লালনের রাজনীতি

আমাদের নিজস্বতার বয়ান

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

 আমাদের নিজস্বতার বয়ান

লালনের রাজনীতি, লেখক-মামুন আল মোস্তফা, প্রকাশক-প্রথমা, প্রকাশকাল-ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মূল্য-৩২০ টাকা

  রিপন ইউসুফ

লালন সাঁই আমাদের মাঝে পরিচিত একজন মরমি সাধক হিসেবে। আর এই ধারণার একাডেমিক পথচলা শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে, যা আজও সর্বমহলে সমাদর পাচ্ছে। আর বর্তমান সময়ে লালনের জনপ্রিয়তা হতে পারে দুটি কারণে। এক. লালনের গানের কথার মর্ম ঠিক কী তা বোঝার আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের মাঝে। নয়তো, দুই. সমাজের ধনিক শ্রেণী নিজেদের সুবিধার অংশটুকু লালনের কাছ থেকে নিয়ে লালনকে বাজারজাত করছেন বলে। তবে যেভাবেই হোক, লালন সাঁই আমাদের মাঝে একজন গীতিকার, সুরকার আর মরমি সাধক হিসেবেই অধিক পরিচিত। তবে, এই বিদ্যমান চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং লালনকে নিয়ে নতুন চিন্তার একটি পথ খুলতে মামুন আল মোস্তফা হাজির হয়েছেন 'লালনের রাজনীতি' নামক একটি বই নিয়ে।

বাঙালীর নিজস্বতা নেই বলে এক ধরনের হাহাকার আমাদের সমাজের মধ্যে বিদ্যমান। আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রে রয়েছে যে, রাজনৈতিক তত্ত্ব অথবা দর্শন কিংবা ধর্ম সে যাই হোক, তা সমস্তটাই পশ্চিমাদের। সেই হেতু যা কিছু ভালো, মহান এবং চির কল্যাণকর, তার সবই পশ্চিমা। বাঙালিদের এসব কিছুই নেই। আর নেই বলে পশ্চিমাদের তৈরি করা 'গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ'-এর দিকেই আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে। আর একের পর এক রেপ্লিকা বানিয়ে যেতে হবে শহর নগর রাজনীতি ধর্ম এসবের। কিন্তু এর ফলে যে বিদ্যমান সমাজ-রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে বস্তুত তা কতোটা ন্যায্য, এই প্রশ্ন করা এখন বাঙালির আত্মানুসন্ধানের জন্যই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও লালন এই প্রশ্নটি বহু আগেই করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, এইসব বিদ্যমান সমাজ-রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহের গণপর্যালোচনা জাগ্রত থাকুক। আর এর ফলে ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক প্রেক্ষাপটে যে 'অন্যায্য' সমাজ তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিটি সবার কাছে পরিস্কার হবে। এবং এই রকম চলতে থাকলে, দীর্ঘদিন যাবৎ যে প্রতিষ্ঠানগুলো (যে কোনো ধরনের) সামাজিক বৈধতা পেয়ে আসছিল সেই বৈধতার পুনরুৎপাদন বন্ধ হবে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই পুনরুৎপাদন বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন আছে কি? আবার, এতো আগেই যে প্রশ্নটি করা হয়েছিল, তা থেমে গেল কেন? অথবা আশঙ্কা জাগতে পারে যে, এই প্রশ্ন উত্থাপন করে আমরা কি তবে, আবার অতীতের ধ্যান-ধারণায় ফিরে যাচ্ছি! আসলে এমন প্রশ্ন কিংবা আশঙ্কার মোকাবেলা করতে হলে প্রথমেই আমাদের যে বিষয়টা আমলে নেওয়া উচিত তা হলো, আমাদের সমাজের গতিশীল জ্ঞান ও চিন্তার রূপখানা কী ধরনের। আমরা সাধারণজনরা কীভাবে এই জ্ঞান ও চিন্তার কাছে পৌঁছাচ্ছি। মজার বিষয় হচ্ছে, সমাজে জ্ঞান ও চিন্তার দুই ধরনের নিয়ন্ত্রক বিদ্যমান। একটি হচ্ছে আধিপত্যশীলদের জ্ঞান, আরেকটি হচ্ছে ব্রাত্যজনদের জ্ঞান। যেখানে আধিপত্যশীলরা ব্রাত্যজনদের জ্ঞানকে হীন মনে করে। এবং প্রায়শই ব্রাত্যজনদের এসব জ্ঞান ও চিন্তাকে ঠেকাতে এদের ধারক ও বাহককে সমালোচনা করে ও অযথা এক ধরনের মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করে।

লালনের সময়ে এইসব আধিপত্যশীল জ্ঞানের বাহকরা ছিলেন বহিরাগত, যারা অস্ত্রের সাহায্যে এখানে এসে এই দেশীয় দোসরদের সহায়তায় এই দেশের মূল ধারাকে বানিয়েছে ব্রাত্য। যদিও এই প্রক্রিয়া শুরুর ইতিহাস আরো অতীতে। ফলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে আমরা এক দীর্ঘ অধঃপতনের দিকে যাত্রা করেছি। এবং আমরা নিজেদেরে জানার নূ্যনতম প্রশ্নটিও করতে ভুলে গেছি। তাই আমরা এখনো একক বাঙালি জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারিনি। ফলত অন্যায্য সমাজের বৈধতা পাওয়ার পুনরুৎপাদন বন্ধ হওয়াটা সময়ের দাবি। এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ন্যায্য বাঙালি সমাজ তৈরি করতে আমরা বহিরাগত কোনো ধ্যান-ধারণার মুখাপেক্ষী না হয়ে আমাদের নিজস্ব জ্ঞান ও চিন্তার দ্বারস্থ হয়েই যে, তা গড়ে নিতে পারি, তারই এক তাত্ত্বিক বয়ান হাজির করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা। তাই লালনের রাজনীতি বইটি শুধু লালনকেই ভিন্নভাবে দেখার দৃষ্টি তৈরি করবে না, সেই সাথে এটি সাহায্য করবে জানতে আমাদের নিজস্বতাকেও।


মন্তব্য