হারুন স্যার বাংলা একাডেমিতে ফিরেই উস প্রেসের টিঅ্যান্ডটি ফোনে আমাকে জানালেন, 'ছোড়া, তোর বিয়ে ঠিক করে এলাম'। মুন্নীর বাবা বড়ো ভালো মানুষরে। সহজেই রাজি হয়ে গেল।'



পুলিশের ট্রাকে বিয়ের শাড়ি

১৯৯৩ সাল। সামনে আমার বিয়ে। বাবা সদ্য শিক্ষকতা থেকে রিটায়ার করেছেন। সংসারে টানাটানি। ধনী চাচাতো ভাই সব জেনে বলল, 'ধুর। টাকার চিন্তা তোর না। আমার। সব খরচ আমার। আমার বাসা থেকে বর সেজে বিয়ে করতে যাবি।' শেষ লাইনটা ঝামেলা বাধাল। তার বাসা থেকে বরকে রওয়ানা দিতে হবে কেন? তিনি আমার বিয়ের খরচ-পাতি দিচ্ছেন- এটাই কি জাহির করার চিন্তা! সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি হল থেকেই বিয়ে করতে যাব। তখনো তো ইউনিভার্সিটি ছাড়িনি। মাস্টার্সের ফলের অপেক্ষায়! বাস করি জহুরুল হক হলের ১২০ নম্বর কক্ষে। আব্বাকে বললাম, দশ-বারোজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নিয়ে হলে চলে আসেন। মিরপুর থানার দারোগা বন্ধু আরিফ বলেছে, বিয়ের দিন সে মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করবে। আমি যাব হারুন স্যারের গাড়িতে। যেহেতু আক্‌দ বিয়ে হচ্ছে, কনে তোলার বাধ্যবাধকতা নাই। আর কনেকে তো ভার্সিটির হলে তোলা যাবে না! রেজাল্ট বের হোক। বর উন্নত চাকরি লাভ করুক। তারপর কনে তুলে নেবার অনুষ্ঠান হবে। সবই বুঝলাম, কিন্তু আক্‌দ বিয়ে হলেও তো কিছু খরচাপাতি আছে। কনেকে তো একটা শাড়ি অন্তত দিতে হবে। একদিন মুন্নী এসে আমার হাতে পাঁচ হাজার টাকার একটা খাম দিল। 'আম্মা দিছে। সহজ-লোন। চাকরি পাইলে পরে দিয়া দিবা।' বিস্ময়ে আমি কাঁদব না হাসব বুঝতে পারছি না। সম্ভাব্য শাশুড়ির পাঁচ হাজার টাকাতেই বিয়ের শাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত ফাইনাল হলো।

মিরপুর থানার দারোগা বাল্যবন্ধু আরিফ বলল, চলে আসো থানায়। মিরপুর বেনারসি মার্কেট থেকে 'পইলা শাড়ি' ক্রয় করা হবে। সম্ভাব্য শ্যালিকা পান্না, কনে মুন্নী ও আমি বেবি ট্যাক্‌সি দিয়ে গেলাম মিরপুর থানায়। থানায় গিয়ে শুনি, দারোগা সাহেব বাইরে গেছেন জরুরি ডিউটিতে। সেন্ট্রি বসতে দিল, আর ওয়্যারলেস করল, স্যার, আপনার বন্ধু আইছে।

কিছুক্ষণ পর দারোগা আরিফ পুলিশের ট্রাক নিয়ে থানায় হাজির। 'দোস্ত শোনো, পান্না আর মুন্নী বসবে ট্রাকের সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে। তুমি আমি চলো ট্রাকের পেছনে গিয়ে বসি। কী দরকার বেবিট্যাক্‌সির? এই ট্রাক নিয়েই চলো যাইগা।'

পান্না আমোদিত। সে শিল্পী মানুষ। থ্রিল অনুভব করছে। গোটা দশেক পুলিশও আছে ট্রাকে। ট্রাক এগিয়ে চলছে। বাহ, বিয়ের প্রথম শাড়ি কিনতে যাচ্ছি পুলিশের ট্রাকে চড়ে। গন্তব্য মিরপুরের বেনারসি মার্কেট।

ট্রাকের ড্রাইভার পুলিশ-সাহেব পুলিশের ট্রাক নিয়ে দাঙ্গা সামলাতে গেছেন বহু জায়গায়। এরশাদ জমানার হরতাল ভাঙতে গেছেন বহুবার। কখনো বিয়ের শাড়ি কিনতে যাননি। তার চোখেমুখে চোরা-হাসি।

যথাসময়ে ট্রাক গিয়ে হাজির হলো মার্কেটে। পুলিশের অসময়ে হানা দেখে মার্কেটের দোকানিরা তটস্থ হলো। তবে কি ইন্ডিয়ার শাড়ি ধরার জন্য পুলিশ এসেছে রেইড দিতে! কিছুক্ষণের মধ্যে দোকানিরা আনন্দিত সহযাত্রী পুলিশদের কাছ থেকে প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে নিজেদের দোকানে সম্ভাব্য বর-কনে-শ্যালিকা ও দারোগা সাহেবকে স্বাগত জানাতে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিল। মুন্নী বিব্রত হবার ভান করছে। আমি গম্ভীর হবার চেষ্টা করছি। আমি আরিফকে বললাম, 'উচিত মূল্যে আমি বিয়ের শাড়ি কিনতে চাই। শাশুড়ি প্রদত্ত পাঁচ সহস্র টাকা বাজেট। তুমি পুলিশি-প্রভাবে দাম কমাবার চেষ্টা কোরো না দোস্ত।' সমস্যা হলো, দোকানিরা কিছুতেই শাড়ির দাম নিবে না। মার্কেট ভরে গেছে কৌতূহলী জনতায়। ট্রাকের ড্রাইভার সাহেব ঘটনার বয়ান দিয়ে চলছেন।



বিয়ের দিনে

দুটো গাড়ি ছুটছে মুন্নীদের বাড়ির দিকে। মাইক্রোবাসে আব্বার নেতৃত্বে অতিঘনিষ্ঠ আত্মীয়গণ। আর একটি গাড়ির সামনের সিটে আমি বসা। পেছনের আসনে হারুন স্যার, চাচি ও হজরত সৈয়দ রশীদ আহমদ জৌনপুরি হুজুর। আমার দেখা এক আলোকিত দার্শনিক ও সুফীবাদী পীর ইনি। ইনি হারুন স্যারের মুর্শিদ। বয়স ১০০ পেরিয়ে গেছে। দেখলে মনে হয় ৫০। হোন্ডায় করে মতিঝিলে অফিস করেন। প্রচলিত পীরের মতো না একদম। কর্ম করে খান, শিষ্যদের খাওয়ান। দান-দক্ষিণা গ্রহণ করার কারবার নাই। জৌনপুরি হুজুর আমাদের সাথে গাড়িতে; তিনি বিয়ে পড়াবেন। আমি হুজুরকে নানাজান বলে ডাকি। আমার সাথে তার সম্পর্ক হাসি-ঠাট্টামিশ্রিত নানা-নাতির। শত শত লোক তার সামনে গিয়ে ভক্তিতে গজগজ, আমি সহজ রসিকতায় গৃহীত। গাড়ি চলছে। হঠাৎ পেছন থেকে আমার মাথায় আঙুলের কঠিন ঠুকনি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি নানাজান। স্বর্গীয় হাসি তার মুখে। আমাকে আঙুল দিয়ে কাটাকাটি চিহ্ন দেখিয়ে বললেন, শোনো নাতি, প্রবেশ করতে যাচ্ছ নতুন জীবনে। পুরোনো সবকিছু কাটাকাটি। ডিলেট। বুঝেছ? তার আঙুলের ঠুকনিতে আমার মাথায় যেন ঝিঁ ঝি ধরে গেল। আমি হাসলাম, জি নানাজান, অতীতের অপ্রয়োজনীয় সবকিছু ডিলেট। তিনি হা হা করে উচ্চস্বরে হাসলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকার রাস্তায় যানজট তেমন একটা ছিল না। আমরা মিনিট তিরিশের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মুন্নীদের বাড়ি।

সংক্ষিপ্ত বিবাহ অনুষ্ঠান। অতিথিদের জন্য ফখরুদ্দিনের কাচ্চি বিরিয়ানির ব্যবস্থা। খাওয়াদাওয়া শেষ। বিবাহ পড়ালেন জৌনপুরি হুজুর। সন্ধ্যার আগেই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। কনে থেকে যাচ্ছে। বরের চাকরি-বাকরি হবে, বাসা হবে তারপর কন্যা তুলে দেওয়া হবে। হারুন স্যারের সঙ্গেই গাড়িতে করে ফিরছি। প্রায় সন্ধ্যা। গাড়িতে আছেন চাচি (হারুন স্যারের স্ত্রী)। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, 'এই, তোরে কোথায় নামাব রে?' স্যার, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে নামিয়ে দেন। কেন? ওখানে কেন? আমার বন্ধুরা ওখানে অপেক্ষা করছে। গাড়ির অভাবে সবাইকে তো অনুষ্ঠানে নিতে পারিনি। 'ও', স্যার বুঝলেন। গাড়ি গিয়ে থামল ধানমণ্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এ। ওখানে অধীর আগ্রহে বিবাহিত সরকার আমিনের জন্য অপেক্ষা করছে সাদ কামালী, মুজিব ইরম, কবির হুমায়ূন আর শাহেদ কায়েস। আমাকে পেয়ে সমবেত উল্লাস। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের ক্যান্টিনে কোমল পানীয়ের অর্ডার দেওয়া হলো। আমি আমার লেখা কবিতার একটা অংশ আবৃত্তি করলাম :'বিবাহিত নই আমি বিবাহিত প্রায়, পরক্ষণে চেয়ে দেখি ঘোড়া হেঁটে যায়।' শুরু হলো ম্যারাথন আড্ডা। কী ছিল আড্ডার বিষয়? মনে পড়ে না। ওই সময়টা ছিল আমাদের সৃষ্টিশীল উন্মাদনার। আড্ডা একবার শুরু হলে তা যে কখন শেষ হবে কেউ জানে না। আলোচনার কোনো মা-বাপ নাই। রবীন্দ্র-পাঠ থেকে শুরু করে জুতো সেলাই তক কোনোকিছু বাদ যায় না। রাত ক্রমে গভীর হয়ে ওঠে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা রাস্তায় বেরোই। আবার হাঁটি আবার কথা বলি। অনন্ত কথাগুচ্ছ শেষে রাত দশটার দিকে জহুরুল হকে ফিরে আসি। হলে ঢুকেই দেখতে পাই দেনে আলী মিয়াকে। ইনি উস প্রেসের পিয়ন। সেই অর্থে আমারও পিয়ন। কী ব্যাপার, এত রাতে দেনে আলী মিয়া কেন হলে? ঘটনা কী? ভয় পেয়ে যাই মনে মনে। দেনে আলী বলে, 'স্যার, তাড়াতাড়ি চলেন হারুন স্যারের বাসায়। আমি কখন থেইক্কা বইসা আছি। আপনারে না লইয়া গেলে আমার চাকরি থাকবে না।' কেন? আমি জানি না। তবে স্যার কইছে সঙ্গে যাতে লুঙ্গি, তোয়ালা লইয়া যান।

মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। স্যারের বাসায় যেতে হবে। এত রাতে। সঙ্গে থাকতে হবে লুঙ্গি-তোয়ালে। বিষয়টা কী? কোমল পানীয়তে কি অ্যালকোহল মিশানো ছিল যে অধিবিদ্যার জগতে ঢুকে যাচ্ছি। না, দেনে আলী মিয়ার কঠিন তাগাদায় সম্বিত পেলাম। লুঙ্গি-তোয়ালে নিয়ে রওয়ানা দিলাম হারুন স্যারের বাসায়।

কলাবাগানের বাসায় পৌঁছামাত্র নাকে এলো সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ। কলিং বেল টিপে ড্রইং রুমে ঢুকেই দেখি বিয়ের শাড়ি পরিহিত এক কনে। সাজুগুজু করা। কনের মুখে কপট রাগ। হারুন স্যার ও চাচির মুখে রহস্যময় হাসি। শাহনাজ মুন্নীকে কনে হিসেবে বেশ ভালো লাগছে।

খাবারের টেবিলে চাচি বললেন নেপথ্য কাহিনী। আমাকে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে গাড়ি থেকে নামিয়ে স্যারের মনে হলো, আহারে বেচারা আমিন! ছেলেটা কবি। বিয়ে হলো আজ, আক্‌দ মানে তো বিয়েই। অথচ ছেলেটা বউ পেল না! এই ড্রাইভার, গাড়ি ঘুরাও। চলো মুন্নীদের বাড়ি। স্যার আমার শ্বশুর সাহেবকে আবার সম্মোহিত করলেন। বিয়াই সাহেব, ছেলের একদিন বাড়ি-গাড়ি হবে। সেদিন কি সে বিয়ের প্রথম রাতটা ফেরত পাবে! আপত্তি না করলে মেয়েটাকে আমাদের সাথে যেতে দিন। ওদের বাসর রাত হবে আমার বাড়িতে। অতঃপর গাড়িতে করে মুন্নীর কলাবাগান আগমন। দেনে আলীকে হলে প্রেরণ। আমার গ্রেফতারকৃত অবস্থা।

রাত গভীর হচ্ছে। চুটিয়ে চলছে স্যারের সাথে আড্ডা। স্যারের বিয়ের ঘটনা। কত কী! এক সময় স্যার ও চাচি বললেন, আজ রাত আমাদের পুরো ফ্ল্যাটটা তোদের। আমরা এক বন্ধুর বাসায় চলে যাচ্ছি। সকালে দেখা হবে।

স্যার, চাচি চলে যাবার পর ওই ফ্ল্যাটে আমি আর মুন্নী। মুন্নীকে বললাম, চলো স্যারের লাইব্রেরিটা একটু ঘুরে দেখি। পেয়ে গেলাম রফিক আজাদের 'প্রেমের কবিতা' বইটা। বার বার পড়লাম একটা কবিতার কয়েকটি লাইন-

'ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া,

বিরহ-বালুতে খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি;

ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি

খুব ক'রে ঝুঁকে থাকা।'

বাইরে একটা কুকুর মাঝেমাঝে করুণ সুরে ডাকছিল। কুকুরের ডাক শুনতে কখনো কখনো খারাপ লাগে না।



এক রুমের নীল সমুদ্র!

আক্‌দ বিয়ে হয়ে যাবার বছর খানেকের মধ্যে ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমিতে আমার চাকরি হয়ে গেল। মুন্নীও চাকরি গ্রহণ করার জন্য তৈরি। এখন তাহলে দেরি কেন? শুরু করলাম বাসা খোঁজা। আগে বাসা তারপর কনেবরণ। বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারগুলোতে সাবলেট পাওয়া যায়। আমাদের দরকার অমল-ধবল একটা মাত্র কক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দারোয়ানের বাসার খোঁজ পাওয়া গেল। মুন্নী আর আমি গেলাম বাসা দেখতে। দারোয়ান সাহেব তরুণ দম্পতি দেখে খুবই খুশি। ঝায়-ঝামেলা কম। বাসা ভাড়া ১২০০ টাকা। আমাদের জন্য চমৎকার। কিন্তু সমস্যা বাধাল মুরগি। রুমের পাশে বিরাট এক ঝাঁকিতে মুরগি পালন কর্মসূচি। মুরগির বিষ্ঠার গন্ধের মধ্যে আমি তো আমার দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারি না। ওঠো মুন্নী। হবে না। এই বাসায় চলবে না। মুন্নী ওঠে না। নেগোশিয়েট করতে চেষ্টা করছে। মুরগিগুলো বিক্রি করে দেন না। গন্ধের মধ্যে তো আপনাদেরও কষ্ট হচ্ছে। দারোয়ান সাহেব অবাক। এ আর কী গন্ধ! সব সহ্য হয়ে যাবে। উঠে যান। আমি মুন্নীর হাত ধরে সজোরে টেনে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি বাখ-বিটোফেনের অনেকগুলো ক্যাসেট বহু কষ্ট করে জোগাড় করেছি ছুটির দিনে বাসায় শুয়ে আরাম করে শুনব বলে। মুন্নী, তুমি ভাবছ মুরগির বিষ্ঠার মধ্যে ক্ল্যাসিকেল মিউজিক শুনব আমি! মুন্নী হাসে। তাহলে উপায়? চলো আজিমপুরে যাই। ওখানে নিশ্চয় কেউ আমাদের জন্য বসে আছে একটি কক্ষ ঝাড়-পুছ করে। চলো তাহলে।

আজিমপুর কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটছি। মার্কেটের একটি রুমে দেখি রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন। ওটা একটা কম্পিউটারের দোকান। কবি নির্মলেন্দু গুণ রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি মেলে বসে আছেন দোকানে। আমি জানতাম গুণ-দা ওখানে কম্পিউটার কম্পোজের বাণিজ্য করেন। গুণ-দাকে এড়িয়ে গেলাম। ওখানে গেলে দেরি হয়ে যাবে। আমাদের টার্গেট একটা অমল-ধবল কক্ষ খুঁজে বের করা।

আজিমপুর গোরস্তানের পাশে ইরাকি কবরস্থান। ওর পাশে চিকন একটা গলি ধরে এগুতেই চোখে পড়ল 'টু-লেট (ছোটো পরিবারের জন্য এক রুম)'। পাঁচতলা বাড়ির দু-তলায় কক্ষটি। দশ বাই দশ একটা রুম। নীল রঙ করা ঘর। জানালা একটা। আমি সেই ঘরে ঢুকেই বললাম, এ তো নীল সমুদ্র। বাড়ির মালিক স্নিগ্ধ দাড়িওয়ালা মাইডিয়ার মানুষ। নবদম্পতির জন্যই তিনি যেন অপেক্ষা করছেন। 'চাচা কবুল। এই ঘর আমরা নিলাম।' ভাড়া ঠিক হলো ১০০০ টাকা। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডভান্স করে ফেললাম।

এর কিছুদিনের মধ্যে কনে তুলে নেবার অনুষ্ঠান হয়ে গেল 'অলরেডি কমিউনিটি সেন্টারে।' অনুষ্ঠানে মুষ্টিমেয় অতিথিকে আমার তরফে বলা হলো। মনে পড়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি ফরহাদ মজহার, কবি কামরুল হাসান, রাজনীতিবিদ ফেরদৌস আহমদ কোরেশী। অন্য বন্ধুরা তখনো অপেক্ষা করছিল শাহবাগের সিলভানায়।

১৯৯৪ সালের শীতে মুন্নী আর আমি এসে ডেরা গাড়লাম আজিমপুরের নিউ পল্টন রোডের এক কক্ষের ওই নীল সমুদ্রে। নীল সমুদ্রের পাশে আরো দুটো পরিবার বাস করে। বাথরুম মাত্র একটা। তাও আবার আমাদের রুম লাগোয়া। রান্নাঘর মাত্র একটা। বাথরুম ও রান্নাঘর ব্যবহার করতে হলে রীতিমতো বুকিং লাগে। আমাদের সমস্যা নাই। কারণ আমরা আজিমপুরের হোটেলে খেয়ে আসি। হোটেল ম্যানেজার আমাদের খাতির-যত্ন করেন। সমস্যার মধ্যে একটা বাথরুমের ব্যাড স্মেল সরাসরি আমাদের কখনো আঘাত করে। সেটাও সমস্যা না। আমি একটু পরপর বালতি মারি।

ওই নীল সমুদ্রে আমরা দরজা-জানালা বন্ধ করে সাঁতার কাটি। আমার একটা ভাঙাচোরা টেপ রেকর্ডারে কেবলই গান করেন কলিম শরাফী, দেবব্রত, হেমন্ত। 'নীড় ছোটো ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো' আমাদের গৃহসংগীত।

বাংলা একাডেমিতে চাকরি করি। বাজার করি আজিমপুর গোরস্তান মার্কেটে। বাসায় আসতে যেতে লাশ গুনি। কবরের পাশের কোয়ার্টারে আমাদের যৌথ-জীবন শুরু হলো।



চটের কার্পেট

১৯৯৪। আজিমপুরের চিকন গলির মাথায় আমাদের এক রুমের নীল সমুদ্র। অতি প্রিয় বন্ধুরা মাঝে মাঝেই সমুদ্র দর্শনে আসছে। আলুভর্তা-ভাত, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ডিম ভাজি। এই হচ্ছে কমন মেন্যু। আগরতলা থেকে ঢাকায় এলেন কবি দিলীপ-দা। সঙ্গে আরো কোনো কবি। আমি নিয়ে এলাম নীল সমুদ্রে।

নিউ মার্কেট থেকে চট কিনেছি। আর কিনেছি রঙের ডিব্বা। লক্ষ্য, কার্পেট বানানো। মুন্নীর ছোটো বোন পান্না। ও আর্টিস্ট। দাওয়াত করে আনা হলো কার্পেট বানানোতে সাহায্য করার জন্য। মুন্নীর ছোটো ভাই শিমুল। বয়স দশের কোঠায় (সে এখন পিজির বিরাট ডাক্তার, এমডি করছে), সেও এসেছে। কার্পেট বানানো দেখতে হবে না! দিলীপ-দা মেঝেতে আজব কার্পেট দেখে প্রথমেই জানতে চান কার্পেট রহস্য। আমি বললাম, এই সেই জাদুর কার্পেট যাতে চড়ে আমি আর মুন্নী ছুটে যাই দিগদিগন্তের ওপাশে। আমাদের এক রুমের সমুদ্রটা হয়ে পড়ে ব্রহ্মাণ্ডের চেতন বিন্দু। কঠিন দার্শনিকতায় সমবেত হাসি।

আলুভর্তা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন হলো। আগরতলার কবিরা জেনে গেল এই আলুভর্তার অপূর্ব স্বাদের কথা। কারণ এটি বানানো হয়েছে অতিথি-গৃহস্থের যৌথ প্রযোজনায়।

একদিন আমার শ্বশুর ঘোষণা দিলেন- তিনি আসবেন মেয়ের বাড়ি দেখতে। এবার আমি চিন্তিত। আমার ট্রাডিশনাল শ্বশুর কি নিউ মার্কেট থেকে কেনা চট দিয়ে বানানো অদ্ভুত কার্পেটসমৃদ্ধ প্রায়-অন্ধকার ঘরটা দেখে পছন্দ করবেন? তিনি ব্যাংকার। অঙ্ক করা মানুষ। তিনি কি আহত হবেন না? আহা রে! মেয়েটার কী হাল! বাবার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে মুন্নী নিশ্চিত নয়।

বাবা এলেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। সঙ্গে আমার শাশুড়ি। তারা সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন দু-তলায়। আমি নীল সমুদ্রের দরজায় দাঁড়িয়ে শ্বশুরকে স্বাগত জানালাম।

তিনি ঘরে ঢুকলেন। তার নজরে পড়ল চটের কার্পেটটা। সারামুখ আলো করে হেসে উঠলেন বাবা। এই তাহলে সেই কার্পেট! বুঝলাম, পান্না ও শিমুল এই মহান কার্পেট সম্পর্কে স্যুররিয়েলিস্টিক বর্ণনা দিয়ে এনেছে বাবাকে।

মুন্নী সমগ্র মনোযোগ দিয়ে রান্নাবান্নারত। এই প্রথম সে তার নিজের বাড়িতে বাবাকে দাওয়াত করে খাওয়াচ্ছে। খানাদানা হবে কার্পেটে বসে। কারণ এক চিলতে কার্পেট ছাড়া ছোটো ঘরটার সবখানে বই। আমার আর মুন্নীর এসব সম্পদ কোথায় ফেলে আসব! প্রতিবেশীদের মধ্যে যাদের সাথে কথা হয়নি, তারা চোরাচোখে ঘরে চুপি দিয়ে কেবলই বই দেখেছে। তাদের অনেকের ধারণা, আমরা পুরোনো বইয়ের ব্যবসা করি।

খাবার খুব ভালো হয়েছে- বাবা ঘোষণা করলেন। তার মানে, বাবা এক রুমের দীন-হীন নীল সমুদ্র দেখে বিষণ্ণ নন। মুন্নী খুশি হলো কি-না অন্যেরা না জানলেও আমি জানি। ভীষণ খুশি সে। বাবা একটু বিশ্রাম করতে চাইলেন। আমরা তাকে ঘরে স্থিত একমাত্র খাটটিতে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করলাম। আর সবাই সমবেত হলাম নিচে কার্পেটে। আমরা আড্ডায় মেতে উঠলাম। আমাদের আড্ডার মধ্যমণি মা। মানে আমার শাশুড়ি। সন্ধ্যাবেলায় বাবার ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙার পর তিনি বললেন, খুব শান্তির ঘুম ঘুমালাম রে মা। মুন্নী উজ্জ্বল হলো। মুন্নীর মুখে অপার্থিব রোদ হামলে পড়ল যেন সন্ধ্যাবেলায়। আমার শ্বশুর বললেন... 'আমিন, আমি তোমাদের ছোটো ঘরটা দেখে সন্তুষ্ট। জীবন একটা সংগ্রাম। আমিও শুরু করেছিলাম জীবন; তোমারই মতো ছোটো একটা ঘর ভাড়া করে। ঘর কোনো ব্যাপার না, মন হলো ব্যাপার।'



স্বর্গছেঁড়া

১৯৯৫। জীবন ছুটে চলছে ঘোরের মধ্যে। অফিস করি, কবিতা করি, আড্ডা করি, ঘন ঘন ঝগড়াও করি। পান থেকে চুন খসলে মুখ কালো করি। মনে হয়, মানুষ কি এত কষ্ট পেয়েছে বউয়ের কাছ থেকে কখনো কোনোদিন! মুন্নী ব্যাকুল হয়ে রাগ ভাঙায়। তারপর তীব্র অপরাধবোধ। মুন্নী নির্লিপ্ত স্নিগ্ধতায় আমার আবেগের বাড়াবাড়ি উপভোগ করে। আজিমপুরের ছোটো ঘরটাতে...

সর্বক্ষণ সঙ্গে আছেন রবীন্দ্রনাথ। সাদাকালো টিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখি। একদিন টরেটক্কা ডিশের লাইন পেয়ে গেলাম মাগনা। পাশের বাসা থেকে উপচে পড়েছে বোধহয়। বিটিভিতে নারী-পুরুষ শিল্পী লাফায়, ঝাঁপায়, গান করে। নব ঘুরিয়ে দেখতে চাই। মুন্নীর সামনে আধানগ্ন নারী দেখতে বেশ শরম লাগে। মুন্নী না আবার নারী-লোভী ভাবে; ভয় পাই, নব ঘুরিয়ে দিই।

একদিন হাঁটছি গোরস্তানের পাশ-ঘেঁষা রাস্তাটা দিয়ে।

চোখে পড়ল 'টু লেট!' বড়ো স্টুডিও টাইপ এক রুমের বাসা ভাড়া হবে, সঙ্গে কিচেন, অ্যাটাচ্‌ড বাথরুম। আরে, এ তো দেখছি স্বর্গছেঁড়া। পুরো রুমটা নীল সমুদ্রের তিনটার সমান!

বাড়িওয়ালি খালাম্মার সাথে দেখা করলাম। মধুর করে হাসলাম। আমি দেখেছি, হাসি হচ্ছে অব্যর্থ সম্ভাষণ। সঙ্গে সঙ্গে কাজ দেয়। তিনি চা-নাস্তা অফার করলেন। চায়ের আমন্ত্রণে বুঝলাম, কাজ হয়েছে। স্বর্গছেঁড়া আমরা পেতে যাচ্ছি। চা খেতে খেতে খালাম্মার জীবনের 'হিস্টরি' শুনছি। ইনি অকাল বিধবা। এক পুত্র, এক কন্যা আর বাড়ি ভাড়া নিয়ে তার জীবন। করুণ মুখ করে তার কাহিনী শ্রবণ করলাম। তাও যদি ঘরটা ভাড়া পাই। ঠিক হলো, ঘরটা আমরা পাচ্ছি। ভাড়া দিতে হবে ২০০০ টাকা। বাহ! নাইস অ্যামাউন্ট! এ টাকা দেবার মতো সামর্থ্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে।

পরদিনই নিউ পল্টন লাইনের 'দশ বাই দশ অন্ধকারাচ্ছন্ন নীল সমুদ্র'কে বিদায় জানিয়ে প্রায় তিন গুণ বৃহৎ স্টুডিও টাইপ ঘরটাতে আমরা উঠে গেলাম। এটিকে নিঃসন্দেহে বাসা বলে ডাকা যায়। এই বাসাটিতে সারাক্ষণ লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে না। জানালা খুললেই পুবদিক থেকে নবীন আলো লাফিয়ে পড়ছে ঘরটায়। কী আনন্দ! কী আনন্দ! কিন্তু সমস্যা একটাই। জানালা খুললেই চোখে পড়ে সারি সারি নতুন কবর। এক-দুই ঘণ্টা বয়সী কবর দেখলে ভেতরটা মোচড় মারে। আর সারা রাত দেখি ও শুনি ভিক্ষুকদের স্বকীয় কলরব। তাহারা সারারাত জেগে গল্প করে। এ স্থানটাকে মনে হচ্ছে ভিক্ষুকদের রাজধানী। ভিক্ষুক-রাজধানী সন্নিকটস্থ মার্কেটে কবি নির্মলেন্দু গুণ কম্পিউটারের দোকানদারি করেন। আর এই মার্কেটের পাশেই আমাদের সুবৃহৎ বাসভবন 'স্বর্গছেঁড়া'। জীবন কাটছে মুর্দার নিঃশ্বাসের শব্দের ধারে-কাছে।

'বাট, আমরা কোনো ফেভার চাই না'

১৯৯৫। শুনলাম, ভোটার লিস্ট তৈরি হচ্ছে। একটি ফার্ম মুদ্র্রণের কাজ পেয়েছে। ওদের প্রুফ রিডার দরকার। দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বের হলো। যারা যারা প্রুফ দেখার কাজ করতে চান, এত তারিখ সরাসরি হাজির হোন মতিঝিলের এত নম্বর অফিসে।

মুন্নী ভালো প্রুফ দেখে। আমি কিছুটা পারি কিন্তু মন দিতে পারি না ঠিকমতো। বললাম, করবা নাকি কাজটা? কিছু বাড়তি আয় হয়। মুন্নী একবাক্যে রাজি।

হাজির হলাম গিয়ে মতিঝিলে। গিয়ে দেখি বিরাট লাইন। শত শত বেকার যুবক-যুবতী আবাল-বৃদ্ধ তীব্র রোদের মধ্যে লাইনে দণ্ডায়মান। ভেতরে ভাইভা হচ্ছে, প্র্যাকটিক্যাল হচ্ছে। এত সহজ নাকি কাজ পাওয়া! খাড়ান মিয়া লাইনে! বিরাট লাইন। কিছুটা দমে গেলাম। তাও আবার দৈনিক মজুরের মতো রোদে লাইন দিতে হবে। কিছুটা ইজ্জতেও লাগল। মুন্নী বলল, চলো গিয়ে দাঁড়াই। শ্রমিক হতে এসেছি, কাজ তো কাজই। ফুটানি দেখিয়ে লাভ কী? দাঁড়ালাম লাইনে। যেন হাজার বছরের দীর্ঘ লাইন।

হঠাৎ দেখি আমাদের দিকে ছুটে আসছেন এক কর্মকর্তা।

ভয়াবহ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমিন ভাই, মুন্নী আপা, আপনারা? কর্মকর্তা যেন বোবা হয়ে গেছেন। আপনারা লাইনে! আমি ততদিনে বাংলা একাডেমির তরুণ কর্মকর্তা, পদটা তত বড়ো না। তবে প্রায়ই সহ-পরিচালকের অনুপস্থিতিতে কাজ করি উপ-পরিচালকের। সিঙ্গেল রুম, ফোন সব আছে। খালি বেতন কম। সরকারি চাকরির বেতন তো ভয়াবহ কম। তো কর্মকর্তা মি. ছমির ইতিপূর্বে বাংলা একাডেমিতে কাজ করতে আমাকে দেখে গেছেন হয়তো। আর মুন্নীও তখন মোটামুটি বিখ্যাত তরুণ কবি। আমাদের মতো মানুষ কি না প্রুফ রিডারের মতো নগণ্য কাজ করার জন্য রাস্তায় রেশন লাইনের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি!

ছমির আমাদের দু'জনেকে ছোঁ মেরে যেন টেনে নিয়ে গেলেন তার বসের রুমে। এসি রুম। সুসজ্জিত। জানলাম, ভোটার লিস্ট বানাবার কাজটা তিনিই পেয়েছেন। চা এলো। 'আপনাদের মতো মানুষ কেন প্রুফ রিডারের কাজ করবেন? আপনারা ম্যানেজমেন্টের পার্ট হয়ে যান। সুপারভাইজ করেন কাজটা।' মালিক মৃদু হেসে বললেন।

অনুচ্চ কণ্ঠের অধিকারী মুন্নী চিরদিন মৃদুবাক। হঠাৎ সে যেন গর্জে উঠল। 'ভাই, আমরা প্রুফ রিডারের কাজই করব। ভাইভা দেব আর সবার মতো। পাস করলে কাজ হবে। না হলে হবে না। আপনাদের থ্যাঙ্কস। বাট, আমরা কোনো ফেভার চাই না।

আমি ভেতরে ভেতরে অবাক! এ কোন মুন্নী! নরম-শরম মুন্নী এত কঠিন! আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এত কর্কশ! মালিক বিস্ময়ে পাথর। সম্মান দিলাম, উপকার করতে চাইলাম, আর মহিলা কি না রেগে গেলেন। ছমির বোকা হাসি মুখে ধারণ করে পরিস্থিতি সামলালেন। ও.কে. মুন্নী আপা, চলেন ওই ঘরে। পরীক্ষা দিন।

আমরা পরীক্ষা দিলাম। যথারীতি কাজ পেলাম। ছমির বিরাট সম্মান জানান। জানা গেল, এই ছমির কবি মুজিব ইরমের রুমমেট। এই তাহলে কাহিনী!

মাস তিনেক শ্রমিকের মতো কাজ করলাম মতিঝিলে। সকাল থেকে বিকাল কাজ করি বাংলা একাডেমিতে। বিকেলে ঢুকি মতিঝিলে। বিশাল হলরুম। মাথার উপর টিউবলাইট। শিট আসছে শিট যাচ্ছে। রাত দশটায় কাজ শেষে মতিঝিলের রাস্তায় বানানো পরোটা আর ডিম খাই। নিজেদের মনে হচ্ছে ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাসের শ্রমিক দম্পতি। তিন মাস কাজ করে পেলাম পনের হাজার টাকার মতো। অনেক টাকা এক সাথে। মুন্নী প্রস্তাব দিল, বইগুলো ফ্লোরে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, চলো একটা বড়ো বুকশেল্‌ফ কিনি। নীলক্ষেত থেকে অর্ডার দিয়ে বড়ো একটা বুকশেল্‌ফ বানানো হলো। আজিমপুরের কবর সংলগ্ন আমাদের অতি সাধের স্টুডিও টাইপ ঘর 'স্বর্গছেঁড়া'য় বুকশেল্‌ফটাকে মনে হলো পরিবারের নতুন সদস্য।

চুরি হইছে, তো, এরা হাসে কেন?

১৯৯৫। আজিমপুর কবরস্থান মার্কেট থেকে একটা টিপতালা কিনেছি। সকালে টিপতালাটায় টিপ দিয়ে আমাদের আস্তানা 'স্বর্গছেঁড়া' থেকে বের হয়ে যাই দু'জনেই। গভীর রাতে বাসায় ফিরে তালাটা খুলি। টিপতালার সংসারে মূলত রাত্রিযাপন হয়। দিনে অফিস। তারপর ভেন্ডের ভেন্ডের ঘুরি দু'জনে। ঘরে আছে কিছু কাপড়চোপড় আর মোটামুটি 'অসীম' বইয়ের গাট্টি। ঘরে ইতিমধ্যে একখানা বুকশেল্‌ফ তার সারা অঙ্গ মেলে আসন গ্রহণ করে আছে। তারপরও ঘরটায় অনেক জায়গা। আমার টেপরেকর্ডারে ভায়োলিন বাজে। আমি যাত্রার প্যান্ডেলে অভিনেতার ভাবে-সাবে হাঁটার মতো করে ঘরটায় পায়চারি করি। মুন্নী এর মধ্যেই বইয়ে ডুবে যায়। আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ন বাতি জ্বলে থাকে। অবসর-এর ফুরসত মেলে না এমন মানুষেরা রাত্রিতে কবর জেয়ারত করতে আসেন। আমরা কবরের চারধার ঘিরে স্বজনদের প্রার্থনার সৌন্দর্য অবলোকন করি। অবলোকনের চোখ মাঝে মাঝে দেখতে চেষ্টা করে গতকালের ভিক্ষুকটির সাথে আজকের ভিক্ষুকনীর যে গল্প হচ্ছে, তারা ঠিক আগের জন কি-না। ভিক্ষুকরা কি ঘন ঘন আড্ডা-সঙ্গী বা সঙ্গিনী বদল করে!

একদিন গভীর রাতে বাসায় ফিরে টিপতালা খুলি।

লাইট জ্বালি। এ কী অবস্থা! সারাঘর জুড়ে তাণ্ডব। মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর টর্নেডো হয়ে গেছে। সবকিছু তছনছ। চোর বড়ো রসিক। যা পারে নিয়ে গেছে, যাবার সময় টিপতালাটা মেরে গেছে। আমরা যাতে ঘরটা খুলে অবাক হবার আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হই।

মুন্নীকে নিয়ে হিসাব করতে বসি কী কী খোয়া গেছে। প্রায় সকল জামাকাপড় উধাও। তা নিয়ে যাক। দুঃখ নাই। মুন্নী বলল, বই নাই! বলো কী! মাথায় হাত দিলাম। বিষণ্ণ হলাম। চোরদল অনেক বই নিয়ে গেছে। অনেক রেয়ার বই। বিশেষ করে নিয়ে গেছে অনেকগুলো ডিকশনারি। মুন্নী কঠিন মন খারাপ করল। আমাদের বই! আমাদের বইগুলো! বইগুলো! বুকের ভেতর গুমরে উঠল শোক! প্রিয়জন হারাবার ব্যথা। জানালা দিয়ে কবরের দিকে তাকালাম। শান্তি পাচ্ছি না। চোরেরা বই নিল কেন? পড়ার জন্য? নীলক্ষেতে বিক্রি করে দেবার জন্য! যে বই তন্ন তন্ন করে খুঁজে সংগ্রহ করেছি, তা তো ওরা সের দরে বিক্রি করে দেবে। মুন্নী ঠা-ঠা হেসে উঠল। আমাদের বন্ধু সাদ কামালীর উপহার দেওয়া অর্ধ ব্যবহূত শেভিং ক্রিমটাও নাই! সৌখিন চোর বটে!

কিন্তু কিছুতেই বই হারানোর শোক ভুলতে পারছি না। কৃষক যেমন গরু হারানোর শোক ভুলতে পারে না। মুন্নীকে প্রস্তাব দিলাম, চলো আমরা আগামী তিন ঘণ্টা মন খরাপ করে রাখি। তারপর সব দুঃখ ভুলে যাব। বিষণ্ণ মুন্নী রাজি হলো। ঘড়ির দিকে একটু পরপর তাকাই। আর এক ঘণ্টা। আর তিরিশ মিনিট। আর দশ মিনিট! এ যেন আত্মপ্রবোধের খেলা! তিন ঘণ্টা পর মুন্নী আমি হাসতে লাগলাম পরস্পরের দিকে তাকিয়ে! এ যেন দু'জন স্ব-রচিত পাগলের পারস্পরিক মশকরা।

ততক্ষণে প্রতিবেশিনীগণ খবর পেয়ে গেছে, আমরা চৌর্য-কবলিত। তারা এলেন সান্ত্বনা দিতে। তাদের দেখে আমাদের হাসি আরো বেড়ে গেল! খালাম্মাগণ অবাক। চুরি হইছে, তো, এরা হাসে কেন?


 
-আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার আমিনের ৫২তম জন্মদিনে প্রকাশিতব্য আত্মজীবনী 'এ জার্নি বাই লাইফ' থেকে


মন্তব্য