কেউ ডাকছে আমাকে...

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

কেউ ডাকছে আমাকে...

ছবি ::মিঠুন দাস

  ইরাজ আহমেদ

গলাগলি করে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি, তাদের পুরনো দেয়াল, জানালায় কাঠের পাল্লা, সানশেড, ভেন্টিলেটর আর সবকিছু ছুরির মতোন এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঢুকে যাওয়া কয়েকটা গলি। কোথাও পড়েছে জামগাছের ছায়া, রিকশা যাচ্ছে, মুদির দোকান থেকে নিচু শব্দে ভেসে আসা রেডিওর গান, ডেকে যাওয়া জুতা সেলাইয়ের লোক, কারো সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো বাজারের ব্যাগ, একতলা বাড়ির ছাদ, হাওয়ায় উড়ছে মানুষের কণ্ঠস্বর। কয়েকটা গলির শরীর থেকে ফুটে বের হওয়া আশ্চর্য জীবনের ছবি দেখতে পাই আজও অবিকল। সিনেমার রাশপ্রিন্ট ভেসে যাচ্ছে যেন দৃষ্টির সামনে দিয়ে। অভিনীত দৃশ্যগুলো কী ভীষণ বাস্তব, কাছাকাছি!

অনেক অনেক বছর আগে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতার তলায় দুই বন্ধু। বাদামের ঠোঙ্গার হালকা উষ্ণতা হাতের তালুতে। হয়তো তখন বিকেল। কেউ ডাকলো আমাদের? চমকে উঠি। হয়তো মাঠ, হয়তো গলির মোড়। বৃষ্টিতে মাঠে যাবার পথ ডুবেছে তখন পানির তলায়। তবু ভিজে ভারী হয়ে থাকা ফুটবলটাই তখন পৃথিবী। বেড়ে উঠছি তখন, বেড়ে উঠছি পুরনো এক মহল্লায়। সত্তরের দশকের আলো-হাওয়া সেখানেই আমাকে তৈরি করে দিচ্ছে তখন এক অজানা মহাপৃথিবীর জন্য।

বেশিরভাগ বাড়ির সামনেই এক খণ্ড উঠান। কিছু ফুলগাছ নিয়ে বাগানের সামান্য ধারণা আর এক মানুষ-সমান উঁচু দেয়াল। দরজাকে অবহেলার প্রান্তে ফেলে প্রায় নিয়মিত গৃহপ্রবেশ ছিল সেই দেয়াল টপকে। দেয়ালের সেই দুর্বল বাধা টপকে রাতে চোরও ছিল প্রায় নিয়মিত অতিথি। কত কেউ যে ঘুরে যেতো মহল্লায়। তারা নিশিকুটুম্বের মতো নীরবে আসতো না। দুপুরে জুতা সেলাইয়ের লোকটা আসতো বহুদূর থেকে। কখনো সেলাই শেষ করে মজুরির সঙ্গে খাবারও পেতো বিভিন্ন বাড়ি থেকে। ছুটির দিনে ঘুরে যেতো বইওয়ালা, পুরনো খবরের কাগজের ক্রেতা, মাঠাওয়ালা। সবাই চেনামুখ, সবাই যেন কাছের মানুষ। কেমন এক আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলো চরিত্রগুলো।

পরেশদা'র মুদিখানা ছিলো; ছিলো মন্দিরের ভাঙ্গা দেয়াল, ছিলো মিটমিটে স্ট্রিট লাইট। সন্ধ্যা হলে আপন নিয়মে জ্বলে উঠেও মহল্লাটাকে আলোকিত করতে ব্যর্থ হতো। পরেশদা'র মুদিখানা ছিলো গন্ধের আশ্চর্য পৃথিবী। চাল, ডাল আর ড্রামভর্তি গুড়ের ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে যেতো লুকিয়ে খাওয়া সিগারেটের গন্ধ। বড়দের চোখ এড়িয়ে বেপরোয়া কিশোরদের ধূমপানের জায়গা ছিলো সেই দোকানের অন্দরমহল। পরেশদা'র মাথা নিচু হিসাবের খাতায়, আর পাশেই বস্তার উপরে বসে তখন চলছে আড্ডা, জ্বলছে সিগারেট।

শীতকালে রোদ উঠেছে। শীত পাঁজর ভেদ করে হানা দিচ্ছে। গলির ভেতরে আজও দেখতে পাই ছুটির দিনে কিশোরদের ক্রিকেট খেলা। শুনি দেয়ালে বল লেগে ছিটকে যাওয়ার শব্দ। কারা ইট জড়ো করে সাজায় উইকেট? কাদের বাড়ির দড়িবাঁধা ব্যাট একমাত্র সম্বল সেই খেলায়? বাতাসে উড়ছে আজও সেই মিলিত কণ্ঠস্বর, উল্লাস। সঙ্গে অনুভূতির শরীরে ঢুকে পড়ছে পুরনো মহল্লার শীত।

শীতকালে স্কুল বন্ধ থাকতো। তখন ছিলো বন্ধুরা মিলে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রমনা পার্কে শরীরচর্চা করতে যাওয়ার তোড়জোড়। বড়জোর পার্কে একটা চক্কর। মুখ বুজে বসে থাকা শীতের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া পার্কের বেঞ্চ। তারপর শুরু আশপাশের মহল্লার খেজুরগাছে বাঁধা রসের কলসি উধাও করার পালা। শীতের ভোরে ঠাণ্ডা হয়ে থাকা ডাবও চুরির আগ্রাসন থেকে রেহাই পেতো না।

মহল্লায় শীতকাল আসতো আনন্দের পতাকা উড়িয়ে। আকাশটাকে মনে হতো এখনকার চাইতে অনেক বেশি নীল। বাড়িগুলো যেনো শীতে গুটিশুটি মেরে আরো কাছাকাছি চলে আসতো। লেখাপড়ার নিয়ন্ত্রণরেখার বাইরে থাকতাম আমরা একদল কিশোর। স্কুল ছুটি। তাই বাড়ির সামনেই সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলতো আড্ডা। আড্ডা চলতো গলির মোড়ের মাথায় রেস্তোরাঁয়। গলির জটলা থেকে কখনো গান ভেসে যেতো কোনো কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি লক্ষ্য করে। সেখানে যে বসবাস বিশেষ একজোড়া চোখের। কতদিন কত গান যে নিবেদন হয়ে উড়ে গেছে সেইসব ঠিকানায় তার ইয়ত্তা নেই! সেইসব শীতকালীন নৈশ মহড়ায় প্রতিবেশীদের দরজা কিন্তু খোলাই থাকতো। ঘুরেফিরে কারো বাড়িতে অনুরোধ পাঠিয়ে একতলার জানালায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া, বাড়তি হিসেবে কখনো জুটে যাওয়া মুড়ি ... অসাধারণ ভালো লাগা জুড়ে থাকতো মনে।

শুধু চা আর মুড়িতেই শেষ হতো না আয়োজন। সেই পুরনো মহল্লায় প্রতিবেশী বাড়ির দরজা মধ্যরাতের আগে বন্ধ হতো না। কখনো আদান-প্রদান হতো খাবার। কোনো বাড়ির রান্নার সুঘ্রাণে অস্থির হয়ে যে কেউ যে কোনো সময় ঢুকে পড়তো সেখানে। কোনো বাড়ির ভালোমন্দ রান্না চলে যেতো প্রতিবেশীর ঘরে। গভীর রাতে দলবেঁধে কোনো বাড়ির টেলিভিশনের পর্দায় গোগ্রাসে মোহাম্মদ আলীর বক্সিং ম্যাচ দেখা অথবা গলি দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কারো খোলা জানালায় দাঁড়িয়েই দেখে নেয়া সাপ্তাহিক নাটক।

দীর্ঘ একটা সময় আমি কাটিয়েছি সেই মহল্লায়। আমার বেড়ে ওঠার সমস্ত গল্প জানে পাড়াটা। এই ঢাকা শহরের প্রায় কেন্দ্রে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় আজও গেলে মনে হয় ওই দেয়ালে আমার হাতের ছাপ আছে বোধ হয়। ভোজবাজির মতোন চোখে ভেসে ওঠে নিজেরই হারানো ছায়া কোনো দোকানের সামনে। দেখতে পাই বন্ধুরা একটা নিরিবিলি ব্যাংকের দেয়ালে বসে গল্প করছে, কোনো ভীরু চোখ স্কুল ইউনিফর্ম পরে হেঁটে যাচ্ছে, রিকশা চলছে মন্থর গতিতে, কোনো বাড়ির ছাদে উড়ছে রৌদ্রে শুকাতে দেয়া কাপড়। ভাবি, আমার কৈশোর, যৌবনের সেই মহল্লা অথবা পাড়া সময়ের কোনো অংশে অবিকল একই রকম হয়ে-ই হয়তো আটকে আছে। জড়িয়ে আছে চরিত্রগুলো, জড়িয়ে আছে কাছের মানুষগুলো। তারা আছে কোথাও। একটু একটু করে একটা গোটা এলাকা কেমন করে মমতায় ভর করে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিলো, সে কাহিনি বুকের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পৃষ্ঠা উল্টে গেলে গল্পগুলো জানান দেয়, আমরা আজও এক পাড়াতেই থাকি। এ শহরে বর্ষা, বসন্ত অথবা শীতে স্মৃতি ডেকে যায়।


মন্তব্য