জন্মদিন

মানিকের গল্পের দুই পর্ব

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

মানিকের গল্পের দুই পর্ব

প্রণম্য কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় [১৯ মে, ১৯০৮-৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৬] বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ [৩ আগস্ট, ১৯৪৩-৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০]-এর সম্পাদনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'শ্রেষ্ঠ গল্প' প্রকাশিত হয় অবসর প্রকাশনা থেকে। গ্রন্থটির দীর্ঘ ভূমিকায় সম্পাদক কথাশিল্পী মানিকের রচনাকৌশল নিয়ে তীক্ষষ্ট আলোচনা করেছেন। সেখান থেকে নির্বাচিত অংশ কথাশিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে পত্রস্থ হলো...

১৯৪৩ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। আমরা এই হিশেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পগুচ্ছকে ভাগ করবো দুটি পর্যায়ে : ১৯২৮-৪৩- প্রথম পর্যায়; ১৯৪৪-৫৬- দ্বিতীয় পর্যায়। এই বিভাজন কিছুটা কৃত্রিমভাবেই সাধিত হলো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের তালিকা প্রকাশিত হলে ১৯৪৪-এর আগে-পরের গল্পগুচ্ছকে চিহ্নিত করা যাবে- তার আগে নয়। গল্পের অন্তর্বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা এই দুই পর্যায়ের গল্পগুচ্ছ আলোচনা করবো। সেই হিশেবে ১৯৪৪-এর পরে প্রকাশিত 'ভেজাল' ও 'হলুদ পোড়া'কেও আমরা '৪৪-অন্তর্বর্তী ধারার গল্প হিশেবে ধরছি। গল্পসংগ্রহগুলো বাদ দিয়ে মানিকের ষোলোটি গল্পগ্রন্থের ঠিক অর্ধেকাংশ আটটি গল্পগ্রন্থকে আমরা প্রথম পর্যায়ের আলোচ্য গল্পগ্রন্থ হিশেবে গ্রহণ করেছি ('অতসী মামী' ১৯৩৫; 'প্রাগৈতিহাসিক' ১৯৩৭; 'মিহি ও মোটা কাহিনী' ১৯৩৮; 'সরীসৃপ' ১৯৩৯; 'বৌ' ১৯৪৩/১৯৪৬; 'সমুদ্রের স্বাদ' ১৯৪৩; 'ভেজাল' ১৯৪০; 'হলুদ পোড়া' ১৯৪৫)। কার্যত ১৯৪৬-এ প্রকাশিত 'বৌ' গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ পর্যন্ত আমাদের আলোচনাপরিধি বিস্তৃত। দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্পগ্রন্থ হিশেবে থাকছে বাকি আটটি গল্পগ্রন্থ ('আজ কাল পরশুর গল্প, ১৯৪৬; 'পরিস্থিতি' ১৯৪৬; 'খতিয়ান' ১৯৪৭; 'মাটির মাশুল' ১৯৪৮; 'ছোট বড়' ১৯৪৮; 'ছোট বকুলপুরের যাত্রী' ১৯৪৯; 'ফেরিওলা' ১৯৫৩; 'লাজুকলতা' ১৯৫৪)।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পগুচ্ছকে এই যে দুটি পর্যায়ে বিভাজন করে নিয়েছি (বা কেউ কেউ করেছেন তিনটি স্তরে) এর কোনোটাই জল-অচল বিভাজ্য কোনো ব্যাপার নয়। মানিক চিরকালই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের রূপকার। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ 'প্রাগৈতিহাসিক'-এর একটি গল্পে প্রাসঙ্গিক যে-কথাগুলি মানিক বলেছেন, তা-ই প্রমাণ করে নিম্নবিত্তের জীবনের বিপুল বিচিত্রতা কীভাবে তাকে আকর্ষণ করে, তার রহস্য উন্মোচন 'অনেক ভদ্রলোকের চেয়ে ওরা বেশি চিন্তা করে। জীবনের এমন অনেক সত্যের সন্ধান ওরা পায়, বহু শিক্ষিত সমার্জিত মনের দিগন্তে যাহার আভাস নাই। কবির নেশা নারী, চোরের নেশা চুরি।... সংসারে এমন লক্ষ লক্ষ সাধু আছে, যাহাদের লইয়া আমি গল্প লিখিতে পারি না। জীবনে তাহাদের গল্প নাই। প্রেমিকের মতো, অন্যায় অসঙ্গত চুরি-করা প্রেমের ব্যুৎপন্ন প্রেমিকের মতো চোরের জীবন গল্পময়।' ('চোর', 'প্রাগৈতিহাসিক') সামগ্রিকভাবে নিম্নবিত্তের জীবন চিত্রণেই মানিকের কুশলতা ও আনন্দ বেশি- ডাকাত থেকে ভিক্ষুকে পরিণত ভিখু-তে যার সূচনা হয়েছিল। ('প্রাগৈতিহাসিক')

'অতসী মামী' গল্পটি যেন অব্যবহিত-পূর্ব কল্লোল ধারাবাহিকতার চিহ্ন ধরে রেখেছে। এই গল্পের নায়কের যক্ষ্ণারোগে মৃত্যু কল্লোলের গল্প-উপন্যাসের একটি সাধারণ লক্ষণ। 'অতসী মামী' গল্পগ্রন্থের অনেকগুলি গল্পের নায়িকাই- পরিস্কার বোঝা যায়, কল্লোলী নায়িকাদের লক্ষণাক্রান্ত- অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বা প্রবোধকুমার সান্যালের নায়িকাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক টের পাওয়া যায়। মানিকের 'দিবারাত্রির কাব্য' (১৯৩৫) উপন্যাসের নায়িকার মতোই রোমান্টিক। মানিকের নায়িকারা ক্রমশ রোমান্টিকতামুক্ত বাস্তব ভিত্তিতে অধিষ্ঠান করে। চরিত্রের কুহেলি-প্রহেলির জায়গায় দেখা যায় একটু-বা মনোবিকলনী আবহ। কিন্তু 'অতসী মামী' গল্পগ্রন্থের রচনাকাল অনুযায়ী সজ্জিত গল্পগুচ্ছে দেখা যাবে মানিক ক্রমশ স্বভূমিতে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। ঐ গ্রন্থের সর্বশেষ গল্পের নাম 'সর্পিল'- মানিক। ক্রমশ মনোপৃথিবীর সর্পিলতায় প্রবেশ করছেন এই ইঙ্গিত দ্যায়। যেটুকু রোমান্টিকতার ফেনা ছিলো তা কেটে গেলো মানিকের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থেই। 'প্রাগৈতিহাসিক' (১৯৩৭) এমন একটি গল্পগ্রস্থ, যেখানে মানিক নিজেকে দাঁড় করালেন বস্তুভিত্তির উপরে। দরকার ছিলো মধ্যবিত্ত রোমান্টিকতার জগৎ থেকে মধ্যবিত্ত আর। নিম্নবিত্তের বস্তুবাদী জগতে মানিকের চলে আসা। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থেই মানিক নিজস্বতা পেলেন।

আশ্চর্য যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্প, 'অতসী মামী' গল্পটাই, চলতি ভাষায় লেখা। 'অতসী মামী' গল্পগ্রন্থের গল্পগুলি সাধু ও চলতি দুই রীতিতেই লেখা হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী গল্পগ্রন্থ 'প্রাগৈতিহাসিক'-এ, দেখা যাচ্ছে, মানিক কেবলমাত্র সাধুরীতিই অবলম্বন করেছেন। সাধু ও চলতি দুই রীতিতেই মানিক স্বচ্ছন্দ তা ঠিক, কিন্তু মানিকের সাফল্য সম্ভবত সাধু রীতিতেই উজ্জ্বলতর। 'প্রাগৈতিহাসিক' গ্রন্থের সবগুলি গল্পই সাধুরীতির। মানিক যখন স্বভূমিতে উত্তীর্ণ ও অধিষ্ঠিত হলেন, তখন দেখা যাচ্ছে সাধু গদ্যই তার অবলম্বন। কিন্তু গদ্যভাষার কথা নয়, 'প্রাগৈতিহাসিক' বইয়ের গল্পগুচ্ছে মানিকের অভীষ্ট হয়ে উঠলো মানুষের মনোজগতের রহস্য উন্মোচন।

দুই.

দ্বিতীয় পর্যায়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের প্রধান লক্ষণ কালচেতনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, স্বাধীনতার মোহভঙ্গ- অনেক গল্পের পৃষ্ঠপট রচনা করেছে। মধ্যবিত্ত জীবন থেকে তার দৃষ্টি ক্রমশ চলে এসেছে অনেকখানি নিম্নবিত্তে। অন্তর্বাস্তবতা কখনো তিনি পরিবর্জন করেননি, বহির্বাস্তবতা এখন বড়ো জায়গা দখল করেছে। মনোজগতের চিত্রণের চেয়ে বহির্জগতের চিত্রণ হয়ে উঠেছে প্রধান। এক-একটি গল্পে তাই অনেক সময়ই দেখা গেছে ভিড় করে আছে অজস্র চরিত্র। মানিক নিজেই অনেক সময় তার সচেতনতার কথা জানিয়েছেন : 'আড়াই বছর বয়স থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস আমি মোটামুটি জেনেছি।' ('কেন লিখি'১৪) "ছেলেবেলা থেকে 'কেন?' নামক মানসিক রোগে ভুগছি, ছোটো বড়ো সব বিষয়ের মর্মভেদ করার অদম্য আগ্রহ যে রোগের প্রধান লক্ষণ।" ('গল্প লেখার গল্প') দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষে 'কেন?'-র স্পষ্ট জবাব দেবার চেষ্টা করেছেন গল্পের মধ্যেই। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাই গল্পের নাম হয় 'ছিনিয়ে খায়নি কেন', 'গলায় দড়ির কেন', 'মানুষ কাঁদে কেন' এ রকম। এখন আর গল্পের নাম হচ্ছে না 'সরীসৃপ', 'সর্পিল', 'প্রাগৈতিকহাসিক'। এখন নামের মধ্যেই উদ্দেশ্যমূলকতা পরিস্কার ধরা পড়ছে কখনো কখনো : 'ঠাই নাই ঠাই চাই', 'আর না কান্না', 'মরবো না শস্তায়', 'সবার আগে চাই' ইত্যাদি। এই পর্যায়ে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধে মানিক তার বাস্তবতার আরাধনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তার মধ্যে আদর্শিকতা যে কী প্রবল ছিলো তারও প্রকাশ ঘটেছে : 'লেখক কে? পিতার মতো যিনি দেশের মানুষকে সন্তানের মতো জীবনাদর্শ বুঝিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন। পিতার মতো, গুরুর মতো জীবনের নিয়ম অনিয়ম, বাঁচার নিয়ম অনিয়ম শেখান বলেই অল্পবয়সী লেখক-শিল্পীও জাতির কাছে পিতার মতো, গুরুর মতো সম্মান পান।' ('সাহিত্য সমালোচনা প্রসঙ্গ') বাস্তবিকতা আর আদর্শিকতার সমন্বয় মানিকের দ্বিতীয় পর্যায়ের ছোটোগল্পের একটি প্রধান বিশিষ্টতা।

সমকালীন দেশ-কাল ধারণের চেষ্টা শুরু হয় মানিকের 'আজ কাল পরশুর গল্প' (১৯৪৬) গল্পগ্রন্থ থেকে। এই পরিবর্তনের শুরু আসলে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের কাল থেকে। চিন্মহোন সেহানবীশেরা একটু অবাকই হয়েছিলেন মানিকের কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করায়। প্রথম থেকেই মানিক সমাজের নীচুতলার জীবনযাপনের রূপদাতা। সংবেদী মানিক 'পদ্মানদীর মাঝি' (১৯৩৬) উপন্যাসেই কি এই পঙ্‌ক্তিগুলি রচনা করেননি? 'ঘুমে ও শ্রান্তিতে কুবেরের চোখ দুটি বুজিয়া আসিতে চায় আর সেই নিমীলনপিপাসু চোখে রাগে দুঃখে আসিতে চায় জল। গরীবের মধ্যে সে গরীব, ছোট লোকের মধ্যে আরো বেশি ছোট লোক। এমনভাবে তাহাকে বঞ্চিত করিবার অধিকারটা সকলে তাই প্রথার মতো, সামাজিক ও ধর্মসম্পর্কীয় দশটা নিয়মের মতো অসংকোচে গ্রহণ করিয়াছে। সে প্রতিবাদ করিতে পারিবে না। মনে মনে সকলেই যাহা জানে মুখ ফুটিয়া তাহা বলিবার অধিকার তাহার নাই। 'পদ্মানদীর মাঝি'র নায়ক কুবেরের বর্ণনা এই। উত্তরকালে এই কুবেররাই মানিকসাহিত্যে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী। কুবের যে-জেলেপাড়ার অধিবাসী, তার বর্ণনা এ রকম : 'জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণ্ণ। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়। আর দেশী মদে। তালের রস গাজিয়া যে মদ হয়, ক্ষুধার অন্ন পচিয়া যে মদ হয়। ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।' উত্তরকালের যে-পরিবর্তিত মানিক, এখানে কি তাঁকে আমরা দেখছি না? -সুতরাং মানিকের কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করা, সাহিত্যদৃষ্টির পরিবর্তন কোনো আকস্মিকতার ফল নয়- ধারাবাহিকতার ফল। প্রথম পর্যায়েই মানিক অসাধারণ গল্প লিখেছেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে লিখতে পারেননি এই উক্তি অযথার্থ।

কয়েকটি গল্পে আছে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের মানুষের অপরিবর্তিত ভাগ্যলেখার বিপন্নতার প্রতিচিত্রণ। এ রকম একটি গল্প 'সখী' (ছোটবকুলপুরের যাত্রী)। রানী আর বিভা দুই সখী। বিভার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে রানী। কিছুক্ষণ পরেই বোঝা গেলো দুই সখী দাঁড়িয়ে আছে একই সমতলে- চূড়ান্ত অভাবের মধ্যে। গল্প শেষ হয় এক অপরাজেয় প্রতিজ্ঞায় :'কী আছে অত ভয় পাবার, ভাবনা করার? সংসারে কুলি-মজুরও তো বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।'

'আর না কান্না' গল্পে কাহিনী থামিয়ে (গল্পের মাঝপথে) মানিকের অদ্ভুত আত্মঘোষণা : 'হে রাত আটটার তারায়-ভরা আকাশ, একবার বিদীর্ণ হও। কোটি বজ্রের গর্জনে ফেটে চৌচির হয়ে যাও। আমার বাংলার ছেলেমেয়েরা আজ খিদেয় কাতর হয়ে একখানা রুটির জন্য, একমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম শুরু করেছে নিরুপায় মায়ের সঙ্গে।'

মানিকের দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্পগুচ্ছে উঠে এসেছে সমকালীন দেশ-কাল : দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, 'ঝুটা' স্বাধীনতা, রাজনীতি, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের সংগ্রামমুখর জীবন, প্রতিবাদ, শ্রেণীসাম্য, জিজীবিষা। কিন্তু একরৈখিক নন। এখানেও- বহুমাত্রিক, বহুস্তর, বহির্বাস্তবের সঙ্গে এখানেও দেখা গেছে অন্তর্বাস্তব, শ্রেণীচেতনার কথা বললেও যৌনচেতনাকে অস্বীকার করেননি এখানেও। এখানেও মানিক মানিক।


মন্তব্য