নিজেকে অপমান করতে আপনি যখন বাধ্য

প্রচ্ছদ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

নিজেকে অপমান করতে আপনি যখন বাধ্য

  জাকির তালুকদার

ভোটের সরকারি হিসাব প্রকাশের আগের রাতেই আপনি জেনে যাবেন যে আপনার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। জামানত বাজেয়াপ্ত অনেকেরই হবে, কিন্তু তারা কেউ আপনার মতো এত কম ভোট পাবে না। অর্থাৎ ভোটের সংখ্যাটি আপনার জন্য হয়ে দাঁড়াবে চিরস্থায়ী লজ্জাজনক। আপনি তিন-চার দিন বাড়ি থেকে বেরুতেই চাইবেন না। হয়তো লজ্জায়, হয়তো ক্ষোভে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ হবে আপনার নিজের ওপর। হয়তো মনে পড়বে আপনার পূর্বসূরি, অধুনা আধাপাগল কমরেড আলাউদ্দিনের কথা- শালার ছোটলোকদের জন্য রাজনীতি করতে নেমে জীবনটাই নষ্ট করে ফেললাম। বাজারে বাজারে হাতে একটা ফাটা বাঁশ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আলাউদ্দিনকে মনের চোখে দেখতে পাবেন। কেউ তাকে তার অতীত হঠকারী রাজনীতি নিয়ে কোনো ইঙ্গিত করলেই তিনি বলছেন- বিচার করো, শোধ নাও। এই বাঁশ আমার মাথায় মারো!

আপনি নিজেই মনে মনে শিউরে উঠবেন হয়তো। এই পরিণতি নিজেরও হবে কিনা, ভাববেন খুব গভীরভাবে। আপনি তো শিখেছেন যে জনগণ কখনো ভুল করে না। তাহলে এই ভোটের ব্যাপারটিতে কী ঘটল! আপনার নিজের কথা না হয় আপনি বাদই দেবেন। কিন্তু সারা দেশে আপনার পার্টির এবং সমমনা পার্টির অন্যদের ভোটের ফল তো আপনারই সমানুপাতিক। তাহলে জনগণ! প্রিয় জনগণ! যারা জনগণের শত্রু, যারা শত শত বছর ধরে সাধারণ মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে সর্বাত্মক বাধা দিচ্ছে,তাদেরকেই কেন বার বার ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসায় জনগণ! আপনি ভাবতে থাকবেন নিজেকে নিয়ে। লোকে কি আপনাকে অযোগ্য মনে করে? অসৎ মনে করে?

কিন্তু তা তো নয়! পুরো তল্লাটে যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, সে নিশ্চিত মাথা নেড়ে বলবে, না বাপু; আর যাই কও, মাস্টারের বেটা একটা খাঁটি মানুষ। আর খুব জাননেঅলা। যে কারো বিপদে-আপদে বুক দিয়ে পড়ে।

তাহলে ভোটের বাক্সের হাল এমন হতে থাকবে কেন! হতে থাকবেই কেন!

আপনার তখন নিজেকে স্তোতবাক্য দেওয়ার একটা পথই খোলা থাকবে- সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তা বেশি মানুষ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। সাধারণ মানুষ সবসময় চেনা জীবনেই থাকতে চায়। তাতে সুখ না পাক, মন স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। তারা যে কোনো মৌলিক পরিবর্তনকে ভীতির চোখে দেখে। তখন আপনি অন্য সময়ের মতো আত্মপ্রসাদের ছিটে অনুভব করবেন এই ভেবে যে, আমি গুটিকয়েক অসাধারণের মধ্যে একজন।

তা না হয় পাবেন, কিন্তু জনগণ! তারা কি এভাবেই পড়ে থাকবে তলানিতে, বছরের পর বছর দশকের পর দশক শতকের পর শতক?

আপনার স্ত্রী পর্যন্ত আপনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলবে- তোমার চেষ্টা তো তুমি করেছ। জান-প্রাণ দিয়ে করেছ। নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে করেছ। মানুষ নিজের ভালো নিজে বুঝতে পারছে না, তাতে তোমার তো কোনো দোষ নেই।

কিন্তু আপনার নিজের মনে সান্ত্বনা আসবে না। আপনি এতদিনের রাজনৈতিক শিক্ষাকে এত তাড়াতাড়ি মন থেকে সরিয়ে দিতে পারবেন না। জনগণের সমালোচনা না করে আপনি বারবার আত্মসমালোচনায় প্রবৃত্ত হবেন। জনগণের কাছে বক্তব্য ঠিকভাবে পৌঁছে দিতে না পারার জন্য আপনি নিজেকেই দায়ী করে যেতে থাকবেন। আর বারবার নিজের একেবারে অতীতে সোনালি তারুণ্যে ফিরে যেতে চাইবেন। মনের চোখে দেখতে পাবেন, আপনি প্রথম দিন কলেজে যাচ্ছেন। কলেজে শত শত তরুণ তাজা প্রাণ। জীবনের উচ্ছ্বসিত কোলাহল। বর্ণাঢ্য তারুণ্যের মেলা। তাদের মধ্যেও একজন আপনার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা এনে দেবে। এত জনের মধ্যেও কী অসাধারণ আলাদা সে! বেশ-বাসে সুচারু নয়, বরং কিছুটা অগোছালোই, চোখে চশমার পেছন থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তির তীক্ষষ্ট আভা। সে যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানেই কিঞ্চিৎ হলেও আলোড়ন। তার মতো মেধাবী কেউ আর এযাবৎ এই কলেজে ভর্তি হয়নি। আর কী আশ্চর্য! সে রাজনীতি করে! সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি। আপনি আলোর দিকে ছুটে যাওয়া পতঙ্গের মতো তার প্রতি আকর্ষিত হবেন। আর সে-ও আপনাকে এমনভাবে কাছে টেনে নেবে যেন সে আপনার মতো কোনো একজনের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে আপনার সামনে দিনের পর দিন উন্মোচন করে দিতে থাকবে জীবনযাপনের প্রকৃত অর্থ। আর আপনি দিনে দিনে নিশ্চিত হবেন যে, জীবন ও মানুষের সমাজ মেনে চলে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অমোঘ নিয়ম। যেসব গরিব-গুর্বো সাধারণ মানুষকে আপনি এর আগে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে স্বীকার করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন, তাদের আপনি শ্রদ্ধা করতে শিখবেন। আপনি শিখবেন যে সৎ ও সততা কোনো একটি দিন বা ঘটনার ব্যাপার নয়। সততাকে সার্বক্ষণিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এবং আপনি বাকি জীবনের জন্য প্রতিনিয়ত সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজকে প্রস্তুত করবেন। এবং চারপাশে আপনার কমরেডদের ক্রমান্বয়ে 'প্রাক্তন কমরেড' হয়ে যাওয়ার মিছিলে আপনি যোগ দেবেন না। আপনি সরকারি চাকরি করবেন না। মাল্টিন্যাশনাল রক্তচোষা কোম্পানির চাকরি করবেন না। সুদের জালে একেবারে প্রান্তিক মানুষকে পর্যন্ত প্রায় ক্রীতদাস বানিয়ে ফেলা এনজিওর চাকরি করবেন না। আপনি সারা দেশের মেহনতি মানুষকে না পারেন, নিজের এলাকার মানুষকে মুক্তির পথ দেখাবেন। হয়তো আপনার কর্মএলাকাই একসময় সারা দেশের মুক্তিকামী মানুষের কাছে মডেল হয়ে উঠবে। আপনি তাই আপনার এলাকার বেসরকারি স্কুলে সামান্য বেতনের চাকরি নিয়ে সংগঠনের কাজে মনোনিবেশ করবেন। আপনি ও আপনার পরিবার বিলাসিতা করবে না, অপচয় করবে না; মানুষের পাশে দাঁড়াবে সহানুভূতি নয়, সমানুভূতি নিয়ে। সেভাবেই চলবে বছরের পর বছর। এবং তারপরে আসবে এই ভোট। এবার আপনি নিজেকে কীভাবে বুঝ দেবেন? কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন মানুষের এই প্রত্যাখ্যানকে? আপনার সব বিশ্বাসের খুঁটি কি এবার একটু হলেও নড়বড়ে হয়ে পড়বে না? মানুষের মনস্তত্ত্ব বলে, পড়বেই। আপনার বিশ্বাসের লোহার বাসরঘরে সুতাশঙ্খ সাপ প্রবেশের ছিদ্র তৈরি হবেই।

সেই ছিদ্র দিয়ে আপনি প্রবেশ করতে দেখবেন আপনার তারুণ্যের সেই আদর্শকে। যিনি অনেক আগেই কমরেড হিসাবে আপনার 'প্রাক্তন'। এমনকি বলা চলে, আপনাদের দমনকারী শিবিরের মন্ত্রণাদাতা ও পরামর্শক। তার মেধা এখন বিক্রি হয় আপনার দৃষ্টিতে 'শোষকের স্বার্থে'। তবুও তার প্রতি আপনার প্রথম তারুণ্যের মুগ্ধতাবোধ কাটেনি। সেই গোত্রের অন্য চাঁইদের আপনি যুক্তি-তর্কে অসার প্রতিপন্ন করতে খুবই উৎসাহী। কিন্তু বরাবরই তাকে রেয়াত দিয়ে চলেন। সেই তাকে এবার আপনি দেখতে পাবেন বহুদিন পরে আবার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে।

তিনি আসবেন আপনার কাছে। কিন্তু আপনি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করবেন যে তিনি আপনার লজ্জাকাতর স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কোনো কথাই বলছেন না। তিনি আপনাকে আপনার অতীতের উজ্জ্বল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। আপনার অনেক পুরনো গুণাবলির কথা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যেগুলির কথা আপনার নিজেরই মনে ছিল না। এত পুরনো ও এত কষ্ট করে মনে করতে হয় যে সেগুলি কোনোকালে আপনার সত্তার অপরিহার্য অংশ ছিল বলে আজ আর আপনার মনে হতেই চাইবে না। তখন আপনি নিশ্চিতই তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করতে থাকবেন। তাকে মনে হবে আপনার সত্যিকারের সংবেদনশীল একজন বন্ধু। আপনি এ কথাও ভাবতে প্রলুব্ধ হবেন যে আদর্শিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও দু'জন মানুষের মধ্যে অকৃত্রিম ও সংবেদনশীল বন্ধুত্ব হতে পারে। টিকেও থাকতে পারে হয়তো অনেক দিন। হয়তো আজীবনও। আর এখন তো আপনার কাছে তাকে মনে হচ্ছে... মনে হচ্ছে... চৈত্র মাসে মেঘহীন, কারুণ্যহীন, নির্দয় রোদেপোড়া মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে একটু দূরে দেখা যাচ্ছে এমন একটি বটগাছের সুশীতল ছায়া। তাকে আপনি এখন কোনোমতেই কাছছাড়া করতে চাইবেন না। ঠিক তখনই আপনার কাছে প্রস্তাব আসবে- চলো, এই সময় কয়েক দিনের জন্য তোমার জায়গা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। নিশ্চয়ই হাতে কোনো জরুরি কাজ নেই। চলো কয়েক দিনের জন্য বাইরে কোথাও ঘুরে আসি।

সবচেয়ে বেশি উৎসাহ জোগাবে আপনার স্ত্রী- হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও! খুব ভালো হবে তোমার জন্য। মনের মেঘ কাটবে। একটু হালকা বোধ করবে। যাও, কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়ে মনটাকে হালকা করে নিয়ে এসো।

আপনার হাতে কখনোই বাড়তি টাকা থাকে না। আর এখন তো ভোটের ঝক্কি পার হয়েছে মাত্র। কিছু না হলেও তো কিছু টাকা খরচ হয়েই গেছে। এই সময় বাড়তি ঝক্কি নিতে আপনার মিতব্যয়ী মন সায় দিতে চাইবে না। কিন্তু আপনার স্ত্রী ব্যাপারটিকে আমলই দেবে না। দেওয়ার কথাও নয়। কারণ তার কাছে এখন সবচেয়ে বেশি কাম্য আপনার জন্য কিছুটা মানসিক প্রশান্তি। সে আপনার নিম-আপত্তির তোয়াক্কা না করে আগ বাড়িয়ে জানিয়ে দেবে যে, আপনি যাচ্ছেন। এবং যাচ্ছেন পরের দিনই।

তারপরের কয়েকটা দিন তো আপনার কাছে স্বপ্নের চেয়েও স্বপ্নিল বলে মনে হবে। বাংলাদেশের মধ্যেই এত যে সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে, আপনি আগে ভাসাভাসা জানলেও কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেননি, সেগুলি এত সুন্দর! প্রতিটি মুহূর্ত একটু একটু করে এগুবে আর আপনার মন বলতে থাকবে যে আপনি একটু হলেও নিজের ওপর অবিচার করেছেন। অবিচার করেছেন স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ওপরেও। অন্তত এটুকু প্রশান্তি, এটুকু নির্দোষ বিনোদন মানুষের অবশ্যই প্রাপ্য হওয়া উচিত।

আপনার বন্ধু এখন, কয়েকদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরে, একটু একটু করে মুখ খুলতে শুরু করবেন। তিনি খুব মোলায়েমভাবে বলবেন যে পার্টির এই হোলটাইমার সিস্টেমটা তুলে দেওয়াই উচিত। হয়তো স্ট্যালিনীয় জমানার আদর্শ মেনে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এটিকে বেশ অমানবিকই মনে হয়। অমানবিক! শব্দটি শুনে আপনি একটু থমকে যাবেন। আপনার প্রতিক্রিয়া দেখামাত্র বন্ধু তার যুক্তির ডালি মেলে ধরবেন- ধরো, যে ছেলেটি আবেগের বশে বিপ্লবের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার, না ক্যারিয়ার শব্দটি না হয় নাই-ই বললাম, বলা যেতে পারে স্বাভাবিক তারুণ্যের জীবন ত্যাগ করে পার্টির হোলটাইমার হচ্ছে, তাকে পার্টি যে টাকা দিচ্ছে তা দিয়ে খুব টেনেটুনে তার ক্ষুণ্ণিবৃত্তিটা হয়। সেটাও এত কষ্টে যে তা আর কহতব্য নয়। হয়তো সে দুপুরের খাবার খায় কুড়ি টাকায়। শুনতে পেল অমুক হোটেলে কুড়ির বদলে পনেরো টাকায় খাবার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাকে যাওয়া-আসার সময় এক কিলোমিটার করে বাড়তি হাঁটতে হবে। সে পাঁচ টাকা বাঁচানোর জন্য সেখানেই ছোটে। ফলে কী হয়? তার বাড়তি সময় যায়, এনার্জি ক্ষয় হয়, দুপুরে খাওয়ার পরে বাধ্যতামূলক হাঁটার জন্য অসুস্থতার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তারপরে ধরো, সে তো একজন শিক্ষিত তরুণ যুবক। তার মনের খোরাক বলে একটা জিনিস তো আছে। তার ভালো বই পড়তে ইচ্ছা করবে, ভালো ফিল্ম দেখতে ইচ্ছা করবে, নাটক দেখতে ইচ্ছা করবে, প্রতিদিন না হোক সপ্তাহে একদিন বান্ধবী বা প্রেমিকার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু হোলটাইমারের জীবনে এগুলির কথা মনে আনাই অন্যায়। তখন! তখন কী ঘটে?

আপনি তার কথায় সায় দেবার মতো করেই জিজ্ঞস করবেন- কী ঘটে?

অবদমন।

আপনি একটু দ্বিধা নিয়েও তার কথায় সায় দিতে বাধ্য হবেন। মার্কসবাদীরা তো ফ্রয়েডের সবটুকুকে অস্বীকার করতে পারে না। অবদমন তত্ত্বকে অস্বীকারের পথ তো নেই। তবু আপনি বলবেন- কিন্তু মানুষ যখন বৃহত্তর-মহত্তর কোনো জীবনবোধের কাছে নিজেকে নিবেদন করে, তখন তার কাছে এসব ত্যাগ তুচ্ছ হয়ে ওঠে। মহৎ আদর্শ আর জীবনবোধ তখন তাকে সবধরনের অবদমনগত জটিলতা থেকে আরোগ্য দান করতে পারে।

তা পারে। বন্ধু আপনার কথায় সায় দেবেন বিনাপ্রশ্নে। সেই সঙ্গে একটু যোগ করবেন- কিন্তু কতদিন? যখন বিপ্লব অত্যাসন্ন, সচেতন কর্মী অবচেতনে বিপ্লবের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে, তখন তার পক্ষে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করা সম্ভব। এমনকি অনেক সাধারণ মানুষও সেই সময় অসাধারণ ত্যাগী হয়ে উঠতে পারে। দেশে দেশে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের সময় তেমন উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে। কিন্তু যখন বিপ্লবের নেতারাই বিশ্বাস করে না যে, বিপ্লব অদূর ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে, তখন সেই তরুণই বা কয়দিন পারবে নিজেকে ত্যাগের পরীক্ষায় সবসময় নিয়োজিত রাখতে? তত্ত্ব বাদ দাও। বর্তমান বাস্তবতা তো তোমার জানা। সেই জানা থেকে বলো, এরা কতদিন টিকছে। আমি আভাসে জানি, আর তুমি প্রত্যক্ষভাবে জানো যে টিকছে না। বাস্তবতা এটাই যে তাদের টিকে থাকাটা অসম্ভব।

তবু কেউ কেউ টিকে যায়।

যেমন তুমি! বন্ধু আপনার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হেসে উঠবেন। তোমার মতো মানুষরাই তো পৃথিবীতে আদর্শ হয়ে বেঁচে থাকে। আমি বা আমরা পারিনি। তাই তো তোমাদের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কিছুটা হলেও ছোট মনে হয়। বাইরে স্বীকার করি না হয়তো, কিন্তু নিজের মনের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হই যে আদর্শের দৃঢ়তার প্রশ্নে মানুষ হিসাবে তুমি আমার চাইতে অনেক বড়।

তারপরেই শশব্যস্ত হয়ে উঠবেন বন্ধু- আরে কথায় কথায় সময় চলে যাচ্ছে। চলো চলো, ওসমানী মিলনায়তনে ইন্ডিয়ার বিখ্যাত ওস্তাদের সেতারবাদন আছে। এসব তো আর রোজ রোজ পাওয়া যায় না। চলো, যেতে যেতে পথে কথা হবে।

আপনার মানসিকতা বন্ধুর মুখস্থ। তিনি আপনাকে কোনো বড় হোটেলের ডিনারে নেবেন না, কোনো বড়লোকের জমকালো পার্টিতে নেবেন না; কোনো বিলাসবহুল অশ্নীলতা দেখাতে নিয়ে যাবেন না। তিনি আপনাকে নিয়ে যাবেন বইয়ের মার্কেটে, নাটকপাড়ায়, কালচারাল সেন্টারে, চলচ্চিত্র সংসদের ফিল্ম শো'তে, ভালো সেমিনার আর আলোচনা অনুষ্ঠানে, আর্টের গ্যালারিগুলোতে। স্বপ্নের মতো কাটবে আপনার কয়েকটি দিন আর রাত্রি। আপনি ভাবতে শুরু করবেন, আহা! জীবনের জন্য এগুলি যে কত মূল্যবান! এতদিন এসব থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখার জন্য আপনার মধ্যে অনুশোচনাও জাগবে বারবার। আপনি তো জানেনই যে মানুষের মনুষ্যত্ব যত পরিশীলিত হয়, সে তত সূক্ষ্ণ আর উচ্চাঙ্গের শিল্প থেকে রস সংগ্রহ করতে শেখে। মনুষ্যত্বের সাংস্কৃতিক পরিশীলন থেকে এতদিন নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন বলে আপনার মনের মধ্যে বারংবার আফসোস জেগে উঠতে থাকবে। এর মধ্যে আপনার সাথে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে আপনার কিছু 'প্রাক্তন' কমরেডদের। তারা একইভাবে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ায় তারা খুবই আনন্দিত। কিন্তু এত স্বল্প সময়ের জন্য দেখা হওয়াতে তাদের অনুযোগ- কতদিন পরে দেখা! একটু মন খুলে আড্ডা দেওয়া যায় না!

যায়।

সেই আড্ডার ব্যবস্থা হবে। আপনার রুচির দিকে বন্ধুর তীক্ষষ্ট নজর। এমন জায়গার ব্যবস্থা হবে যেখানে আপনিসহ সবাই খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।

আর সেই আড্ডার শুরু থেকে অসাধারণ আন্তরিকতা। আপনার মনে হবে, আপনি সেই কলেজ-ইউনিভার্সিটির যুগে ফিরে গেছেন। সঙ্গে সঙ্গে আবার এটাও মনে হতে থাকবে যে আপনি অহেতুক এই রকম আলোকিত আড্ডা থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন দীর্ঘদিন।

আড্ডা তখন জমে উঠবে পুরোপুরি। আর এই সময় আপনি সচকিত হয়ে দেখবেন আড্ডায় এসে যোগ দিয়েছেন আপনার আরও দুইজন 'প্রাক্তন' কমরেড। আপনাদের দলে তাদের অবস্থান এতই উচ্চ ছিল যে, তাদের আপনি গুরু বা পথপ্রদর্শক হিসাবেই বেশি ভাবতেন; কমরেড হিসাবে নয়। কেননা কমরেড যত সমপর্যায়ের হয়, তাদের দুইজনকে সেই পর্যায়ের ভাবতে আপনাদের অসুবিধা হতো। তারা এতই বড় ছিলেন। এখনও বড়। অনেক বড় জায়গায়। একজন এখন শাসকদল শুধু নয়, দেশেরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও মন্ত্রী। অন্যজনও মন্ত্রী এবং শাসক দলের নীতি নির্ধারকম লীর একজন। তার মানে, দেশ যাদের কথায় উঠ-বোস করে তাদের দুইজন এখন আপনাদের আড্ডায়। আপনি মুগ্ধ হয়ে দেখবেন, পুরনো কমরেডকে কত আন্তরিকভাবে কাছে টেনে নিচ্ছেন তারা। আপনি কথায় কথায় আভাসে খোঁচা দিলেও তারা রেগে উঠবেন না খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো। তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই, আপনাকে তাদের চাইতে বড় অবস্থানে বসিয়েই কথা চালিয়ে যেতে থাকবেন। তারা বলতে থাকবেন যে মানুষের মুক্তি মানে তো মানুষের মঙ্গল করা। সেই কাজ তারা আগের অবস্থান থেকে যতটুকু করতে পারতেন, এখন তার চেয়ে বেশি করতে পারছেন। মানুষের ক্ষতি করতেও যেমন, তেমনই মানুষের ভালো করতে হলেও ক্ষমতা হাতে পাওয়ার বিকল্প নেই। আজ পৃথিবীতে সমাজতন্ত্রের ধারণাটাই অনেকাংশে বাতিলযোগ্য। আমাদের দেশে তা কোনোদিনই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো মাত্রা পায়নি। তবু যে মানুষ মার্কসবাদে সমর্পিত হতেন, এখনও রয়ে গেছেন, যেমন আপনি; তা শুধুমাত্র নিজেকে সৎ রাখার জন্যই। আপনি যদি এইভাবেই চালিয়ে যান তাহলে আপনি মানুষের তেমন একটা কাজে কোনোদিনই আসতে পারবেন বলে মনে হয় না।

আপনি এখন বিতর্কে নন, আড্ডায় মগ্ন আছেন। এই আড্ডার কাউকে আপনার কাছে আপনজনের বাইরে বলে মনে হচ্ছে না। তবু আপনি মিনমিন করে বলার চেষ্টা করবেন- কিন্তু জনগণ! তাদের ঠিকমতো বোঝানোর ব্যাপারটা...

আরে সত্তর বছর ধরে বুঝিয়ে তো ফলাফল এই। যতদিন একনিষ্ঠ সৎ ছিলাম, ততদিন ভোটে দাঁড়িয়ে ভোট পেতাম সর্বোচ্চ দেড় হাজার। আর এখন আমি সেই একই মানুষ; না এক নই, আগের চাইতে নীচু মানসিকতার মানুষ হয়ে ভোট পাই কমপক্ষে দেড় লাখ।

তারপর ঘটনা এগোবে খুব দ্রুত।

আপনি ক্ষমতা হাতে পেলে মানুষের উপকার করতে পারবেন অনেক সহজে। যে ভূমিহীনদের খাসজমি দেওয়ার জন্য আপনি বছরের পর বছর ধরে মিছিল-সভা করছেন, সেটি বরাদ্দ দিতে আপনার সময় লাগবে বড়জোর কয়েক ঘণ্টা। ডিসিকে হুকুম করবেন, সে কাগজে স্বাক্ষর করে দেবে। মিথ্যে মামলায় যে ক্ষেতমজুর থানা-পুলিশের অত্যাচারে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, যাকে রক্ষা করার কোনো পথ আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না, আপনার একটা শুধু টেলিফোন... এসপি সঙ্গে সঙ্গে মামলা তুলে নেবার ব্যবস্থা করবে। তাহলে আপনি সেই ক্ষমতা হাতে পেয়ে নেবেন না কেন! হ্যাঁ, আর্থিক ব্যাপার তো আপনাকে দেখতে হবেই। কেননা, আপনি যদি সার্বক্ষণিকভাবে রাজনীতি, মানে জনসেবায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে আপনার নিজের অর্থ সংস্থানের দায়িত্ব তো জনগণকেই নিতে হবে। জনগণ তা নেয়। নেয় বলেই না ক্ষমতাসীন নেতারা নিজেদের অজান্তেই কোটিপতি হয়ে যান।

এই ধরনের দলে কোনো কাউন্সিল বা সভা কোনোকিছুর দরকার হয় না। আপনাকে হাই কমান্ডের হুকুমে জেলার সর্বোচ্চ বা বিশেষ সমন্বয়কারী বানিয়ে দেওয়া হবে।

আপনি বাড়ি ফেরার দিন অবাক। দেখবেন জেলার প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে কিছুদূর পর পর তোরণ। তাতে আপনার নাম লেখা, আপনার প্রতিকৃতি। আর তোরণে দাঁড়িয়ে আপনাকে শুভেচ্ছা-স্বাগতম জানাচ্ছে হাজার হাজার জনগণ। ক্ষোভে-রাগে আপনি মনে মনে বলবেন- শুয়োরের বাচ্চা জনগণ!- কিন্তু মুখে চওড়া হাসি ঝুলিয়ে রাখা আর সমানে ডান হাত নাড়ানোর কাজটি আপনি করেই চলবেন।

সারাদিন সংবর্ধনা, সারাদিন নানাবিধ অনুষ্ঠানের পরে আপনি গভীর রাতে বাড়ি ফিরে দেখবেন, আপনার কলেজপড়ূয়া ছেলে আপনার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে এমনকি কিছুটা ঘৃণাও মেশানো।

আপনি তখনই অনুভব করবেন, সারাজীবন কতবার কতভাবে অপমানিত হয়েছেন, সেগুলো পুত্রের দৃষ্টির ঘৃণার কাছে তুচ্ছ।

এই অপমান আপনাকে বাকি জীবন ঘুমাতে দেবে না।


মন্তব্য