সময়ের বাচন

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

সময়ের বাচন

  বুলবুল চৌধুরী

আমার পিতা, মানে আব্বা আবদুল মতিন চৌধুরীর হাত ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্টত্মানের রাজধানী ঢাকায় আমার প্রথম প্রবেশ ঘটে ১৯৫৭ সালে। সেই যাত্রায় শুধু আমি নই, সঙ্গে ছিলেন মা সুফিয়া চৌধুরী, নানি হালিমা খাতুন, ছোট ভাই দুলু এবং নিলু। সরকারি অফিস ইরিগেশনে চাকরিজীবী হয়ে কর্মস্থল শহরে সপরিবারে স্থায়ী হবার লক্ষ্যে আব্বা পুরান ঢাকার সিংটোলা মহলল্গার ৪/১, পূর্ণ ব্যানার্জি লেনস্থ বাড়িটি কিনেছিলেন। মনে পড়ে, সেই বাড়িতে প্রবেশ পর্বে গ্রামের বসবাস ছেড়ে বর্ষাকালের এক সকালে তিনি নৌকায় করে আমাদের নিয়ে আড়িখোলা রেলস্টেশনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কয়লা ইঞ্জিন চালিত ট্রেনে চেপে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে পৌছতেই তিনি বলেছিলেন, এবারে নামতে হবে আমাদেরকে।

তারপর সবাইকে নিয়ে আব্বা গেটে টিকেট দেখিয়ে পল্গাটফর্মের ওপাশে পিচঢালা রাস্টত্মায় দাঁড়ানো একটা ঘোড়ার গাড়ি চালকের সঙ্গে সিংটোলা এলাকায় যাওয়ার জন্য দরদাম সারলেন। পাদানিতে পা রেখে বড় আকারের চারটি চাকার ওপর লাগানো পালকিসদৃশ ঘোড়ার গাড়িতে উঠে ভিতরে থাকা দু'দিকের কাঠের আসনে বসলাম আমরা। সময় বুঝে কোঁচোয়ান গাড়ির সুমুখে জুড়ে নেওয়া ঘোড়ার লাগাম বাঁ হাতে টেনে ধরে ডান হাতে ধরা চাবুকটা শূন্যে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ইশারা বুঝে ঘোড়া দুটি সবেগে ছুটতে শুরু করেছিল। সেদিন আব্বা রাস্টত্মায় চলমান যানবাহনগুলোর দিকে অঙ্গুলি তুলে আমাদেরকে চিনিয়েছিলেন কোনটা বাস, কোনটা মটর আর কোনটা রিকশা। একসময় ঘোড়ার গাড়ি পূর্ণ ব্যানার্জি লেনের বাসার সামনে পৌঁছতেই গলা উঁচিয়ে তিনি হাঁক দিয়েছিলেন, কোঁচোয়ান সাহেব, থামান, গাড়ি থামান।

জন্মেছি নানা নাসিরুদ্দিন আহমেদের দক্ষিণবাগ গ্রামের বাড়িতে। ঢাকায় আসবার আগে সেখানকার জল-কাদায় মাখামাখি হয়েই অনেক ক'টা বছর বেড়ে উঠেছি। ফের বলতেই পারি, ঢাকাবাসী হতে গিয়ে সেদিন ট্রেনে প্রথম চড়বার উত্তেজনা যেমন পুহিয়েছি, শহরের দালানকোঠা আর যানবাহনের দিকে তেমন অবাকপনা চাহনিই একীভূত পেয়েছি। বোধকরি, আসতে পথে ঢাকায় আব্বার কেনা বাড়িটা কেমন হতে পারে কল্পনায় তা আঁকতে গিয়ে অথৈ মেনেছিলাম। তারপর হয়েছিল কী, ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকবার মুহূর্তে আশপাশের মানুষজন আমাদের ঘিরে ভিড় জমিয়েছিল। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় সেরে আমাদের নিয়ে আব্বা কাঠের দরজা পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলেন। কিন্তু গৃহপ্রবেশের ক্ষেত্রে একতলা বাড়ির পাঁচটি কামরার মধ্যে মাত্র দুটি কামরা খালি পেলাম। আব্বা জানালেন, অন্য তিন কামরায় ভাড়াটিয়া থাকে। তারা কথা দিয়েছে সামনের মাসে ভাড়া নেওয়া অন্য কোনো বাসায় চলে যাবে।

তবে কার্যক্ষেত্রে ব্যাপারটা জটিল রূপ নিয়েছিল। সেই বিবরণে পরে আসা যাবে। তারও আগে পূর্ণ ব্যানার্জি লেনের অন্যান্য বাড়ি আর বাসিন্দাদের ছবি মনোলোকে বাঁধা হলো। এই গলির ইট-সুরকি দিয়ে গড়া একতলা ও দোতলা বাড়িগুলোর প্রায় সবগুলোতেই হিন্দু সল্ফপ্রদায়ের বসবাস। শুধু দুটো দোতলা বাড়ির একটির নিচতলায় থাকতেন মুসলমান সল্ফপ্রদায়ের পেশোয়ারি মানুষ সোলেমান খান। আর সেটির দোতলায় বাস করতেন ইন্ডিয়া থেকে আসা মুসলমান বাঙালি মানুষ কাজী হামিদ। আর অন্য দোতলা বাড়িটির মালিক ছিলেন উর্দুভাষী বিহারী মানুষ হোসেন মোলল্গা। এই স্মৃতি অধ্যায়ে সোলেমান খানের কথা আমার মধ্যে বিশেষ ছাপ তুলেছিল। তিনি নিজের বাঙালি স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে সব বয়সের প্রতিবেশীদের 'আপনি, আপনি' করতেন। সবাইকে অমন সম্বোধন করা নিয়ে অনেকেই বলে উঠতেন, সোলেমান খান বড়ই আজব মানুষ।

এখানে উলেল্গখ করা চাই যে, হিন্দু মালিকের কাছ থেকে বাড়ি কেনার বদৌলতে আমরা হয়েছিলাম মহলল্গার তৃতীয় মুসলমান পরিবার। ঢাকায় এসেই আমাকে বাংলাবাজার এলাকার কে,এল,জুবিলী হাইস্কুলে নিয়ে গিয়ে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আব্বা। আমি কোনো কোনোদিন পূর্ণ ব্যানার্জি লেনের পশ্চিম সীমানা থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতাপ দাস লেনের ওপারের শ্রীশ দাশ লেন হয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছতাম স্কুলে। আবার কোনো কোনোদিন বাসস্থানের দক্ষিণ দিকের হেমেন্দ্র দাস রোডের পর প্যারী দাস রোড ডিঙিয়ে যেতাম স্কুলে। মনে পড়ে, স্কুলে ভর্তি হবার অল্প কিছুদিন বাদে আব্বার সমবয়সী প্রতিবেশী অবনী বাবু আমাদের বাসায় এসে সখ্য পাতিয়েছিলেন। 'রূপমহল' সিনেমাহলের ম্যানেজার ছিলেন তিনি। তার আমন্ত্রণে বিনা টিকেটে আমরা ওই হলে গিয়ে একখানা ভারতীয় বাংলা ছায়াছবি দেখেছিলাম। সেটির নাম আজ আর স্মরণে নেই। তবে জীবনের প্রথম পর্দায় মানুষের কাহিনি রূপায়িত হওয়ার দৃশ্যে আমি বেজায় বুঁদ মেনেছিলাম।

ঢাকার অধিবাসী হয়ে একে একে মহলল্গার প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে কম-বেশি চিনজান গড়ে উঠেছিল। তাদের কারো কারো বাসায় আমরা যেমন যেতাম, তারাও তেমন আমাদের বাসায় আসা-যাওয়া করত। তবে সেই যাপনে অস্বস্থি নেমেছিল আমাদের বাসার ভাড়াটিয়া অন্যত্র উঠে যাওয়ার বদলে আরো জেঁকে বসার কারণে। ওই বিপদে নানির বড় ভাই উকিল শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন আব্বা। তার বাসা ছিল বংশাল মহলল্গার আগা সাদেক রোডে নিজের কেনা একটা দ্বিতল বাড়িতে। সব শুনে তিনি বলেছিলেন, জামাই, কালই আমি কোর্টে কেস ঠুকে দিয়ে তাদের তাড়াবার ব্যবস্থা করছি।

উকিল শাহাবুদ্দিন আহমেদ ওই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ভিতর দিয়েই দুষ্টু প্রকৃতির ভাড়াটিয়াদের সরানো গিয়েছিল। ফলে ৪/১, পূর্ণ ব্যানার্জি লেনের পুরো বাড়িটা আমাদের আওতায় আনতে পেরেছিলাম। সেদিনে ঢাকায় হিন্দু এবং মুসলমান সল্ফপ্রদায়ের নানা রকম ধর্মীয় পর্ব উদযাপিত হতো। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমকালো ঠেকেছে দুর্গা পূজার ম প। সেদিনের রাজপথ এবং অলিগলির বিভিন্ন বাড়ি ও মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দুর্গা দেবীর মূর্তিকে ঘিরে হিন্দু সল্ফপ্রদায়ের ঢল নামত। তাতে দর্শক হতো মুসলমান, খ্রিষ্টান ছাড়াও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের অনেকেই। পূজা মণ্ডপে প্রতিষ্ঠিত দুর্গা দেবীর উদ্দেশে ব্রাহ্মণের মন্ত্রপাঠের পাশাপাশি চলত ধূপদানি হাতের নানা বয়সের পূজারীর ঘোর হয়ে নেমে আসা নাচ। বাজত ঢাক, ঢোল, কাঁসর। সেই সঙ্গে প্রায়ই বিরতিহীন ধারায় মাইকে বাজানো হতো রেকর্ডে তোলা বেশ কিছু গায়ক-গায়িকার গাওয়া গান। দুর্গাপূজা, কী কালিপূজা লাগলেই আমার সহপাঠী সঞ্জয় এসে ডাকত, দেখবে যদি দেবী, চলো আমার সঙ্গে।

তার আমন্ত্রণে চলে যেতাম শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার ছাড়িয়ে দূর দূর এলাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে। চৈত্র সংক্রান্ত্মিতে প্রতিটি বাড়ির ছাদে বসত ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। নিজেও তাতে যুক্ত হয়ে নাটাইয়ে পেঁচিয়ে নিয়েছি মিহি কাঁচের গুড়া আর রঙের মিশ্রণে মাঞ্জা দেওয়া সুতা। তারপর বিভিন্ন বাড়ির ছাদ থেকে সেই সুতায় বাঁধা ঘুড়ি শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে চলত কাটাকাটি খেলা। সেসব সময়ে বিশেষ কৌশলে এক পক্ষ অন্য পক্ষের সুতা কেটে দিয়ে ঘুড়ি ছুটিয়ে দিতে পারার আনন্দে বলে উঠত, ভাকাট্টা।

মহরম মাসে শিয়া সল্ফপ্রদায়ের মুসলমানরা বের করত মহরমের বিশাল মিছিল। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর নাতি হাসান এবং হোসেনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার শোকে তারা 'হায় হাসান, হায় হোসেন' বলে কী যে মাতম জুড়ত। তাছাড়া শোকে বিহ্বল ওই সল্ফপ্রদায়ের অনেকেই লোহার শিকল এবং ছুরি দিয়ে রক্তাক্ত করত নিজেদের দেহ। এমন দৃশ্য দেখার জন্য নগরের আবালবৃদ্ধবনিতা হমুড়ি খেয়ে পড়ত।

ঢাকায় এসে প্রথম চেনা হয়েছিল হিজড়াদের। কোনো পরিবারে বাচ্চা জন্ম নিলে ঠিকই খবর জুটিয়ে সেই বাড়িতে ঢুকে তারা নবজাতককে কোলে নিয়ে নাচ-গান করত। বিনিময়ে অবশ্য কিছু পয়সা-কড়ি হাতিয়ে নিত হিজরারা। তবে এসবের মধ্যে আমার মায়ের সবিশেষ ঝোঁক গিয়েছিল বেঁদেদের দিকে। আমাদের গলিতে কোনো বেদেনি 'দেখবেন সাপের খেলা' বলে ডেকে উঠতেই আম্মা আদেশ করতেন, যা তো, তাদের নিয়ে আয় বাসায়।

আমাদের পাঁচ কামরার বাড়িটিতে ছিল বেশ প্রশস্থ একখানা উঠান। ডাক পেয়ে বেদেনী এসে মাথার ঝাঁপি নামিয়ে দিত সেখানে। তারপর ঝাঁপির মুখ খুলে বের করে আনত নানা রকম সাপ। সেই সঙ্গে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত ফণা ধরা সাপের সামনে ঘুরিয়ে নিতে নিতে বলে উঠত, খা, খা, বখ্‌খিলারে খা।

অমন আচরণে ফণা ধরা সাপ শরীরে মোচড় তুলে বেদেনীর হাতে ছোবল মারবার প্রাণান্ত্ম কসরৎ চালাত। তবে কোনো বারেই কোনো সাপ তাতে কামিয়াব হতে পারার ঘটনা ঘটেনি। এও বলি, আমাদের বাসায় বেদেনী এলেই প্রতিবেশীরা উঠানময় ঠাসাঠাসি দাঁড়িয়ে যেত। নানার কাছ থেকে পাওয়া কলের গানে বাজানো গান শুনতেও অনেকেই আসত আমাদের দুয়ারে। আবার কেউ কেউ এসে মায়ের কাছে আবদার জুড়ত, আপনার গান শুনতে এলাম গো।

সংসারী হওয়ার আগেই বাড়িতে ওস্টত্মাদ রেখে নজরুল গীতি গলায় তুলে নিয়েছিলেন মা। আত্মীয়স্বজনরা তো বটেই, প্রতিবেশীরাও তার গাওয়া গান শুনে মুগ্ধ ভাব প্রকাশ করত। আবার কেউ কেউ বলত, রেডিওতে কতজনের গান শুনি আমরা। আপনার যা গলা, সেখানে গেলে রেডিওর লোকজন আপনাকে লুফে নেবে।

ঢাকায় আসবার পর মায়ের গর্ভ থেকে একে একে জন্মেছিল ছোট ভাই লিটু, পিটু এবং বোন বেবী। এই সময়ের মধ্যে পূর্ণ ব্যানার্জী লেনের বেশ কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। অবনী বাবু হঠাৎ করেই চলে গেলেন ইন্ডিয়ায়। প্রতিবেশী নৃপেন বাবুও একই পথের পথিক হলেন। ক্রমে ক্রমে তাদের বাইরেও এই তালিকায় উঠল আরও কিছু মানুষের নাম। ক্রয়সূত্রে প্রত্যেকের ছেড়ে যাওয়া বাড়ির মালিক হলো মুসলমান সল্ফপ্রদায়ের লোকজন। ওই অবস্থায় সিংটোলার নারায়ণ বাবুর বাড়িতে অন্যান্য বছরের মতো দুর্গা কিংবা কালি পূজার মণ্ডপ সেজে ওঠা বাদ পড়ল। অতীতে স্কুলের সহপাঠি আবেদ খানের আহব্বানে মাঝেমধ্যে আমি মহলল্গার পুব দিকের ধোলাইখালের কাঠের পুল পেরিয়ে চলে যেতাম গেন্ডারিয়া। বর্ষাকাল এলেই সে এসে বলত, চড়বে তো কোষায়, চলো আমার সঙ্গে।

ধোলাইখালের পারে ছিল আবেদ খানের বাড়ি। তারই ঘাটে বাঁধা নিজেদের কোষায় করে আমাকে নিয়ে ওই খালের উৎসমুখ বড়িগঙ্গা নদীতে চলে যেত সে। আমাদের বরাবর উল্টোদিকের বাড়িতে এক উকিল সপরিবারে উঠে এসেছিলেন। তার মেয়ে ক্লাস নাইনের ছাত্রী সাইদা ছিল নৃত্যে পারদর্শী। একদিন ছোটো বোনের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের সামনে সাইদা নেচেছিল। সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত আবেদ খান আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিল, দোস্টত্ম, আমি কিন্তু মেয়েটার প্রেমে পড়েছি।

আবেদ খানের ওই উক্তি ক'দিন বাদে উকিল সাহেব বাড়িটি মটর পার্টস ব্যবসায়ী বশীর আহমেদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। পরে আবেদ খান সাইদার ঠিকানা খুঁজলেও তা মেলানো যায়নি।

সেদিনে অনেক বোম্বাইয়ার বসবাস ছিল ঢাকায়। বাঙালি কিংবা বিহারীদের তুলনায় তারা দীর্ঘ দেহের ধারই ধারে। ভারি ফর্সা তাদের প্রত্যেকের বরণ। রূপের বিচারেও তারা অন্য সল্ফপ্রদায়ের সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের লেশমাত্র ছিল না। রোজ বিকেলে জুবিলী স্কুলের উল্টোদিকে জামায়েতখানায় ওই সল্ফপ্রদায়ের মানুষজন সমবেত হতো। সেবারে হয়েছিল কী, স্কুলের সহপাঠী আজিম বক্স জানিয়েছিল, পশ্চিম পাকিস্টত্মান থেকে প্রিন্স করিম আগাখান আসবেন এই জামায়েতখানায়। তাকে সম্মান জানাতে বোম্বাইয়া মেয়েরা মাটিতে শুয়ে মাথার চুল বিছিয়ে দেবে। আর প্রিন্স করিম আগাখান তারই উপর দিয়ে হেটে যাবেন।

আজিম বক্সের কথা শুনে খুবই ইচ্ছা জাগল, দেখব তো দৃশ্যটা। কিন্তু অবশেষের ব্যাপার হলো, জামায়েতখানার ভিতরে অন্য সল্ফপ্রদায়ের কারো প্রবেশ অধিকার ছিল না।

স্কুলের আরেক সহপাঠী কায়েস আহমেদের ও আমি একে অপরের বড়ই বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। সে রোজই কোনো না কোনো গল্পের বই পড়ত। আমারও ছিল সেদিকে নেশা। ক্লাস নাইনে উঠবার পর স্কুলের বার্ষিক পত্রিকায় কায়েস আহমেদ 'চোর' নামক একটা গল্প লিখে সবার দৃষ্টি কেড়েছিল। সেটা পড়ে নিজেরও অমন লিখতে পারার সাধ গিয়েছিল। তাকে সেই ভাব ব্যক্ত করতেই উত্তর এসেছিল, লিখতে চাইলে বেশি বেশি পড়তে হবে। থাকা চাই মানুষ দেখার চোখও।

একই বছরে একই ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম আমি ও কায়েস আহমেদ। সেদিনে পাশাপাশি হয়ে মাঝেমধ্যেই আমরা বিভিন্ন পথে ঘুরে ঘুরে ঢাকার ধরন-ধারণ বুঝতে গেছি। পাঠ তৃষ্ণা মেটাতে কতবারই তো দুজনে হেঁটে হেঁটে আরমানীটোলার মাঠে স্থাপিত সরকারি পাঠাগারে গিয়ে পছন্দের বই জুটিয়ে নিয়েছি। কায়েসের সঙ্গ দিয়ে লেখক হওয়ার ইচ্ছা আমাকে তাড়িত করেছে। কিন্তু অনেক চাইলেও স্কুলে থাকতে আমি কোনো কবিতা কিংবা গল্প লিখবার উপাদান নিজের মধ্যে জমা করতে পারিনি। এরকম দিন গড়িয়ে চলার ভিতর দিয়ে ১৯৬৫ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আমার স্কুল জীবনের সমাপন ঘটে। ওই সালেরই মাঝামাঝি সময়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হবার পর আমার মনের প্রবাহে চাঞ্চল্যের বাড় বেড়েছিল। মূলত সেটা ছিল আমি কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পদার্পন করবার অনুভব।

সেদিনগুলোয় ঢাকার সিনেমা হলে গিয়ে ভারতীয় বাংলা, হিন্দি ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্টত্মানের নির্মিত উর্দু আর পূর্ব পাকিস্টত্মানে নির্মিত বাংলা ছায়াছবি দেখেছি। হঠাৎ হঠাৎ ভাবতাম কী, লেখক নই, এ জীবনে চিত্রপরিচালক-ই হবো।

আবার মনে পড়ে, এক বিকেলে কায়েস আহমেদ আমাকে সামনে পেয়ে বলেছিল, চলো তোমাকে সাহিত্যিকদের আড্ডায় নিয়ে যাই।

ঠিক যে চিত্রপরিচালক হওয়ার আকাঙ্খা সত্তেও ফাঁকে লেখক হবার তৃষ্ণা আমি পুহিয়েছি। তাই কায়েস আহমেদের ডাকে ঢুকেছিলাম প্যারী দাস রোড থেকে বেরিয়ে যাওয়া শ্রীশ দাস লেনের মুখে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিংয়ে। সেখানে চা-নাস্টত্মা, দুপুর এবং রাতের খাওয়াদাওয়া মিলত। কায়েসের হাত ধরে বিউটি বোডিংয়ে প্রথম ঢুকে জানলাম, এখানে ঢাকার অনেক প্রবীণ এবং নবীন সাহিত্যিকরার আড্ডা জমান। পরে ওই আড্ডায় আমিও নিয়মিত গতায়ত দিয়ে কবি আবুল হাসান আর কবি নির্মলেন্দগুনের নিতুই সঙ্গী হয়ে ওঠেছিলাম। ওই মেলামেশার এক পর্যায়ে মূলত কায়েস আহমেদের অনুপ্রেরণায় 'জোনাকি ও সন্নিকট কেন্দ্র' নামক একটা গল্প আমি লিখেছিলাম। সেই ছিল আমার প্রথম চয়ন।

আজ বলতেই পারি, অমন সাফল্যের আনন্দে আমি দিনে দিনে আরও ও উড়ূ উড়ু স্বভাবের হয়ে উঠছিলাম। এ সময় আমার দৃষ্টি গিয়েছিল পাশের বাসার দ্বিতলের অধিবাসী কাজী সাহেবের মেয়ে শেফুর দিকে। অনুমান করি, আমাদের ঘরের জানালা থেকে তাদের জানালার দূরত্ব হাত চলিল্গশেক হবে। মাঝে একখানা উঠানই দৃশ্যমান। আমার ভাব বুঝে মেয়েটি তাতে মজে গিয়েছিল নিশ্চয়ই। নইলে কেন এক বিকেলে জানালায় দাঁড়িয়ে আমাকে লেখা তার একখানা চিঠি দেখাল। তারপর একটা ইটের ছোটো টুকরায় সেটি পেচিয়ে আমাকে তাদের বাড়ির পেছনদিকে রাস্টত্মায় যাবার ইশারা দিয়েছিল।

সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটে গিয়ে রাস্টত্মায় ইটের টুকরায় পেচানো শেফুর ছুড়ে দেওয়া চিঠিটা মুঠোয় তুলে নিয়েছিলাম। সেটি পড়ে তারই মতো আবেগের তোড়ে প্রতিউত্তর তৈরি করেছি। আর সেটি শেফুর দেওয়া নিয়মে ইটের টুকরোয় জড়িয়ে ছুড়ে দিয়েছিলাম তাদের উঠানে।

আসল কথন হলো, মানুষ যা করতে চায় বা যা পেতে চায়, অদৃশ্যের সাধন সেখানটায় অভাবনীয় অন্ত্মরাই বাঁধাতে পারে। তাই বুঝি আমার আর শেফুর প্রেম পরিস্টম্ফুট হবার আগেই নানী এসে দাঁড়ালেন মাঝখানে। নাতির রকমসকম টের পেয়ে তিনি আমাকে এই বলে শাসালেন, ফের যদি ওই দিকে তাকাও, তাহলে তোমার মা-বাবাকে দিয়ে এর বিচার করাব।

সেই কথায় আমি চুপটি মেরে গিয়েছিলাম। সেইসঙ্গে ভুল করেও আমার জন্য নিজেদের জানালায় অপেক্ষমান সেফুর মুখ দেখা দূরে থাক, মন থেকেও সরাবার দ্বন্দে নিপতিত ছিলাম। সেই অবকাশে হলো কী, শেফুর একগাদা আফিম খেয়ে চেতনা হারাল। তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ হবার পর ফিরিয়ে আনা হলো বাড়িতে। সেই অবস্থায় আমার মনে একটা জিজ্ঞাসাই ঘুরপাক খেতে থাকল, হায়, প্রেমিকের নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিবাদ জানাতে গিয়েই কি আফিম গিলে প্রেমিকা মরতে চেয়েছিল?

তারপর দুর্ভাবনা হলো, বেঁচে উঠবার পর শেফু অপমানের প্রতিশোধ নিতে আমাদের সম্পর্ক ফাঁস করে দিতেও পারে। শেষাবধি ঘটনা আমার আশঙ্কার কাছ-ঘেঁষা হয়নি। মাঝে জানলাম, গভীর ঘুম পাওয়ার জন্য কাজী সাহেব রোজ রাতে একদানা আফিম ও এক গল্গাস দুধ খেয়ে থাকেন। ওই সুযোগে তার কৌটায় রক্ষিত আফিম গিলে শেফু ঘুমের ভিতর দিয়ে মরে যাবার ইচ্ছা ধরেছিল। এই ঘটনার অল্পকিছুকাল বাদে কাজী সাহেব ওই মেয়েকে পাত্রস্থ করলেন।

তারপর ভাবলাম, সেই থেকে ধরে একান্ন বছর পেরিয়ে এলাম। ইতোমধ্যে সিংটোলা মহলল্গা হারিয়েছে আগের চেহারা। একে একে স্থানীয় প্রায় সব হিন্দু পরিবারই মিলিয়ে গেছে। তাদের জায়গায় আসা অধিকাংশ মুসলমান মালিক পুরান দিনের বাড়ি ভেঙ্গে তুলেছেন সুউচ্চ নতুন দালান। নীতিনিত্যিই এই মহলল্গার অনেকের সাক্ষাৎ পাই। তাদের কারো কারো সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ বাক্য বিনিময়ও চলে। আবার তো তাদের দিকে তাকিয়ে অনুভব করি, আজ একমাত্র আমিই সিংটোলা মহলল্গার বয়জ্যোষ্ঠ মানুষটি হয়ে বেঁচে আছি।

শেষে জানাই, অনেক আগেই কাজী সাহেব বাড়িটা বেচে দিয়ে অন্যত্র উঠে গেছে। মহলল্গার অন্যান্য বাড়ির সংস্কার ঘটলেও এই বাড়িটি কিন্তু পুরনো চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বীকার করতেই হয়, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমার চোখ যায় শেফু যে জানালায় এসে আমার দিকে তাকাত, সেই জানালায়। পরিণতিতে আমার অন্তরে দুঃখবোধ আছঘে পড়ে। তবে শুধু এই দুঃখবোধই নয়, অনুশোচনার প্রলেপও তাতে আছে। সত্যিই, একী করলাম আমি! হায়, এজীবনে আমি শেফুর প্রেমিকই সাঝলাম মাত্র। তাই তার মতো সুন্দর হতে পারি নি।


মন্তব্য