পিতার জগৎ

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

পিতার জগৎ

ছবি ::মাহাদী হাসান সৌখিন

  শোয়াইব জিবরান

তখনো তাঁর দেহ রক্তে স্নাত। ক্রুশে ছয় ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। নিদারুণ ব্যথায় দীর্ণ। তবু প্রাণবায়ু আছে। আর তিনি তখনো এই বলে আর্তনাদ করে উঠলেন- এলি এলি লামা সাবাক্তানি- পিতা, পিতা, তুমি কি আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছো?

পিতা তবে এক আশ্রয়, পিতা তবে নির্ভরতা, পিতা তবে গতি, পিতা তবে জগৎপতি।

এ সৃষ্টিজগৎকে আদিকাল থেকে পিতা ও প্রকৃতিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। পিতা আদি, ধারণা, ভাব, কারণ। আর যা কিছু তার সৃষ্টি- সব নিত্য অনিত্য তা প্রকৃতি।

জাদু বিশ্বাস আর পুরাণে, লোকাচার আর ধর্মে পরমকে পুরুষ হিসেবেই কল্পনা করা হয়েছে। আর কেনান অঞ্চলীয় বিশ্বাসেও পৃথিবীতে প্রথম এসেছে পুরুষ। সে আদি পিতা- আদম। পরবর্তী যা কিছু ঘটনাপ্রবাহ তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখেই। ধারণা করা হয় আদিম মানুষ নিজে থেকে ফসল ফলানো শুরু করা আগে এদের জীবন ধারণের প্রধান উপায় ছিল পশু শিকার আর পরবর্তীকালে পশুপালন, পশুচারণ। এ কাজটি প্রধানত করতেন কৌমের পুরুষ সদস্যরা। ফলত স্বভাবতই সে সমাজের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন পুরুষ সদস্যরা। আর সে বাস্তব অধিকারই প্রতিফলিত হয়েছিল তাদের রূপকথা, পুরাণ আর বিশ্বাসে।

সে সূত্রেই আধুনিক পরিবার প্রথায় কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে পুরুষই প্রধান। পরিবারে পিতার অধিকার আর ভার লাভ করেছে পুরুষ।

অভিধান বলছে পিতা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত পিতৃ থেকে। যার আরেকটি প্রতিশব্দ ব্রহ্মা। বাংলায় পিতা শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলা হয়েছে বিশেষ্য, জনক, বাপ। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, পিতা একজন পুরুষ অভিভাবক হিসেবে যে কোনো ধরনের সন্তানের জনক হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়ে থাকেন। তিনি যে কোনো সন্তানের পুরুষ জন্মদাতা। মাতা পিতার বিপরীত লিঙ্গ। পিতার বিভিন্ন প্রতিশব্দ হলো- জনক, আব্বা, বাবা, জন্মদাতা ইত্যাদি। পিতা অনেক রকম হতে পারেন। স্বয়ং ইশ্বর যিনি জগৎপিতা। মানবজাতির পিতা। একটি জাতির পিতা। সন্তানের পিতা। আবার সন্ত্রাসের পিতা হিসেবে গডফাদারও। পিতাকে সমাজে নানা কারণে বন্দনা করা হয়। কখনও ভালবাসায়, কখনও ভয়ে।

পিতা অনেক রকম হতে পারেন। স্বয়ং ইশ্বর যিনি জগৎপিতা। মানবজাতির পিতা। একটি জাতির পিতা। সন্তানের পিতা। আবার সন্ত্রাসের পিতা হিসেবে গডফাদারও। পিতাকে সমাজে নানা কারণে বন্দনা করা হয়। কখনও ভালবাসায়, কখনও ভয়ে।

সংসারের পিতাটি মূলত পরিবারের কর্তা। প্রধানত অর্থ উপার্জনকারী। পরিবারের সদস্যরা তাকে খানিকটা সমীহসহ ভালবাসে। তিনি সংসারে থেকেও খানিকটা দূরবর্তী। মাকে যেমন পরিবারের সবাই খুব কাছের মনে করে বাবাকে সে তুলনায় খানিকটা দূরবর্তীই মনে করে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পরিবারে পিতাও বন্ধুতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছেন। তবু মায়ের তুলনায় কোথাও একটা দূরত্ব যেন থেকেই যায়। কিন্তু বিপদের সময়, সাহস সঞ্চয়ের সময়, ভরসার সময় পিতাই আশ্রয়।

পরিবারে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে মায়ের পাশাপাশি বাবার ভূমিকা অপরিসীম। মনোবিজ্ঞানে পিতৃক্ষুধা (ঋধঃযবৎ ঐঁহমবৎ) বলে একটি তত্ত্ব রয়েছে। তত্ত্বটি বলছে- পিতার অনুপস্থিতি শিশুর ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। শৈশবে যে সব শিশু পিতাকে হারায় বা পিতাকে পায় না তাদের মানসিক ও শারীরিক গঠনে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পিতৃহীন শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠনে সমস্যা হয়। শৈশবে তারা একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ফলত পূর্ণ বয়সে এ সব মানুষের আত্মবিশ্বাস থাকে কম। দেখা গেছে- তারা অপর পক্ষকে তোয়াজ করে চলে নিরাপদ বোধ করে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে আরও জটিল পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ সব শিশু নিরাপত্তাহীনতাবোধের পাশাপাশি শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পিতৃহীন বা অনুপস্থিত পিতার কন্যা সন্তানের স্বাস্থ্য সাধারণত ক্ষীণ হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার উল্টোটি ঘটে। এরা অতিরিক্ত মোটা হয়। তারা শিশু বেলা থেকেই ঘুম এবং খাবার গ্রহণে অনিয়ম করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্যগ্রহণে অনীহা বা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে। অর্থাৎ তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে না। বাস্তবেও দেখা গেছে- কন্যাশিশুরা বাবার প্রতি অধিক অনুরক্ত থাকে। এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী জিগমুন্ড ফ্রয়েডের বিখ্যাত তত্ত্ব বহুল পরিচিত। তিনি এটাকে অভিহিত করেছেন ইলেকট্‌্রা কমপ্লেক্স বলে। পিতা কন্যা বা পুত্রের জন্য একটি আশ্রয়। এ নিয়ে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখিকা সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচের একটি চমৎকার রচনা রয়েছে। সেই রচনাটি তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সাথে সাথেই আমার ভাষান্তরে কালের খেয়ায় পাঠক পড়েছিলেন। আবার পড়া যাক-



ভয়

বাবা-মা ভেবেছিল আমরা ঘুমুচ্ছি। আসলে আমি আমার ছোট বোনের পাশে লুকিয়ে ঘুমের ভান করছিলাম। আমি দেখলাম বাবা মাকে চুমু খেতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে সে চুমু খাচ্ছিলো মার মুখে, বাহুতে আরো নানান জায়গায়। আমি খুব বিস্মিত হচ্ছিলাম বাবার এই দীর্ঘ চুমু খাওয়া দেখে। কেননা, এর আগে এমনটি কখনো দেখিনি।

তারপর বেরিয়ে তারা বারান্দায় চলে গেলো। আমি দৌড়ে গিয়ে জানালায় দাঁড়ালাম। মা বাবার কাঁধে ধরে ঝুলছিল। আর তাকে যেতে দিচ্ছিলো না। বাবা একসময় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো আর দৌড়াতে লাগলো। আম্মু তাকে আবার ধরে ফেললো আর আটকাতে চেষ্টা করলো। এক সময় চিৎকার করতে শুরু করলো।

আমি তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমিও তখন চিৎকার করতে শুরু করলাম, বাবা, বাবা...

আমার ছোট বোন আর ভাই ভাসইয়া জেগে উঠলো। আমার ছোট বোনটি দেখলো আমি কাঁদছি তখন সেও চিৎকার করতে শুরু করলো, বাবা, বাবা। আমরা বাবার পেছনে সকলে দৌড়াতে শুরু করলাম। আমরা কিছুদূর গিয়ে থামলাম। আমার এখনো মনে আছে- আমাদের বাবা আমাদের দিকে ফিরে তাকালো আর হাত দিয়ে মুখটি ঢেকে ফেললো। তারপর দৌড়াতে শুরু করলো। সে তখন কোনো দিকে তাকাতেও সাহস করলো না!

তারপর সকালের উষ্ণ সূর্য উঠেছিল- আমার এখনো মনে আছে- কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমাদের পিতা সে সকালেই যুদ্ধে চলে গিয়েছিলো। আমি তো তখন খুব ছোট ছিলাম তবু মনে করতে পারি সেই তাকে শেষবারের মতন দেখেছিলাম। ফলত আমি এখনও মনে করি, যুদ্ধ তো তখনই শুরু যখন তোমার পিতা পাশে নেই।

* * *

পিতাকে ভালবাসার যেমন অসংখ্য নজির রয়েছে তেমনি অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে পিতৃহত্যার ঐতিহাসিক ঘটনাও কম নয়। পিতাকে হত্যা ও মাতাকে বিয়ে করার কাহিনী নিয়ে গড়ে ওঠা বিখ্যাত গ্রিক নাটক ইডিপাসের কথা সকলেই জানেন। সে নাটকে আমরা দেখতে পাই- ডেলফির মন্দিরে ঠিক হওয়া নিয়তিচক্রে ইডিপাস তার রাজা পিতাকে পথে রথ থেকে টেনে নামিয়ে ঘোড়ার সহিসের চাবুকের আঘাতে হত্যা করছে। তারপর পিতার সিংহাসনে বসে মাতাকে বিয়ে করছে। এটি গ্রিক ফেটুম ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা ও দেবতার ক্ষমতা মহিমা কীর্তনের নেহায়েত নাটক হিসেবে দেখতে পারি। কিন্তু বাস্তবেও পিতৃহত্যার ঐতিহাসিক ঘটনা কম নয়। ইতিহাসের বিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আমাদের পাশেই আছে। মধ্যযুগে ভারতবর্ষে বুঘরা খান তার পিতা গিয়াসউদ্দিন ওসমানকে হত্যা করেছিলেন। প্রেমের জন্য জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। কিন্তু তার শেষ দিনগুলো কেটে ছিল খুবই করুণভাবে। তাঁকে তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব বৃদ্ধাবস্থায় বন্দি করে রেখেছিলেন। বন্দিদশায় শাহজাহানের শেষ দিনগুলো কেটেছে প্রিয়তমা স্ত্রীর সমাধির পানে চেয়ে চোখের জল ফেলে ফেলে।

মানুষকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া যিশু যেমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন একইভাবে বাঙালি জাতিকে মুক্তি এনে দেয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, সপরিবারে।

পিতারা সংসার গড়ে তোলেন, প্রতিপালন করেন নিজের রক্ত পানি করে। তিনি নিজ কর্মগুণেই হয়ে ওঠেন পরিবারের রাজা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত হয় করুণভাবে। এক সময় যে পিতার অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষায় সবাই অপেক্ষা করত সে পিতা যখন অবসর নেন তখন তার জন্য কেউ আর অপেক্ষা করে না। তিনি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকেন। সবচেয়ে করুণ হয় স্ত্রী হারানো পিতাদের। তারা সংসারে সাধারণত সবকিছুর জন্য স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল থাকেন। মানসিক, শারীরিক সবদিক থেকে। শেষ বয়সে একা হয়ে গেলে তারা পুরোপুরিই অসহায় হয়ে যান। সংসারে নতুন আসা বৌমারা হয়ত দেখাশুনা করেন বা করতে পারেন না; কিন্তু সে একা লোকটির সীমাহীন নিসঙ্গতা কিছুতেই কাটে না। তার শেষ দিনগুলো কাটে ক্ষমতাচ্যুত সম্রাট শাহজাহানের মতই- পুত্রের সংসার নামক বন্দিশালায় বা বৃদ্ধনিবাসে হারানো প্রিয়তমার স্মৃতির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।


মন্তব্য