সাহিত্য ও অর্থনীতি :বাংলার কয়েকটি দুর্ভিক্ষ

পর্ব ::১৯

এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে খাদ্যশস্যের বাজারে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের মজুদদারী ও ফাটকাবাজি প্রবণতা ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না। র‌্যাভালিওন এটাকে 'ÔRational ExpectationÕ' মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। এক হিসেবে, এটা ব্যবসায়ীদের 'যৌক্তিক প্রত্যাশারই' প্রতিফলন।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্বে খাদ্যশস্যের আমদানি যেখানে হয়েছিল মাসে ২৬৩-২৮৭ হাজার টন করে; ১৯৭৪ সালে পূর্বে-উল্লিখিত কারণে আমদানি করা গিয়েছিল কেবল মাত্র মাসে ২৯-৭৬ হাজার টন। খাদ্যশস্যের আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতি হবে এই পূর্বাভাস পেয়ে ব্যবসায়ীরা খাদ্যশস্যের মজুদ আরো বাড়িয়ে দেয় বাড়তি লাভের আশায় (যে প্রবণতা ইতিপূর্বেই তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের আলোচনায় আমরা দেখেছি)। তবে দুর্ভিক্ষের বছরে সীমান্তের ওপারে এ দেশ থেকে প্রচুর খাদ্যশস্য চলে গিয়েছিল। তার সপক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। ব্রায়ান রেডাওয়ে সীমান্ত এলাকার গবেষণা চালিয়ে দেখান যে, বিডিআর কর্তৃক চোরাচালানির সময় ধৃত মালামালের মধ্যে খাদ্যশস্যের স্থান ছিল '৬ষ্ঠ অথবা ৭ম স্থানে'। তদুপরি, সে বছর বাংলাদেশে চালের তুলনামূলক মূল্য (Relative Price of Rice) পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চালের মূল্যের প্রেক্ষিতে অনেক বেশি উঁচুতে অবস্থান করছিল, ফলে এ দেশ থেকে খাদ্যশস্যের চোরাচালানি হওয়ার যৌক্তিকতা বা  Incentive
খুব কমই হওয়ার কথা।

যে কোনো কারণেই বা প্রভাবেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ঘটে থাকুক না কেন, এর অশুভ অনুরণন দীর্ঘকাল ধরে চলেছিল- এটা অনুমান করা যায়। এই অনুরণন প্রথমেই ধরা পড়বে সমসাময়িক কবিতা বা কথাসাহিত্যে, নাটকে বা উপন্যাসে। যেমনটা হয়েছিল ১৩৫০ সালের মন্বন্তরের ক্ষেত্রে। 'নাম রেখেছি কোমল গান্ধার' কাব্যগ্রন্থের 'আষাঢ়েরই জয়গান' কবিতার শুরুর পঙ্‌ক্তিগুলোতে বেজে ওঠে বিষ্ণু দে'র স্বর :

'শতাব্দীতে নয়, আজ মন্বন্তর বছর বছর,

প্রতিদিন দুর্ভিক্ষে বর্বর।

পোড়ো জমি। সুদে সুদে দেউলিয়া খেত,

অনাবৃষ্টি অতিবৃষ্টি নদীর খালে মৃত্যুতে বন্যার বছর বছর,

এখানে ওখানে। হাল লাঙ্গল ভঙ্গুর। সার নেই, নেই বীজধান

পেশী নেই। রক্তে রক্তে আকালের কালি। রক্তহীন প্রাণ,

কামারের কুমোরের জেলের তাঁতির পঙ্গু হাত

আনন্দের লেশ নেই জীবনযাত্রার জীবিকার'



১৯৪৩ সালের মন্বন্তরকে স্মরণ করে লেখা এই পদাবলি। কিন্তু এসব লাইন ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষিতেও দিব্যি পড়া চলে। সেজন্যেই রফিক আজাদ অত উচ্চকিতভাবে মানচিত্রকে গ্রাস করার হুমকি দিয়েছিলেন। একটা অমীমাংসিত ক্ষোভ আর একটা অবর্ণনীয় ক্রোধ মিলে-মিশে একটা দুর্বাসা-অভিসম্পাতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এর কালছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে। নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় সেকারণেই কি ১৯৭৩ সালেই পড়েছিলাম 'আমি চালের আড়তকে নারীর নগ্নতা বলে ভ্রম করি', বা শামসুর রাহমান লিখেছিলেন 'দুঃসময়ের মুখোমুখি', বা শুনেছিলাম আবুল হাসানের উদ্বিগ্নে-ভরা উচ্চারণ 'রাজা যায় রাজা আসে'? বা এ কারণেই কি কিছু পরে শহীদ কাদরী লিখবেন- 'কোথাও কোন ক্রন্দন নেই'? এরকম অবস্থায়, দুর্ভিক্ষের ঐ বছরে, যেসব তরুণ-তরুণী প্রথম প্রেমে পড়েছিল, তারাও জানত- এ পরিস্থিতিতে প্রেম করাও অন্যায় : 'প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না।'

কথা-সাহিত্যে ১৯৭৪-র দুর্ভিক্ষ যতটুকু এসেছে, সেটা ভয়াবহ। হান্নাহ আরেন্ড ((Hannah Arendt)) হলোকাস্টের পরে মানুষ আর নিজেকে 'নির্দোষ' বলে দাবি করতে পারবে না- এ কথা বলেছিলেন। দুর্ভিক্ষ আমাদের কিছুকালের জন্যে হলেও 'সভ্যতার থেকে' বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। সেই সাথে মরে গিয়েছিল আমাদের সত্তার ভেতরের শৈশব-কৈশরের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি। কিছু একটা মানবিক সেবছর আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তির জীবন থেকে চিরকালের জন্য মুছে গিয়েছিল। মানুষের মধ্য থেকে সহজেই অনুমেয় সহমর্মিতা উঠে গিয়েছিল। এবং এরই প্রতিক্রিয়ার চাপে প্রবল ঘোরের মধ্যে লিখিত হয়েছিল হাসান আজিজুল হকের কিছু গল্প সেদিন। আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই তার 'মধ্যরাতের কাব্যি' ও 'সরল হিংসা' গল্প দুটি।

মধ্যরাতের কাব্যি-র বিষয়বস্তু ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। ঘটনার স্থান ঢাকার রেলস্টেশন, যেখানে জোয়ারের মতো নামছে দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষ। দাদি আর নাতনির মধ্যে কথোপকনের ওপরে গল্পটি কাঠামোগতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দাদি চোখে ঠিক দেখতে পায় না, নাতনির বয়স খুবই কম- ঠিক কত তা পড়ে জানা যায় না। তবে সে যে কিশোরী এটা বোঝা যায় যে- পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে কথোপকথন চলছে তা এরকম :

১. 'দুদিন আগে একটা ট্রেনে চেপে তারা এখানে পৌঁছেছে। সঙ্গে গায়ের অনেক লোক ছিল। অগুনতি মেয়ে-পুরুষ। নাতনি ভেবেছিল দাদি তার পথেই মরবে, ঢাকা আর পৌঁছুতে পারবে না। গত চার-পাঁচদিনে পটাপট তার চোখের সামনেই মরে গিয়েছিল তিন-চারটে বাচ্চা আর গোটা দুই বুড়ো। কিন্তু হাড়ের জোর আছে বুড়ির, একনাগাড়ে ক'দিন উপোস দিয়েও ঠিক পৌঁছে গেল।'

২. তবে এই প্রেক্ষিতে আগেও প্রেক্ষিত রয়েছে। সরব দুর্ভিক্ষের আগে সংঘটিত হয় নীরব দুর্ভিক্ষ। এর আগে না-খেতে পেয়ে মারা গেছে বুড়ির উপার্জনক্ষম ছেলে। তাই নিয়ে নাতনির অভিযোগ :

'নাতনি তীব্র চাপা গলায় বলল, আবার মিছে কথা বলছিস! আর রবিবার তোর ছেলে মরল না? তিনদিন না খেতে দিয়ে কাজে লাগিয়েছিলি- তোর ঘরে মরা ছেলে ফিরে এলো না? মিছে কথা বলছিস?

আহারে বাছা, মরে যাই- বুড়ি চুক চুক শব্দ করে জিব দিয়ে।

তোর নিজের প্যাটের গর্ত ভরবার লেগে ছেলেকে কাজে পাঠিয়েছিলি- ছেলে তোর গাছতলায় মরে ছিল না?

কী করব বুন- প্যাট যে মানে না।

ছেলে যে গাছতলায় দুম করে পড়ল আর মরল দাদি।

বালাই ষাট, বাছার আলাই বালাই নে আমি মরি।

তুই তো মরিস নি দাদি।

৩. শেষ পর্যন্ত দাদি আগে মরেনি। কথোপকথনের এক পর্যায়ে নাতনি মৃত্যুর কোলে ক্লান্ত হয়ে ঢলে পড়ে। এক প্রকার প্রলাপ বকতে বকতে।

'নাতনি বলে, তোর ছেলে গেল কোথা দাদি, আমার বাপ? দুলুনি দিয়ে বুড়ি বলে, আহারে কপাল?

তোর গাঁ কই?

বুড়ির দুলুনি, আহারে কপাল!

তোর ভিটে কই?

আহারে কপাল!

এইবার মরতে যাই দাদি?

বুড়ি দুলুনি বন্ধ করে দু'হাতে একগোছা শুকনো চুল ছিঁড়ে বলে, আমার মাথায় যত চুল তত তোর পরমায়ু হোক।

মরতে যাই দাদি?

হায়, আমার কপাল- বলে বুড়ি উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে।'

৪. এরপরে সেই শিহরণ-জাগানো দৃশ্য। হাসান আজিজুল হক তখন ফিরে গেছেন ১৯৭৬-এর মন্বন্তরে, নরমাংস খাওয়ার যে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছিলেন আনন্দমঠে' বঙ্কিমচন্দ্র।

'নাতনির ফেঁপে ওঠা পলকা শরীর। তার ওপর হাত রাখতেই কণ্ঠার হাড়টি মুট করে ভেঙে যায়। সেইটিকে বেশ করে চুষে চুষে খাওয়া হলো...'

কারা খেল, তা বুঝতে ততক্ষণে বাকি নেই। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মতোই এ গল্পের 'কালো কালো প্রেতের মতো সব মানুষ' চারপাশে-তাদেরই কেউ হবে।

হাসান আজিজুল হকের 'সরল হিংসা' গল্পটি ততধিক ভয়াবহ। ক্ষুধার জ্বালায় শরীর-বিক্রি করতে চাইছে নারীরা। নারী-মাংসের যে খদ্দের, সে এক লোভী কদর্য পুরুষ : 'মোটা থলথলে আ-গড়া এক বামন।' হাতে টাকা নিয়ে সে এক ক্ষুধার্ত নারীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর মেয়েটি ভাবছে, 'সারাদিনে হামি একবার খেনু- দুধ হয়ে বেরিয়ে গেলু, তবে তো হামি আর বাঁচিম না।' কিন্তু মেয়েটি শুধু একা নয়, এরকম অবস্থায় আছে আরও অনেকেই। এবং তারা মেয়েটির প্রতিযোগিনী হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। লেখকের বর্ণনায় শুনুন এরপর।

১. 'সামনে, পিছনে, রাস্তার দিক থেকে, আলোর ভেতর দিয়ে অন্ধকার সরিয়ে মেয়ে মানুষেরা এগিয়ে আসে- সাত আটটি মেয়ে মানুষ। তারা এসে বামন মানুষটিকে ঘিরে ধরে। ... বোবা বামনটির দিকে তারা ঘুরোফিরে সালাম ঠোকে, এই যে সায়েব, দ্যাখেন, মাত্তর এট্রা টাকা আমারে দিবেন। তালিই হইবে। এইভাবে জয়তুন, তসিরুন, টেপি, গোলাপি, পুষ্প ইত্যাদি তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে যায়।'

২. প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য সবাই একসময় তাদের পরিধানের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন পোশাক খুলে ফেলে।

'তবে আমারেও দ্যাখেন- জয়তুন তসিরুনের পাশে দাঁড়ায়। সেও সময় নেয় না।

এই মেয়ে শুকিয়ে রসহীন, পেট সেঁটে গেছে পিঠের সঙ্গে, দ্যাখেন, চারডে বাচ্চা হইছে, আমার দোষ কি, ও সায়েব দ্যাখেন, বয়েসকালে ভালোই ছেলাম। এখন আমার শ্যাষ বাচ্চাডা মরতিছে।...

এইবার বামনকে ঘিরে উলঙ্গ মেয়ে মানুষেরা দাঁড়িয়ে যায়।'

৩. এসব অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের সামনে অপ্রস্তুত পুরুষ হতবাক হয়ে যায়।

'বামন হুমড়ি খেয়ে পুষ্পের ওপর পড়তে পড়তে বলে, দোহাই, আমাকে ছেড়ে দাও তোমরা।

জয়তুন বলে, কী কথা কন সায়েব? আপনের দয়া চাইনে আমরা, ভিক্ষে না, জিনিস নে দাম দ্যান।....

তখন আরম্ভ হয়। নিজেদের মধ্যে তাদের সঙ্গীতের সমন্বয়। অতি চমৎকার ভারসাম্য। কেউ ধরে বামনের হাত, কেউ পা। কেউ চুল বা কোমর। ...বাঘিনীর মতো ঝাঁপ দিয়ে পড়ে তসিরুন। লোকটার জামা মুহূর্তে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে ফেলে। পকেট থেকে একগোছা নোট পড়ে গেলে সে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে লোকটার সামনে এসে বলে, দ্যাখ সায়েব, তর টাকার হাল দ্যাখ।... সবাই মিলে চিত করে শুইয়ে দেয় লোকটাকে। বামন সব চেষ্টা ছেড়ে দেয়, দু-হাত ছড়িয়ে দেয় দুদিকে, মেলে দেয় দুই পা যতদূর যায়...'

৪. লোকটা মারা গেল এভাবেই :

'সমান তালে লোকটার ঘৃণা কি ভালোবাসা, আক্রোশ বা কষ্টের নিঃশ্বাস চলতে থাকে : তার চোখের ভাব বর্ণনার যখন আর কোনো আশাই নেই, তখন তসিরুন একা সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তার মুখের ওপর দুই পা তুলে দাঁড়ায়। এইবার আপন বুকে দু-হাতে দমাদম আঘাত করতে করতে সে নারীর দিকে চেয়ে খলখল করে হেসে ওঠে।'

নগরী মানে ঢাকা মহানগরী। দুর্ভিক্ষ-চলাকালীন ভাবলেশহীন প্রাত্যহিকতায় ব্যতিব্যস্ত বিশাল জনপদের নিস্করুণ ঢাকা নগরী। দৈনিক এক হাজার রুটি বানানো হতো মিরপুর টেকনিক্যালে- 'যেখানে আমি বাস করতাম তখন। এই সাহায্যটা সেখানকার অধিবাসীরা করেছিল। সেই রুটি মিরপুরের লঙ্গরখানায় প্রতিদিন পৌঁছে দেওয়া হতো। আমাদের বিবেক ওই পর্যন্তই কাজ করেছিল। আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে পড়ালেখা করেছি; বিকেল বেলায় টেবিল টেনিস, সন্ধ্যের মুখে আলিয়ঁসে গিয়ে ফরাসি ভাষা শিক্ষা' আবৃত্ত করতাম বোদলেয়ারের 'ল ফ্ল্যুর দ্যু মাল' (ক্লেদজ কুসুম), এভাবেই কেটেছে শাহরিক দিন-রাত্রি। দুর্ভিক্ষের কথা নিয়ে সরগরম আলোচনা হতো চায়ের আড্ডায়, ক্লাসরুমে বা খেলার মাঠে, মনে পড়ে না। এ জন্যেই কি আমরা স্মরণযোগ্যভাবে এখনও পাইনি বিভূতিভূষণের অশনি সংকেতের মতো কোনো উপন্যাস, বা বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন-র মতো কোনো নাটক? এই প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।

নওমী হোসেন ২০১৭ সালে লিখেছেন একটি তাৎপর্যপূর্ণ বই : 'দ্য এইড ল্যাব : আন্ডারস্টেন্ডিং বাংলাদেশ আনএক্সপেক্টেড সাকসেস'। বইটিতে তার একটি প্রধান তর্ক হলো, ১৯৭৪-র দুর্ভিক্ষ না হলে বাংলাদেশ নড়ে-চড়ে বসত না। দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তাড়া করে বেড়ানোর কারণেই এ দেশ অন্যান্য তুলনীয় দেশের প্রেক্ষিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারকে কমিয়ে আনা, নারীদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য, চরম দারিদ্র্য প্রশমনে বিশেষ উন্নয়ন বা সামাজিক নিরাপত্তা-বেষ্টনী, উন্নয়নে এনজিওদের ভূমিকা প্রভৃতি কর্মসূচিকে পূর্বাহেপ্তই স্বীকৃতি দিতে পেরেছিল। অনেক সময়ে সংকটে পড়েই তবে মানুষের বা দেশের বোধোদয় হয়। নওমী হোসেনের কথার অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের আগেও বেগম রোকেয়া পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের নারী আন্দোলন এবং তদ্‌জনিত নানাবিধ কারণে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছিল। ষাটের দশকেই রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম ও 'সবুজ বিপ্লব'-এর ডাক দেওয়া হয় এদেশে। ১৯৭৩ সালেই গৃহীত হয় ১ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা- সেখানে নারী শিক্ষা, কৃষি-মুখীন উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বন্যা-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ইত্যাদি অর্থনৈতিক নীতিমালা ঘোষিত হয়। ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধানে প্রতিশ্রুত হয়- কার্ল মার্কসের 'ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম' থেকে সেই বিখ্যাত আপ্ত-বাক্য- 'সবাইকে শ্রম অনুযায়ী বণ্টনের' সমতামুখী নীতিমালা। তারপরও আমার মনে হয় যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে নওমী ঠিকই করেছেন। তবে তিনি তার লেখার মূলত পলিসি-ফ্রন্টে 'ইতিবাচক প্রভাবের' ওপরই জোর দিয়েছেন। দুর্ভিক্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি অশুভ প্রভাবের বিষয়টি তার আলোচনায় তেমনভাবে আসেনি। এ নিয়ে ইতিহাস ও সমাজবিদ্যার গবেষকদের আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে বলব।

[সাহিত্য ও অর্থনীতি :বাংলার কয়েকটি দুর্ভিক্ষ প্রসঙ্গ সমাপ্ত]


মন্তব্য