মর্গের প্রেম

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯

মর্গের প্রেম

  হাইকেল হাশমী

প্রথম চাকরি যে কোনো যুবকের জন্য একটি শাস্তি ছাড়া আর কিছু নয়। আর যদি সেই যুবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোনো প্রতিষ্ঠানে তার যৌবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করে থাকে, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। যেখানে কোনো চিন্তা নেই, কোনো ভাবনা নেই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, টিএসসির চত্বরে সকাল-বিকেল জমজমাট আড্ডায় মেতে থাকা, আর পরীক্ষার সময় কোনোভাবে পড়াশোনা করা ও পরীক্ষা দেওয়া। পড়া ছাড়া যতগুলো কর্মকাণ্ড, সবগুলোতে জড়িয়ে থাকা, হোক না গানের অনুষ্ঠান, না হয় নাচের প্রোগ্রাম, আবৃত্তি আর কবিতার আসর, নাটকের রিহার্সাল অথবা কোনো মিছিলে যোগ দেওয়া সবই করা চাই। সব কাজে অনেক সিরিয়াস শুধু পড়াশোনার কোনো বালাই নেই।

যাক এমনই জীবন কাটাচ্ছিলাম, দেখি হঠাৎ অনার্স পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। বন্ধুরা সবাই তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল। আমরা কয়েকজন ঢাকাবাসী ঢাকায় থেকে গেলাম। রোজ টিএসসিতে যাওয়া হতো; কিন্তু আগের মতো আর আড্ডা জমত না। যারা সব সময় আসত, আস্তে আস্তে তাদের আসাতে মাঝে মধ্যে বিরতি ঘটতে লাগল। অনেকে অজুহাত দিতো যে, তাদের বাবা তাদের ব্যবসায় অথবা দোকানে বসিয়ে দিয়েছেন কাজ শেখার জন্য, অনেক বন্ধু ধুমিয়ে টিউশন পড়াচ্ছে। আর আমাদের মতো ছেলে যাদের বাবার ব্যবসাও নেই, কোনো দোকানও নেই তারা সারাক্ষণ ছাদের ওপর অথবা ব্যালকনিতে পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে 'টাঙ্কি' মারতে ব্যস্ত। অথবা গান শোনা আর উপন্যাস পড়া। আমার এ সুখাবস্থা বোধহয় নিয়তির পছন্দ হলো না। এরই মধ্যে আমার এক মামা তার ভাগ্নের এই বাউন্ডুলে জীবনের অবসান ঘটানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। তিনি একজন কন্ট্রাক্টর ছিলেন এবং তার কাজ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছিল। উনি বিদ্যুতের 'টাওয়ার' এবং 'হাই পাওয়ার ইলেকট্রিক লাইন' টানার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। উনি আমাকে তার সঙ্গে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।

ঈদের কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে তার 'সাইট' নাটোরে পাঠালেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজটা ছিল, ওখানে কাজ প্রদানকারী অফিসের আমলাদের জন্য ঈদী বিতরণ করা। আমি মোটামুটি কয়েক হাজার টাকা নিয়ে নাটোরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। টাকাগুলো আমার বুকের ভেতরের পকেটে যত্নসহকারে রেখেছি আর বারবার হাত দিয়ে দেখে নিই টাকা আছে কি-না। মনে মনে নানা রকমের ফন্দি আঁটলাম- এ টাকা ওদের না দিয়ে কীভাবে নিজের কাছে রাখা যায়। পরিকল্পনা করলাম যে, কয়েকদিনের জন্য অন্য কোথাও চলে যাব; পরে বলব আমাকে 'হাইজ্যাকার'রা ধরে নিয়ে বন্দি করে রেখেছিল আর সব টাকা নিয়ে গেছে। কিন্তু প্ল্যানটা বাতিল করলাম এই ভেবে যে, আমার মা-বাবা তো নিশ্চয় পুলিশকে জানিয়ে দেবে আর পুলিশ আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করে নেবে। তারপর চিন্তা করলাম যে, টাকা মেরে দিয়ে বলব, বাসে একজন আমাকে খাবার সাধল, আমি ভদ্রতার খাতিরে খাবারটা খেলাম। তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম আর যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমার পাশে বসা যাত্রীও ছিল না আর আমার পকেটের টাকাও ছিল না। একটু চিন্তা করে দেখলাম এটাও 'ফুলপ্রুফ' প্ল্যান নয়। যা হোক রাতের বেলা নাটোরে গিয়ে নামলাম, মামার সাইটের ম্যানেজার আমাকে নিতে এসেছিল। সে আমাকে ওখানে সবচেয়ে বড় হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিলো। পাঁচতলা খুবই সাধারণ হোটেল। রুমে একটি খাট ছাড়া আর কিছু নেই। রাত্রে কোনো রকম ঘুমালাম, সকালে ঘুম ভেঙে গেল গরমের জন্য। দেখি ফ্যান চলে না দেখলাম লাইট জ্বলে কিন্তু ফ্যান ঘোরে না। যা হোক উঠে গেলাম, গোসল করে নিচে নামলাম। রিসেপশনে জানালাম যে ফ্যান নষ্ট, আমাকে অন্য রুম দিন। লোকটি হেসে বলল, 'স্যার এখানে সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যানের আলাদা লাইন আছে; মালিকের হুকুমমতো মেইন সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সারাদিন ফ্যান ঘুরবে না, অনেক ইলেকট্রিক বিল আসে তো, তাই এ ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর আবার ফ্যান ঘুরবে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'যাদের বাইরে কাজ নেই তারা যদি একটু বিশ্রাম নিতে চায় তাহলে সে কী করবে?' সে লোকটি উত্তরে বলল, 'করার কিছু নেই। ফ্যান ছাড়াই থাকতে হবে।' আমিও চিন্তা করলাম এ গরমে নাটোর শহরই না হয় দেখি আর কী করা। ভেতরে গরমে সিদ্ধ না হয়ে বাইরের গরমই সহ্য করলাম।

আমার মাথায় এখনও মামার টাকার কথা ঘুরছে। আজ প্রথম কাজ ছিল ওই অফিসে গিয়ে সবাইকে ঈদের বখশিস দেওয়া। আমি খুবই কষ্টে ছিলাম যেম আমার মামার টাকা আমি নিতে পারছি না; অন্যদের দিয়ে দিতে হচ্ছে। পরে মাথায় একটি বুদ্ধি এলো যে, সবার প্যাকেট থেকে কিছু টাকা সরিয়ে রাখলেই তো হয়। তারা তো আর মামাকে জিগ্যেস করতে যাবে না যে, আপনি খামে কত টাকা পাঠিয়েছিলেন। যেই চিন্তা সেই কাজ। সব খাম থেকে কিছু টাকা সরিয়ে রাখলাম। বেশ একটা মোটা অঙ্কের টাকা জমা হয়ে গেল। সবাইকে টাকা বিতরণ করে পরের দিন আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। এখানে আমার বন্ধুদের জন্য বেশ ভালো এক পার্টি দিলাম। আমার বন্ধুরা বলল, 'তুই তো পুরা চুরি করলি' কিন্তু আমি বললাম, 'আমার মামার টাকায় আমার হক বেশি, তার ওপর আর একটি পুণ্যের কাজ করেছি যে ঘুষ কম দিয়েছি। মামা বখশিস বলুক বা অন্য কোনো নাম দিক; কিন্তু ওটা তো ঘুষ।'

যা হোক মামা পরে ঠিকই টের পেয়েছিলেন যে, ওনার ভাগ্নে খুব বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি নয়, তাই আমাকে আর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়নি। কিন্তু আমার জীবনটা খুব আনন্দময় থাকতেও দেয়নি। হঠাৎ করে একদিন সকালে ওনার সঙ্গে মতিঝিল যেতে বলল, আমি কী আর করব, যেতে হলো। উনি আমাকে নিয়ে মতিঝিলে তার এক বন্ধুর অফিসে গেলেন। ওনার সেই বন্ধু আমদানি-রফতানি আর ইন্টেন্ডিংয়ের কাজ করতেন। আমার মনে হয় তিনি আগেই কথা বলে রেখেছিলেন, যেহেতু ওনার বন্ধু। আমার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের পরপরই আমাকে তার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে বললেন। আমাকে 'সিনিয়র এক্সিকিউটিভ' হিসেবে নিয়োগ দিলেন; কিন্তু বেতন ছিল মাত্র পাঁচশ' টাকা। ওই টাকা দিয়েই আমি রাজার হালে চলতে পারব এমন হাবভাব। যা হোক মামার ভয়ে চাকরিতে যোগ দিলাম। বেতন যেমনই পাই না কেন, একটা আলাদা চেম্বার দেওয়া হলো, যেখানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু ছিল একটি টেলিফোন সেট। যাকে এখন ল্যান্ডলাইন বলা হয়, ওই সময় টেলিফোন বলতে ওটাই বুঝাত। আমি তো মহাখুশি এখন বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করা যাবে।

কয়েকদিন বন্ধুদের ফোন করলাম; কিন্তু সবাই ব্যস্ত, কারও মা ধরে, কারও বাবা ধরে আর বলে ও তো বাসায় নেই, অথবা সে তো বাথরুমে আছে বলব তোমাকে ফোন দিতে। মেয়েবন্ধুদের মা-বাবা তো কোনো দিনই তাদের ফোন দেয়নি, তারা নাকি সব সময় বান্ধবীদের বাসায় থাকত। বাধ্য হয়ে ইচ্ছামতো ফোন নম্বর ঘুরাতাম কিন্তু তার আগে ওই নম্বরটা লিখে রাখতাম যদি কোনো মধুরকণ্ঠী ধরে তাহলে যেন আবার ওই নম্বরে ডায়াল করতে পারি। যা হোক এমনি নম্বর ঘুরাতে থাকলাম, কোনো পুরুষের কর্কশ গলা শুনলে কেটে দিতাম। কোনো মধুর কণ্ঠ শুনলে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তাও একটা 'টেকনিক' ছিল, 'হ্যালো, সালাম ও আলাইকুম, আবুল কি আছে, একটু ডেকে দেবেন?

অন্য প্রান্ত থেকে, 'আবুল? আপনি কোন নম্বরে ফোন করেছেন?'

টুকিয়ে রাখা নম্বর দেখে, 'জি, এটা এই নম্বর না?'

'হ্যাঁ নম্বর তো ঠিক আছে কিন্তু আবুল বলে তো এখানে কেউ থাকে না।'

'ও আচ্ছা মনে হয় সে আমাকে ভুল নম্বর দিয়েছে, 'আই এম এক্সট্রিমলি সরি।' ইংরেজি বললে একটু বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে, তাই ইংরেজি বলতাম। তারপর ওনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা, অনেকেই কথা বলত আবার অনেকেই বলতেন 'বাবা এখন একটু ব্যস্ত আছি, বুয়াকে রান্নার জন্য বলতে হবে, রাখি।' সব উত্তেজনা সাবানের ফেনার মতো চুপসে যেত। যা হোক নিষ্ঠা সফলতার চাবিকাঠি, তাই লেগে থাকতাম।

একদিন ভাগ্যের দেবী আমার ওপর প্রসন্ন হলো। এমনি এক নম্বরে ডায়াল করার পর একটি অতি মধুরকণ্ঠীর সঙ্গে পরিচয়। একই 'ট্রিক' চালালাম। তখন সে বলল, 'না আবুল তো এখানে থাকে না, আপনি কে বলছেন?'

আমি খুব মার্জিত ভাষায় বললাম, 'আমি একটি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ বলছি, আপনার নাম কি জানতে পারি?'

সেও খুব ভদ্রভাবে বলল, 'জি আমার নাম আফিয়া।'

'আপনি কি করেন?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

'জি, আমি মেডিকেল ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।'

আমি আরও অনেকক্ষণ গল্প করে তাকে বললাম, 'আপনার সঙ্গে কথা বলে অনেক ভালো লেগেছে, আমি কি আপনাকে আবার ফোন করতে পারি?'

'হ্যাঁ, করতে পারেন; কিন্তু আমি তো ব্যস্ত থাকি পড়াশোনা নিয়ে। আপনি একটি কাজ করবেন, আমাকে বিকেল ৩টার দিকে ফোন করবেন।'

আমি তো খুশিতে টগবগ। যাক এতদিন পর একটা সুন্দরী, সুন্দর কণ্ঠের অধিকারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হতে যাচ্ছে। আমি বললাম, 'আমি আপনার পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাতে চাই না, তাই আপনি যখন বলেছেন, তখনই ফোন করব।' এই বলে ওই দিনের জন্য আমি ফোন রেখে দিলাম। অধীর আগ্রহে আগামী দিনের অপেক্ষায় থাকলাম কখন তার সঙ্গে আবার আলাপ হবে। তার পরের থেকে প্রত্যেক দিন আড়াইটা থেকে ৪টার মধ্যে তার বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তাকে ফোন করতাম। আর মনে হয় সেও আমার ফোনের অপেক্ষায় থাকত কারণ সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরত তারপর দুনিয়ার আলাপ। তার গলা অনেক মিষ্টি ছিল, তাই সে আমার অনুরোধে আমাকে গানও শুনাত। পুরান বাংলা গান, নতুন গান, হিন্দি গান সবই শুনাত। একবার ফোন করলে কমপক্ষে এক ঘণ্টা তো আলাপ হতোই, সময় যে কোন দিক দিয়ে চলে যেত টেরও পেতাম না।

দিনকাল বেশ ভালোই কাটছিল। হঠাৎ একদিন আমার 'বস' আমাকে বললেন এখন তোমাকে একটু বাইরে মার্কেটিং করতে যেতে হবে, অফিসের কাজ তো তুমি সব শিখে নিয়েছ তাই একটু বাইরের কাজে মন দাও। আমার মাথায় তো বাজ পড়ল, এখন আমার সম্ভাব্য ভালোবাসার কী হবে? কথা না বলতে পারলে প্রেম কীভাবে বাড়বে। কিন্তু 'বসে'র আদেশ অমান্য করা যায় না, তাই আফিয়াকে সবকিছু জানালাম যে এখন হয়তো বা প্রতিদিন ফোন করা হবে না; কিন্তু আমি চেষ্টা করব নিয়মিত ফোন করার, যদিও মাঝে মাঝে বিরতি ঘটতে পারে।

এরপর ব্যবসা আনার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে শুরু করলাম। খুব কমই অফিসে বসা হয়। যখন অফিসে থাকি, তখন হয়তো তার বেঁধে দেওয়া সময় থাকে না। এদিক কপাল একটু প্রসন্ন হলো। আরও একটা টেন্ডারের কাজ পেয়ে গেলাম। একটি কারখানাকে জিঙ্ক-ইনগট সরবরাহ করতে হবে বাইরে থেকে আমদানি করে। যাক কনট্রাক্ট সই হলো। এবার এলসি খোলার পালা। একটি সরকারি ব্যাংকে এলসি খোলা হলো। এখন আমার বস আমাকে রোজ ব্যাংকে পাঠান খবর আনার জন্য যে এলসির কী অবস্থা। ব্যাংকের যে অফিসারের কাছে ফাইল সে কথা বলতে নারাজ। আমার সমস্যার কথা বসকে জানালাম। তিনি বললেন, ওকে একটু সিগারেট, চা-টা খাওয়াও। আমি তাই করলাম। বেনসনের এক প্যাকেট সিগারেট কিনে ওর কাছে গেলাম। প্যাকেট খুলে একটি সিগারেট বের করে প্যাকেট ওনার দিকে বাড়ালাম, দেখি ভদ্রলোকটি পুরা সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে তার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলেন। যাক ওইদিন আমার সঙ্গে একটু কথা বললেন আর দু'দিন পর যেতে বললেন। এবার আমার বস আমাকে বললেন তাকে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে। পরের দিন তাকে লাঞ্চের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। তাকে নিয়ে গেলাম মতিঝিলের একটি রেস্টুরেন্টে। তিনি একাই পোলাও, মোরগ মোসাল্লাম, কাবাব, রেজালা, দই, মিষ্টি সবই খেলেন। আমি তো আশ্চর্য হয়ে গেলাম একজন লোক এতকিছু একাই কীভাবে খেতে পারে। যা হোক ওই লাঞ্চের সুবাদে আমার কাজটা তিনি করে দিলেন।

এদিকে আফিয়ার সঙ্গে অনেক দিন যোগাযোগ নেই। যখন ফোন করি অন্য কেউ ধরে, ধপ করে ফোন রেখে দিই। মনে করলাম, সে হয়তো অনেক ব্যস্ত পড়াশোনা নিয়ে, মেডিকেল পড়া কোনো যা তা কাজ তো নয়। কিন্তু তার দেওয়া সময়ে ফোন করেও তাকে আর পাওয়া যায় না। কোনোদিন তার ঠিকানাও নিইনি আর তাকে চিনিও না এখন তাকে কোথায় খুঁজে পাব। তবু মনে মনে একটা ভরসা ছিল যে, সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে। ওখানে গেলে তাকে ঠিকই খুঁজে বের করা যাবে।

এদিকে আমরা টঙ্গীতে যে কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ করার কথা, তাদের মাল পৌঁছে দিয়েছি। এখন আমার আর একটা নতুন কাজ যোগ হলো ওখান থেকে বিল সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। এখন রোজ টঙ্গী দৌড়াই। গিয়ে কমার্শিয়াল ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে দেখা করি। তিনি খুব ভদ্রলোক, অনেক নামাজি মানুষ, ভালোভাবে কথা বলেন। চা খাওয়ান কিন্তু কাজটা করে দেন না। বারবার যাই এবং আর একদিন আসতে বলেন, আবার যাই আর তিনি আর একদিন ডাকেন কাজ তো আর করে দেন না। শেষমেষ বসকে বললাম, তিনি পরামর্শ দিলেন খোঁজ নিয়ে দেখো তিনি কীভাবে কাজটা করে দেবেন? দেখো আবার টাকা-পয়সা খেতে চান নাকি? আমি জানালাম যে, তিনি খুব ধার্মিক মানুষ, এসব কাজ করবেন না। যা হোক আর একদিন গেলাম। তখন তিনি আমাকে দেখে অনেক খুশি হলেন আর বললেন আমি আপনার কথা মনে করছিলাম, আপনাকে খুব ভালো লাগে। আমি তো খুশি হয়ে গেলাম এবং বললাম, 'স্যার কেন মনে করছিলেন আমাকে?' তিনি উত্তরে বললেন, 'আসলে আগামীকাল আমার ছেলের জন্মদিন, একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান করছি, আপনাকে অবশ্যই আসতে হবে।' আমি চিন্তা করলাম, কত যে ভালো লোক, কত ভদ্র মানুষ আমাকে দাওয়াত দিচ্ছে, আমি রাজি হয়ে গেলাম। পরের দিন আমার বসকে জানালাম যে ওনার বাসায় আমার জন্মদিনের নিমন্ত্রণ আছে। এবার বস হেসে দিয়ে বললেন, 'এবার তোমার কাজটা হয়ে যাবে।' তিনি আমাকে দশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড আনিয়ে দিলেন আর বললেন, 'এটা উপহার হিসেবে উনার ছেলেকে দিও।' গেলাম বেশ খাওয়া-দাওয়া হলো, আমি ছাড়া বাইরের অন্য কোনো লোক ছিল না সবই উনার আত্মীয়স্বজন। পরের দিন আবার ফ্যাক্টরিতে গেলাম। উনি হাসিমুখে আমাকে জানালেন, আজ আপনার চেক নিয়ে যাবেন, ওটা অ্যাকাউন্টসে রেডি আছে। এই ঘটনা দিয়ে জীবনের একটি শিক্ষা পেলাম যে, দুনিয়াতে 'ফ্রি লাঞ্চ' বলে কিছু নেই।

এর কিছুদিন পরে আমার মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়ে গেল আর আমি ওই চাকরি ছেড়ে আবার পুরো ছাত্র হয়ে গেলাম। কিন্তু আফিয়া তো আর ফোন ধরে না। আমাদের বন্ধু যারা মেডিকেলে পড়ত, তাদের দিয়ে খোঁজ নিলাম যে, এই নামের মেয়ে আছে কি-না তারা 'কনফার্ম' করল যে, এই নামের একটি মেয়ে এখন দ্বিতীয় বর্ষে আছে।

আমি আর একদিন তার বাসায় ফোন করলাম, একটা মেয়ে ধরল, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আফিয়া কি বাসায় আছে?'

মেয়েটি বলল, 'হ্যাঁ বলছি।' আমি বিস্মিত হলাম যে, ওর কণ্ঠস্বর তো আফিয়ার সঙ্গে মেলে না, তবুও সে আফিয়া হওয়ার দাবি করছে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি আফিয়া বলছেন?' মেয়েটি বলল, 'কেন আপনার কোনো সন্দেহ আছে?'

আমি বিপাকে পড়লাম। আমি বুঝতে পারছি আমি এখন যে মেয়ের সঙ্গে কথা বলছি সে ওই মেয়ে নয়, যার সঙ্গে আমি আগে কথা বলতাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি কি আমাকে চেনেন?' সে মেয়েটি উত্তর দিলো, 'আপনি কি আপনার পরিচয় দিয়েছেন যে আমি আপনাকে চেনব?' এবার আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, আমি যার সঙ্গে কথা বলছি সে ওই মেয়েটা নয়। আমি বিব্রত হয়ে তাকে বললাম, 'কিন্তু এতোদিন যে আমি একজন আফিয়ার সঙ্গে কথা বললাম তাহলে সে কে ছিল? সে তো আমাকে বলেছিল, সে মেডিকেলে পড়ে, সে একমাত্র মেয়ে ইত্যাদি।'

মেয়েটি বলল, 'আমি তো হোস্টেলে থাকি, মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীরা বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে পারে না।'

আমি আরও বিব্রত হলাম এবং বললাম, 'তাহলে আমি যে প্রতিদিন ৩টার সময় ফোন করে পুরা এক ঘণ্টা আলাপ করতাম তাহলে সে কে ছিল?'

সে একটু চুপ করে থেকে বলল, 'আমিও বুঝতে পারছি না। ওই সময় তো বাসায় শুধু আমার মা আর কাজের মেয়ে থাকে, তাহলে ওই কাজের মেয়ে শান্তা আপনার সঙ্গে নিশ্চয় কথা বলত।'

আমি তো আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম এবং খুব লজ্জিত হয়ে বললাম, 'মেয়েটা দারুণ স্মার্ট ছিল, আমি তো বুঝতেই পারিনি।'

এখন আসল আফিয়া হাসিতে ফেটে পড়ল, তার হাসি তো আর থামে না। সে বলেই ফেলল, 'আপনি তো দেখি আস্ত বেকুব, মানে বোকা।' আমি আর কী বলব। তার হাসি থামার পর সে জিজ্ঞাসা করল, 'এখন বলেন তো আপনি আসলে কে?' আমি আমার পরিচয় দিলাম, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শেষ বছরে পড়ি খুব শিগগির বের হয়ে যাব, তারপর জীবিকার সন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়ব।'

সে এখনও হেসে যাচ্ছে, 'আপনি তো শিক্ষিত মানুষ, একজন অশিক্ষিত মেয়ে আপনাকে বোকা বানাল, আপনি টেরও পেলেন না, কী অদ্ভুত!'

আমি আমার বোকামি স্বীকার করে নিলাম, সে তো হেসেই খুন। অনেকক্ষণ আলাপের পর আমি তাকে বললাম, 'জানি না এখন আপনি আবার আমাকে বোকা বানাচ্ছেন কি-না? আপনি যে আসল আফিয়া, কীভাবে বুঝব?' সে বলল, 'আপনি কি বায়োলজি পড়েছেন? ওখান থেকে আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন?' আমি বললাম, 'আমি তো কমার্সের ছাত্র, বায়োলজি তো আমার জানা নেই।' সে তখন বলল, 'আচ্ছা আমাকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে পারেন অথবা কথা বলতে পারেন।' আমি তাই করলাম কিছুক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলার পর বুঝলাম সে বেশ ভালো ইংরেজি বলে। আমি তাকে বললাম, 'আমি আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব খুশি হয়েছি, আপনি অনুমতি দিলে আবার ফোন করব।' সে বলল, 'আমি তো আমার হোস্টেলে থাকি, সপ্তাহে শুধু ছুটির দিনে বাসায় আসি তখন আপনি আমাকে ফোন করতে পারেন।' আমি তাই করব বলে তাকে জানিয়ে ফোন কেটে দিলাম।

এর পর সপ্তাহে একদিন তার সঙ্গে কথা হতো। তাকে কথাবার্তায় বেশ মেধাবী মনে হয়েছে, এবং খুব ইন্টেরেস্টিং কথা বলে যেটা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এর ভেতর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে। আমিও মাস্টার্স পাস করে এখন চাকরি খুঁজতে বের হয়ে পড়েছি। সব জায়গায় দরখাস্ত করি। কোনো কোনো জায়গা থেকে 'ইন্টারভিউ কার্ড' পাই, কোথাও থেকে পরীক্ষার জন্য ডাক পাই তারপর 'ভাইভা' হয়, আশায় বুক বাঁধি আর আশাভঙ্গ হয়। এই করে একটা চাকরি পেয়েই গেলাম। মাইনে খুব বেশি ছিল না কিন্তু ছিল একটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। প্রথম থেকেই কাজে মন দিলাম, আগের চাকরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বসদের নজরে পড়ে গেলাম। এদিকে আফিয়ার সঙ্গে সাপ্তাহিক ফোনে আলাপ বহাল থাকল।

এখন আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। একদিন তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাটা প্রকাশ করেই বসলাম এবং সেও বলল এতদিন ধরে আমাদের কথাবার্তা কিন্তু আজও দেখা হলো না- এটা ঠিক নয়, আসুন একদিন দেখা করি। আমি অনেক হোটেল, রেস্টুরেন্টের নাম প্রস্তাব করলাম; কিন্তু সে কোনোটাতেই রাজি হলো না বরং বলল আমার হোস্টেলে আসেন তারপর প্ল্যান করে কোথাও যাব। আমি তাতেই রাজি হয়ে গেলাম। সামনে শনিবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক হলো। আমি অধীর আগ্রহে সপ্তাহটা পার করলাম। রাত্রে ঘুমাতে পারি না, ঘুম এলে তাকে স্বপনে দেখি, যদিও বাস্তবে এখনও তার সঙ্গে দেখা হয়নি; কিন্তু মনে মনে তার একটি সুন্দর ছবি এঁকে রেখেছি। চেহারাটা সুচিত্রা সেনে'র মতো আর 'ফিগার'টা র?্যাকুয়েল ওয়েলসের মতো। দিন তো আর কাটে না, এক এক প্রহর ঘণ্টার মতো লাগে। কোনো রকম সপ্তাহটা শেষ হলো, শুক্রবার তার সঙ্গে সাপ্তাহিক আলাপ করে আবার দেখা করার ব্যপারে 'রি-কনফার্ম' হলাম।

শনিবার রাতে ঘুমাতেই পারলাম না, একটি তন্দ্রার মধ্যে রাত কেটে গেল, রাত যে এত বড় হয় সেদিনই টের পেলাম। ভোর ৪টার সময় উঠে 'শেভ' করলাম। দেখা করার কথা সন্ধ্যা ৬টায়। আমি তৈরি হতে শুরু করলাম ভোর ৪টা থেকে। সারাদিন একটি ঘোরের ভেতর কাটালাম। বিকেল ৫টায় সেজেগুঁজে, পারফিউম লাগিয়ে, বারবার চুল আঁচড়িয়ে একটি রিকশা করে মেডিকেল কলেজের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। মেয়েদের হল খুঁজতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। এখন সমস্যাটা হলো, কীভাবে তাকে খবর দিই যে আমি এসেছি। ভেতরে তো ঢুকতে পারি না। গেটে দারওয়ানকে তোষামোদ করলাম, তাকে দশ টাকা ঘুষ দিয়ে একটা চিরকুট তার কাছে পাঠালাম। এখন যে মেয়ে বের হয়, তাকেই আফিয়া মনে হয়, তার দিকে হাসি মুখে চেয়ে থাকি। অনেকে দেখে মুখটা ব্যাজার করে চলে যায়, অনেকে আবার দেখেও না। অনেকক্ষণ পর একটি মেয়ে গেটের বাইরে এসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে যেন কাউকে খুঁজছে, আমি একটু এগিয়ে যেতেই আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার নাম নিয়ে বলল, 'আপনি অমুক?' যাক তার দেখা পাওয়া গেল; কিন্তু মনে মনে যে নকশা আর আকৃতি ঠিক করে রেখেছিলাম তার কাছাকাছিও ছিল না। তবু একটি স্মার্ট মেয়ে মনে হলো। সে প্রথমেই আমাকে বলল, 'আচ্ছা আপনাকে আমি যা চিন্তা করেছিলাম তার সঙ্গে কোনো মিলই নেই।'

আমি বললাম, 'আচ্ছা তাই না কি? আমিও যা চিন্তা করেছিলাম তার সঙ্গেও কোনো মিল নেই।'

সে বলল, 'আপনি কি চিন্তা করেছিলেন?'

আমি বললাম, 'একটি ফর্সা-লম্বা মেয়ে। আপনি তো শ্যামলা; কিন্তু শ্যামলা আমার প্রিয় রঙ আর আপনাকে বেঁটেও বলা যাবে না, বেশ কিউট হাইট। আপনি কী চিন্তা করেছিলেন আমার সম্বন্ধে?'

'আমি মনে করেছিলাম আপনি একজন শুকনা বেঁটে লোক হবেন, কিন্তু আপনি বেশ লম্বা এবং আপনাকে বয়স্ক দেখাচ্ছে। আর আপনার চুলের স্টাইল আমার একদমই পছন্দ হয়নি।'

'আর কী করা, আমি তো আর পরিবর্তন হয়ে যেতে পারব না আর আপনি যা আছেন তাই থাকবেন, এখন এসব নিয়ে চিন্তা করার কোনো মানে হয় না' আমি বললাম।

ওখানে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছিলাম, তখন সে নিজেই বলল, 'চলেন অন্য জায়গায় যাই।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোথায় যাবে?' সে বলল, 'হসপিটালের ছাদ খোলা থাকে। ওখানে গিয়ে আরামে বসে কথা বলব।' তারপর সে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে ছাদে গেল, বিরাট ছাদ আর মাঝে মাঝে গম্বুজ বানানো। বেশ চওড়া চওড়া কোমর পর্যন্ত উঁচু দেয়াল সারা ছাদ জুড়ে, যেখানে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে বসে গল্প করছে। আমরাও একটি দেয়ালে বসে পড়লাম। অনেক দিনের জমে থাকা কথা বলতে থাকলাম, তার কথা শুনলাম। এক ফাঁকে আমি চিৎ হয়ে দেয়ালের ওপর শুয়ে পড়লাম আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি অজস্র তারা। ঢাকা শহরে এতদিনে এত তারা কোনোদিন দেখিনি। কথা বলতে বলতে কখন যে রাত ১০টা বেজে গেল টেরই পাইনি। সে বলল, এখন উঠতে হবে। আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম যে, আমাকে টেনে ওঠাও। সে একটু থমকে গেল; কিন্তু পরে আমার হাত ধরে আমাকে উঠতে সাহায্য করল। আমার প্ল্যান ছিল যখন সে আমাকে হাত ধরে ওঠানোর চেষ্টা করবে, তখন আমি তাকে টেনে আমার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেব; কিন্তু এমন কিছুই হলো না। অথবা আমার সাহসের অভাব ছিল। আমরা আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতি করে বিদায় নিলাম।

তারপর আরও দুই সপ্তাহ কেটে গেল, তার সঙ্গে কথা হলো কিন্তু তার পরীক্ষার কারণে দেখা করার সুযোগ হলো না। তৃতীয় সপ্তাহে সে দেখা করার জন্য রাজি হলো। আমি আগে থেকে তার জন্য কিছু গিফট কিনলাম, যেমন 'প্রেমের কবিতা', একটি পারফিউম আর যাওয়ার দিন একগুচ্ছ গোলাপ। যা হোক নির্ধারিত দিনে আবার গেলাম, এবারও কলেজের ছাদের ওপর গিয়ে বসলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সে আমাকে বলল যে এখানে অনেক লোকজন আছে, চলেন একটি নিরিবিলি জায়গায় যাই। তারপর সে আমাকে নিয়ে মেডিকেল কলেজের পেছনে বেশ জীর্ণ একটি একতলা বাসার বাইরের বারান্দায় সিঁড়ির ওপর বসল। ওখানে বেশ অন্ধকার ছিল। ওই বারান্দায় একটা টিমটিমে হলুদ বাতি কোনোভাবে আলো ছড়ানোর বৃথা চেষ্টায় মগ্ন ছিল। আফিয়া আমার পাশে বসে অনেক কথা বলে যাচ্ছিল; কিন্তু আমার কেমন যেন একটা ভুতুড়ে অনুভূতি হচ্ছিল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দেখলাম একটা বড় রুমের ভেতর অনেক লোক সাদা চাদর গাঁয়ে দিয়ে শুয়ে রয়েছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, এত লোক একসঙ্গে কেন শুয়ে আছে? কিন্তু কোনো লোকের কোনো নড়াচড়া দেখছি না, অথবা নিঃশ্বাসের আসা-যাওয়াতে বুকের ওঠানামারও কোনো চিহ্ন নেই। আমার ভুতুড়ে অনুভূতিটা আরও প্রকট হয়ে গেল। আমি আফিয়ার দিকে তাকিয়ে ওকে কোনো প্রশ্ন করার আগেই ও আমাকে বলল, 'ঘাবড়াবেন না, এরা সবাই মরা মানুষ, এটা আমাদের কলেজের মর্গ।' আমি তো হতভম্ব হয়ে গেলাম আর আমার সারা গা শিরশির করে উঠল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, তার চোখদুটি মার্বেলের মতো হয়ে গেছে আর সে যখন হাসছে তখন তার ওপরের দুটি দাঁত তীক্ষষ্ট দেখাচ্ছে আর ঠোঁটের দুই কোনায় লাল রক্তের আভা। আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কেঁপে উঠল। তারপর দেখলাম আমি উঠে দৌড়াচ্ছি, প্রাণপণে দৌড়াচ্ছি। আমার মনে হলো একটি ছায়া আমার পিছে ছুটে আসছে আর আমার নাম নিয়ে ডাকছে। এর মধ্যে আমি মেইন রাস্তায় চলে এসেছি, পেছনে ঘুরে দেখলাম কেউ নেই, একটি দাঁড়ানো ট্যাক্সিতে উঠে বাসার দিকে ছুটে চললাম আর থেকে থেকে গায়ে শিহরণ অনুভব করলাম। সারারাত ঘুমাতে পারিনি, স্বপ্নের ভেতরেও সেই লাশগুলো জেগে উঠছে।

সকালে ফোনটা বেজে উঠল, তুলে দেখি ওদিক থেকে আফিয়া বলছে, 'আপনি এত ভীতু আমি তো জানতাম না। ওই লাশগুলো তো কিছুই করতে পারত না, তারা তো মরা।' আমি কিছু না বলে লাইনটা কেটে দিলাম। মর্গে বসে প্রেম আমার দ্বারা হবে না। ি


মন্তব্য