পাড়াতো আখ্যান

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

পাড়াতো আখ্যান

  লোপা মমতাজ

কাঁঠাল আমার প্রিয় ফল। দুই দোকান ঘুরে মনের মতো একটা কাঁঠাল কিনেছি। কোষগুলো খুব ছোট ছোট আর ভীষণ নরম। একসঙ্গে তিন-চারটা কোষ খাওয়া যায়। এই সেরেছে, কথা বলতে বলতে বিচিসহ কাঁঠালের কোষ গিলে ফেলেছি! খুব হাসি পাচ্ছে, অথচ আজ থেকে ত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমার বয়স যখন পাঁচ কি ছয়, তখন ব্যাপারটা ছিল ভয়ঙ্কর। ওই বয়সে কীভাবে যেন মাথায় গেঁথে গিয়েছিল যে, কোনো ফলের বিচি খেয়ে ফেললে পেটের মধ্যে গাছ হয়ে বাড়তে থাকে।

ছোট্ট একটা পাড়া আমাদের, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল ওখানে। একখানা কামারঘর, একখানা সেলুন, মাছের বাজার। সকাল সকাল এলে তরতাজা সব ভালো মাছ পাওয়া যেত সেখানে। দু'জন মাছওয়ালা ছিলেন আব্বার বন্ধু গোত্রীয়। তাদের ছয়/সাতজন করে ছেলেপুলে। আমরাও সাতজন ভাইবোন, সুতরাং ওদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগেনি। যে কারণে আগেভাগে বাজারে না এলেও আমরা ভালো মাছটাই পেয়ে যেতাম। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমি বাজার করেছি। বাজার করতে, বাজারের টাকা মারতে মানে টাকা সেভ করতে আমি ছিলাম ওস্তাদ। আমার কিছু করতে হতো না। ১৫ টাকা মাছের ভাগা হলে ১৩ টাকায় দিয়ে দিতেন আব্বার পাড়াতো বন্ধু। গরুর মাংস ৪৫ টাকা কেজি, কিন্তু আমি পেতাম ৪৩ টাকায়, পাড়াতো বন্ধু বলে কথা। ডিমের হালি চার টাকা হলেও দুইটা ভালো আর দুইটা একটু ভাঙা ডিম কেনার ফলে হালি পড়তো আড়াই টাকা। তো, এইভাবে কিছু টাকা সেভ করতে পারতাম। এ সবই হতো আমার পাড়াতো চাচা, মামা আর জ্যাঠাদের বদৌলতে।

যা বলছিলাম, কাঁঠালের বিচি তো খেয়ে ফেলেছিলাম- অহন কী অইব, আমার বান্দর ভাইটা কয় 'প্যাডে গাছ হইব, দেখবিনে আস্ত একটা কাডল গাছ।' পেটে হাত চেপে দৌড়ে গেছি আমাদের পাড়া শুরু যেখানে, সেখানটায়। দোকানের নাম 'শাহীন হোমিও হল'। শুধু ডাকটা দিতে পেরেছি, কাকাআআআ। আর কিছু বলতে পারছিলাম না।

কী হইসে? কী সমস্যা?

কাকা প্যাডে তো কাডল গাছ হইয়া যাইতাসে।

কার প্যাডে?

আমার।

তুই গেল সপ্তাহে না আইসিলি?

হ।

এখানে একটু বলে নেই। গেল সপ্তাহে এসেছিলাম ভিন্ন একটা কারণে। আম্মার পেটিকোট আর ব্লাউজ দিয়ে তার একটা শাড়ি পড়েছিলাম। আমার বড় বোনের কাছে পড়তে আসে যে মেয়েটা, নাম জ্যোৎস্না, বলে কি, তোর প্যাডে তো অহন বাচ্চা হইব। তুই বাচ্চাঅলা মানুর জামা পড়ছোস। সেইবার এই কাকার ওষুধ খেয়েই তো রক্ষা পেয়েছিলাম।

কাকা বললেন, কাডল কখন খাইছোস?

আইজকা সকালে, কাকা।

উনি শুনলেন, তারপর একটা পুড়িয়া দিলেন আর দানাদার ধবধবে সাদা কিছু বড়ি। কী যে স্বাদ! বললেন অক্ষণি খা। গাছ আর হইব না।

আহ, কী শান্তি। তখন তো মনে মনে এটাই ভেবেছিলাম যে, কাকার হাতে বানানো বড়ি খেয়েই তো কাঁঠাল গাছটা বড় হতে পারেনি। সে সময়ের স্মৃতি যখন রোমন্থন করছি, তখন গা কেমন শিউরে ওঠে। এখন তো কোনো বাচ্চাকে একা পেলেই শুনি এই কাকারা, চাচারা ধর্ষণ করছে। কী ভয়ঙ্কর!

আচ্ছা, চার আনায় কলাপাতায় মোড়ানো খাঁটি দুধের আইসক্রিম কে কে খেয়েছেন? চিনির সিরা দিয়ে বানানো এক প্রকারের মণ্ডার কথা মনে আছে? যেটা বাঁশের আগায় বাঁধা থাকত। পাঁচ পয়সা বা চার আনা দিলে আংটি কিংবা চশমা বানিয়ে দিত ওই মণ্ডা দিয়ে? কিংবা পাঁচ পয়সায় নাবিস্কো বিস্কুট খেয়েছেন? কিংবা আট আনায় বাদাম আর গুড়ের গাট্টা? কিংবা চার আনায় শিঙাড়া খেতে গিয়ে দোকানের ক্যাসেটে বাজতে থাকা গজল শুনেছেন- জিন্দেগিমে তো সাভি পেয়ার কিয়া কারতে হ্যায়, ম্যায়তো মারকারভি মেরি জান তুঝে চাহুঙ্গা, জিন্দেগিমে তো সাভি পেয়ার কিয়া কারতে হ্যায়...।

এই ছিল আশির দশকে আমার শৈশব-কৈশোরের প্রিয় মহল্লার পরিচিত দৃশ্য। আমরা থাকতাম দুই পাড়া বা মহল্লার মাঝামাঝিতে। অর্থাৎ যেখানে এসে একটা পাড়া শেষ হয়ে নতুন আর একটা পাড়ার শুরু। যেটা শেষ হয়েছে সেটা আমলাপাড়া আর যেটার শুরু সেটা কালীর বাজার। কালীর বাজার শেষ হয়েছে যেখানে, সেখানটায় একখানা কালীমন্দির আছে। সেখান থেকেই কালীর বাজারের পত্তন। আর আমলা শব্দের অর্থ দিয়ে অনুমান করা যায় যে, একসময় এই এলাকায় আমলাদের ব্যাপক আনাগোনা ছিল।

ও, আরও একটা কথা মনে পড়েছে। আমাদের মহল্লায় ঢুকতেই একটা টংঘর চোখে পড়ত। বেশ উঁচু। আমার শৈশবের কাঁধ অত উঁচুতে তখন উঠতে পারত না বিধায় দোকানওয়ালার চেহারা দেখতে পেতাম না। তবে সওদা দেওয়ার আর পয়সা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালে সেই হাত দেখেই বুঝে ফেলতাম, ইনি সুরুজ মিয়া। মানে আমাদের পাড়াতো সুরুজ চাচা। কোনো কোনো দিন চাচার ছেলেও বসত। ওর নাম ছিল চান মিয়া। আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত। ক্লাস থ্রিতে। ওর কাছে বাকিতে কিচ্ছু কেনার জো ছিল না। কিন্তু সুরুজ চাচা ছিলেন ভীষণ দিল-দরিয়া মানুষ। চাচার খাতায় মহল্লার সবার নামে বাকির পাতা ছিল। অত্র এলাকায় ভাট নামে যে একখানা বংশ আছে আর আমি যে সেই বংশের মেয়ে, তা আমাকে জানান দিতে হতো না। আমাকে আমার নামে নয়, ভাটের মেয়ে নামেই লোকে চিনত। আর তাতে যে সুবিধা হতো তা হলো, আমার বাপের নামে যে বাকির একটা পাতা আছে তাতে আমার চার আনা, আট আনা কি পাঁচ সিকি যোগ হয়ে যেত। শনপাপড়ি বাদে সুরুজ চাচার দোকানে বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল রাজা কনডম। এখনকার সময়ে চিপসের প্যাকেট দোকানের সামনে যেভাবে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঝুলতে থাকে, ওগুলোও তেমন করে ঝুলে থাকত। প্যাকেটটা দেখতে ছিল দাবার চেকের মতন। ওহ, কনডম বলছি কেন, তখন তো ইহাকে চিনতাম বেলুন বা পটকা নামে।

ছোট্ট দুইটা পাড়া। এই পাড়ার প্রত্যেকটা পরিবার প্রত্যেককে চেনে। নিজের বাপকে যেমন জমের মতো ভয় পেতাম, ঠিক তেমনি পাড়ার মন্নান চাচা, কলিম মাস্টার, লোকমান চাচা তাদেরও ভয় পেতাম। রাস্তায় তাদের দেখা যখনই পেতাম, সঙ্গে সঙ্গে একটা লম্বা সালাম দিতাম। সালাম না পেলে বাসায় যাওয়ার আগেই আমাদের নামে নালিশ চলে যেত। সুতরাং আদব-কায়দা না শিখতে চাইলেও বাপ আর পাড়াতো চাচাদের শাসানিতে শেখা হয়ে যেত। মায়াও করতেন খুব। আম-কাঁঠালের দিনে দলবেঁধে সবাই সবার বাসায় পেট ভরে খেয়েছি।

এখন জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকি। যে বিল্ডিংয়ে ভাড়া থাকি, সেখানে সবার নামটাও ঠিকমতো জানি না। বিপদে পড়ে কেউ যদি দরজায় টোকা দেয়, কেউ দরজা খুলবেন কি-না সন্দেহ। এমন ঘটনা তো হরহামেশাই দেখি পত্রিকায়। গায়ে আগুন লেগে একজন মা হয়তো পুড়তে পুড়তে নিচে নেমে এসেছেন। কোনো কোনো দরজায় ধাক্কাও দিয়েছেন, অথচ কেউ দরজা খোলেননি। সন্তান কোলে নিয়ে পুড়তে পুড়তে শেষ হয়ে গেছে দম।

কেমন একটা সময়ে বাস করছি আমরা! শুধু নিজে ভালো থাকার জন্য আমাদের প্রাণান্ত চেষ্টা। ঘর থেকে বের হলে প্রতিদিন মনে হয় এই শহরটা একটু একটু করে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। একই এলাকা তো দূরের কথা, একই বিল্ডিংয়ের কারও চেহারাটাও কেউ ঠিকমতো দেখি না।

আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। একবার হলো কি, ক্লাস শেষে সবাই বাড়ি ফিরছি। তখন সবেমাত্র বাচ্চাদের জন্য স্টিলের ব্যাগ বাজারে এসেছে। দু-একজন বন্ধু এরই মধ্যে কিনে ফেলেছে। একদিন আব্বাকে বললাম, আমাকেও একটা ওই রকম ব্যাগ কিনে দিতে হবে। সেদিনই আব্বা কোথা থেকে জানি একটা টিনের ট্রাঙ্ক আনলেন। দেখতে স্কুলব্যাগের মতোই। আমি আর আমার সেজ বোন মিলে ওটাকে রঙ করলাম। সাদা রঙ। যা দারুণ একখানা ব্যাগ হয়েছিল! সবার থেকে আলাদা। আমার এমন অদ্ভুত ব্যাগ নিয়ে কেউ কোনোদিন হাসাহাসি করেনি। ওই বয়সে স্কুলবুলিং কী জিনিস, তা কোনোদিন জানতে পারিনি। তার একটা প্রধান কারণ হতে পারে একই পাড়ার স্কুলপড়ুয়া প্রত্যেকটা পরিবারের সঙ্গে প্রত্যেকের দারুণ সম্পর্ক। কি হিন্দু, কি মুসলিম, কি খ্রিস্টান, কি ধনী, কি গরিব- কারও নামেই বাপ-চাচাদের মুখে খিস্তিখেউড় করতে শুনিনি। পাড়ায় পূজা হলে সেই লাড্ডু যেমন খেয়েছি, তেমনি ঈদের পায়েসটাও রান্না করে ওদের বাড়িতে সবার আগে নিয়ে গিয়েছি। আর যদিও বা কোনো শিশু কাউকে কিছু বলেছে, পরিবারে পরিবারে তার একটা মীমাংসা হয়ে যেত। মোদ্দাকথা, সেই সময়ে পাড়াগুলো একটা কমিউনিটি সিস্টেমের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতো।

ওই দেখো, কী কথা বলতে কোথায় চলে গেছি। যা বলছিলাম। ওই স্কুলব্যাগের মতোন দেখতে আমার ট্রাঙ্ক নিয়ে একদিন বাড়ি ফিরছি। সেদিন উমার মা আমাদের জন্য কলা পাঠিয়েছিল। একেবারে গাছপাকা কলা। তাই খেতে খেতে ফিরছি। এমন সময় কোথা থেকে এক দঙ্গল বানর এসে হাজির। ব্যাগ ফেলে সবাই পড়িমরি দৌড়। আমাদের সুরুজ চাচা ব্যাগগুলো পড়ে থাকতে দেখে সবার ব্যাগ বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তখন ব্যাগ নিয়ে একটুও ভাবিনি। কিন্তু এখন ভাবি, সম্পর্কের হৃদ্যতা কতটা গভীর হলে, কোনটা কার ব্যাগ সুরুজ চাচা তা ঠিকই চিনে নিয়েছিল!

একবার বরফ-পানি খেলতে গিয়ে আমার সঙ্গে ধাক্কা লেগে তানভীরের ছোট বোনের একটা দাঁত গেল ভেঙে। সেই খবর পেয়ে আম্মা আমাকে টানা ১৫ দিন দুপুরবেলা শুধু লবণ দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিলেন। আমার পাতের মাছ, ডিম আমার সেজ বোনটাকে দিয়ে দিতেন। তানভীরের মা এসে আমার সেই শাস্তি মওকুফ করিয়েছিলেন। আর এখন? দশটা না, পাঁচটা না একটা মাত্র সন্তান আমার। কলিজার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখি। অপরাধের শাস্তি তো দূরের কথা, সন্তান ভাত একটু বেশি খেলে আনন্দে কেঁদেই ফেলি। ভাইবোন বেশি ছিল বলেই একাকিত্ব কী জিনিস, তা তখন বুঝিনি। পাড়া-মহল্লায় সকলের প্রতি সকলের ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল বলেই আমাদের স্কুলের যাওয়ার পথ কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে আমার আম্মার কোনোদিন ভাবতে হয়নি।

টিপুদের মাঠ নামে আমাদের পাড়ায় বিশাল এক খেলার মাঠ ছিল। এখন আর নেই। মাঠের পাশে একখানা হিন্দুবাড়ি, তারপরই আমাদের ঘরটা। বিকেল হলেই হিন্দুবাড়ির দেয়াল টপকে খেলার মাঠে চলে আসতাম। সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত বরফ-পানি আর চোর-পুলিশ চলতেই থাকত। এখন ছেলেমেয়েরা একা একা মাঠে যাবে! অন্যের সন্তান পড়ল কি মরল, কে-ই বা রাখে তার খবর! সকলেই 'চাচা আপন পরান বাঁচা' ভেবে জীবন পার করে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি তো খোলা আকাশ দেখে বড় হতে পেরেছিলাম; কিন্তু আমাদের সন্তানরা আকাশ কোথায় পাবে? ঘরের জানালা দিয়ে কতটুকুন আকাশই বা দেখা যায়! কুয়ার ব্যাং কুয়াটাকেই তো সারাজীবন পৃথিবী বলে ধরে নেয়। আচ্ছা, কুয়ার ব্যাং কি কখনও জানতে পারে পৃথিবীটা কত বড়?

১০০% গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আজ আমরা নগরে, কি গ্রামে যে ভয়াবহ রকমের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছি, আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ে তেমনটা কখনই বোধ করিনি। দিন যত যাচ্ছে হত্যা, গুম, মাদক, পর্নোগ্রাফি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ- এই অনভ্যস্ত শব্দগুলোই খুব স্বাভাবিক হয়ে মস্তিস্কে গেঁথে যাচ্ছে। আমরা কেমন অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছি। গরুর দুধে অ্যান্টিবায়োটিক, মাছ-মাংসে ফরমালিন, চালে ভেজাল, হলুদ-মরিচ-তেলেও ভেজাল, তবু কেমন নির্বিকার আমরা। আমার মা মুরগি পালতেন। ঘরের পাশে ছিল লাউ আর ধুন্ধুলের মাচা। আমার বান্ধবী শিল্পী, ওর মা পালতেন গরু আর ছাগল। উমার মা পালতেন হাঁস-মুরগি দুটোই। ঝন্টুর মায়ের ছিল ২২ জোড়া কবুতর। ঘরের পাশে অল্পবিস্তর যতটুকু জায়গা থাকত শাকসবজি কিংবা ফুলের গাছ থাকত ততটুকুতে। খুব সুন্দর বিনিময়প্রথা ছিল আমাদের পাড়াতো মা-চাচিদের মধ্যে। দুই জোড়া কবুতরের বাচ্চা দিয়ে বালতি ভরে দুধ নিয়ে যাচ্ছেন, সঙ্গে দুইটা মানকচু। এখন আর কেউ একফোঁটা খালি জায়গা ফেলে রাখে না। যদিও বা থাকে, তাহলে সেখানে দেখা যাবে ফ্লেক্সিলোডের দোকান অথবা ফাস্টফুডের দোকান। মানুষ আর অল্পতে তুষ্ট নেই, যেমনটা ছিলেন সুরুজ কাকা। অনেক অনেক বেশি চাই সবার। পাড়াতো চাচিদের দেখেছি শাড়ি পুরনো হয়ে গেলে মনুর মাকে দিয়ে আসত। মনুর মা সেই শাড়ি দিয়ে কাঁথা বানিয়ে বিক্রি করত। আর এখন কেউ কাউকে কিছু ফ্রিতে দেয় না। ভাবে, পুরনো শাড়িটা ১০০ টাকায় বেচতে পারলে ১০০ টাকাই তো লাভ! কালীর বাজারে বিশাল ওষুধের দোকান। হুট করে কেউ অসুস্থ হয়ে খবর দিলে দোকানের ডাক্তার ওষুধ নিয়ে নিজেই বাড়ি চলে আসতেন। এই দৃশ্য আমি কত দেখেছি। কোনো দিন মনে হয়নি তো, বাড়তি লাভের আশায় ডাক্তার বেশি ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। আর এখন ডাক্তারকে মনে হয় কসাই, আর ফার্মেসিতে বসে আছে যেন এক একটা যমদূত। নকল আর মেয়াদ ফুরানো ওষুধ দিতে তাদের হাত একটুও কাঁপে না। কে বাঁচল, কে মরল তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না। কারণ, এইখানে কেউ কাউকে চেনে না। কেউই কারও আত্মার আত্মীয় নয়।

আমাদের পাড়ায় একখানা প্রাইমারি স্কুল আর দুইখানা মসজিদ ছিল। সব মসজিদেই একজন বড় হুজুর আর একজন ছোট হুজুর থাকতেন। স্কুলের আগে আমাদের মসজিদে যেতে হতো। এক দঙ্গল পোলাপান। এটা একটা কমন দৃশ্য ছিল, ভোর হলে এক একটা ঘর থেকে পোলাপান বের হচ্ছে আর ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে মসজিদে যাচ্ছে। পোলাপানগুলো ছিল এক্কেবারে বদের হাড্ডি। আমাদের বড় হুজুর রেগে গেলে খুব মুখ খারাপ করতেন। আমরা তখন জোরে জোরে আলিফ-লাম-মিম পড়তে থাকতাম। থাকে না কয়েকটা বদমায়েশ পোলাপান, হুজুরের গালিগুলোকে ওই রকম পোলাপান সুর দিয়ে তিলাওয়াত করে পড়তে থাকত। এইটা একদিন ছোট হুজুর ধরে ফেললেন। তারপর সবগুলারে সেই রকমের প্যাদানি! পাক্কা একদিন লেগেছিল পিঠ সোজা হতে।

আরবি পড়া শেষ হলে বাড়ির পথ ধরে হাঁটা ধরতাম, বড়জোর তিন মিনিটের পথ, সেই পথেই কোনো চাচি হয়তো গাছের একট কুমড়া অথবা সজনে আম্মার জন্য দিয়ে দিত। আম্মা আবার সেই কুমড়া, সজনে রান্না করে গরম গরম বাটিভরে ওই পাড়াতো চাচির বাসায় দিয়ে আসতেন। আহা, সেইসব হিরণ্ময় পাড়াতোপ্রেম-ভালোবাসা আমি এখন অন্তরে অনুভব করি।

আফসোস, আমাদের পাড়ায় কোনো সিনেমা হল ছিল না। ১০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে যেতাম মেট্রো সিনেমা হলে। হলের পরিবেশ যে খুব একটা ভালো ছিল, তেমন নয়। তবু সিনেমা দেখতাম আগ্রহ ভরে। লুকিয়ে লুকিয়ে যেতাম, কিন্তু বাসা পর্যন্ত খবর চলেই আসত। সুতরাং লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া অথবা স্কুল পালানো, ধরা খেতেই হতো।

পাড়ার জ্যাঠা, মামা, কাকা, চাচা, মেসো, খুড়া কারও চোখই ফাঁকি দেওয়ার জো ছিল না। তাই বলে কেউ প্রেম করেনি? করেছে, একশ'বার করেছে। তবে সম্পর্ক কাটাপ হলে ফিল্মি কায়দায়, ৩০ কি ৪০ জন চেলাপেলা নিয়া গার্লফ্রেন্ডকে শায়েস্তা করবে বা গার্লফ্রেন্ডের নতুন প্রেমিককে মেরে যাবে, তেমনটা হতো না। এলাকায় একে অন্যের সঙ্গে যে বাঁধন ছিল, তাতে প্রাক্তন প্রেমিক হলিউড মুভি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মারদাঙ্গা কিছু করবে, তার সুযোগই ছিল না। মুরব্বিরা একটা কথাই বলতেন, 'কোনো রকমের বাঁদরামি বরদাশত হইব না কিন্তু। যা করবা এলাকার বাইরে গিয়া করো।' অথচ এই সময়ে, পত্রিকা খুলেই, এই রকমের কতশত ঘটনা পড়তে হচ্ছে প্রতিদিন।

বুঝলেন, বছরে দু-একবার আমি এলাকাতেই হারিয়ে যেতাম। কেউ খুঁজে পেত না। আমিও বুঝতে পারতাম না যে কোথায় হারালাম। এলাকা যদিও খুব ছোট, আমি মানুষটাও তো খুব ছোট ছিলাম। একবার মনে আছে, আব্বার পেছন পেছন চারারগোপ ঘাটে যেতে যেতে আব্বাকে হারিয়ে ফেললাম। একলা দাঁড়িয়ে আছি, ডানে-বামে কিচ্ছু চিনতে পারছি না। সেদিন এক নরসুন্দর আমাকে আবিস্কার করল-

'তুই ভাটের মাইয়া না?' এইখানে কী করোস? তোর আব্বায় কই?

খুইজ্জা পাই না। হারাইয়া গেসে।

হাতে বিস্কুটের একটা প্যাকেট দিয়ে দোকানে বসিয়ে রাখল। আমি কাঁদছি আর বিস্কুট খাচ্ছি। একসময় আব্বাও এ পথ দিয়েই ফিরেছেন যথারীতি আমাকে সঙ্গে নিয়ে। আব্বা তাকে কোনো রকমের ধন্যবাদ দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি, যেন এইটা সেই নরসুন্দরের দায়িত্বই ছিল। আর একবার হলো কি, আমাদের পাশের মহল্লায় পূজামণ্ডপ দেখতে দেখতে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। এই স্বর্ণপট্টির পূজামণ্ডপ অত্র এলাকার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মণ্ডপ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে দেখতে। তো, পূজা দেখতে দেখতে হারিয়ে গেলাম। পাড়াতো এক জ্যাঠা আমাকে বাড়ি দিয়ে গেল। কই, মনে তো পড়ে না, ষাটোর্ধ্ব পুরুষের হাতে পাঁচ/ছয় বছরের বাচ্চার ধর্ষণের খবর তখন শুনেছি। সম্পর্কগুলো শুধুই নামকাওয়াস্তে ছিল না। তখন সম্পর্ক দিয়েই সম্পর্কের মান রাখা হতো।

এখন ইন্টারনেটের যুগ। মুক্ত-আকাশ যুগ। তা দিয়ে আবাধ যৌনাচার দর্শন। ঐন্দ্রজালিক বক্স সবার হাতে হাতে। সুইচ টিপলেই সবকিছু হাতের মুঠোয়। যে শিশুরা ফুলের মতো নিষ্পাপ ছিল, সেই শিশুদের নিয়েই তৈরি হচ্ছে পর্নোগ্রাফি! বৃদ্ধ থেকে শিশু, সবার হাতে হাতে পর্নো মাদক। যাকে এখন সহজ বা কঠিন কোনো আইন দিয়েই রোধ করা যাচ্ছে না। মানবের তরে মানবের যে প্রেমের সম্পর্ক, যে নৈতিক মূল্যবোধ তার ভাঙন শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।

পুঁজিবাদ, ভোগবাদ, বিশ্বায়ন, মুক্ত-আকাশ বাণিজ্য আমাদের সুন্দর কাঠামোগুলোকে চুরমার করে দিচ্ছে। ভোগ, এর মানে তো যুদ্ধ। অন্যের ভাগেরটা নিজের করে নাও, প্রতিযোগিতায় নামো। ভাইয়ের সঙ্গে ভাই, প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশী, এক পাড়ার সঙ্গে অন্য পাড়া। একান্ত ঘনিষ্ঠ যে তুমি, সেই তোমার সঙ্গে আমার যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তার শুরুও তো এখান থেকেই। এই ভোগবাদ, আমাদের মগজে ঢুকে ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করছে। ফলে বাই প্রডাক্ট তোমার আমার যৌথ যে ফসল, সেও তো ওই একই লক্ষ্যে এগোবে। তাই নয় কি?

নগরায়ণের নামে মাঠ, নদী ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও দম ফেলার এক টুকরো ফাঁকা জায়গা নেই, দালান আর দালান। বড় পরিবারগুলো ছোট হয়ে গেছে। এখন আর কারও বাড়ির কচুশাক কি একটা লাউশাক অন্য বাড়ি যায় না। দেশি মুরগি, দেশি মাছ, গরুর দুধ সে এখন রূপকথা। সবকিছুই কিনে খেতে হচ্ছে, সবকিছুরই আকাশছোঁয়া দাম। ছোট হয়ে গেছে পরিবার, কিন্তু পরিবারের খরচ তো ছোট হয়নি। সংসারের ঘানি টানতে, বাবা-মা দু'জনেই সমানতালে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে কখন যে কোলের শিশুটাকে চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলছে, তা কেউ টেরও পায় না! পাড়াতো আড্ডা এখন চলে গেছে মেসেঞ্জারে। ছেলেমেয়েদের চোখ মনিটরে বন্দি। হলের মুভি মুঠোফোনে, হলগুলো একে একে বন্ধ। খাবারের অর্ডার নিচ্ছে ফুডপান্ডা। সুরুজ চাচার দোকান আর চলে না। এখন ফ্রিতে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যায় না। অবশ্য পয়সা দিয়ে যে পানি কিনে খাচ্ছি, তার বিশুদ্ধতারও কোনো গ্যারান্টি নেই। নিত্যদিনের তেল-সাবান, শাড়ি-গয়না সব চলে এসেছে অনলাইনে। মানুষ একা মানুষ একা থেকে আরও কত একা হলে সম্বিৎ ফিরে পাবে, কে জানে!

আহা, আমাদের দ্যুতিময় শৈশব আর পাড়ার সেইসব মায়াময় দৃশ্য, কোথায় যে হারাল!


মন্তব্য