গল্প

আত্মজা

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

আত্মজা

অলঙ্করণ ::আনিসুজ্জামান সোহেল

  কাজী সুফিয়া আখতার

হৈ হৈ করতে করতে লালীকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো ময়না। গোয়ালঘরের খুঁটিতে গরুটাকে ঁেবধে রেখে হাত-পা ছড়িয়ে ধপাস করে বসতঘরের বারান্দায় বসে পড়ে সে। উঠোনে রাতের রান্নার তরকারি কুটতে কুটতে মা আয়মা হাঁক পাড়েন, বইস্যা পড়লি ক্যান? সইন্ধ্যা হইয়া যাইতাছে, ঘরে বাতি দেওন লাগবো না? যা, কুপি পরিস্কার কর।

-চুপ কর। তোমার লালী আইজ আমার জান বাইর কইরা দিছে।

- ক্যান, খুঁটা উটাইয়া ফেলছিল?

- হয়। চোখ ডলতে ডলতে হাই তুলতে তুলতে বলে ময়না। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে তার। উঠতে একদম ইচ্ছে করছে না। ঘুম পাচ্ছে। সে শুয়ে পড়ে। আয়মা বেগম এবার নরম গলায় বলেন, ঘুমাইস না মা আমার। তুই সাহায্য না করলে আমি সব কাজ করতে পারি? রান্ধন শেষ হওনের আগেই ত রাইত নামব। সোনা মা আমার, একটু উডো।

ময়না অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে কুপি মোছে, কেরোসিন ভরে বাতি জ্বালায়। পুকুরঘাটে গিয়ে ভাল করে হাতমুখ ধুয়ে ঘুম তাড়াতে চেষ্টা করে। কালকে পরীক্ষা আছে, পড়ন লাগব। পুকুরে তার সই আসমার হাঁসগুলো দেখে মন ভাল হয়ে যায়। কী সুন্দর সাঁতার কাটতাছে! একবার গলা উঠিয়ে একবার গলা নামিয়ে তাদের আনন্দের প্যাঁক প্যাঁক ডাকে পুকুরের চারপাশ ভরে যায়। সূর্য ডোবার আগে যেমন আকাশে রঙ ছড়াতে ছড়াতে যায়, তেমনভাবে নিচের দিকে রঙ ছড়ায় না। গাছের নিচে, মাটির বুকে, খেজুর গাছ দিয়ে বানানো ঘাটের খাঁজে খাঁজে নীরবে নিঃশব্দে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। পুকুরের চার পাড় ক্রমশ গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যেতে থাকে। আবছা আলো-আঁধারে গাছগুলো কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে! নীড়ে ফিরে আসা পাখিগুলো নিজেদের মধ্যে স্ব স্ব জায়গা নিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। কিচিরমিচির শব্দে সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্য চিড় খায়। ময়না মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিত্যদিনের দেখা এসব দৃশ্য নতুন অনুভূতিতে তন্ময় হয়ে দেখতে থাকে। মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পায়।

- কইরে, ঘাটে গিয়া আঠার মত লাইগ্যা রইলি ক্যান? ঘরে আয়। কাইল না তোর পরীক্ষা!

জবাব দিতে ভাল লাগে না। শেষ আর একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে জোরে পানির ঝাপটা মুখে দিয়ে ময়না বাড়ির ভিতরে ছুট দেয়। মনে মনে ভাবে, আমি ছাড়া মায়ের আর আছে কেডা! আমারেই তো মায় বকা দিবো, আদর করবো। তাঁর মনের অকারণ অভিমানের কালিমা সন্ধ্যা-রাতের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায়।

আয়মা বেগম রান্নাঘরের সবকিছু গুছিয়ে শোবার ঘরে আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। আজকাল কেমন জানি অল্পতেই ক্লান্তি লাগে! একটু বেশি সময় বসে কাজ করলে কোমরে ব্যথা হয়। রাতে ঘুমানোর সময় গরম তেল মালিশ কইরাও কোনো আরাম হচ্ছে না। ময়না ঘরের কোণে পড়ার টেবিলে বসে একমনে পড়ছে। মাইয়াডা বড় ভালা হইছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রশান্তিতে আয়মার বুক ভরে যায়। একজন বাড়িতে পড়ানোর মাস্টার দিতে পারলে ভালা হইতো। টাকা কই? বড় মাইয়া বিয়া দিয়া এহন যৌতুকের টাকা গলায় বিন্ধা আছে। দিতা পারতাছি না। হের লাগি আয়নারে দিন-রাইত শউর বাড়িত কথা শুনতি হয়। এতো সুন্দর একটা পোলা হইল, তাও যৌতুকের টাকার কথা ভুলতি পারে না। আয়নাল, মেয়ের জামাই শক্ত-সমর্র্থ্য বেডা, অলসের ঘোড়া। আরে, আমরা যুদি পারতাম তাইলে তো দিয়াই দিতাম। কথা যহন দিছি আইজ হোক, কাইল হোক দিমু। পর পর দুই বছর আগাম বানে ধান ঘরে তুলতি পারলাম না। কিইন্যা খাওনে দিন পার করনই কষ্ট। নদীর চরে মাল বাহনের জন্যি ঘোড়া কিনোনের লাই একটা-দুইডা টাকা না, চল্লিশ হাজার টাকা কুনথে দিমু? বিয়ের সময় একবার দিলাম। সেই টাকা তোরা সংসারে খরচা করি ফেলাইলি। হের বাদে আবার টাকার লাগি মাইয়াডারে আমার যহন-তহন কথায় কথায় মারস। ক্যান? কোন আক্কেলে? বারে বারে যৌতুক, কয়দিন পর পর যৌতুক। এমন জানলে মাইয়া এইহানে বিয়াই দিতাম না। ঘরের মাইয়া ঘরেই রাখতাম। কথাডা মনে হতেই তার বুকের মধ্যে পুরানো স্মৃতি ঘাই মারে। সময়ে-অসময়ে রাইত-দিন খালি গেরামের জোয়ান পোলাগো বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি আর গান। মাইয়ারে একা রাইখা কুনহানে যাওনের উপায় ছিল না। কহন কী অঘটন ঘইটে যায়! সকলেই বললো, মাইয়ারে বিয়া দিয়া দেও। স্কুলের পথও ত নিরাপদ না। তুমি কি এ্যাতো পাহারা দিয়া রাখতে পারবা? মাইয়ার বয়সও বেশি হয় নাই। মাত্র চৌদ্দ বছর। শরীর কেবল খুলতে শুরু করছে। মাইনসের মাইয়ারে সগলে ত ডাঙ্গর দ্যাহে। গরিব হইলে ত কথাই নাই। একরহম বাধ্য হইয়াই বিয়া দেওন লাগলো। বিয়ার পর মাস ছয়েক ভালা আছিল। তারপর থাইক্যাই অশান্তির শুরু। অশান্তি আর শেষ হইতেছে না। মাঝেমইধ্যে মনে হয় মাইয়াডারে লইয়া আহি। মাইনসে কী কইবো বইল্লা আনতে পারতেছি না। ময়নার বিয়ার জইন্য প্রস্তাব আসতিছে। এক ভুল আমি দুইবার করুম না। স্কুল পাস না করাইয়া মাইয়া বিয়া দিমু না। সে পোলা যত ভালাই হোক। অনেক শিক্কা হইছে। অহন ময়নারে একটা মাস্টার দিতাম পারতাছি না। অর মাথাডা ভালা। হেড স্যারে কইছে। এমন মাইয়া যহন হইল, বাপ মুখ দেখলো না। মাইয়া হইছে শুইন্না হেই যে শহরে চইল্লা গেল, আর এমুহি হইল না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে আয়মা জায়নামাজ পাতে। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এশার নামাজ পড়া শেষ করে আজ মা-মেয়ে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বে। আগামীকাল হাটবার। কাউকে দিয়ে লালীকে হাটে পাঠাতে হবে। বিক্রি করলে পনেরো/বিশ হাজার টাকা হাতে আইবো। জামাইরে দশ হাজার টাকা দিয়াম। পাঁচ হাজার টাকা দিয়া একটা বকনা বাছুর কিনুন লাগবো। আর ময়নারে মাস্টার দিয়ন লাগবো। ফাইভে বৃত্তি পাইলে আর চিন্তা নাই। আট ক্লাশ পর্যন্ত নিশ্চিতি। ইয়া আল্লাহ, তুমি আমার রব, তুমি আমার সব। হে দয়াময়, তুমি আমার মাইয়ারে নিজের পায়ে দাঁড়াইতে সাহায্য কইরো। বড় মাইয়ার মত ওরে লইয়া যেন আমারে কুন ঝামেলা পোহাইতে না অয়। দুই মাইয়া লইয়া অনেক কষ্ট করছি। তবু তোমারে হাজার শোকরিয়া জানাইছি। মরি ত নাই। বাঁইচা আছি। ভালা আছি। আয়মার চোখ ভিজে যায়। গলা বুজে আসে। লালীকে বিক্রি করনের কথা মনে হলি চোখ দিয়া আপনাআপনি পানি আসে। লালী বইল্লা ডাক দিলি আর ডাক শুনলি পর খুঁটি উডাইয়া এক দৌড়ে বাড়ি চইল্লা আহে। নিজের সন্তানের লাহান হই গ্যাছে। তারে বিক্রি করইতে মন লয় না। বিক্রির কতা মনে হইলে চোখ দিই পানি ঝরে। বুকডা ফাইট্টা যায়। আঁচলের কোণা দিয়ে চোখ মুছে নামাজে দাঁড়ায় সে। ময়না পড়া মুখস্থ করতে করতে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। মায়ের কান্নার কারণ বুঝতে পারে না সে। নিজে কোনো অপরাধ করেছে ভেবে মনের কোণে অপরাধের ঘটনা হাতড়াতে থাকে। তার পড়ার আওয়াজ কমে যায়। মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এমন সময় লালীর 'হাম্বা' 'হাম্বা' আর্তস্বরের ডাক কানে আসে। ময়না 'কী হইছে লালী' বলে তাড়াতাড়ি কুপি হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। কিন্তু কোথায় লালী? দেখে গোয়ালঘরের খুঁটিতে সন্ধ্যার সময় বেঁধে রাখা লালী নাই। মোটা দড়িটা পড়ে আছে শুধু। তার বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে। সে কুপি হাতে 'লালী' 'লালী' বলে চিৎকার করতে করতে বাড়ির একোণা- সেকোণা খুঁজে কাউকে কিছু না বলে পাগলের মত রাস্তার দিকে ছুটে যায়। চিৎকার শুনে আশেপাশের সকল ঘরের সবাই উঠোনে বেরিয়ে আসে। আয়মাও নামাজ ছেড়ে চলে আসে বাইরে। দ্যাখে, গোয়ালঘরে লালীর জায়গা শূন্য পড়ে আছে। সে 'ও আল্লারে, আমারে কী করলা রে' বলে উঠোনে মূর্ছা যায়। সকলে তাকে ধরাধরি করে বারান্দাতে তুলে এনে শুইয়ে দেয়। পাশের ঘরের আসমার মা আসমারে এক গ্লাস পানি আনতে বলে। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতে আয়মা চোখ খোলে। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে। আশাভঙ্গের বেদনায় বুক ফেটে যাচ্ছে তাঁর। সে করুণভাবে সকলের মুখের দিকে তাকায়। ময়নার মুখ খোঁজে। পায় না।

-ময়না, আমার ময়নায় কই?

এতক্ষণ পরে সকলের খেয়াল হয়, ময়না এখানে নেই। তাই তো! কুনে গেলো মাইয়াডা? সকলের টনক নড়ে। বড় রাস্তার দিকে মনে লয় ময়নারে যাইতে দেখলাম, আসমা বলে।

-পিছ পিছ যাইয়া আর কী হইবো! এই গ্রামে চুরি হওয়া কোনো গরু ত কেউ আর কোনো দিন পাইছে নাই। পাশের ঘরের মরিয়ম বলে।

-একা একা কতদূর গেল মেয়েটা? হেষমেষ হের না আবার কুন বিপদ অয়! আসমার মা চিন্তিত কণ্ঠে বলেন। শুনে আয়মা ডুকরে ঁেকদে ওঠেন। এমন সময় সাহেব আলী বাড়ির মধ্যে ঢোকেন। সম্পর্কে আয়মার চাচা হন। বারান্দা ঘিরে জটলা দেখে -কী হইছে এইহানে বলে গলা খাঁকারি দেন। আসমার মা সব ঘটনা খুলে বলেন। শুনে সাহেব আলী বলেন,- বড় জামাই আহে নাই বাড়িত?

-তার ত আগামী হপ্তায় আহোনের কথা।

-বৈকালে বাজারে যাওনের সময় আমি ত তারে মনে লয় মাঠে দেকলাম।

-ময়না ত সইন্ধ্যা বেলা লালীরে মাঠ থিকা নিয়া আইলো। হেয় ত কিছু কয় নাই।

-ময়না কই?

-লালীরে খুঁজতে গেছে।

-লালীরে খুঁজতে গেছে- মানেটা কী!

-গোয়ালে লালী নাই গো চাচা। কে জানি লইয়া গেছে! কান্না করতে করতে বলে আয়মা।

-কী কইতাছস? গরু আর গুলান কই?

-বেবাকের গরু আছে।

-হুদ্দা লালীরে চুরি করতে কেডা আইলো হাইন্‌ঝা রাইতে! তুমরা যার যার ঘরে যাও। আমি দেহি ময়না কই গ্যাল। ওই কাশেম, তুই আয় আমার লগে।

২.

ময়না দৌড়িয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে গ্রাম পেরিয়ে সদরে যাওয়ার বড় রাস্তায় উঠতেই চাঁদের আলোয় দেখে কে যেন ওদের লালীকে দ্রুত হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেও দৌড়াচ্ছে। চিৎকার শুনে একবার পিছন ফিরে তাকালো। দূরত্বের জন্য ময়না ঠিকভাবে তার চেহারা দেখতে পেলো না। তবে তাকে দেখতে অনেকটা বুবু'র বরের মত মনে হল তার। এমন চিন্তা মাথায় আসছে দেখে দূর- কী আবোল-তাবোল ভাবছি বলে ময়না উচ্চ স্বরে 'লালী' 'লালী'বলে চিৎকার করতে করতে ওদের ধরার জন্যে তীব্র গতিতে দৌড়াতে থাকে। ডাক শুনে লালী পিছনে মুখ ঘোরায়। জোরে লাফ দেয়। ফিরে আসতে চায়; পারে না। দ্বিগুণ জোরে সপাট লাঠির বাড়ি পড়ে পিঠে। সেও ঊর্ধ্বমুখে দ্রুতগতিতে সম্মুখ পানে ছোটে। তার আর নাগাল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ময়না দ্রুত ছুটতে গিয়ে মাটির ঢেলাতে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। হাত ও হাঁটুর চামড়া ছিলে রক্ত ঝরে। তার উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সাহেব আলী 'ময়না' 'ময়না' বলে ডাকতে ডাকতে ময়নাকে খুঁজতে বড় রাস্তায় চলে আসেন। ডাক শুনে সে কোনো রকমে উঠে বসে কাঁদতে থাকে। দেখা পেয়েও চোর ধরতে না পারার ব্যর্থতায় নিজের গায়ের মাংস কামড়িয়ে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। সাহেব আলী ময়নার কাছে এসে দাঁড়ান। মাথায় হাত রাখেন। জিগ্যেস করেন- চোরডারে দ্যাখছস? ময়না 'হ্যাঁ'সূচক মাথা নাড়ে।

-কুনদিগ গ্যাল? ময়না হাত তুলে দেখায়। দিকচক্রবালে কারো ছায়া দেখা যায় না। রাস্তার ঢালে নেমে গেছে। কাশেম হুদাই বলে- শালারে একবার হাতে পাইলে দেইখ্যা লইতাম। কান্নার বেগে ময়নার হেঁচকি উঠে গেছে। ওরা চাঁদের আলোতে মন্থর পায়ে বাড়ির পথ ধরে।

ময়নার মা বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে মাটির দাওয়ায় বসে 'কেডা আমার এমুন সর্বনাশ কইরলো রে' বলে মৃদু স্বরে বিলাপ করছিলেন। ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেখে আশান্বিত চোখে তাকায়। না, নেই। তার লালীকে ওরা খুঁজে আনতে পারে নাই। আগামী কয়েক মাসের সুখচিত্র এক লহমায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় এতক্ষণ পরে আয়মা আবার মাথা ঘুরে বারান্দায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। ময়না ভেবে পায় না সে এখন কী করবে? নিজে হাত-পা ধুয়ে মলম লাগাবে, না মায়ের হুঁশ ফেরাবে। একা একা সে মাকে তুলে ঘরে নিতে পারবে না। বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে সাহেব দাদা, কাশেম মামা যার যার ঘরে চলে গেছেন। গরু চুরির ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা না। মধ্যরাত অবধি গাঁও-গেরামে কেউ জেগে থাকে না। বাড়ির সবাই অনেক আগেই খেয়েদেয়ে বিছানায় ঘুম। ময়না গরু খোঁজার পরিশ্রমে শ্রান্ত। শরীর অবশ হয়ে ঝিমুনি আসছে। হাতের জ্বলুনিও বাড়ছে। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মায়ের মাথা কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। দু'তিন বার মাকে ডেকে জাগাতে চেষ্টা করে; পারে না। ব্যর্থ হয় জাগাতে। একটু ভয় ভয় করে। বাড়ির নেড়ি কুকুরগুলো কিছু সময় ঘেউ ঘেউ করে ওর সমব্যথী হয়ে দু'পাশে বসে আছে। মৃদুমন্দ বাতাসে চোখ জড়িয়ে আসছে তার। ভোর রাতের দিকে আয়মার হুঁশ ফিরে আসে। আস্তে আস্তে চোখ মেলে ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় বুঝতে চেষ্টা করে, সে এখানে কেন? মাথাডা একদম খালি। কিছু মনে পড়ছে না। ময়নাও জেগে ওঠে। দেখে, মা তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। -চলো ঘরে যাই। এট্টু বাদে আজান পড়বো। ভাত খাইয়া নামাজ পইড়া ঘুমাইয়া থাইক্কো। লালীরে হাটে পাঠানোর ঝামেলা নাই। এতক্ষণে আয়মার মনে পড়ে, লালী চুরি হয়ে গ্যাছে। আজ ময়নার পরীক্ষা। বিকালে বড় মাইয়ার জামাই আইবো টাকা নিতে। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

৩.

সকালে হাঁসগুলো প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে গড়িয়ে গড়িয়ে পুকুরে নামে। ময়না ঘর-উঠোন ঝাড়ূ দিয়ে পড়তে বসে। মাকে ডাকে না। অন্যদিন মা আগে ওঠেন। আজ তাকে একটু আগে স্কুলে যাওন লাগবো। পরীক্ষায় বসার আগে একবার একটু রিভিশন দিতে হইবো। নয়টা/দশটার দিকে বড় মেয়ের জামাই আয়নাল 'ময়না' 'ময়না' বলে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢোকে। তাকে আজ বেশ হাসিখুশি লাগছে। কিন্তু আয়মার মুখ শুকিয়ে গেছে। মতলবটা কী? তার ত বিকালে আহনের কথা। গরু বিক্রি কইরা টাকা দেওন। -ময়না ত স্কুলে গ্যাছে। আইজ তার পরীক্ষা। আপনে কী মনে কইরা?

-ভাবলাম, আপনে লালীরে কারে দিয়া হাটে পাঠাইবেন..

তার কথা শেষ হওনের আগেই সাহেব আলী তার ঘরের দরজা থেকে তাকে দেখেন- নাত-জামাইরে মনে অয় কালই বিকালে পশ্চিমপাড়ার মাঠে দেখলাম! বাড়ি আইলা না ক্যান?

-সইন্ধ্যা হয়া গ্যাছে দেইখ্যা বাইত চইল্লা গেলাম।

- লালীরে কারা যেন চুরি কইরা লইয়া গ্যাছে। তুমার শাউরির ত বড় বিপদ হইল।

-কী কন দাদা! ক্যাডায় এ্যামুন কামডা করল?

আয়মা কেঁদে ওঠেন। আয়নাল 'আম্মা কাইন্দেন না। চুরি হইয়া গ্যালে ত কারো কিছু করনের থাহে না' বলে আস্তে আস্তে বিষাদ বদনে উঠে চলে যায়। নাহ, তাকে তাইলে ময়না চিনতে পারে নাই। সে খুশি মনে শিষ দিতে দিতে পাশের গেরামের হাটে যায়। মন দোলে রে প্রাণ দোলে রে...

এতক্ষণে বশির মনে অয় লালীরে লইয়া হাটে উপস্থিত হইছে। কাইল রাইতে ওর বাড়ির গোয়ালে লালীরে রাইখ্যা বাড়িত যাইয়া বউয়ের লগে অনেকক্ষণ সোহাগ করছে। বউ আয়না ত একেবার থ। একবার মাত্র বললো- পাগলা হইয়া গ্যালেননি? আয়নাল মনে মনে হাসে। বউরে কীভাবে বলবে, আইজ ও সত্যিই পাগল হইয়া গ্যাছে। মনে মনে বলে, কাইলকা হাটে ওর মায়ের লালীরে বিক্রি করুম। বিক্রি কইরা সব টাকা আমার। শাউরি জানতেও পারলো না। আমারে বুলে টাকা দিবার পারব না। দুই বছর ধইরা কইতাছি, লালীরে বিক্রি কইরা আমারে টাকা দেন। একটা ঘোড়া কিনি। জিনিসপত্র লইয়া চরের বালুতে পথ দিয়া ভ্যান চালান কষ্ট। একটা ঘোড়া কিনতে পারলে ব্যবসা ভালা হইত। বুড়ি কয় কিনা- লালী আমার আরেকটা মাইয়া। ওরে সহসা বিক্রি করুম না। বিক্রি করলে আমার জানডা এট্টু আসান পাইত। ক্যামুন দিশা টাকা আদায় কইরা লইলাম, ইবার টের পাইব। আন্ধাইর থাকতে থাকতে উঠতে হবে ভেবে আয়নাল শুয়ে পড়ে। একটু পরে তার নাক ডাকতে থাকে। আয়না তার মুখের দিকে তাকাইয়া থাকে। আচমকা খুশির কারণ খুঁজে পায় না। আরেকডা বিয়ার মতলব ভাঁজছে মনে লয়। প্রায়ই যৌতুক না দিলে আরেকডা বিয়া করার হুমকি দেয়। আয়না আর পারে না। মা ত স্বামী থাকতেও বিধবা মানুষের মত একা একাই সংসারডা চালাইয়া নিতাছে। কত বছর হইয়া গেল বাবা'র কোনো খোঁজ নাই। আয়না আর ভাবতে পারে না। যা করে করুক, আয়না আর মায়ের কাছ থেকে টাকা আনতে পারবে না। আয়নালের পাশে সেও শুয়ে পড়ে। পরদিন ভোরে উঠে আয়নাল পান্তা খেয়ে হাটে যাওনের কথা বলে বাড়ির বাইর হয়। তার আর তর সইছে না। গরম ভাত রান্ধনের সময় সে বউরে দিতে পারে না।

হাটে 'লালী'র চারপাশে ভিড় লেগে গেছে। তেল চিকচিকে লাল রঙের উঁচা লম্বা, নাদুস-নুদুস মায়া-ভরা চোখের এমন সুন্দর গরু আর একটিও হাটে ওঠে নাই। সে বারে বারে সামনের দুই পা উপরে তুলে মাথা নাড়িয়ে দড়ি ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। বশির অনেক কষ্টে সামাল দেয়। আয়নাল ভেবে পায় না, ময়না আর তার শাউরি কীভাবে এতদিন লালীকে লালন-পালন করেছেন। লালী খুব শক্তিশালী। তাকে দেখতে আসা ঘিরে দাঁড়ানো হাটের মানুষগুলো শিং উঁচিয়ে মাথা নাড়ানো আর লল্ফম্ফঝম্প দেখে একবার ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে, আরেকবার ফিরে এসে একই স্থানে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে। কয়েকজন দালাল লালীকে কেনার জন্য দরদাম করছে। আয়নাল দাম হাঁকে- চল্লিশ হাজার। দালাল তিনজন বিশ হাজার টাকা থেকে একটু একটু করে বাড়তে থাকে। বেলাও বাড়তে থাকে। মাথার উপরে গনগনে সূর্য। সবচেয়ে বেশি তেতে উঠছে লালী। তাকে ধরে রাখা দায় হয়ে উঠছে। লাঠির আঘাত তাকে আরো খ্যাপা করে তুলছে। শান্ত থাকছে। মাঝে মাঝে অশান্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দাঁত দেখার সময়ে। আয়নাল তার পরিচিত। কিন্তু কীভাবে যেন অবোলা এই জীব বুঝে যায়, সে তাকে অন্যের হাতে তুলে দিবে। গতরাত থেকে এই পর্যন্ত সময়ে তাকে খড়কুটো, ঘাস কিছু খাওয়ানো যায়নি।

শেষ পর্যন্ত ত্রিশ হাজার টাকায় রফা হয়। লালীর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আয়নাল কলিম বেপারির হাতে দড়ি তুলে দিবে, এমন সময়ে হঠাৎ করেই লালী দুই পা তুলে সজোরে তাকে লাথি মারে। সে মাটিতে পড়ে যায়। তার মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। বশির তাড়াতাড়ি তার মাথা চেপে ধরে। আরো লোকজন ভিড় করে। কিন্তু অন্য কেউ তার গলার দড়ি ধরবার পূর্বে লালী লেজ উঁচু করে এক ছুটে গরুর হাটের বাইরে। তার পিছনে পিছনে লোকজন ছুটতে থাকে। কেউ ধরতে পারে না। হাট ফেরত মানুষ রাস্তাতে তাকে দেখে ভয়ে ঢালুতে নেমে যায়। লালী ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে। ঠিক যে-পথে তাকে আয়নাল ও বশির তাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। দালালরা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিছুদূর এসে থেমে যায়। লালী রাস্তা ছেড়ে চকের মধ্যে দিয়ে অনেকদূর চলে গেছে। তাকে বিন্দু মত মনে হচ্ছে।

দৌড়াতে দৌড়াতে সন্ধ্যা নাগাদ লালী ময়নাদের উঠোনে পৌঁছায়। আবছা অন্ধকারে লালীকে দেখে আয়মা জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। আয়নাল বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে- সে কথা তার মনে থাকে না।


মন্তব্য