অগ্রন্থিত

অন্যতম পরিচ্ছেদ

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

অন্যতম পরিচ্ছেদ

অলঙ্করণ ::নাজিব তারেক

  শওকত ওসমান

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী শওকত ওসমান [২ জানুয়ারি, ১৯১৭-১৪ মে, ১৯৯৮]। ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক কোহিনূরের বিশেষ সংখ্যায় তাঁর 'অন্যতম পরিচ্ছেদ' শিরোনামের গল্পটি প্রকাশিত হয়। দুর্লভ এই রচনা এখন পর্যন্ত গ্রন্থভুক্ত হয়নি। গল্পটি কালের খেয়ার জন্য সংগ্রহ করেছেন ভূঁইয়া ইকবাল

আঠারো শ' সাতান্ন সাল। সেপ্টেম্বর মাস। তারিখ মনে নাই। আমরা পনর জন ব্যারাকে ঘুমাইতেছিলাম। খাটিয়ার পাশেই বন্দুক কিট্‌ব্যাগের উপর রক্ষিত ছিল।

বৃটিশ রাজ খতম, বৃটিশ শালালোগ্‌কো ভাগাও জুলুম আওর নেহি বরদাস্ত করো, বৃটিশ রাজ খতম।

হঠাৎ এমন কত গুলি শব্দ কানে গেল। ঘুমের ঘোরে তখন ঠিক শুনিতে পাই নাই। পরে উপলব্ধি করিয়াছি। ভয়ানক ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। বহরমপুর হইতে মাইল পনর দূরে সিপাহীদের একটি ব্যারাক ছিল। আমরা গিয়াছিলাম তাহাদের নিরস্ত্র করিতে। আমাদের ক্যাপ্টেন হুকুম দিয়াছিলেন : ঐ সব সিপাহীরা বৃটিশের কানুন খেলাপ করিয়াছে, উহাদের অস্ত্র কাড়িয়া লইবে। যদি কেহ বাধা দেয় গুলি করিবে। আমাদের কাহাকে-ও গুলি করিতে হয় নাই। কিন্তু কয়েক জন-কে গ্রেপ্তার করিতে হইয়াছিল। এই য়দীদের লইয়া পনর মাইল হাঁটিতে বড় বেগ পাইতে হয়। সহজে কেহ অগ্রসর হইতে চায় নাই। আর মুখের রোয়াব-ও তেমন : তোমরা শালারা বৃটিশের হারামী বাচ্চা। আমাদের ধরিয়া লইয়া যাইতেছ, এই কথা এক দিন অন্য সিপাহীদের কানে যাইবে, তখন বুঝিবে ঠেলা। বৃটিশ কা কুত্তা। বুট-চাট্টা। পাঁচজন য়দী কত রকমের গালি দিল, কত মার খাইল। কিন্তু মুখ তাহাদের বন্ধ হয় নাই। শেষ আমাদের দলীয় বোধ সিং বলিল, "ছোড় দো শালে লোগ কো, গালি বক্‌নে দো"। বিংহজী জলন্ধরের অধিবাসী। তিনি-ও আমাদের প্ল্যাটুনে ছিলেন।

বৃটিশ রাজ খতম!!

ঘুমের ঘোরে শুনিলাম। কিন্তু তারপর-ই ছম্‌দম শব্দ। শান্ত্রীর হুইসেল বাজিয়া উঠিল। ঘুমের ঘোরেই বন্ধকের দিকে হাত বাড়াইলাম। কিন্তু কে যেন তাহা হাত ছিনাইয়া লইল। তখন ঘুম বিদায় লইয়াছে। সম্মুখে দেখিলাম, দুই জন শিখ ও পেশোয়ারী সিপাহী এক দম স্তম্ভিত! কি ঘটিতেছে দিশা করিতে পারিতেছিলাম না।

শেষ রাত্রি। কার্তিকের ঠাণ্ডা বাতাস বহিতেছিল। তন্দ্রা একদম ছুটিয়া গেল।

পরে সব উপলব্ধি করিতে পারিলাম। ইহারা অন্য কান্টের চল্লিশ জন বিদ্রোহী সিপাহী। আমাদের অনুসরণ করিয়া আসিয়াছিল। তখন আমরা ইহাদের হস্তে বন্দী।

আমাদের প্ল্যাটুন কমাণ্ডার হজেস্‌ সাহেব ছাড়া অন্যান্য ইংরেজ অফিসারেরা লড়িতে গিয়া প্রাণ দিয়াছে। ক্যাম্পের পাশে গাছ-তলায় তিনটী মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে।

কয়েদীরা ছাড়া পাইয়াছে। ব্যারাকের সম্মুখস্থ মাঠে এক জমায়েৎ বসিল আমি ভয় পাইয়াছিলাম। ছাড়া-পাওয়া কয়েদীরা গত দিনের প্রতিশোধ মুহ আসলে আদায় করিবে। নিকটস্থ গাছে ঝোলা ছাড়া আর উপায় নাই।

আগত দলের দলপতি আহমদ আলি অযোধ্যার অধিবাসী। তিনি আমাদের সম্মুখে দাঁড়াইয়া হিন্দুস্তানী ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। আমাদের হাতে অস্ত্র নাই। এক এক জন শান্ত্রীর প্রহরাধীন রহিয়াছে। এমন বক্তৃতা আমি কখন শুনি নাই। এই ইংরাজ শত বৎসর ধরিয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান শিখ সমস্ত ভাইদের উপর জলুম করিয়াছে। আমরা লক্ষ লক্ষ- দুর্ভিক্ষে, রোগে অনাহারে শোকে মরিয়াছি। ইংরেজ শাসন এখন-ই সুফল, এক শ' বছরে আমাদের আয়ু গড়ে কমিয়াছে দশ বৎসর। মুর্শিদাবাদ ঢাকার মত শহর জঈল গ্রাস করিতেছে। যেখানে মানুষের আবাস ছিল তাহা আজ বিরাণ, শৃগালের বিচরণ-ভূমি। শত বৎসরের গোলামীর প্রতিশোধ লইবার দিন আসিয়াছে। নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে শত বৎসর আগে এই জালেম ইংরেজেরা খুন করিয়াছিল। সেই প্রতিশোধের দিন আজ আসিয়াছে। সর্দ্দার আহমদ আলি চারিদিকে যেন অগ্নি সংযোগ করিতেছিলেন। বিদ্রোহীরা আমার প্রাণ-নাশ এই ভয়ই আমার তখন মনে ছিল না। তিনি বলিলেন, "ভাইগণ! আপনারা যদি আমাদের সহিত আসিতে চান আসুন, আপনাদের অস্ত্র শস্ত্র সব ফিরাইয়া দিব। আর যদি না আসিতে চান আবার বৃটিশের গোলামী করিতে চান, আমরা কোন বাধা দিবনা। কিন্তু আপনারা অস্ত্র আর ফিরিয়া পাইবেন না।" আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে ছিলাম। এমন সময় আমাদের কিছুক্ষণ আগে-কার একজন কয়েদী উঠিয়া হাঁক দিয়া বলিতে লাগিল, "বন্ধুগণ, আপনাদের উপর আমাদের কোন ক্ষোভ নাই। আপনারা ভুল পথের পথিক, তবু আপনারা আমাদের ভাই। ভাইয়ের সঙ্গে ভাই লড়াই করে না। আপনারা-ও আসুন।" আমি কয়েদী ও শান্ত্রীর প্রহরাধীন এ-কথা আমি তখন ভুলিয়া গিয়াছিলাম। আমি এক দৌড়ে ঐ বক্তা-কে বুকে জড়াইয়া ধরিয়াছি। শান্ত্রী তখন হৈচৈ শুরু করিয়াছে। "আপনারা দেশের সাচ্চা সন্তান- আমাকে আপনাদের সঙ্গী করিয়া লন" বলিলাম। বক্তা আমাকে আলিঙ্গনে জড়াইয়া বলিল, "এই ত সত্যিকার ভা'য়ের মত কাজ।" আমার দেখাদেখি দলীয় সকলে অনুপ্রাণিত। একই সুরের মত আমরা যেন এই প্রভাতের হাওয়ায় বাজিতেছিলাম।

কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের বন্দুক ও উর্দ্দি ফিরিয়া পাইলাম। আবার সিপাহীর বেশ। ঠাণ্ডা বাতাস আসিতেছে কত রাজ্যের সঙ্গীত তার শন শন শব্দে, যেন কহিতেছে, "আজাদী, আজাদী। আজাদীর নিঃশ্বাস গ্রহণ করো, আমি, তোমার বুক ভরিয়া দিই।" বোধ সিং আবার পোষাক পরিয়া বালকের মত উচ্ছ্বাসে ফাটিয়া পড়িতে লাগিল। আমাদের সঙ্গী ছিল গয়া জেলার অধিবাসী ওয়ারেস আলি। সে খুব নিরীহ। হাসি-মশকরা পছন্দ করিত না। হুকুম তামিল ছাড়া আর অন্য কোন কাজ আছে যে জানিত না। আজ ওয়ারেশ আলি পর্য্যন্ত অনর্গল কথা বলিতে লাগিল। আমাদের সকলকে যেন ভূতে পাইয়াছে।

সর্দ্দার আহমদ আলি হাঁক দিলেন। "সিপাহী তৈইয়ার।" আমরা সকলে, লাইন বাদী দাঁড়াইলাম। মোট পঁয়ষট্টি জন। সকলের সম্মুখে সর্দ্দার সাহেব। আবার হুকুম : কুইক মার্চ।

ভোরের আকাশ উপরে আলোক ছিটাইয়া দিতেছে তরুলতার উপর, সৈনিক শিরে, দিজ্ঞ্বলয়ের কোনে কোনে। আবার হাঁটিতে লাগিলাম। ওয়ারেশ আলি গান ধরিল, আমরা কোরাস :

সদীয়ূঁ কে বাদ টুটে গুলামি কা জিঞ্জীর।

আজাদী! আজাদী!!
চলো নও-জওয়ান
বাড়্‌হাও কদম
দুষ্‌মন কে সাম্‌নে ঝুঁকানা না শির

আজাদী! আজাদী!!

আমরা অগ্রসর হইতে লাগিলাম। পঁয়ষট্টি জন। বিভিন্ন প্রদেশের অধিবাসী, বিভিন্ন কওম। কিন্তু আজ এক কাতারে হাঁটিতেছি শত স্বপ্ন-ভরা একটি প্রাণের মত।

সূর্য্যের কিরণ ছড়াইয়া পড়িল। হিমেল হাওয়ায় কিরণের তেজ নাই। বড় আনন্দ লাগিতেছিল। দু-পাশে ক্ষেত। কৃষাণেরা আমাদের দিকে চাহিয়া দেখিতেছিল। কচি ছেলেফুলে রাখাল-বালকেরা চাহিয়া ছিল। গ্রামে ইহারা ত সচরাচর সিপাহী দেখে না। কৌতূহল ও বিস্ময়ের মাত্রা তাই সমান।

প্রহর দুই পরে জলদ-গম্ভীর শব্দ হইল : হল্ট- রোকো। এক শব্দে পদধ্বনি থামিয়া গেল যেন এক জনই এতক্ষণ সড়কে হাঁটিতেছিল।

এই সময় শুরু হইল যুদ্ধের মন্ত্রণা-সভা। সর্দ্দার আলি চার পাঁচজনকে বাছিয়া লইলেন। যোধসিংহ, ওয়ারেশ আলি, শুকুর মামুদ, রমা নাথ পাে ও আমি জম্‌শেদ খাঁর নেতৃত্বে তের জন করিয়া সিপাহী বরাদ্দ হইল। 'সলা পরামর্শের জন্য তিনি এই পাঁচ-জন-কে ডাকিবেন। কিন্তু কোন গোপন পরামর্শ বলিয়া কিছু থাকিবে না।

সর্দ্দার আলি বলিলেন, "জম্‌শেদ খাঁ, আব থোড়া সালাহ্‌ হোনা চাহিয়ে।"

"জী সর্দ্দার।" আমি জবাব দিলাম। স্থির করা হইল : আমরা পদ্মা নদী পার হইয়া রাজশাহী উপস্থিত হইব। পরবর্ত্তী লক্ষ্য : ঢাকা ও জল্‌পাইগুড়ির সিপাহীদের সহিত যোগাযোগ স্থাপন। তাহাদের সহিত এক জোট হইলে কর্মপন্থা স্থির হইবে পরে।

জনরবে আমরা শুনিয়াছিলাম : ঢাকার এক দল সিপাহী বিদ্রোহ করিয়া জলপাইগুড়ির দিকে রওয়ানা হইয়াছে। আবদুল গণি নামক একজন চামড়ার ব্যবসায়ী নাকি ইংরেজ-কে সাহায্য করিয়া নওয়াব খেতাব পাইয়াছে। এই লইয়া আমাদের বন্ধুদের মধ্যে হাসির র্হ‌রা উঠিয়াছিল : চাম্‌ড়ে কা নওয়াব। জুতি কা নওয়াব।

আলি সর্দ্দারের বয়স পঞ্চাশ কিন্তু মজ্‌বুত শরীর! আর চোখে ছিল অসম্ভব দীপ্তি। প্রথম দেখিয়াই তাহাকে শ্রদ্ধার শিরোপা দিয়াছি। কোন যুক্তি-পরামর্শের সময়, পরে-ও দেখিয়াছি, তিনি সকলের কথা মনোযোগ সহকারে শুনিতেন তারপর নিজের মতামত দিতেন। চাপাইয়া দেওয়া কাজ তিনি পছন্দ করিতেন না। প্রায় বলিতেন, "নিজের মনে যদি কাজ না কর, কোন লাভ নাই। একগুঁয়ে বলদ দিয়ে কি হাল-চাষ হয়।"

বহরমপুর হইতে আমরা কাশিম বাজার অভিমুখে রওয়ানা হইলাম। পরামর্শে আরো স্থির হইয়াছিল, গোয়েন্দা দ্বারা মুর্শিদাবাদের খবর লইতে হইবে। যদি সুযোগ পাওয়া যায়, শহরে ঢুকিয়া আরো কিছু লোক ও অস্ত্র সংগ্রহ করিতে পারিলে মোকাবিলার সুবিধা।

সকলে হাঁটিতেছি। কারো মনে কোন ক্ষোভ নাই। কি যেন পাইয়া বসিয়াছে। আমাদের দুপুরের রৌদ্রে ঘামিয়া উঠিতেছিলাম। ওয়ারিশ আলি পর্য্যন্ত মশ্‌করা শুরু করিয়াছে। ঘামের পানী নয়, সরকারী পানী- বাহির হইতেছে। গোলামির নালা বিশেষ এই শরীর। সকলে এক চোট হাসিলাম।

দুপুরে খাওয়া শেষ হইল একটী মাঠে। নিকটে লোকালয় ছিল। তাহারা পানী ও কয়েকটী মুরগী ও শাক সব্জী সরবরাহ করিল। আলাদা আলাদা পাক হইয়া গেল। দেড় ঘণ্টার বেশী লাগিল না।

সন্ধ্যার সময় আমরা একটা খেয়া-ঘাট পার হইলাম। মাঝি ভয়ে পলাইয়াছিল। আর কোন লোক ছিল না নিকটে। এই পথে ইংরেজ সৈন্য গিয়াছে কিনা সন্ধান দরকার ছিল।

আলি সর্দ্দার রীতিমতো আপ্‌শোষ করিয়া বলিলেন, "গ্রামের লোকের সঙ্গে মিল-মহব্বত না থাকিলে আমরা কার ভরসায় লড়াই করিব? এখন হইতে আমাদের কাজ হইবে ক্যাম্পের আশ্‌পাশের গ্রামে রাজনৈতিক প্রচার।" শুকুর মামুদ ও যোধসিংহের উপর তার ভার পড়িল। শুকুর মামুদের বাড়ী বিহার। কিন্তু বহুদিন বাংলা দেশে আছে আর বিহারে যায় নাই। ভাঙা-ভাঙা বাংলা সে ভালই বলিতে পারে।

সড়কের অনতিদূরে একটী গাছ পরিবেষ্টিত খোলা জায়গা পাওয়া গেল। এইখানে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা ঠিক করা হইল। তিনজন শান্ত্রী রহিল পাহারায়। দুই ঘণ্টা অন্তর শান্ত্রী বদল হইবে। জায়গাটা তিন দিক খোলা। হঠাৎ কোন দিক হইতে আক্রমণের সম্ভাবনা নাই। চতুর্থ দিকে পোড়ো ভিটা কয়েকটি। অতর্কিত আক্রান্ত হইলে এই উঁচু ভিটাগুলি আমাদের ওৎ বা ভাল কাজে লাগিবে।

আকাশের নীচে আমরা শুইয়া পড়িলাম। মাথার উপর শত শত তারা জ্বলিতেছে প্রিয় চক্ষুর মত। কয়েকজন মৃদুস্বরে তখনও কথা বলিতেছিল। পারিবারিক কথা নয়। আগামী কর্মপন্থার বিষয়। গত দু-দিনে আমি লক্ষ্য করিলাম, সমস্ত সিপাহী যেন নতুন কিছু পাইয়াছে। বদ রসিকতা পর্য্যন্ত কাহারও মুখে শোনা যায় না।

সর্দ্দার আলি নামাজ পড়িতেন। যোধসিংহ গাছের তলায় পূজায় বসিয়া যাইত অবসর সময়ে। দলে বে-নমাজীর সংখ্যা বেশী। আলি সর্দ্দার কিন্তু জিদ করিতেন না কারো উপর। কিন্তু প্রাভাতিক ব্যায়াম প্রভৃতিতে সকলের যোগদান বাধ্যতা-মূলক।

ওয়ারেশ আলি গান করিত আর স্বপ্ন দেখিত। আমাদের এই দল কাহিনীতে পরিণত হইয়াছে। পদাতিক, গোলন্দাজ ঘোড়-সওয়ার বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত; বাজ-দার শ্রেণী পর্যন্ত আছে। আলি সর্দ্দার বলিতেন, "হোগা ভাই, খোদা দেনে সে হোগা।"

আমরা যে কোন গ্রামের ভিতর দিয়া গেলেই সেখানে জমায়েৎ ডাকিতাম ও আমাদের উদ্দেশ্য বুঝাইয়া দিতাম। কাশিম বাজারের নিকট একটী গ্রামের কুড়িটা চাষী যুবক আমাদের দলে যোগ দিল। একজন বিধবা রমণীর একমাত্র পুত্র। সে পুত্রের ব্যবহারে ঘর ছাড়িয়া বাহিরে আসিয়া রোদন করিতে লাগিল। সর্দ্দার আলি পর্যন্ত যুবক-কে নিষেধ করিলেন। কিন্তু সে বে-পরোয়া। ভীরু নামে সে বাঁচিয়া থাকিতে চায় না। এমন উন্মাদনা বহু গ্রামে দেখিয়াছি। পরবর্ত্তী বৎসর আত্রাই ঘাটের নিকট এই যুবকটী মারা যায়। কিন্তু তার অসুর-সুলভ উৎসাহ মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। বিধবা জননী অপেক্ষা সে দেশকে অধিক স্নেহ করিত।

এমন বহু জনের সঙ্গে পরে আমার পরিচয় হইয়াছে। সে কথা প্রকাশ করিব যথাস্থানে।

দলে প্রায় পঁচানব্বই জন আমরা। কিন্তু সকলের কাপড়-চোপড় ও অস্ত্র ছিল না। হাতিয়ার নাই অথচ সিপাহী! এমন বেড়ে অবস্থা কারো পছন্দ নয়। দু-একজন অসন্তোষ প্রকাশ করিল। আলি সর্দ্দার বলিলেন, সবুর।

মুর্শিদাবাদের নিকট আমরা একটী ছোট পুলিশ বাহিনী ধ্বংস করিয়া বন্দুক ও উর্দি যোগাড় করিলাম। অবশ্য এই মোকাবিলায় আমাদের তিন জন প্রাণ হারাইল।

সংবাদ মুর্শিদাবাদে পৌঁছিল। আমাদের পশ্চাতে একটা সেনা দল পাঠানো হইয়াছে, সে-সংবাদ আমরা পাইলাম একজন হরকরার মুখে। আলি সর্দ্দার বলিলেন, আমাদের সোজা গোদাবাড়ী ঘাটের দিকে রওয়ানা হওয়া এখন-ই দরকার।

গ্রামের পথ ধরিলাম। জেলার সড়ক নয়। শত্রুর সংখ্যা কত কে জানে? কিন্তু পরদিন বৈকালে সর্দ্দার আলি বলিলেন, চরের সাহায্যে এখন শত্রুর গতিবিধি জানা প্রয়োজন। আজ এইখানে ডেরা পাতা যাক্‌। গ্রামের এক শরীফ লোকের দুইটী ঘোড়া আনা হইল। পর্য্যবেক্ষণের ভার পড়িল আমার উপর। সঙ্গী ওয়ারেশ আলি। বিভিন্ন ঘাঁটি আগলাইয়া রহিল আরো তিন জন। আমি ও ওয়ারেশ আলি অগ্রসর হইলাম। অপরদের বলিলাম, বিপদ সংকেত দিলে তাহারা যেন মূল ঘাঁটিতে খবর পৌঁছাইয়া দেয়। আমরা হয়ত আর না-ও ফিরিয়া আসিতে পারি।

সন্ধ্যা নামিয়া আসিল। ওয়ারেশ আলি আমি ও পাশাপাশি ঘোড়ার উপর। আমরা কেউ ক্লান্ত নই। গোধূলির লাল বোরখা তখনও পৃথিবীর তনু-বেষ্টন ছাড়ে নাই। বনজ ফুলের গন্ধ ভাসিয়া আসিতেছিল। ওয়ারেশ আলি পার্শি গজল ধরিতে গেল। আমি ধমক দিয়া বলিলাম, "দু দিনে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ইয়ার। কি কাজে এসেছো, তা বুঝি মনে নেই?" ওয়ারেশ আলি লজ্জিত হইয়া ঘোড়ার লাগাম ঢিলা করিয়া দিল। ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিলাম।

'জাম্‌শেদ'! প্রথমে মৃদু স্বরে ওয়ারেশ আলি বলিল। দুই ঘোড়া এক সঙ্গে থামিল।

আমি জবাব দিলাম, কি?

-কি যেন আওয়াজ শোনা যায়।

দুই কান পাতিলাম। ঢোলের আওয়াজের মত এক রকমের শব্দ। দুই জনে শব্দ অনুসরণ যুক্তিযুক্ত মনে করিলাম।

কয়েক গজ অগ্রসর হইবার পর একটা লোকের সহিত আমার মোলাকাত হইল। সিপাই দেখিলে সে আগেই ভয়ে পলাইয়া যাইত। কিন্তু তাহার মাথায় খড়ের বোঝা ছিল, যে পথ বাহিয়া আসিবার সময় আমাদের দেখিতে পায় নাই।

বোঝার আড়াল হইতে আমাদের দেখিয়া সে ভয়ে বোঝা ফেলিয়া দিল। কিন্তু আমরা প্রথমে বলিলাম, "ডরো মাৎ। আমরা কোম্পানীর সিপাই নই।" লোকটা নিকটস্থ গ্রামের চাষি। বয়স পঞ্চাশ পার হইয়া গিয়াছে। ভয়ের প্রাথমিক স্তর কাটাইয়া উঠিয়া সে বেশ নির্ভীকতার পরিচয় দিল। "এতদিন বাদ আপনারা এলেন, চলুন।" তারপর সে আমাদের পথ দেখাইতে পা বাড়াইল। আমরা ঘোড়া হইতে নামিয়া তার বোঝা ঘোড়ার পিঠে চাপাইয়া বলিলাম, "চলো"।

গ্রামের মুখে ঢুকিতে লোকটি বলিল, 'একটু সবুর।' সে এক আঁটি খড় জ্বালাইল। সম্মুখস্থ গাছের দিকে চাহিয়া তিনজনে শিহরিয়া উঠিলাম। একটি পচা লাশ গলায় ফাঁসি-বদ্ধ ঝুলিতেছে।

- এ কে? জিজ্ঞাসা করিল।

- একজন গ্রামের লোক। পরে প্রৌঢ় চাষিটি ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। সে আমাদের আরো নিকটস্থ হইতে চলিল। খড়-জ্জ্বলা আলোয় দেখিলাম, নিচে একটি ইশতেহার লটকানো :-

এতদ্বারা জনসাধারণকে জানানো যাইতেছে যে কোম্পানি শাসনের বিরোধী ব্যক্তিদের যে আশ্রয় দিবে সামরিক আদালতের রায় অনুসারে তাহাদের শাস্তি মৃত্যুদ। যাহারা বিদ্রোহীদের সন্ধান দিবে বা ধরাইয়া দিবে কোম্পানি তাহাদের যথেষ্ট পুরস্কৃত করিবেন!

ক্যাপ্টেন এস, ডাল্‌টন।

ওয়ারেশ আলি বিড়বিড় শব্দ করিয়া ইশতেহারটি ছিঁড়িয়া ফেলিল ও পদদলিত করিতে লাগিল।

বৃদ্ধ আমাদের অনুসরণ করিতে বলিলেন। পরবর্তী দৃশ্য দেখিয়া আমরা শিহরিয়া উঠিলাম। গ্রামের একটি বস্তি একদম ভস্মীভূত। বৃদ্ধের মুখে শুনিলাম, ইহারা বিদ্রোহীদের আশ্রয় দিয়াছিল। এই পরিবারের একটি প্রাণীও জীবিত নাই। দুইটি মেয়েকে ইংরেজ সিপাহিরা ধরিয়া লইয়া গিয়াছিল। সারা রাত্রি তাহাদের ক্যাম্পে রাখিয়াছিল। পরদিন তাহাদের লাশ দেখা গেল, গ্রামের মাঠে দুইটি বাবলা গাছে ঝুলিতেছে। দুইজনে আত্মহত্যা করিয়া পারিবারিক শোক ও অবমাননা হইতে নিষ্কৃতি পাইয়াছে। সখিনা ও করিমা দুই বোন! চাষিটি তারপর উচ্চস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিল।

বৃদ্ধের মুখে সংবাদ পাইলাম, দুই মাইল পশ্চিমে একদল ইংরেজ সৈন্য আছে।

- তাহাদের সংখ্যা কত?

- তা জানি না।

বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দিয়া আমরা তাড়াতাড়ি গ্রামের বাহিরে আসিলাম। আবার দুইজনে পশ্চিমমুখী।

বৃদ্ধ ঠিক বলিয়াছিলেন। দেড় মাইল দূর হইতে আমরা কতগুলি হ্যারিকেন ও লণ্ঠনের আলো দেখিতে পাইলাম। তখন সড়কের পথ আর নিরাপদ নয়। আমরা ঝোপের আড়ালে ঘোড়া দুইটি, একটি গাছের গোড়ায় বাঁধিলাম। তারপর কদম কদম পথ হাঁটা। কিন্তু সড়ক ধরিয়া নয়। সড়কের পাশাপাশি মেঠো পথে।

আরও আলো ও ক্যাম্পের দৃশ্য আমাদের চোখে পড়িল। হঠাৎ কয়েকটি হুইশেল বাজিয়া উঠিল। আমরা শঙ্কিতচিত্তে ওঁৎ পাতিয়া রহিলাম। তারপর বিউগল নামক বাদ্যের শব্দ হইল। দেখিলাম, একদল ইংরেজ টমি কুচ করিয়া খোলা মাঠের দিকে আসিতেছে। দুইজনে নিরীক্ষণ করিলাম। ইহাদের বূ্যহের মাঝখানে চারি পাঁচজন দেশি সিপাহি। গ্যাস আলোকধারী দুইজন ইংরেজ আসিয়া পৌঁছিল শেষে। এখন দেশি সিপাহিদের দেখা যায়।

তারপর শুরু হইল কোরবানি। হাতবাঁধা কোমরে দড়ি এক একজন সিপাহিকে সম্মুখে রাখিয়া ইংরেজ সৈন্যরা একযোগে কুড়িটি বন্দুকে গর্জমান করিয়া তুলিল। দ্রুম, দ্রুম। দুইজন সিপাহি লুটাইয়া পড়িল।

ওয়ারেশ ফিসফিস শব্দে বলিল, ভাইয়া আওর নেহি। হাম ভি শুরু করে।

তাহাকে নিরস্ত্র করিলাম। আবার দুইজন আসিল। আবার দ্রুম দ্রুম দ্রুম। আবার দুইজন। কোরবানির উৎসব শুরু হইয়াছে।

এমন সময় আর দুইজন আসিল। গ্যাসের আলোয় দুইজনকে দেখা যায়।

ওয়ারেশ আলির আর এক ভাই সৈন্য বিভাগে ছিল, নাম মজিদ আলি। সে বহরমপুর ক্যান্টনমেন্টে কাজ করিত।

হঠাৎ ওয়ারেশ আলি চাপা গলায় বলিল, জামশেদ দেখো ত সামনে মজিদ ভাইয়া না আওর কোন?

আমি চাহিয়া দেখিলাম। সে ওয়ারেশের ভাই। কোনো সন্দেহ নাই। চক্ষু মিথ্যা বলে নাই। কিন্তু ওয়ারেশকে বলিলাম, না জানে কোন।

কিন্তু আমি আর কিছু বলিবার আগে সে বন্দুক লইয়া হঠাৎ চিৎকার করিয়া উঠিতে গেল, মেরা ভাই, মেরা ভাইয়া। তখন দ্রুম দ্রুম শব্দ উঠিতেছে। তার কথা কেহ শুনিতে পায় নাই। আমি কিন্তু আর সময় দিলাম না। এক বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়ে ওয়ারেশ আলিকে মাটিতে ফেলিয়া দিয়া তাহার মুখে কাপড় গুঁজিয়া দিলাম। বন্দুক ছিটকাইয়া পড়িল। আমি দুই হাত ও মুখ বাঁধিয়া ওয়ারেশ আলিকে পিঠে তুলিলাম। সে জোরে নড়াচড়া করিতেছে; কিন্তু আমার মতো শক্তিশালী হইলেও আমি প্রথমে হামলা চালাইয়াছি।

বেলপের মধ্য দিয়া ওয়ারেশকে কোনো রকমে বহন করিয়া আনিলাম। আহ, হতভাগ্য! এখনই স্বচক্ষে ভ্রাতার মৃত্যু দেখিয়াছে সে অথচ কাঁদিবার উপায় নাই। আমিও প্রায় কাঁদিয়া ফেলিয়াছিলাম। কিন্তু এখন সময় অপচয় করা চলে না।

কোনো রকমে ওয়ারেশ আলিকে ঘোড়ার পিঠে তুলিয়া বাঁধিয়া ফেলিলাম। সে নীরব চক্ষে আমার গতিবিধি দেখিতেছিল, ও দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করিতেছিল।

অতঃপর পা দিয়া আমি দুই ঘোড়া ছুটাইয়া দিলাম।

শিবিরে পৌঁছানো মাত্র এই দৃশ্য দেখিয়া সকলে আসিয়া জমায়েত হইল।

ওয়ারেশ আলির বন্ধন খুলিয়া দিলাম। সে তখন বালকের মতো জমিনে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল।

আলি সর্দার আসিয়া তাহাকে বুকে তুলিয়া লইলেন ও চোখের পানি মুছিয়া দিতে দিতে বলিলেন, সবর মেরা ভেইয়া, ভেইয়া। "খুন কা বদলা খুন।"

নিশীথিনীর নিভাজ স্তব্ধতা তার জলদগম্ভীর রবে তরঙ্গে-তরঙ্গে বিদীর্ণ হইতে লাগিল গ্রাম-গ্রামান্তরের বুকে। খুন কা বদলা খুন।


মন্তব্য