বিদ্যুৎ সুন্দরী

গল্প

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

বিদ্যুৎ সুন্দরী

অলঙ্করণ ::সমর মজুমদার

   জেসমিন মুননী

অনেককাল আগের কথা; পার্বতীপুরের রাজা কিচক তার অপূর্ব সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী কন্যা পারবতীর নামানুসারে অত্র এলাকার নাম রেখেছিল পার্বতীপুর। পার্বতীপুরের ঠিক মধ্যখানে মধ্যপাড়া গ্রামটিতে তার জন্ম। প্রকৃতির মতো পারবতীর মুখখানা ছিল মায়াবী। মধ্যপাড়ায় দাদার রাজদরবার ছিল পারবতীর প্রিয় জায়গা। সেখানে দাদার কাছে শুনত মধ্যপাড়ার গল্প। কী করে এই কঠিন শিলার উৎপত্তি।... দাদার কাছে শুনেছিল- শক্ত, ঘন, কেলাসিত আগ্নেয় অথবা রূপান্তরিত শিলাই হচ্ছে কঠিন শিলা। মধ্যপাড়ার এসব কঠিন শিলা মূলত নাইস, গ্রানোডায়োরাইট এবং কোয়ার্টজ ডায়োরাইট সহযোগে সৃষ্ট। দাদার কাছেই শুনেছিল তুষার যুগে হিমালয় পর্বতমালা ছিল সুউচ্চ এবং পুরোপুরি বরফাবৃত। তখন হিমবাহসমূহ ছিল পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সে সময়ে শুস্ক জলবায়ুগত অবস্থার প্রভাবে বরফগলা পানি, বঙ্গীয় সমভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কিছু সংকীর্ণ ও গভীর নদী প্রণালির মাধ্যমে প্রবাহিত হতো। সর্বশেষ বরফ যুগের অন্তিমকালে বর্ষা মৌসুমে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃষ্টিপাত ঘটত এবং সে সময় হিমবাহও গলতে শুরু করেছিল। এই গলিত পানি বর্ষার বর্ধিত পানি সহযোগে বঙ্গীয় সমভূমির ওপর দিয়ে, সংকীর্ণ নদী ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতো। এসব নদীপ্রবাহের মাধ্যমে প্রবাহিত বিপুল জলরাশি বিপুল পরিমাণ নুড়িপাথর বহন করে আনত এবং তা পর্বত পাদদেশীয় ভূস্তর হিসেবে সঞ্চয় করত।... এসব শুনতে শুনতে পারবতী পাথরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। কঠিনকে ভালোবাসলো কোমল হৃদয় দিয়ে। পারবতীর ভালোবাসার প্রশ্রয় পেয়ে কঠিন শিলার গুরুগম্ভীর হাসিতে লতাগুল্মেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। এভাবে দিনগুলি তার সুখেই কাটছিল। আচমকা একদিন আকাশ ফাটানো শব্দে পুরো মধ্যপাড়া কেঁপে উঠলে সবাই দেখল একদল প্রলুব্ধ মানুষের সমাবেশ। গ্রানাইড দিয়ে তারা পাথরের বুক ফাটাবার চেষ্টায় ব্যস্ত। মধ্যপাড়ার আজকের শব্দ প্রকৃতির সকল নীরবতায় চিড় ধরাল আর বাড়াল পারবতীর হূৎকম্প। কৌতূহল নিয়ে দেখল বিস্তৃত মাঠের প্রান্তে যেখানটাতে তারা খেলত, সেখানে তখনও কিছু মানুষ মাটির বুকে সুড়ঙ্গ করে চলছিল।

দৌড়ে পারবতী দাদাকে সামনে পেয়ে বলল, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এইখানে কূপ খনন করে ভূপৃষ্ঠের অতি অল্প গভীরতায় পুরাজীবীয় যুগের কেলাসিত ভিত্তিস্তরে কঠিন শিলার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। ভিনদেশি এক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তারা বেশ কয়েক বছর এইখানে থাকবে। হাঁফাতে হাঁফাতে পারবতীর গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।

'চিন্তা করিস না। তারা কিছুই করতে পারবে না।' নাতনিকে সান্ত্বনার কথা বললেও দাদা খান্ডোবার মুখে চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাহলে কি তারা আদি বসতভিটা হারাতে বসেছে? কিন্তু নাতনিকে কিছু বুঝতে দিল না।

পারবতী কিছু একটা বলতে চাইছিল; কিন্তু মুখে কিছু না বলে চোখ দিয়ে বোঝাল- কিছুই ঠিক নাই।

পারবতীর মনে হলো গভীর একটা আলোড়ন এসেছে তার মধ্যে, তার হৃদয়ে এমন ভারাক্রান্ত আগে কখনো অনুভব করেনি। নিশ্চিত বুঝল গভীর প্রেমে নিমগ্ন বলে এত কষ্ট পাচ্ছে। জড়ো পদার্থের প্রতি তার এহেন প্রেমানুভূতি নিয়ে বিছানায় যেতে না যেতে ঘুমিয়ে পড়ল। মুখে কান্নার ছাপ আর হৃদয়ে প্রেম নিয়ে পারবতী একেবারে সকাল পর্যন্ত একটানা নিটোল ঘুমাল। ভোর হতেই হৃদয়ে চিন চিন বেদনা শুরু হলো ষোড়শী পারবতীর।

প্রতিদিনই ভিনদেশিরা এসে জরিপ করছে। মাঝে মধ্যে দিগন্ত কাঁপিয়ে গ্রানাইড ফাটাচ্ছে। টুকটাক উড়ো খবর শুনছিল। কানাডীয় পরামর্শক ভূপৃষ্ঠের গভীরে ছয়টি কূপ খনন করে সমীক্ষা করে মতপ্রকাশ করেছে, ১২৮ থেকে ১৫৪ মিটার গভীরতায় তারা পুরাজীবীয় কঠিন শিলার সন্ধান পেয়েছে।

খননকারীরা আসলে পারবতী বিভিন্ন কৌশল উদ্ভব করত তাদের তাড়াতে। ভয় দেখাবার চেষ্টা করত। ভাবত ছোটখাটো ভয় দেখালে মানুষ প্রজাতি দূরে সরে যাবে। সেখানকার সাপেরা বিষ ঢেলে দিত শ্রমিকদের শরীরে। শ্রমিক মৃত্যু ও অলৌকিক সব কাণ্ডকারখানাতে স্থানীয়রা আন্দোলন ও ধর্মঘট করলে কাজের তোড়জোড় কিছুকালের জন্য বন্ধ থাকত। কাজ বন্ধ হলে পারবতী আবারও কঠিন শিলার কাছে ফিরে যেত। ক্ষত-বিক্ষত পাথর স্পর্শ করে নিজেকে যতটুকু সম্ভব পাথরের গায়ে যেন নিজেকে ঠেসে ধরতে চাইত। এই কঠিন শিলা তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করত।

সেদিন শীতের এক দুপুরে ভিনদেশিদের দেখে পারবতী ঝোপের আড়ালে নিজেকে আড়াল করল। ভরদুপুরে একান্ত নিবৃত্তে পাথর স্পর্শ করার জন্য ছুটে আসত। নরম রোদের তাপে জায়গাটা যতটুকু উষ্ণ হয়ে উঠত সেটুকুতে পারবতী নিবিষ্ট হয়ে লতাগুল্ম আর বন্য ফুলেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিত। সে যেন এক ভাষাচিত্রী। ভাষা দিয়ে গল্পের পর গল্প রচনা করত। সেদিন দেখল বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পেট্রোবাংলা ও উত্তর কোরিয়া সরকারের পক্ষে ন্যাম ন্যাম কোম্পানি প্রতিষ্ঠানটি লিজ নিয়ে কাজ শুরু করে দিল। পার্বতীপুর ধরে মধ্যপাড়া রাস্তার ধারে ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা প্রকল্পটি প্রায় ১.৪৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হলো। দিনরাত মধ্যপাড়ায় বন ও ঝোপঝাড় কেটে সমতল ভূমিতে বিশাল বিশাল মেশিন বসানো হলো, ভিনদেশিদের থাকার জন্য তৈরি করা হলো অত্যাধুনিক আবাসিক ভবন। এভাবে সময় গড়ালে শোকে-দুঃখে পারবতীর দাদা খান্ডোবার দেহান্তর হলে রাজা কিচক মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মেয়ের জন্য তার চিন্তার অন্ত ছিল না। বিবাহিত না হয়েও পারবতী বিধবার বেশ ধারণ করে থাকত। কন্যার বৈধব্যদশা রাজা সহ্য করতে পারছিল না। কোনো বাবার পক্ষে তা সম্ভবও না। এভাবে কয়েক বছর কেটে গেল।

সেদিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। মধ্যরাতে কোরিয়ান জেনারেল ম্যানেজার চো মিঙ্গের ঘুম ভেঙে গেল অদ্ভুত এক শব্দে। ঘুম ভেঙে দেখল টিভি, ডেস্কটপ কম্পিউটার সবই খোলা। কাজ করতে করতে চোখ লেগে এসেছিল বোধ হয়। বছর পাঁচেক ধরে সে এখানে কাজ করছিল। পরিবার বলতে কেউ ছিল না বলে পিছুটানও ছিল না। তার সঙ্গে অদ্ভুত কিছু একটা হচ্ছে ব্যপারটা কমবেশি সবাই বুঝতে পারছিল। মাসখানেক আগে একদিন খনিতে নামার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ ফল করলে লিফটে আটকে গেল। ভেতরে বসে চো মিঙ্গ ইমার্জেন্সি বেল বাজাচ্ছিল। তারপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে উদ্ধারের অপেক্ষায় ছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত সে জানে ধৈর্যই হচ্ছে একমাত্র গতি। চোখ বন্ধ করলে সে কারো উপস্থিতি টের পেল। দ্রুত চোখ মেললে দেখল অন্ধকার। তার সঙ্গে কি কেউ ছিল? না তো যদ্দুর মনে পড়ে সে একাই ছিল। মনের ভুল ভেবে পুনরায় চোখ বন্ধ করতেই আবারও কারো উপস্থিতি বেশ ভালোভাবে অনুভব করলো। মনে হলো একদম গা ঘেঁষে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। এতই কাছে যে তার ঘ্রাণ ও নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছিল। লিফটের বাইরে বরফিকরণ স্তরের মধ্যেও সে ঘেমে অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। ঘ্রাণটা কি তার পরিচিত! হঠাৎ 'সারাং ইয়ে' শব্দটা তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কণ্ঠস্বরটা অতি পরিচিত মনে হলো। নিঃশ্বাস আরো ঘন হলে চারদিকে নীলাভালোয় একটি মেয়ের অবয়ব স্পস্ট হয়। সয়ে যাওয়া সেই আলোতে যাকে দেখল সেখানে কোনো ভুল ছিল না। তার সামনে দাঁড়ানো কিম সে রোঙ্গ! ধবধবে সাদা মুখটা রক্তশূন্যতা রোগীর মতো।

চো মিঙ্গের হিমশীতল দৃষ্টি সেদিকে প্রসারিত। সে কি স্বপ্ন দেখছে! নিজেকে নিজে চিমটি কাটে। নাহ! সে স্বপ্ন দেখছে না। কিম সে রোঙ্গ তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ইয়োগিওয়া। সেই শিশুসুলভ পবিত্র হাসি দেখে তার শরীর ততক্ষণে জমে বরফ।

- কিম!

উত্তর না দিয়ে খনির সুড়ঙ্গ ধরে ক্রমশ নিচে হাঁটতে শুরু করল কিম। অন্ধকারের দিকে...

চো মিঙ্গ চিৎকার করে, কিম কোথায় যাচ্ছ! ওইখানে গ্রানাইড আছে।

কিম সো মিঙ্গ তড়িৎ গতিতে অদৃশ্য হলে বিকট এক শব্দ। পরক্ষণে চারদিক আলোকিত হলে নিজেকে লিফটের মধ্যে আবিস্কার করে বুঝতে পারে উপরের দিকে যাচ্ছে।

বাইরে উৎসুক শ্রমিকরা দ্রুত লিফটের দরজা খুলে চো মিঙ্গকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে, উদ্ধার কর্মীরাও ব্যস্ত লিফট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবার কারণ উদঘাটনে। সেদিনর ঘটনার আর কিছু মনে নেই তার। দিনাজপুর সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর মধ্যপাড়ার ফিরে আসার পর অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন লক্ষ্য করল সবাই। বলা নেই কওয়া নেই চো মিঙ্গ উধাও। অনেক খোঁজাখুঁজির পর হয়তো দেখত খনির কাছে, নয়তো পাথরের স্তূপের পেছনে বসে নিজের মনে কথা বলছে। সেদিন রাতে দরজা খুলে দেখল কিম সে রোঙ্গ দাঁড়িয়ে বলছে, ইয়োগিওয়া। আজ সে তাকে অনুসরণ করল। সকালে সবাই দেখল রুমের পাশে বিশাল আমগাছটাতে তার ঝুলন্ত লাশ।

কয়েক বছর অতিক্রম হয়ে গেলে কোরিয়ান কোম্পানি সাফল্যের চাইতে লোকসান দিচ্ছিল বেশি। এদিকে কোরিয়ানরাও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-বিবাদে জড়িয়ে নানা রকম ফ্যাসাদের সৃষ্টি করছিল। অন্যদিকে মাসখানেক পরপর রহস্যজনক মৃত্যুতে পুরো মধ্যপাড়া অস্থির হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি নিজেদের আয়ত্তে আনতে ব্যর্থ হয়ে ফেরত গেলে পারবতী সুখনিঃশ্বাস ছেড়েছিল। এসবের পেছনে পারবতীর হাত ছিল এমনটা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। যত্রতত্র স্তূপ করে রাখা পাথরের মধ্যে ততদিনে ঘাস গজিয়ে গেলেও জায়গাটা নিজের দখলে এসেছে দেখে পারবতী আপন মনে ঘুরে বেড়াত। বিষাদ ভুলে আনন্দের গান গাইত। কুসুম রঙের বৃত্ত আর দুধসাদা রঙ পাপড়ি নাগেশ্বর ফুল খোঁপায় গুঁজে মিশে যেত প্রকৃতিতে। প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্যের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিত, তার সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যেত। প্রকৃতি যেন তার পরম আত্মীয়, সখা। মধ্যপাড়ায় দিবারাত্রি মেশিনের শব্দ বন্ধ হয়ে গেলে সে মনোরম প্রকৃতির আহ্বান শুনতে পেত। নিসর্গপ্রেমে প্রগাঢ় হয়ে বুঁদ হয়ে থাকত। তাতে তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো।

সময় সব সময় কারো প্রতিকূলে স্থায়ী হয় না। হঠাৎ একদিন নতুন এক ধরনের মানুষ মধ্যপাড়ায় এসে উপস্থিত। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেলারুশের জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনর্সোটিয়াম সংক্ষেপে জিটিসি পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ শেষে বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার সঙ্গে ৬ বছরের চুক্তিতে পুরোদমে কাজ শুরু করে দিল। জার্মানিরা একটা মুহূর্তকে অবহেলা না করলে পারবতীর জীবনে শুরু হলো কষ্টের অধ্যায়। তারা মধ্যপাড়ায় দামি দামি সব অত্যাধুনিক মেশিন প্রতিস্থাপন করল। জায়গাটা বসবাসের উপযোগী করার জন্য চারদিকে বাউন্ডারি ওয়াল তুলে দিল, যাতে স্থানীয়রা যত্রতত্র প্রবেশ করতে না পারে।

পারবতী রাতের অন্ধকারে ঘুরে ঘুরে উন্নয়নের ধারা পর্যবেক্ষণ করত। মনে হতো জার্মান থেকে একটা অংশ তুলে এনে মধ্যপাড়ায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পারবতী এদের কাছে ঘেঁষতে নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে ব্যর্থ হচ্ছিল। বিনা অনুমতিতে বাইরের মানুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল বলে দুপুর কিংবা রাতে নিজের রূপ পাল্টেও সেখানটাতে যেতে পারত না।

তাই অদৃশ্য হয়ে খনিতে তিন সিফটে মাটির নিচ থেকে পাথর বের করা দৃশ্য দেখে আশ্চর্যান্বিত হতো। এতো অত্যাধুনিক পদ্ধতি এক সময় পারবতীকে ভালোলাগার অনুভূতি দিল। সে ধাপে ধাপে পাথর উত্তোলনের দৃশ্য দেখত। খনি থেকে পাথরের চাকা তুলে সেগুলো বিভিন্ন ধাপে ধাপে ভাঙার জন্য তিন ধরনের স্টোন ক্রাসারে চলে যেত। এভাবে মনুষ্য প্রজাতির প্রতি তার আসক্তি জন্ম নিল।

লাল হেলমেট, বুট জুতা ও কমলা পোশাক পরে এসব কাজে যে নির্দেশনা দিত তার চেহারা পারবতী কখনো দেখেনি। সেদিন ভরদুপুরে ঝুপ করে বৃষ্টি নামলে জাভেদ মাথার হেলমেট খুলে ক্লান্তিগুলোকে বৃষ্টিতে ধুয়ে ফেলতে চাইলে কাছে কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়ল। জাভেদকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে আসবার জন্য শ্রমিকরা চিৎকার করল, স্যার চলে আসুন, জায়গাটা নিরাপদ না।

জেনারেল ম্যানেজার জাভেদ চাকরিতে জয়েন করার পর এখানকার অনেকে তাকে এক ধরনের ভীতি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাভেদ দমে যাবার পাত্র না। কথাগুলো হেসে উড়িয়ে দিত। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজকে এতো বড় একটা পদে দায়িত্ব পেয়েছে।

বাজটা ধারে-কাছে কোথাও পড়েছে অনুধাবন করতে পারল। দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা বিদ্যুৎ যেন তার চোখ-মুখ ঝলসে দিল। চোখ ঝলসে যাবার পূর্বে দেখল অসাধারণ সুন্দর এক নারী মূর্তি। যেন উড়ে এলো দিক দিগন্ত থেকে, তারপর মিলিয়ে গেল তড়িৎ আলোকে। তারপর সব অন্ধকার।...

যখন জ্ঞান ফিরল জাভেদ দেখল সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাইরের স্ট্রিট লাইটে ঘরের সবকিছু কেমন যেন অলৌকিক মনে হচ্ছিল। জানালার বাইরে আমগাছটায় এক রহস্যজনক জমাট বাঁধা অন্ধকার। জাভেদ সেদিকে তাকিয়ে বিকেলের ঘটনাটা পুনরায় ভাবার চেষ্টা করল। ঘটনাটা আসলে কী ছিল? বিদ্যুতের আলোয় সে কিইবা দেখেছিল?

জার্মানি কোম্পানিতে দায়িত্ব পাবার পর জাভেদ পুরো মধ্যপাড়া রেনোভেট করেছিল। কোম্পানিটি জার্মানি হলে সেখানে বেশিরভাগ মানুষ ছিল রাশিয়ান ও বাংলাদেশি। বড় মাপের ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য রুমের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও পুরোনো জিএমের রুমটি সে বেশি পছন্দ করেছিল। রুমটির বারান্দা ও জানালা দিয়ে খনি থেকে শুরু করে ডাইনিং, খেলার মাঠ, জিম সবই নজরে আসত। বিশেষ করে আমগাছটার মধ্যে কী যেন এক রহস্য ছিল।

জাভেদ বারান্দায় এলো। ক'টা বাজে ভেবে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে ঘড়ি নেই। এমন সময় পিএস ফারুক এসে পাশে দাঁড়ালে সে চমকে ওঠে।

নতুন জিএম মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরত এসেছে দেখে ফারুক বলে, আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।

আমার ঘড়িটা পাচ্ছি না। চলতো ব্যপারটা দেখে আসি।

স্যার, আপনার শরীর ভালো না। সবাই বলাবলি করছিল আপনাকেই সে আঘাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু একটুর জন্য আপনি রক্ষা পেয়েছেন।

রাজ্যের বিরক্ত মিশিয়ে জাভেদ বলে, 'সেটা' আবার কে?

- তাকে স্পষ্টভাবে কেউ দেখেনি। কিন্তু তার চলাচল অনেকে টের পেয়েছে। যারাই তাকে দেখেছে তার অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনি এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। মনে হয় সে আপনাকে পছন্দ করেছে।

জাভেদের মুখ আরো বেশি ফ্যাকাশে হলে দুই ভ্রুর মাঝখানে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করে, এসবের মানে কী! দু'চোখ বিস্টেম্ফারিত করে বলে, স্পষ্ট করে সব খুলে বল।

কাঁচুমাচু হয়ে ফারুক কিছু বলতে উদ্যত হলে জাভেদ সেদিকে তোয়াক্কা না করে শার্টটা গায়ে চেপে বেরিয়ে পড়ে।

ম্যানেজারকে আসতে বল। শিলাখনির ইয়ার্ডের দিকে একবার ঘুরে আসি, সঙ্গে আমার ঘড়িটাও খোঁজা যাবে।

-রাত ম্যালা হয়েছে।

ফারুকের কোনো কথাই কর্ণপাত না করে জাভেদ গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। সঙ্গে নাইটগার্ড রহমান।

শিলাখনির ইয়ার্ডের দিকে যেতে জাভেদের বেশি সময় লাগে না। সে সব সময় খুব দ্রুত হাঁটে। ইয়ার্ডে পৌঁছে দেখল ধূসর পাথরগুলো বৃষ্টিতে ভিজে আরো গাঢ় রঙ ধারণ করেছে। চারদিকে পাথরের ডাস্টের মাঝে গজিয়ে ওঠা ভেজা ঘাসেরা চকচক করছিল। প্রকৃতি এখানে নীরব সুনসান। জাভেদ ২নং ক্রাসার মেশিনের দিকে যেখানটাতে বিদ্যুৎ সুন্দরীকে দেখেছিল সেদিকটাতে পথ ধরল। বিদ্যুৎ সুন্দরী শব্দটা তাৎক্ষণিক আবিস্কার করে এক ধরনের সুখানুভূতি হলেও পরক্ষণে চেহারায় আতঙ্কের ছাপ দেখা দিল। আসলে সেটা কী ছিল! চমকপ্রদ অবিশ্বাস্য কোনো দৃশ্য! স্মার্ট সুদর্শন জাভেদের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুখ শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। মুখে হাসির চিহ্নটুকু নেই। উদভ্রান্তের মতো ইতিউতি তাকাচ্ছিল। কথাও জড়িয়ে যাচ্ছিল। বিচলিত হয়ে বলল, কই কোথাও তো কিছু দেখছি না!

কী দেখছেন না! ফারুক ফিসফিস করে জবাব দেয়। ভয়ে মনে হাচ্ছিল ফারুকের কণ্ঠ জমে যাচ্ছে।

-আমার ঘড়িটা।

- সকালে খুঁজে দেব।

জাভেদ ইতস্তত করতে লাগল। ভাবল, সত্যি কি সে ঘড়ি খুঁজতে এসেছে! কোথায় সেই বিদ্যুৎ সুন্দরী। তাহলে কি মধ্যপাড়া সম্পর্কে এতোদিন যা শুনে আসছিল সবই সত্যি! অশরীরী বলে এখানে কেউ আছে। যাকে সে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু নিরাকার ব্যক্তিটি তাকে দেখছে।

পরদিন বেলা গড়িয়ে গেলে সবাই এক প্রকার ধরে নেয় এবারের জিএমও গলায় দড়ি দিয়েছে। আমগাছে কিছু না দেখতে পেয়ে তিনতলা ঘরের দরজা ভাঙতে উদ্যত হলে জিএম নিজেই দরজা খুলে হাসছিল। ম্যাডাম ততক্ষণে ফ্রেস হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।

- আপনাদের স্যারকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য রাতেই রৌনা দিলাম।

ম্যাডামের মুখের কোণের রহস্যের হাসি অনেকে বুঝতে পেরেও চুপসে গেল। সবাই চলে গেলে পারবতী আজন্ম প্রেমের তৃষ্ণা নিয়ে জাভেদের গলা জড়িয়ে ধরল। জাভেদও স্ত্রীকে বাহুর আলিঙ্গনে নিলে মনে হলো এই প্রথম কোনো নারীকে স্পর্শ করছে। আজকের মতো সুখানুভূতি দীর্ঘ দশ বছরের বিবাহিত জীবনে হয়নি।

সেদিন সকালে প্রচারিত হচ্ছিল বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে অজ্ঞাত এক নারীর মৃত্যুদেহ পাওয়া গেছে মধ্যপাড়া রাস্তার ধারে।


মন্তব্য