প্রকৃতি মগ্নতার ছাপাই ছবি

প্রদর্শনী

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

প্রকৃতি মগ্নতার ছাপাই ছবি

চিত্রকর্ম ::ফারজানা রহমান ববি

  দীপংকর বৈরাগী

শিল্পী ফারজানা রহমান ববির একক ছাপচিত্র প্রদর্শনী 'দ্য সউল অব দ্য সয়েল' আয়োজিত হয়ে গেল রাজধানীর লালমাটিয়ার শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে। সাদাকালো নির্ভরতায় অর্গানিক ফর্মে শিল্পী নির্মাণ করেছেন তার এ প্রদর্শনীর ছাপচিত্রকর্মগুলোকে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল ফারজানা রহমান ববির করা ছোট-বড় মোট ৭৩টি ছাপচিত্রকর্ম।

ছাপের মাধ্যমে শিল্পকর্ম তৈরির একটি প্রক্রিয়া বা মাধ্যমই হলো ছাপচিত্র। প্রথম ছাপচিত্রের প্রয়োজনটা বোঝা যায় আদিম যুগ থেকেই, মানুষ যখন গুহার দেয়ালে দেয়ালে তাদের প্রয়োজনেই হাতের ছাপ রাখল। পরে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হতে থাকল। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন উপাত্তের ভেতর এটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলো এবং তা ধীরে ধীরে শিল্পকলার জগতেও শক্তিশালী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার দাবি নিয়ে শিল্পীদের হাতে প্রকাশ পেল।

প্রিন্টমেকিংয়ের চারটি প্রধান মাধ্যম হলো- রিলিফ প্রসেস, ইন্টাগ্লিও প্রসেস, প্লেনোগ্রাফিক প্রসেস ও স্টেনসিল প্রসেস। এই সবগুলো প্রসেস বা পদ্ধতিই প্রথমে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের হাত ধরে বা বাণিজ্যের প্রয়োজনে তৈরি ও বিকাশলাভ করে। পরবর্তীতে তা শিল্পীদের করণ কৌশলের মধ্য দিয়ে শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।

ছাপ বা ছাপা- এমন এক প্রকাশমাধ্যম যা পৃথিবীতে শিল্পচিন্তা বা শিল্পের ধারণা সৃষ্টিরও আগে থেকে মানুষের সমাজে আবির্ভূত। বর্তমান শিল্পসচেতন বিশ্বে যা ছাপচিত্র বা প্রিন্টমেকিং বা ছাপাই ছবি এমন নানা নামে শিল্পকলা ও এর চর্চার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু চারুকলার বিভাগীয় চর্চায় তুলনামূলক গুরুত্বের দিক দিয়ে এই ছাপচিত্রের অবস্থান-বাস্তবতা আজ কীরূপ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তা বুঝতে হলে যেমন চারুকলার তুলনামূলক আলোচনা পর্যালোচনার দরকার, তেমনি দরকার ইতিহাসের নিরিখে ছাপচিত্রের আবির্ভাব এবং এর ক্রমবিবর্তনের পথে কী কী সংযোজন-বিয়োজন রূপান্তর ঘটে গিয়ে ছাপচিত্রকলা বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তা বিশ্নেষণ করা।

চিত্রকলার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সময়ের প্রয়োজনেই ছাপাই ছবির সূচনা। ছাপচিত্র সূচনার সঠিক সন্ধান উদ্ঘাটিত না হলেও ধারণা করা হয় যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাবাসী মানব হাতের ছাপ থেকেই ছাপচিত্র ভাবনার শুরু।

পর্তুগিজদের হাত ধরে এ উপমহাদেশে প্রথম মুদ্রণশিল্পের আবির্ভাব হলেও ব্রিটিশদের ভারত শাসনকালে ছাপাইকর্মের শিল্প সৃষ্টিতে ব্রিটিশরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেখানে কলকাতার পাশাপাশি ঢাকায়ও গড়ে ওঠে উডব্লক-উড এনগ্রেভিং, মেটাল এনগ্রেভিংয়ের প্রাচীনতম ধারা। লিথোগ্রাফের শুভসূচনা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

উপমহাদেশে আধুনিক ছাপচিত্রের ধারাকে নিরীক্ষার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন বহু গুণী শিল্পী। বাংলাদেশে চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় ছাপচিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শুভসূচনা হয় শিল্পগুরু সফিউদ্দিনের হাত ধরে। প্রথম দিকে উডকাট, এনগ্রেভিং দিয়ে শুরু করলেও কালক্রমে এচিং অ্যাকুয়াটেন্ট, লিনোকাট, ড্রাই পয়েন্ট ও লিথোগ্রাফ চর্চার বিস্তৃতি লাভ করে।

আদি থেকে শুরু করে শিল্পীরা প্রকৃতির মধ্য থেকে খুঁজে ফিরেছেন শিল্প সৃষ্টির প্রধান উপাদান। টারনার, রেমব্রান্ট ভ্যানগগ, জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান প্রমুখরা প্রকৃতি মগ্নতায় তাদের শিল্প সৃষ্টিতে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। যার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ তাদের বিখ্যাত সব শিল্পকর্মে।

শিল্পী ফারজানা রহমান ববি তার শিল্পের উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রকৃতিকেই। শিল্পীর প্রকৃতি মগ্নতাই ফুটে উঠেছে তার প্রথম একক ছাপচিত্র প্রদর্শনীতে। ৫ জুলাই শুরু হওয়া প্রদর্শনীতে শিল্পী কয়েকটি পর্বে তার শিল্পকর্মগুলো উপস্থাপন করেছেন।

ট্রি ট্রাংক, ফোলিয়েজ সিরিজের কাজগুলোতে শিল্পী রেখাধর্মিতায় ডিটেইল নির্মাণে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। তিনি প্রকৃতির ছোট ছোট অনুষঙ্গ বৃক্ষ-পত্র, লতাপাতার সমন্বয়ে রেখা ও রঙের বুনটে প্রকৃতির অনুষঙ্গকে নতুন নতুন রূপে উপস্থাপন করেছেন। অর্ধবিমূর্ত এ উপস্থাপনে শিল্পী যেন গতানুগতিক ফর্মকে ভেঙে নতুন ফর্মে শিল্পকর্মগুলোকে শোভিত করতে সচেষ্ট ছিলেন।

'ফোলিয়েজ অন দ্য রক' সিরিজের শিল্পকর্মগুলো মিশ্র মাধ্যমে গড়া, যেখানে শিল্পী চারকোল, পেনসিলসহ ভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে চিত্রে এক ধরনের ইলুশন তৈরি করেছেন। চিত্রপটজুড়ে রঙ, রেখা ও উপস্থাপন ভঙ্গিমায় নিজস্ব ধরন তৈরির প্রবণতা লক্ষণীয়। তার ছাপাই ছবির মূল বিষয় হলো রেখাধর্মিতা ও রঙের পরিশীলিত ব্যবহার। শিল্পী একান্ত অনুভূতি দিয়ে মনের গহিন থেকে শিল্পরস নিঃসরণ করে রচনা করেছেন তার চিত্রপট। শিল্পী ফারজানা রহমান ববি পত্র-পল্লবের রূপান্তরকে তুলে এনেছেন চিত্রপটে, যেখানে ছবির বিষয়ের সঙ্গে ছাপাই ছবির করণকৌশলগত মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পী সবুজপত্র পল্লবের প্রতি ভালোবাসার বোধকে যেন চিত্রপটে পরম মমতা ঢেলে দিয়েছেন। যা দর্শক মননে কখনও কল্পিত রাজ্যে আবার কখন তরু-পল্লবের অনাবিল সৌন্দর্যে অবগাহন করবে।

ফারজানা রহমান ববি চিত্রশিল্পী ও ছাপচিত্রী। কিবরিয়া ছাপচিত্র স্টুডিওতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ছাপচিত্র চর্চা করছেন নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। তারই পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ চলমান এ প্রদর্শনী। লিথোগ্রাফ, এচিংসহ নানা মাধ্যম করণকৌশল ও প্রযুক্তিতে সৃষ্ট ছাপচিত্রের মধ্য দিয়ে মূর্ত করে তুলেছেন বাংলার চিরসবুজ প্রকৃতির বিমূর্ত রূপ।


মন্তব্য