তুমুল গাঢ় সমাচার

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশ : ০২ আগষ্ট ২০১৯

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ

  বিনায়ক সেন

নতুন প্রসঙ্গ

পর্ব ::২৩

১. টি.এস. এলিয়ট : আধুনিক ধারার পথিকৃৎ

'ভালবাসার সাম্পান' বইতে ষাট-সত্তর দশকের কবিতার আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে বলতে গিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঘুরে-ফিরে বোদলেয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। ষাটের দশকের শুরুতে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে 'শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা' প্রকাশের পর দুই বাংলাতেই কবিকুলের ওপরে ফরাসি প্রভাব ঘনীভূত হয়েছিল। অধ্যাপক সায়ীদ লিখেছেন :

'পশ্চিম ইয়োরোপ আর আমেরিকার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যসর্বস্ব রুগ্‌ণ ও অবক্ষয়ী সংস্কৃতি ধারার... ঘুণেধরা ও বিকারগ্রস্ত প্রবণতাগুলো... আমাদের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার বিটনিকদের প্রভাব পড়েছিল সরাসরি। পশ্চিমবঙ্গের তরুণ সাহিত্যের অবক্ষয়ী ধারাটি হয়ে উঠেছিল আমাদের দোসর। তবে বাইরের যেসব অবক্ষয়ী প্রভাব আমাদের সাহিত্যিকভাবে আক্রান্ত করেছিল, তার মধ্যে আমার মনে হয়, সবচেয়ে সর্বাত্মক ও গভীর ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি কবি বোদলেয়ারের প্রভাব।'

এই বিবরণীতে কোথাও টি.এস. এলিয়টের উল্লেখ নেই। পরোক্ষভাবে, এক জায়গায় 'ফাঁপা মানুষ' কথাটার উল্লেখ রয়েছে, যা এলিয়টের ÔWe are the hollow menÕ'-এর প্রতি ইঙ্গিত। এটি কিছুটা বিস্ময় না জাগিয়ে পারে না। তিরিশের যুগে রবীন্দ্রনাথের সাথে বুদ্ধদেব বসুদের যখন চিঠিপত্রে তর্কালাপ হচ্ছে আধুনিক বাংলা কবিতার গতি-প্রকৃতি নিয়ে, তখন প্রথমেই যে-নামটি চলে এসেছে সেটি এলিয়টের নাম। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের একাধিক কবিতার অনুবাদ করেছেন; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত 'স্বগত' গ্রন্থে এলিয়টকে নিয়ে উদ্ৃব্দতি-বহুল একাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন; বিষ্ণু দে আলাদা করে প্রকাশ করেছেন 'এলিঅটের কবিতা' শীর্ষক অনূদিত কাব্যগ্রন্থ; জীবনানন্দ দাশের একাধিক প্রবন্ধে ঘুরে-ফিরে এসেছে এলিয়টের নাম। ওয়েস্টল্যান্ড ও ফোর কোয়ারটেটস্‌ যার হাত দিয়ে বেরিয়েছে তার সম্পর্কে ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে বিস্ময়কর নীরবতা কৌতূহলোদ্দীপক, সন্দেহ নেই। বিশেষত যদি মনে রাখি যে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংকট, অবক্ষয় ও বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রবল প্রভাববিস্তারকারী কবিতা এলিয়টের হাত দিয়েই নিষ্ফ্ক্রান্ত হয়েছিল। এই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, ইংরেজিতে লিখিত হওয়ার কারণে এলিয়টের অনেক কবিতাই বা কবিতার নানা বিচ্ছিন্ন পঙ্‌ক্তিমালাই পাঠকের মুখে মুখে ফিরত। বোদলেয়ারের ক্ষেত্রে যেটা সম্ভবপর ছিল না বুদ্ধদেব বসুর অনুপম অনুবাদের পরও।

আমরা যারা সত্তর দশকে এলিয়টের কবিতার নিমগ্ন পাঠক ছিলাম, তাদের কাছে এলিয়টের স্থান ছিল হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। 'লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক' আমরা ঘরে-বাইরে আবৃত্তি করেছি :

'Let us go then, you and I,
When the evening is spread out against the sky
Like a patient etherised upon a table'

অথবা,

'In the room the women come and go
Talking of Michelangelo'

অথবা,

'I grow old... I grow old...
I shall wear the bottoms of my trousers rolled.'

বা

'There will be time to murder and create,
And time for all the works and days of hands
That lift and drop a question on your plate;
Time for you and time for me,
And time yet for a hundred indecisions,
And for a hundred visions and revisions,
Before the taking of a toast and tea'

এবং সবশেষে

ÔNo! I am not prince Hamlet, nor was meant to be;
Am an attendant lord, one that will do
To swell a progress, start a score or twoÕ

'প্রুফ্রক' লেখা হয়েছিল ১৯১৭ সালে- প্রথম মহাযুদ্ধের ভেতরে। এই যুদ্ধের ধংসাবশেষের ওপরে ১৯২২ সালে লেখা হয় এলিয়টের সর্বাধিক পরিচিত 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড।' এই কাব্যগ্রন্থটিও আমাদের প্রজন্মের ওপরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আধুনিকতার জন্মই বলতে গেলে হয়েছিল ঐ বছরে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় এলিয়টের 'ওয়েস্ট ল্যান্ড, জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস' উপন্যাস, হারমান হেস-এর সিদ্ধার্থ, এবং বরিস পাস্তারনাকের 'মাই লাইফ সিস্টার' (জীবন আমার বোন)। [ঐ বছরেই প্রকাশ পায় আইনস্টাইনের 'দ্য মিনিং অব রিলেটিভিটি]। প্রুফ্রক আমাদের মুগ্ধ করেছিল ঠিক, কিন্তু ওয়েস্ট ল্যান্ড আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কবিতার মধ্যে নাটকীয় সংলাপ স্থাপনা, উক্তি ও পুনরুক্তি, আকস্মিক দার্শনিক স্বগত সংলাপ, ঘরের ও বাইরের পৃথিবীর মধ্যকার দেয়াল ভেঙে-পড়া, প্রথাগত মূল্যবোধের বিপর্যয়, ইতি ও নেতির দ্বন্দ্বে দীর্ণ শূন্য মানুষ, সভ্যতার সংকট- এই সবই ছিল সেখানে। এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে আধুনিকতার মৌলিক অনুভব হয়েছিল। পরপর কয়েকটি বহু-উদ্ৃব্দত লাইন নিচে তুলে ধরছি :

১.  April is the cruellest month, breeding
Lilacs out of the dead land, mixing
Memory and desire, stirring
Dull roots with spring rain.

২. Unreal City,
Under the brown fog of a winter dawn,
A crowd flowed over London Bridge, so many.
I had not thought death had undone so many.

৩.‘My nerves are bad to-night. Yes, bad. Stay with me.’
‘Speak to me. Why do you never speak. Speak’
‘What are you thinking of? What thinking? What?’
‘I never know what you are thinking. Think.’

৪. I think we are in rats’ alley
Where the dead men lost their bones.

৫. ‘What shall I do now? What shall I do?’
‘I shall rush out as I am, and walk the street.’
‘With my hair down, so. what shall we do tomorrow? ‘What shall we ever do?’
The hot water at ten.
And if it rains, a closed car at four.
And we shall play a game of chess.
Pressing lidless eyes and waiting for a knock upon the door.

৬. When lovely woman stoops to folly and
Paces about her room again, alone.
She smoothes her hair with automatic hand.
And puts a record on the gramophone.

৭. Who is the third who walks always beside you?
... ... ... ... ... ... ...
I do not know whether a man or a woman
- But who is that on the other side of you?

১০. 10. London Bridge is falling down falling down falling down
... ... ... ... ... ... ...
These fragments I have shored against my ruins.
... ... ... ... ... ... ...
Datta. Dayadhvam. Damyata.
Shantih shantih shantih


কবি নিজে ওয়েস্ট ল্যান্ড কাব্যগ্রন্থের জন্য পাদটীকা প্রস্তুত করেছিলেন। ওয়েস্ট ল্যান্ডের আদি খসড়ার সাথে প্রকাশিত পাঠের মধ্যে স্থানে স্থানে প্রচুর পরিবর্তন হয়েছিল। কিছুটা কবি এজরা পাউন্ডের খুঁটিনাটি মন্তব্যের কারণে, কিছুটা কবির নিজের পুনর্চিন্তায়। কবি-কৃত পাদটীকার সংখ্যা ছিল ৪৩৩টি; কিন্তু তাতেও এই দীর্ঘ কবিতার সম্পূর্ণ উপলব্ধি হয় না। উনিশ বছর বয়সে যখন পাঠ করেছি, তখনও ওয়েস্ট ল্যান্ড হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, যদিও সমস্ত অনুষঙ্গ সে বয়সে করায়ত্ত হয়নি। একষট্টি বছরে যখন পাঠ করেছি, তখন অনেকটাই বুঝেছি যে কোন লাইনটা কোন বই থেকে বা কোন সাহিত্যিক প্রয়োজন মেটাতে লেখা, কিন্তু তারপরও রহস্য এতটুকু কমেনি। এ বই এলিয়টকে চূড়ান্ত খ্যাতি এনে দিয়েছিল- ইংরেজি আধুনিক কাব্য চর্চার জগতে তাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল শীর্ষস্থানীয় আসনে। কিন্তু তারপরও কবির যাত্রা থেমে থাকেনি। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে- দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিতে- লেখা হবে তার 'ফোর কোয়ারটেটস্‌'; এর মধ্যকার 'দ্য ড্রাই স্যালভেজেস' কবিতাটি হবে তার মহত্তম সৃষ্টি।

আমার মনে পড়ে, অগ্রজ অর্থনীতিবিদ (ও কবি) আবু আবদুল্লাহর প্রিয় কাব্যগ্রন্থের একটি ছিল এলিয়টের ফোর কোয়ারটেটস্‌। আবু আবদুল্লাহর কাব্যরুচির ওপরে আমার পূর্বাপর অগাধ নির্ভরতা ছিল। এই কাব্যগ্রন্থের থেকে বিচ্ছিন্ন অনেক স্তবক ও পঙ্‌ক্তিমালা তার মুখে আবৃত্তি হতে শোনা গেছে। তার বড় ভাই অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার মত তিনিও ছিলেন কবিতার বড় সমজদার ও আবৃত্তিকার। আবু আবদুল্লাহ অনর্গল পড়ে যাচ্ছেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছি :

১১. Houses live and die : there is a time for building
And a time for living and for generation

১২. There is, it seems to us,
At best, only a limited value
In the knowledge derived from experience.
The knowledge imposes a pattern, and falsifies,
For the pattern is new in every moment
And every moment is a new and shocking
Valuation of all we have been.  

১৩. So here I am, in the middle way, having had twenty years
Twenty years largely wasted ...
Trying to learn to use words, and every attempt
Is a wholly new start, and a different kind of failure.

১৪. We shall not cease from exploration
And the end of all our exploring
Will be to arrive where we started
And know the place for the first time.  


কবি হায়াৎ সাইফের সাথে আবু আবদুল্লাহর একটি যুগলবন্দি- এক মলাটে দুই জনের আলাদা আলাদা কবিতা সংবলিত কাব্যগ্রন্থ- বেরিয়েছিল, মনে পড়ে।

[ক্রমশ]


মন্তব্য