প্রচ্ছদ

একজন আছেন...

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

একজন আছেন...

ছবি ::নাফিউল হাসান নাসিম

  সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম

শ্বেতকেতু গুরুগৃহ থেকে এক যুগ বেদ ও অর্থ অধিগত করে বাড়ি ফেরার পর পিতা আরুণি জানতে চেয়েছিলেন গুরুর আদেশের কথা। পুত্র গুরুর কাছ থেকে এমন কোনো আদেশ পেয়েছে কি-না, যা শুনলে অন্যান্য অশ্রুত বিষয়ও শ্রুত হয়; যাকে মনন করলে অমতও মত হয় এবং নিশ্চিতরূপে জানা নেই তাও নিশ্চিত হয়? প্রতিউত্তরে পুত্র শ্বেতকেতু নিবেদন করলেন পিতার কাছেই, যা জ্ঞান হলে আমার সর্বজ্ঞতা হতে পারে আপনি আমায় তা উপদেশ দিন। পিতা আরুণি শ্বেতকেতুকে অধ্যাত্মবিদ্যা উপদেশ দেন। উপদেশের সারকথা হলো, সৎস্বরূপ ব্রহ্মই একমাত্র সত্যবস্তু। পিতা উপদেশ দিয়েছিলেন, সদেব সৌম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম (উৎপত্তির পূর্বে নামরূপ এই জগৎ এক অদ্বিতীয় সদ্বস্তুই ছিল)। শ্রুতিবাক্যটির তাৎপর্য হলো, জগৎ এখন যেমন সৎ, তেমনি পূর্বেও সৎরূপেই ছিল। আমার পিতা ক্ষেত রক্ষার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেননি বলে তাকে আরুণির মতো উদ্দালক জ্ঞান করতে পারি না, তিনিও নিজ সন্তানকে গুরুগৃহে পাঠাতে পারেননি। পাঠিয়েছিলেন স্কুল-কলেজে। রোজ বাড়ি থেকে যাতায়াত করেই তার শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করেছিলেন। আরুণির সাথে আমাদের সাধারণ গড়পড়তা পিতাদের তুলনা চলে না। তবুও খুব সাধারণ একজন পিতাও কেন অসাধারণ, সে গল্প বলার অধিকার সন্তানের জন্মগত।

এজমালি এক মানুষের পরিচয়ে 'বিশেষ্য' ব্যবহার করে তাকে 'বিশেষ' রূপে উপস্থাপন করা যায়; অন্তত সন্তান বাবাকে নিয়ে তেমন লিখতেই পারে। তবে একজন সাধারণ মানুষকে নিজের জায়গায় রেখে শ্রদ্ধা জানানোই অকৃত্রিম ও সত্য। আমার বাবা মফস্বলের একজন সাংবাদিক ও সাহিত্য সংগঠক। সন্তানের শৈশবেও তিনি এমনই ছিলেন, শুধু আমার দেখার চোখটা ছিল ভিন্ন। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ার দায় যতটা সময়ের, অতটাই নগর জীবনে নিজের ঠাঁই নেবার সাফল্যের।

নব্বইয়ের দশকে ফরিদপুর শহরে দৈনিক পত্রিকা বাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা/নয়টা। নিয়মিত পাঠকদের অতটা দেরি সহ্য হয় না, তার উপর যদি নিজের তৈরি প্রতিবেদন প্রকাশ হয় তাহলে একেবারে অযাচিত। ঢাকা থেকে পত্রিকার গাড়ি থামত পুরনো বাসস্ট্যান্ডে 'লাক্সারি হোটেল'-এর সামনে। সেখান থেকে হকাররা পত্রিকা ভাগ-বণ্টন করে নিতে নিতে রোদের খানিকটা বয়স হয়ে যেত। নির্ধারিত পত্রিকাটা বাড়ির দরজায় আসার আগে সেখানে উপস্থিত হলে আরও দুটো পত্রিকা পড়া যায় বিনি পয়সায়। প্রতিদিন ভোরে ঝিলটুলির বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে বাবা চলে আসতেন লাক্সারি হোটেলের সামনে। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়া রাজধানীর দিনের খবর দিনে জানার কোনো পথ নেই। পরের দিনের পত্রিকাই ভরসা। তিনি কাজ করতেন 'দৈনিক জনতা'য়। বাংলার বাণী, ইনকিলাব, রূপালি, সংবাদ, ডেইলি অবজারভার, ইত্তেফাক আর দৈনিক জনতাই সে সময়ের প্রধান। ম্যাগাজিনের মধ্যে ছিল বিচিত্রা, বিচিন্তা, যায়যায়দিন, রোববার, ক্রীড়ালোক আর অপরাধচিত্র। রাজনীতির মাঠ যত উত্তপ্ত হচ্ছে, পত্রিকার দোকানে সকাল বেলা সময় কাটানো বাড়ছে তাঁর। একই সাথে ফেরার পথে ইসলামিয়া হোটেল থেকে বুটের ডাল আর পরোটা খাওয়ার অভ্যেস। এই হোটেলের খাবারের ব্যাপারটা টের পাওয়ার পর থেকে আমিও হয়ে গেলাম সকাল বেলার পাখি। বিশ্বাস করুন, পত্রিকা নিয়ে আমার তখনও আগ্রহ শুরু হয়নি, তবে পরিবেশটা টানত। কেউ খবর পড়ে আনন্দিত, কেউ ধুর শালা বলে একটা গাল দিয়ে পত্রিকা ছুড়ে দিল, আর তখনই পত্রিকাওয়ালা চেঁচাতে শুরু করল দামের জন্য। একজন সাহিত্য পাতা খুঁজছে ওদিকে তরুণ পাঠকরা এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়সূচি নিতে। এর পাশ দিয়েই হয়তো হুশ করে বেরিয়ে গেল রাজধানীমুখী দক্ষিণাঞ্চলের ভোরের প্রথম ট্রিপ সূর্যমুখী, সাউদিয়া পরিবহন। জানালার এপাশ থেকে ভেতরের মানুষগুলোকে বেড়াতে যাওয়া সুখী মুখ মনে হতো আমার। অবশ্য ফেরার পথে হোটেলের নাশতা রাজধানীতে বেড়াতে না যাওয়ার কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। রমরমা হয়ে থাকত তখন লাক্সারি হোটেলের সামনের জায়গাটুকু। ১৯৮৯ সালে রাজনীতির মাঠ তখন সরগরম। স্বৈরাচার সরকার পতনের আগে আগে পত্রিকার দোকানে দীর্ঘ কালক্ষেপণ বাবার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেল। নিজের রুটি-রুজিও জড়িত এর সাথে। একদিন ছুটির সকালে পত্রিকার সেই মেলা থেকে ফিরতে ফিরতে দেখি সাত সকালেই হোটেলের শাটার নামছে। জনতা ব্যাংকের মোড়ে সরকার পতনের আন্দোলনের মিছিল শুরু হয়েছে।

বাবা বললেন, আজ আর অফিস যাব না। দেরি যখন হয়েই গেল, চলো এক আত্মীয়ের বাড়ি দেখা করে যাই। সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের আগে হাতের ডানের গলিতে ছিল ফারুক কাকাদের বাসা। তিনি অনেকটা সময় নিয়ে সে বাড়িতে আড্ডা দেওয়ার সুবাদে আমি চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে খেয়ে ফেললাম মিষ্টি আর এক মগ ওভালটিন। লাল ঝকঝকে মেঝের ঘরে স্যান্ডেল খুলে প্রবেশ করেছিলাম। ফ্রকের তলা দিয়ে বেরিয়ে থাকা আমার কালো লিকলিকে পায়ে বেমানান ছিল বাটা'র ফিতে দেওয়া শখের জুতো জোড়া। অবশ্য শখের কাছে পৃথিবীর সবই মানানসই। তখন মফস্বলে বাটা একমাত্র ব্র্যান্ড। আমার মধ্যবিত্ত বাবা ঈদের বোনাসের টাকা থেকে সদ্যই কিনেছিলেন। বাইরে এসে দেখি একপাটি'র সৎকার করেছে সে বাড়ির প্রভুভক্ত কুকুর। দীর্ঘ সময় গল্প করার অভিযোগে যিনি জুতো কিনেছিলেন সেদিন তিনি হয়ে গেলেন আসামি। আরেক পাটি'র মায়া সংবরণ কঠিন। অগত্যা একটা জুতো হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটছি। আরেক হাত দিয়ে মাঝে মাঝে চোখ মুছে নিচ্ছি নিজের। কিছুক্ষণের মধ্যে পা ধুলোয় ধূসরিত। সেদিকে তাকিয়ে চোখের জল সামলানো কঠিন। সহপাঠী কেউ দেখলে মান-সম্মানের অবশিষ্ট থাকবে না, মনে হতেই পা দুটো জামার ভেতর লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। আমার বাবা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। নিজের স্যান্ডেল জোড়া খুলে হাতে নিয়ে বললেন, 'আমাদের দুজনের পায়েই জুতো নেই। লাল জুতো আবার কিনে দেব, মন খারাপ করে না লক্ষ্মী মেয়ে।' আমার তখন কয়েকটা দাঁত পড়ে ফোকলা মুখ। চোখ মোছা হাত দিয়ে ফোকলা মুখ ঢেকে হাসি লুকোলাম। বাবা কাঁধ ঘুরিয়ে প্রতিউত্তর দিলেন হেসে। তখন বাবা প্রতি রাতে বাড়ি ফিরতেন বাঁশপাতার কাগজের খামে বইপত্র, কাগজ নিয়ে। সেসব খামের গায়ে লেখা থাকত অপরিচিত মানুষের নাম, ফোন নম্বর, টুকরো তথ্য। অসীম আগ্রহে সে বিচ্ছিন্ন শব্দগুলো জোড়া দিয়ে পড়তে চেষ্টা করতাম। তখনও বুঝতে শিখিনি- ওসব আমার বাবার সাথে সংযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আসলে অর্থহীন।

ছুটির দিনে তিনি বসার ঘরের মেঝেতে কাঁচি, আঠা নিয়ে বসতেন এক গাদা পত্রিকা ক্লিপিং করতে। এর পর আমার শিক্ষানবিশ পর্ব শুরু। খাতার উপরের অংশে তারিখ লেখা, কাটিংয়ের মাপে আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া, পাতার বাইরের কাটিং পেজটুকু ভাঁজ করে উপরে তুলে দেওয়া ইত্যাদি। বাবা তখন আমার চোখে বিস্ময়ের মানুষ। বই, পত্র-পত্রিকা নিয়ে যার বিস্তৃত একটি রাজ্য আছে। দুই যুগেরও আগের কথা এসব। টুকরো কাগজ, ফোন নম্বর লিখে রাখা মফস্বলের সাংবাদিক, সাহিত্য সংগঠক হিসেবে তিনি এখনও একই জায়গায় আছেন।

পত্রিকার অজুহাতে নিত্য সকালে হোটেলের নাশতার লোভ দুই যুগ পর আমার প্রয়োজনে ঠাঁই নিয়েছে। মহানগরের কেন্দ্রে কারওয়ান বাজারে বসে পেট-পুজো করতে সকাল-রাত এখন অবধারিত হোটেলের খাবার। সেসব গলাধকরণ করতে করতে সামনে চলমান অন্তত বিশটি গণমাধ্যমের খবরও অনুসরণ করতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের দপ্তরে বসে সংবাদে ছুরি-কাঁচি চালানোর সময় আত্মপ্রসাদ হয় আমার। সংশোধন করে দেওয়া তথ্য, সংগ্রহ করা খবর এক মুহূর্তে চলে যায় অটোকিউতে। চোখের পলকে সম্প্রচার হয় এবং সারাদেশের মানুষ ঘরে বসেই শুনতে পারে। খবর সরবরাহ করতে না পারলে মফস্বল প্রতিনিধিদের ফোনে হুমকি-ধমকিও কাজের খাতিরেই দিতে হয়। ক্ষমতার দাপট কার না ভালো লাগে, বলুন! সংবাদ বিভাগে চাকরির সুবাদে দু'একটা বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়। এর বাইরে সাহিত্যচর্চার সাধনা নিষ্ম্ফল হলেও খানিকটা পরিচিতি জুটছে। তারকা সংবাদকর্মীরা আমার সহকর্মী। দিনরাত সেসব নামি মানুষের সাথে কাজের কথা বলতে বলতে এখন প্রাণের আলাপের সঙ্গীও তাঁরাই। যাদের কক্ষে অনেকের প্রবেশানুমতি পেতে একটা বেলা দরজার বাইরে বসে থাকতে হয়, আমি সেখানে হুটহাট প্রবেশ করে চা খেয়ে আসি। 'আধুনিকতা'র নির্ধারণ করে দেওয়া 'সফলতা'য় খানিকটা আহদ্মাদ আমার হতেই পারে। শৈশব-কৈশোরজুড়ে আমার চোখে সবচেয়ে সফল ব্যক্তির উদাহরণ হয়ে থাকা মানুষটি তখনও মফস্বলের শিল্প-সংস্কৃতি, লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে চর্চা করে যাচ্ছেন। সে যে আমার এই দৌড়ে অনেকটা সেকেলে হয়ে গেছেন, তা টের পাই পরতে পরতে।

পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে নিজের নাম প্রকাশ নিয়ে বাবার একটা মোহ আছে। আফসোস, পত্রিকার সংবাদদাতাদের প্রতিবেদন ছাপা হতো বাই লাইনে 'জেলা প্রতিনিধি' বা 'নিজস্ব সংবাদদাতা' হিসেবে। তাই নিজের নামটা কমই দেখেছেন। এখন 'উঠোন' নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। মাঝেমাঝে রাজধানীতে আসেন; একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়ান লেখা সংগ্রহ করতে। কোথাও কোথাও কথা বলে যাওয়ার পরও হয়তো দেখাই করতে পারেন না। তীব্র তাপদাহে গণপরিবহনে রাজধানীর আরেক প্রান্তে লেখা আনতে গিয়ে বিফল হয়ে ফিরে আসেন। তবুও নির্দেশ মেনে সংযত থাকেন সেই বিখ্যাত সাহিত্যিকটির কাছে সন্তানের পরিচিতির উল্লেখে। পারতপক্ষে নিজের নাম ব্যবহার করতে না দেওয়ার সৌজন্য নিজেকে 'পৃথক' প্রমাণের চেষ্টায় আমাকে শিখে নিতেই হয়েছে।

আমার বাবা এখনও দক্ষভাবে ল্যাপটপ ব্যবহার করতে জানেন না। বুঝতে চান না, সময় এগিয়ে গিয়েছে কতখানি। যে কোনো সময় চাইলে যে কোনো লেখার পাতা সংগ্রহ করা যায়। খাতায় কাগজ সেঁটে রাখার প্রয়োজন বহু আগে ফুরিয়েছে। তবুও মফস্বলের সেই ছায়া ছায়া বাড়ির স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বসে পত্রিকা ফাইল করার তিন দশকের অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। কিছুদিন আগে একবার ছুটিতে বাড়ি যেয়ে সেসব সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। ড্রয়ার থেকে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে দিতে আবিস্কার করলাম, সেখানে সংরক্ষণ করা সব লেখাই আসলে আমার। প্রতি বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানে তিনি আম জনতার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। ঘাসে পেতে রাখা পল্গাস্টিকের চেয়ারে বসে সারারাত কুয়াশার ভেতর গান শোনেন। আমি হয়তো তখন এক নম্বর গেট দিয়ে বিশেষ অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত লাল গদির আরাম কেদারায় বসে চৌরাশিয়ার বাঁশিতে ভেসে যাই। এসব নাগরিক সুযোগ ও মাপে আমি অংশত তাকে অতিক্রম করেছি। তাঁর না পেরে ওঠা কিছু কিছু বাসনা আমি পূরণ করেছি নিজের প্রয়োজনেই। এর মধ্য দিয়ে আমি হয়ে যাই জরা গ্রহণ করা যযাতিপুত্র 'পুরু'।

আমাকেও ক্লান্ত করে আলোকময় এই মহানগর। প্রাপ্তির পেছনে নিজেকে হারানোর ভারাক্রান্ততাও থাকে, যা অধিকাংশ সময় রয়ে যায় অপ্রকাশ্য। সেসব থেকে জন্ম হয় বিষণ্ণতার। দিনরাত উচ্ছ্বাস, আনন্দ, চায়ের কাপে ঝড় তোলা সহকর্মী, স্বজন, বন্ধুরা দু'দিনে ক্লান্ত হয়ে যায়। তৃতীয় দিনে কেউ মুখ ফিরিয়ে জানতেও চায় না আমি কি আছি কোথাও? তখন আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। ক্রমাগত এইসব ক্লান্তি গ্রাস করলে নিদ্রাহীনতা অনিবার্য। তখন মুঠোফোনে নিশ্চিত একটা ক্ষুদে বার্তা পাই মাঝরাতে। হয়তো ভুল বানানে, হয়তো আঞ্চলিক ভাষায়। তবু ওই একটি নম্বর থেকেই জানতে চাওয়া হয়, 'মন খারাপ?' বিস্মিত হই। যোগাযোগহীন হয়েও দূরে বসে একজনই ঠিক জানেন আমার কিছু ঘটছে। তিনিই বোঝেন অব্যক্ত যন্ত্রণা। হয়তো তিনিও বোঝেন নিজের স্বার্থেই। কেননা, আমার দাদি চলে যাওয়ার পর থেকে বাবা বলেন, আমার কাছে তিনি মায়ের ঘ্রাণ পান। মাতৃত্বের সংবেদনশীলতা বহন না করেও বোধ করি মা হয়ে ওঠা যায়, শুধু নিজের পিতা-মাতার জন্য। পুত্রের সমব্যথী হয়ে আমি তখন বারবার ভুল করে অভিশাপ কুড়োনো পিতা 'যযাতি'। মফস্বলের খুব সাধারণ একজন মানুষ আমাকে একাধারে পিতা-পুত্রের ভূমিকায় পৌঁছে দেন। আমি তাঁর পিতা, আমিই পুত্র অথবা এই গড়পড়তা মানুষটি আমার পুত্র ও পিতা। আমার সকল সংবেদনশীলতার জন্ম তাঁর অনুভব থেকে। আমি তাঁর অংশ হয়ে জন্ম নিয়ে বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, পুনরায় সংযুক্ত হই তাঁরই আত্মার সাথে। জীবনের রূপ রস আলোর উৎসের পরিচিতি তাঁরই দেওয়া ঐশ্বর্য অনুভব থেকে। উপনিষদে মৃত্যুশয্যায় মানুষ কী করবে, তা নিয়ে এক বর্ণনা পাওয়া যায়। নিজে মাটিতে শোবে, সন্তানকে নিজের উপরে নেবে আর বলবে- আমি আমার ইন্দ্রিয় তোমাকে দিলাম। সন্তান তখন বলবে, নিলাম। এভাবে আগের প্রজন্ম শক্তি ঐশ্বর্য বুদ্ধি দিয়ে যাবে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে। আমি সে শক্তি ঐশ্বর্য প্রতি মুহূর্তে পাই তাঁর যাপনের কাছ থেকেই।

সকল প্রতিবন্ধকতা, ব্যর্থতা, গ্লানিতে জগৎ ও জীবনের সাথে বিচ্ছিন্নতা এলেও বিশ্বাস থাকে- একজন আছেন, যিনি হাত ধরে দাঁড় করিয়ে বলবেন...এই তোমার জীবনের যাত্রা। গত তিন যুগ ধরে তিনিই আমাকে ক্রমাগত বলছেন, যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই পূর্ণ হয় জীবনের পরিক্রমণ। মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে ব্যবধানহীন অভিজ্ঞতাও আসে জীবনে। সেই সংকটকালে অথবা একটি সামান্য গাছের মাথায় কচি পাতা জন্মাবার মতো নিছক বিস্ময় দৃশ্য উপভোগ, দু'সময়েই আমার কানে বেঁচে থাকার মন্ত্রণা দেন এক সাধারণ পিতা। তিনি নত কণ্ঠে বলেন, জীবন সুন্দর। দুটি শব্দই আমার কাছে জীবনের অশ্রুত বোধও শ্রুত এবং মননে অমতও মত হওয়ার উপদেশ নিয়ে আসে। অতি সাধারণ পিতা তখন হয়ে ওঠেন জীবনের এক অসাধারণ শিক্ষক। আমার কাছে তিনিই আরুণি। সেই আরুণি পিতাকে 'পিতা' সম্বোধন করতেই যেন বারবার স্পর্শ করা হয় ধুলোমাটির এই পৃথিবী।


মন্তব্য