তুমুল গাঢ় সমাচার

ক্ষমতা প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো: মাইক্রো পাওয়ারের ধারণা

ধারাবাহিক

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০১৯

ক্ষমতা প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো: মাইক্রো পাওয়ারের ধারণা

  বিনায়ক সেন

পর্ব ::২২

[ক্রমশ]

এ জন্যই ফুকো বলছেন, '[Individuals] are not only its [Power’s] inert or consenting target; they are always also the elements of its articulation. In other words, individuals are the vehicles of power, not its points of applicaton.'



ঘ. চতুর্থ উপদেশ

প্রথম তিনটি বৈশিষ্ট্য থেকে ক্ষমতা-বিচারের ফুকো-নির্দেশিত চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি বেরিয়ে আসে। এর আগের রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনে ক্ষমতার বিশ্নেষণ করা হয়েছে 'উপর থেকে নিচে নামতে নামতে'। ক্ষমতা কী করে রাজার ডিক্রি-জারি থেকে 'নামতে নামতে' প্রজার পর্ণ কুটিরে পৌঁছায়, সে ধরনের বিশ্নেষণকে ফুকো বলেছেন 'descending analysis of power..' আগেই বলেছি, ফুকো এ ধরনের বিশ্নেষণে উৎসাহী ছিলেন না। তিনি এর বিপরীতে 'নিচে থেকে উপরে ওঠা' ক্ষমতার বিশ্নেষণ করতে চান, যাকে তিনি বলেছেন- 'ascending analysis of power..' ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যার দাবি করে।

ধরা যাক, রাষ্ট্র-ক্ষমতার ভরকেন্দ্র- কেবিনেট, পার্লামেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার বা প্রেসিডেন্ট-এর কার্যালয়, মন্ত্রীদের দপ্তর- ছাড়াও রাজনীতির বলয়ে, অর্থনীতির মধ্যে, সমাজের পরিসরে, পরিবারের ভেতরে নানা ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগ বা চর্চা চলছে। এসব স্তরে অর্থাৎ, দলের-উপদলের পর্যায়ে, কারখানা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পর্যায়ে, সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যথা সমিতি-সংগঠন, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা-মক্তব, এনজিও, মসজিদ-উপাসনালয় প্রভৃতি পর্যায়ে, বা পরিবারের ভেতরে, ক্ষমতা-প্রয়োগের কলা-কৌশলে রূঢ় অথবা সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, মমতার সাথে বা নির্মমতায়, ছোট-বড়-মাঝারি ক্ষমতার প্রয়োগ বা অনুশীলন হচ্ছে। এসব মাইক্রো পাওয়ার প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলোতে যেসব বা যে ধারার ক্ষমতার চর্চা হচ্ছে তার টেকনিক বা কলা-কৌশলগুলো স্থির নেই- কালক্রমে দেশক্রমে সেগুলো পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। মাইক্রো-ক্ষমতার সেই পরিবর্তনের ধারা সবসময় যে কালক্রমে 'আরো মানবিক', 'আরো প্রগতিশীল' বা 'আরো উন্নত' হচ্ছে বা হবে, তা কিন্তু নয়। ফুকোর কথা হলো, উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এসব মাইক্রো-পাওয়ারের পরিবর্তন-বিবর্তনের একটা 'ট্রেকিং' (Trekking) হওয়া দরকার। তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে, আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মাইক্রো-পাওয়ারগুলোর কীভাবে আত্তীকরণ করা হচ্ছে, বা কেন ক্ষমতার কোন ডিসকোর্স কলা-কৌশল বা 'মেকানিজম' কখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্র-ক্ষমতায়। সবকিছুর জন্যই শুধু বুর্জোয়া শ্রেণিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করলে আধুনিক পুঁজিবাদে ক্ষমতা-চর্চার ধারা ও পালাবদলকে বোঝা যাবে না। এটাই ফুকোর মূল বক্তব্য। কাজে লাগলে বুর্জোয়া শ্রেণি 'সামন্তবাদী অবশেষ'কে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে; মানবিকতা ও অমানবিকতা দুয়েরই চর্চা করতে পারে। তাই ফুকো আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার এনলাইটেনমেন্ট তথা হিউম্যান রাইটস জাতীয় অধিকার-এর ডিসকোর্স বা সাংবিধানিক ভাবাদর্শের প্রতি না তাকিয়ে এর মাইক্রো-পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কীভাবে চলছে বা ক্ষমতার চর্চা করছে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে বলেছেন।

ঙ. পঞ্চম উপদেশ

ফুকোর সবশেষ (পঞ্চম) পদ্ধতিগত মন্তব্যটি স্পষ্টতই মার্কস-আলথুসারের ভাবাদর্শ-সম্পর্কিত আলোচনাকে মনে রেখে করা। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে ভাবাদর্শের (Ideology) প্রচার করতে হয় এবং ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলোর তরফে যার যার নিজস্ব ভাবাদর্শ-প্রচারও অব্যাহত রয়েছে। যুগে যুগে এর ব্র্যান্ডিংও বদলায়। আমাদের দেশে 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' যেমন একটি ভাবাদর্শের স্ট্যাটাস পেয়েছে। শান্তিনিকেতন-এর বিদ্যালয় সম্পর্কে 'উন্মুক্ত পরিবেশে পাঠদান'-এর একটি ভাবাদর্শ কথিত রয়েছে। ভারতের রাষ্ট্র-সংবিধান বললে একটি 'সেক্যুলার' ভাবাদর্শের ভাবমূর্তিকে তুলে ধরা হয়। এসব ভাবাদর্শ বাস্তবে পালিত হচ্ছে কিনা, তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু ফুকো বলছেন, ক্ষমতা টিকে থাকে শুধু ভাবাদর্শের মাধ্যমে নয়- এটি ভাবাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি এবং অনেক কম কিছু- 'both much more and much less than ideology.' ক্ষমতা টিকে থাকে ভাবাদর্শের ওপরে নয়, জ্ঞানের ওপরে নির্ভর করে। যারা ক্ষমতাবান তারা বা তাদের অধীনস্থ সংস্থাগুলো বিভিন্ন 'বিশেষায়িত জ্ঞান'-এর অধিকারী হন। একজন নাগরিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেন না; সেটি আসে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাধর একটি আবহাওয়া সংস্থা থেকেই। সুতরাং আলথুসার কথিত 'আইডিওলজিক্যাল অ্যাপারেটাস অব স্টেট' নয়, বরং রাষ্ট্র 'নলেজ অ্যাপারেটাস' তৈরি করেই ক্ষমতার চর্চা করে থাকে। এ জন্যই রাষ্ট্রের জন্য রিসার্চ পেটেন্টসের সংখ্যা, পপুলেশন সেন্সাস, পরিসংখ্যান ব্যুরো, প্রবৃদ্ধি-দারিদ্র্যের হিসাব কষা এত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফুকো বলেছেন, ' It is the Production of effective instruments for the formation and accumulation of knowledge- methods of observation, techniques of registration, procedures for investigation and research, apparatuses of control. All this means that power, when it is exercised through these subtle mechanisms, can not but evolve, organise and put into circulation ... apparatuses of knowledge, which are not ideological constructs.'
ফুকোর এই ধারণাটিকে পরবর্তী সময়ে তিনি গভর্নমেন্টালিটি (Governmentality) এবং বায়ো-পাওয়ার (ইরড়-চড়বিৎ)-এর আলোচনায় আরও বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। এর আগে 'ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ' বইয়ে তিনি 'ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার' (Disciplinary Power) বা 'নরমালাইজিং পাওয়ার' (Normalizing Power)-এর কথা বলেছেন। অন্যত্র, ফুকোর Panopticon ও ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের কথা বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছি।১



৪. ক্ষমতা ও গণতন্ত্র

সবশেষে, একটি কথা যোগ করতে চাই। এই লেখাটিতে 'আধুনিক রাষ্ট্র' বলতে গিয়ে আমি মূলত আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকেই বুঝিয়েছি। কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগ-পদ্ধতি ও তার কলা-কৌশল শুধু উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই দেখা যায়, তা কিন্তু নয়। এর রেপ্লিকা দেখা যায় উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশেও; বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফুকো অবশ্য মনে করতেন যে, পুঁজিবাদী দেশ থেকে ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারের কলা-কৌশল একদা বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও আমদানি ও আয়ত্ত করেছিল, এবং বাস্তবে তা প্রয়োগ করেছিল। ফুকোকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'ক্ষমতার নজরদারির কলা-কৌশল কি আধুনিক শিল্পায়িত পুঁজিবাদী দেশের উদ্ভাবন?' এর উত্তরে ফুকো (যিনি এক সময় তার শিক্ষক লুই আলথুসারের মতাই ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন) বলেছিলেন:'কোথায় ক্ষমতার এই কলা-কৌশলের উদ্ভাবন হয়েছিল, তা হয়তো নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশে এসবের ব্যবহার শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ক্ষমতার এই ফর্মগুলো দেখা গেছে; ক্ষমতার প্রয়োগ-কৌশল এখানে শুধু স্থান বদলেছে মাত্র।' মিশেল ফুকো এখানে ইঙ্গিত করছিলেন যে, ক্ষমতা সমস্যাটির সমাধান শুধু রাষ্ট্র-ক্ষমতার হাতবদলের মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়ার নয়। এই সমস্যার শিকড় সমাজ-রাষ্ট্রের অত্যন্ত গভীরে রয়ে গেছে। বুর্জোয়া-রাষ্ট্রে ও প্রলেতারিয়েত-রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন শ্রেণির চরিত্র একেবারে ভিন্ন বা বিপরীত হলেও ক্ষমতার প্রয়োগ-পদ্ধতি ও কলা-কৌশলের খুব একটা হেরফের হয়নি। কথাটা নিয়ে আমরা ভেবে দেখতে পারি।

ক্ষমতার বিষয়ে ফুকোর আলাপের একটি আংশিক পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখার মাধ্যমে। এই আলাপটি মূলত গড়ে উঠেছে ১৯৭৫ সালের 'ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ' বইটিকে ঘিরে। এর পরেও ফুকো আরো ৯ বছর বেঁচে ছিলেন। সে সময়ে তিনি তার 'বায়ো-পাওয়ার' (যাকে তিনি বলেছেন 'পাওয়ার ওভার লাইফ') ধারণার সূত্রপাত করেন। এ নিয়ে অন্য কোন সুযোগে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু একটা স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর এখানেই, এখনই দেওয়া যেতে পারে। ফুকো এসব লিখেছেন কেন? ক্ষমতা বিষয়ে তার আলাপকে কেন আমাদের গুরুত্বের সাথে পাঠ করতে হবে?

এর কারণ জড়িত আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার 'গণতন্ত্র' সমস্যাটির সাথে। রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার হাতবদল ঘটলেও ক্ষমতার ধরন-ধারণার ক্ষেত্রে খুব একটা 'গণতন্ত্রায়ন' হয় না। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল হলেও তাতে ক্ষমতার খুব একটা গণতন্ত্রায়ন হয়নি। ১৯৭১ সালেই এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোয়াম চমস্কির (Chomsky) সাথে বিতর্কে মিশেল ফুকো জানিয়েছিলেন সে কথা। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনি কি মনে করেন, উন্নত দেশগুলোতে যে সমাজ রয়েছে তা গণতান্ত্রিক সমাজ?' উত্তরে ফুকোর স্পষ্ট জবাব ছিল, 'না, আমার মধ্যে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই যে, আমাদের সমাজকে কোনভাবে 'গণতান্ত্রিক' বলা যেতে পারে' (No, I don’t have the least belief that one could consider our society democratic) । তারপরই তিনি ক্ষমতার প্রসঙ্গটি যোগ করলেন গণতন্ত্র-আলোচনার সাথে। 'যদি গণতন্ত্র বলতে শ্রেণি-বিভক্তিহীন বা উচ্চ-নীচ ভেদাভেদহীন এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষমতার কার্যকরী প্রয়োগকেই বোঝানো হয়, তাহলে বলতেই হবে যে সেই গণতন্ত্রের থেকে আমরা যোজন যোজন দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছি।' এ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ উদ্ৃব্দতিটি তুলে ধরার দাবি রাখে :

'If one understands by democracy the effective exercise of power by a population which is neither divided nor hierarchically ordered in classes, it is quite clear that we are very far from democracy. It is only too clear that we are living under a regime of a dictatorship of class, of a power of class which imposes itself by violence, even when the instruments of this violence are institutional and constitutional; and to that degree, there isn’t any question of democracy for us.'

ফুকোর এই চিন্তাধারাকে অনেকেই 'চরমপন্থি' অবস্থান বলে চিহ্নিত করবেন। এ রকম গণতন্ত্র পৃথিবীতে কোথায়ই বা আছে, বলবেন তারা। কেউ কেউ এর মধ্যে 'নৈরাজ্যবাদ'-এর ছায়া দেখবেন। ফুকো অবশ্য বলবেন, নতুন ধারার চিন্তা-পদ্ধতিকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এসব লেবেলিং বা তকমার প্রয়োগ এক সনাতনি 'ধূর্ত কৌশল' কেবল। 'আমাদের সমাজ এক অদ্ভুত অসুখে ভুগছে- এই অসুখের উপসর্গ দেখতে পাচ্ছি কেবল। কিন্তু এর নাম আমরা জানি না।' ফুকোর বর্ণিত এই 'অদ্ভুত অসুখ'-এর সাথে জীবনানন্দীয় 'অদ্ভুত আঁধার'-এর আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে।

টিকা

১। 'ক্ষমতার ভিন্ন পাঠ :মার্কস প্রসঙ্গে ফুকো', সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্র, ৭ম সংখ্যা, ২০১৪। [এই পর্ব সমাপ্ত]


মন্তব্য