মধ্যরাতের হলুদ স্মৃতি

গল্প

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

মধ্যরাতের হলুদ স্মৃতি

  কাজী রাফি

এমন হয়। মাঝে মাঝেই হয়। ঘোরলাগা আঁধারে কুমকুম মুখের উপর ছড়িয়ে পড়া নিজের চুলগুলোর বিস্তার দেখে ভয় পায়। বাইরে ঘন অন্ধকার। আঁধারের ওপাশে ঘন বন, বলয়বিস্তৃত মেঘলা আকাশের সাথে মিশে আছে। প্রকৃতির ভিতরে ঘন আঁধারের বিস্তৃত রূপ দিয়ে স্রষ্টা কেন গড়েছেন নারীকে? ভেতরের এত এত জমে থাকা গল্পরা কুমকুমকে ঘুমাতে দেয় না। উঠে বসে সে। হোস্টেলের এই রুমটায় সে একা কত রাত কাটিয়েছে! অথচ আজকের নিঃসঙ্গতা যেন সবচেয়ে আলাদা। সুরের সব তন্ত্রীতে কষ্টের বাঁশিরা অদ্ভুত এক তান তুলছে। অন্ধকারে নিজেকে দেখতে না পেলেও কুমকুম নিজের শরীরের আলাদা অস্তিত্ব অনুভব করে। আলাদা অঙ্গের একীভূত কষ্টরা কি মৌন মিছিল করে? আশ্চর্য! সেই মৌন মিছিলে, নক্ষত্রখচিত আকাশের আঁধারে কুমকুমের আরো মিশে যেতে মন চাইছে। কেন?

সে জানে না। শুধু জানে ঘরের অন্য প্রান্তের ফ্যানটা থেমে আছে। তিন দিন আগে যে ফ্যানে শিউলির নিথর শরীরটা ঝুলে ছিল। মরে যাবে জেনে মৃত্যুর আগে যে মেয়ে সাজে তার কষ্টকে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করে কুমকুম। হাতড়ে হাতড়ে পানির বোতল খোঁজে সে। ঢকঢক শব্দ তোলা জলেরা নিজের প্রিয় শরীরের কণ্ঠনালী হয়ে কোথায় গিয়ে যেন থেমে যায়। কোথায়? এসব থেমে যাওয়া কি জীবনের থেমে যাওয়ার মতো? শিউলির মতো? কতদিন ধরে, একসাথে তিন বান্ধবীর বাস এই কক্ষে। কত স্মৃতির সাথে! কিন্তু শিউলি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। প্রতিদিন যায় হাসি-ঠাট্টা আর ছুড়ে দেওয়া বুদ্ধিদীপ্ত বাক্যগুলো তিন বান্ধবীকে প্রাণবন্ত করত সে সত্যিই কোথাও নেই? ওই যে শিশির ধোয়া উজ্জ্বল তারারা, অন্ধকার আকাশ থেকে একটু নিচে নেমে আসা জ্বলজ্বল তারা- সেখানেও নেই শিউলি? টেলিভিশন দেখতে দেখতে সেদিন কুমকুম বীভৎস গোলাগুলির দৃশ্য দেখে যখন প্রশ্ন করল,

এত গোলাগুলি শুরু হলো কেন? শিউলি সাথে সাথে উত্তর দিল,

ছবি দেখা ছেড়ে তুই বাথরুমে গেলি। এই ফাঁকে পরিচালক সাহেব রেগে গিয়ে ...গোলাগুলি শুরু করতে বললেন।

হাসিতে হাসিতে নিভাঁজ শরীরে অহংকারী রূপের ভাঁজ তোলা সে-ই শিউলি আর কোথাও নেই? এখন যদি ফিরে এসে অন্ধকারে কুমকুমের পাশে দাঁড়িয়ে যায়; এই মধ্যরাতে, তাহলে কুমকুম কী করবে? না, সে ভয় পাবে না। মৃত শিউলি ওর ভয়ের কারণ নয়। হুতোম পেঁচা ডেকে ওঠে। বাদুড় অন্ধকারে পাখা ঝাপটায়। কুমকুমের যদি অমন একটা পাখনা আর পালক থাকত! কণ্ঠের কাছে ভেজা অনুভূতিগুলো হঠাৎ শুকনা হয়ে দলা পাকিয়ে ওঠে। নবীনবরণের দিনেই ভাগ্যক্রমে এই রুমে ওরা উঠেছিল। শিউলি কুমকুমের হাতে চকলেট দিয়ে বলেছিল,

ওমা, আমার এত সুন্দর রুমমেট? ইস! রুমটা আলোয় ভরে গেল। সুবর্ণা, দ্যাখ কুমকুমের চুলগুলো! যেন চাঁদমুখের পিছনে মেঘের হাট।

সেদিন শিউলির মুখে সুন্দর বিশেষণের এক আলাদা অর্থ তৈরি হয়েছিল। 'সুন্দরী' শব্দের চেয়েও 'সুন্দর' শব্দটায় এত পরিপূর্ণতা কুমকুম আগে কখনোই খেয়াল করেনি। মা-বাবা আর ছোট ভাইকে জীবনে প্রথমবারের মতো ছেড়ে ভেতরের কান্নারা শিউলির স্পর্শে স্থিত হয়েছিল। তারপর তিনটি বছর। মুক্তমঞ্চের সামনে আড্ডা, প্রতিটি বিকেলের আলাদা রঙের খেলায় জীবনের বসন্তগুলোকে চিনতে পারা।

শিউলি যদি বিকেলের হলদে রোদ গায়ে মেখে ঘর আলো করে হঠাৎ এসে পাশে দাঁড়িয়ে যায়? কুমকুম কি ওর চেহারায় ভৌতিক কিছু দেখবে? মনে হবে কি, শিউলির চোখগুলো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে? এখনই বের করবে ড্রাকুলার মতো রক্তচোষা দুই পাটি দাঁত? না। কুমকুম এসব ভাবনাতে মোটেও ভয় পাচ্ছে না। পর্দাটা সরিয়ে দেয় সে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আকাশের মিটিমিটি জ্বলা তারাগুলোর দিকে। মনে পড়ে শিউলির সাথে অন্ধকারে বসে তারা দেখা সেই রাত তাদের শেষ কথা বলা রাত-

দ্যাখ কুমকুম, তারাগুলো যেন কী বলতে চায়! বৃষ্টিভেজা এই তারারা আমরা হারিয়ে যাবার পরও এমনি থাকবে, তাই না? যেন কথা বলার জন্য ব্যাকুল।

শিউলি, তুই কবিতা লিখলেই পারিস।

আমার মনের কথারা তোর সাথে যত সহজ, শব্দের সাথে তত নয়। চেষ্টা করিনি বললে ভুল হবে। আমার কবি মন! কাগজ-কলমের চেয়ে তোর মতো বন্ধুর কাছে বেশি তরল।

শিউলি?

বল।

আমার মনে হয়, বাবা-মা'র কাছে সারাজীবনের জন্য অতিথি হয়ে গেলাম। এখন যাই ছুটিতে, কিছুদিন পর, বরের বাড়ি থেকে যেতে হবে কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে। ছেলেগুলোর কত সুবিধা আর স্বাধীনতা!

ওই সুবিধার জন্যই ছেলেরা মা-বাবাকে হয়তো আমাদের মতো করে বোঝে না। বুঝতে চায়ও না। কী জানি, হয়তো বোঝে। আচ্ছা কুমকুম, তুই কারো প্রেমে পড়িসনি এখনো?

পাগল! আজকাল ছেলেদের মাথার ডিজিটে কি আর প্রেম শব্দ আছে?

তবে?

প্রেমের চেয়ে বিছানা ওদের প্রিয় শব্দ।

তুই জানলি কীভাবে?

দু'জনের সাথে একটু ভাব হয়েছিল। কয়েক দিন যেতে না যেতেই। শুনিনি। আমাদের মননের আগে মননহীনতা দৌড়াচ্ছে। কী আর করা। আর তাই সম্পর্ক ভেঙে গেল। প্রতিজ্ঞা করেছি- আর নয়।

এ এক মৃত সময়। মরা সময়ে বেঁচে থাকার কী মানে? এ জন্য আমার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে।

শিউলির কণ্ঠের দৃঢ় ঘোষণায় চমকে ওঠে কুমকুম। মনোযোগ শিউলির কণ্ঠে নিবন্ধ করে অন্ধকারে শিউলির মুখটা স্পষ্ট করে দেখার চেষ্টা করে। শিউলি বলেই চলে,

কোটি কোটি বছর পরও ঠিক এই সময়ে, এই সেপ্টেম্ব্বরে, তারাগুলো আকাশের এই স্থানটাতে থাকবে। ছেলেগুলো মানুষ হলে এই ছোট্ট সত্যিটুকু বুঝত।

শিউলি, ওরা মানুষ নয় তো কী?

জানি না। তবে সেই রকম মানুষ, যাদের কথা মনে হলে ঘৃণায় গা রি রি করে। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না।

তুই মনে হয় বেশি বলছিস। কুমকুমের মুখের কথা কেড়ে নেয় শিউলি। বর্শাবিদ্ধ বাঘিনীর মতো বলে,

গলাকাটা, ধর্ষিতা রাহেলারা এখানে তিন দিন নয়, শত শত দিন ঘড়ঘড় শব্দ করে। আর ওই বিশ্রী তারাগুলো চেয়ে চেয়ে দেখে। আমার এসব একদম সহ্য হয় না।

২.

অলস ভঙ্গিতে শিউলি বলে,

যাকে ভালোবাসি, সে ভাগ্যিস দেশে নেই।

শাওন দেশে থাকলে কী এমন সমস্যা হতো?

নিজেকে সামলাতে পারতাম না। পড়াশুনা ছেড়ে হয়তো দৌড়ে গিয়ে বলতাম, আমাকে বিয়ে করো।

কী পাগল!

হ্যাঁ, কুমকুম। দূরত্ব মনে হয় ভালোবাসা বাড়ায়। তা ছাড়া আমাদের দু'পরিবার আমাদের সম্পর্কটাকে সহজভাবে দেখে।

শাওন ভাইয়া তো অনেক ভালো ছেলে। কেমন নিরীহ! স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে পড়াশুনা করছে। আর তুই-ও শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্রী। সুন্দরী, লক্ষ্মী মেয়ে। ইস! ব্যাপারটা কেমন মধুর আর কষ্টের। স্বপ্নের কোনো হানিমুনে, দূরের বরফ-পাহাড়ে যাওয়ার ট্রেনের টিকিট হাতে পেয়ে স্টেশনে ট্রেনের জন্য অথবা বিমানবন্দরে যেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করা। তা-ও একা একা।

অনুভূতিগুলো তুই এত ভালো বুঝিস! সে জন্যই তুই আমার প্রিয় বান্ধবী।

কবে ফিরবে শাওন ভাইয়া?

আর সাতটা মাস। উফ্‌; এক একটা দিন যেন এক এক যুগ!

এত ছটফট অনুভব নিয়ে তুই এত গুছিয়ে পড়াশুনা করিস কীভাবে?

পড়া শেষ হওয়ার আগেই তো আমার বিয়ে হবে। তারপর ডাব্বা মারি কি-না, কে জানে! সাত মাস পর ওর বউ হবো- ভাবতেই কেমন যে লাগে!

কথা শেষ হওয়ার আগেই শিউলি কথা হারিয়ে ফেলে। বুকের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে একরাশ লজ্জা মেশানো উদ্বেগের বজ্রপাত হয়। কুমকুম সে লজ্জাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। শিউলির বুকে হাত রেখে বলে,

ওমা, এখনই তোর এই অবস্থা? প্রিয় মানুষটা সামনে এলে তো তুই অজ্ঞান হয়ে যাবি।



সে-ই শিউলি! আর কোথাও নেই? পৃথিবী নামক গ্রহের ঘূর্ণনের জন্য অথবা মহাবিশ্বের অন্তহীন ছুটে চলার জন্য, সপ্তর্ষীমণ্ডল তার অবস্থান বদলে কুমকুমের চোখের আড়াল হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে ফ্যানটার ঘূর্ণন সেই আড়াল শব্দকে আরো লুকিয়ে ফেলছে। কুমকুমের হঠাৎ মনে হয়, গাছটার আড়ালে অদৃশ্য হলো তিনটা ছায়ামূর্তি। তাদের একজন নারী বুঝি? শিউলি কি তিনটা ছায়ামূর্তির একটা?

তুমি কত বাজে কুমকুম! এমন ভাবনায় কত পাপ হয়!

আঁধারের কানে ফিসফিস করে নিজেকে বলা নিজের কথাগুলো হারিয়ে যায়। হঠাৎ এক রাগিণীর তান ভেসে আসে কুমকুমের কানে। শরীরের সব লোম এক সাথে সে তানের বিরুদ্ধে সজাগ হয়। কুমকুমের মনে হয়, অসংখ্য শিউলির ছায়ামূর্তিরা বেহালায় মৃদু-মগ্ন সুর তুলে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে! ভেসে ভেসে তারা ছাতিম গাছ পর্যন্ত গিয়েই একটা করে বেহালা হাতে নিচ্ছে। ছাতিম গাছের ঘন-পাতারা এক একটা বেহালায় পরিণত হয়েছে। সেদিন যেন ছাত্রনেতা বক্তৃতার ধোঁয়া তুলল, সে যেন বেহালাগুলো বিতরণ করছে।

কুমকুম কাঁধে ব্যথা অনুভব করে। বাঁকা হয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা থেকে মুক্তি পেতে চায় সে। কাঁধ সোজা করার চেষ্টা করতে গিয়েও পারে না। স্নায়ুর অনুভূতি আর সব শক্তি কে যেন কেড়ে নিয়েছে!

৩.

চিৎকার করতে গিয়েও ঠোঁট সরে না।

'দ্যাখ কুমকুম, তারাগুলো কী যেন বলতে চায়'-

কিন্তু তারাগুলো কোথায়? শেষ-রাতের আঁধারকে প্রায় তাড়িয়ে দিয়ে ছাতিম গাছের পাতাগুলোর ঘন-সন্নিবেশ স্পষ্ট করছে ভোরের আলো। একটা পাখি পাখা ঝাপটায়। আলো-আঁধারির অযুত বিন্যাসে ঘুম-পরীরা সারারাতের গান শেষে যেন ফিরে যাচ্ছে স্বপ্নহীন বাস্তবে। দ্রুত আড়মোড়া ভেঙে নিজেরই শরীরকে বিছানায় টেনে ফেলে দেয় কুমকুম। মাত্রই বিদ্যুৎ চলে গেল। ফ্যানের পাখাগুলো তাদের একক অস্তিত্বে দাঁড়িয়ে যায়।

পাশের শিউলির বিছানাটা খালি। আসলেই সে কোথাও নেই। কাঁধের ব্যথা স্থির হয়ে যায়। কুমকুমের চিত্রকল্পগুলো অমসৃণ, ভূমিদৃশ্যে আটকে থাকা মেঘ আর পাহাড়ের অকপট অবস্থান যেন। শিউলিকে ঘিরে স্মৃতিগুলো ভোর ভোর ঘোরের ভেতরে বাক্যের ক্রিয়াপদের সাথে দূরত্ব তৈরি করে। যেন মনে মনে সে দিনলিপির পাতায় লিখছে-

ভোর হতেই খালি পায়ে হাঁটতে বের হয়েছে শিউলি। ছাত্রীনিবাস জীবনের শুরু থেকেই ওর এই অভ্যাস। গ্রামের প্রকৃতির কোলে কেটেছে ওর জীবন। সেই জীবনের স্মৃতির মেলবন্ধন হলো এই খালি পায়ে হাঁটা। সবুজ ঘাসের ওপর পা ফেলে ফেলে সে আসলে মধুর কোনো স্মৃতিকেই যেন আদর করতে থাকে। সেসব স্মৃতির মাঝে যে সে ফেলে রেখেছে তার জীবনের ভালোবাসা, তা শিউলির মুখ দেখলেই যে কেউ বুঝে নিতে পারে। কোলভর্তি ফুল কুড়িয়ে হাসিমুখে সে বিজয়ীর বেশে এই কক্ষে ফিরছে। উচ্ছল, প্রাণবন্ত শিউলির কাছ থেকে প্রেরণা ধার করা সময়গুলো আমাদের অন্তর ধুয়ে দেয়। কিছুদিন পরই আমাদের এক বান্ধবী তাকে সাবধান করল,

এত সকালে বন-জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো। ছলছল হেসে শিউলি তাকে বলেছিল,

ওমা! এসব গাছ-জঙ্গলে বুঝি বাঘ আছে? সাপকে অবশ্য আমি ভয় পাই। তবু, এটা তো আমার ছোটবেলার অভ্যাস! ঘাসে পা না রাখলে আমার পায়ের তলা জ্বলে যায় রে। তোরা আমাকে ভয় দেখাস না, প্লিজ।

বিয়ে হলে যখন ফ্ল্যাটে বন্দি হয়ে পড়বি?

বিয়েই করব না তাহলে। আমার পৃথিবী এত ছোট হোক- আমি তা চাই না।

শিউলির ভাব-বিলাসিতায় বান্ধবীরা হাসে। একদিন ভোরে শিউলি প্রায় পাগলের মতো ছুটে আসে। যেন তার বুকভরা আর্তনাদ ভিতরে গুমরে উঠছে অথচ সে চিৎকার করতে পারছে না।

শিউলিকে কি কেউ তাড়া করেছিল? ঘাস আর শিশিরভেজা শরীরটাকে ওমন করে কাপড়ের মতো ছিঁড়ে ফেলতে কেন চাইছিল সে? শরীর কি আত্মার খোলসমাত্র? শিউলি কি অদ্ভুত উল্টা ভাবনায় আত্মার কাছ থেকে শরীরকে প্রাণপণে সরাতে চাইছিল! পারেনি বলেই কি শরীরকে ওভাবে ফ্যানে ঝুলিয়ে...

কিন্তু সে রাতে ঘুমের ঘোরে শিউলি বারবার কেন 'রাহেলা' 'রাহেলা' করেছিল? তার উত্তরটা লিখে রেখে গিয়েছিল শিউলি। কুমকুমের পড়ার টেবিলে অর্ধসমাপ্ত উপন্যাসের পাতার ভাঁজে। জীবনের শেষ সময়ে প্রিয় বান্ধবীকে ভালোবাসা জানাতে মোটেও ভোলেনি সে। ভাঁজ করা চিঠির ফাঁকে চার রঙের চারটি গোলাপ আর হৃদয় নিংড়ানো অস্ম্ফুট অভিব্যক্তি-

"একটা লাশ আর কতজনকে লাশ বানায় আমরা কি তা জানি? রাহেলা জীবন্মৃত এক লাশই ছিল। দৌড়ে বাঁচতে গিয়ে তার শরীরে পা লেগে পড়ে গেলাম। আর সেখানেই লম্পটগুলো আমাকে-। ওদের মুখেই নামটি শুনেছি।

'রাহেলা এখনো বেঁচে আছে? মাগিকে কেটে ফেল!'

আমার জীবন নিয়ে কষ্ট অথবা দুঃখ কোনোটাই তেমন নেই। শুধু জানলাম না, পাপ নিয়ে টানাহেঁচড়া কারা করে? ওরা কি বহিরাগত, না আমাদেরই কারো সতীর্থ? যারা দোষ অথবা পাপ করে তারাই বড় গলায় দোষগুলো ছড়িয়ে দেয় সমগ্র বাংলায়। তোর জন্য বসে থাকব অপারে। মৃত্যুপারে মনে হয় ফুল পাব না। তাই তোর পড়া উপন্যাসের পাতার ভাঁজে আমি ফুল হয়ে থাকলাম। ভালো থাকিস রে কুমু। তোকে আমি অনেক ভালোবাসি।''

ধর্ষিত গলাকাটা এবং পাতার স্তূপের ভেতরে জীবন্মৃত সেই রাহেলা। ক্রিয়াপদগুলো দিনলিপির পাতা থেকে মনের পাতায় আশ্রয় নেয়। ক্রমশ সুর হয়ে উঠতে থাকে-

তুমি নেই! এই আঁধার নামা সন্ধ্যায় তুমি নেই,

মিশে গেছ তারাদের ভিড়ে, ফেলে আমায় মরমে

কেন নেই? তুমি নেই, তুমি নেই, কেন নেই?

তোমার কণ্ঠ রয়েছে বাতাসে, সুর রয়েছে প্রাণে

শুধু তুমি নেই। নেই! কেন নেই? কেন নেই?

সুরগুলো দূরাগত আভাসের মতো মিলিয়ে যায় বাতাসে। কুমকুম বালিশটা মাথার নিচে টেনে নেয়। চুলগুলো বুকের উপর বিছিয়ে দিয়ে ঘুম-ঘুম চেতনায় ভাসা ভাসা কোনো এক অস্তিত্বকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। অস্তিত্ব ভেঙে ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবচ্ছেদিত বাক্য হয়ে যায়-

ঝিঁঝিঁ ডাকা বন। শিউলি। বৃষ্টিভেজা রাত। চুপচাপ। মোমবাতির নীলাভ অবনমন। স্বপ্ন, শিউলির মোম-আলোর মুখ। ঝরে পড়া ফুল। ভোর, একা-একা, চুপ-চুপ। বন। নির্জন, ধর্ষণ। রাহেলা, নিথর। পাতার মর্মর, পত্রিকার খবর। গলা কাটার পরও ষাট ঘণ্টা ধরে ধর্ষিতা রাহেলার বেঁচে থাকা। ১৪ দিন পর রাহেলার মৃত্যুবরণ। দৌড়। শিউলি! রাহেলার শরীরে ধাক্কা খাওয়া। তারপর? পাতার স্তূপ, শিউলির কুমারী রক্ত। রক্তাক্ত শুকনা পাতা। কনের সাজে শিউলি। স্বপ্নযৌবন-আত্মহত্যা। সমাজ, মিডিয়া। শিক্ষক, প্রলোভন, সেঞ্চুরিয়ান। আবার বৃষ্টি, ফাগুন, রঙ। শিউলির চিঠি। মা লিখছেন। 'পড়া শেষ করে শাওন ফিরেছে। সামনের ছুটিতে তোদের ধুমধাম করে বিয়ে দেবো।' চুপ-চুপ, অনন্ত জীবন। শিউলি বলল, ছোটবেলায় ঘুড়ি উড়িয়েছিলাম একবার। শাওনের সাথে। দিগন্তজোড়া এক মাঠের শুরুতে। শাওন শিউলির চোখে চোখ রাখল। আনন্দ-লজ্জায় লাল-নীল শিউলি। কবিতা।

চোখের তলায় খুশির কাঁপন। অতল। শিক্ষক বললেন, দেশটা কোথায় যাচ্ছে? বাবা বলছেন, কবে আসবি মা? শিউলির মা রিকশা থামালেন। নিউমার্কেট। বিয়ের গহনা, কনে শিউলি! বাবা। ছোট্ট শিউলি। বিয়ের গাড়ি, শিউলি কাঁদছে। সুখের কান্না। শাওন লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে। চুপচাপ। তারপর আকাশের নিচ। একটা কবর। এলোমেলো বাতাস। জোছনা রাত। চুপচাপ। অনন্তকাল।



মধ্যরাতের হলুদ স্মৃতির অতলে লুকিয়ে থাকা রাতের হৃদয় কুমকুমের শ্রান্ত মুখে নিঃসঙ্গ-ক্লান্তির ছাপ এঁকে দিয়েছে।

ঘুমিয়ে পড়েছে কুমকুম।


মন্তব্য