বইয়ের ভুবন

স্বপ্ন-বাস্তবতার শব্দাবলি

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯

স্বপ্ন-বাস্তবতার শব্দাবলি

কালো জোছনায় লাল তারা, লেখক-আব্দুল্লাহ শুভ্র, প্রকাশক-অন্বেষা প্রকাশন, প্রকাশকাল-ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মূল্য-২০০ টাকা

  ইমরুল কায়েস

'দুর্নামে সঙ্গিন হয়েছে আমার কলম,

আদি পৃষ্ঠে লিখে চলে কালি,

লিখে চলে স্বীকারোক্তিনামা।'

এভাবেই শুরু, এভাবেই ক্রমশ কবিতার নিবিড় গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যাবেন পাঠক। অবশেষে দেখতে পাবেন, কাব্যভাবনার দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছেন আব্দুল্লাহ শুভ্র, হাতে 'কালো জোছনার লাল তারা'। নতুন ও প্রাণগ্রাহী ৯৬টি কবিতার এ সংকলনে পাঠক নতুন করে নিজেকে আবিস্কার করতে পারবেন। কবিতাগুলোতে উঠে এসেছে নিজেকে মেলে ধরবার প্রয়াস।

শূন্য দশকের কবিতা ও কাব্যচেতনা প্রথম দশকে এসে কিছুটা বাঁক বদলেছে। আর এই বাঁক বদলের ধারাবাহিকতার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করেন কবি আর বলে ওঠেন, 'পৃথিবী কি খুলে দিল আজ কামিনীর খিলান'। কবিতার অবকাঠামোগত বিনির্মাণ ও আত্মচেতনে ভরা কবিতাগুলো চোখের পলকে পড়ে ফেলা যায়।

প্রথাগত বা প্রথাবিরোধী এমন ভাবনায় না যাই। আমরা বরং ভাবি কী নেই এ কবিতাগুলোতে। প্রকৃতি, প্রেম, কাব্যিক ব্যঞ্জনা, নিসর্গপ্রীতি, সরল নৈঃশব্দ্য, ঘৃণা, ক্রোধ, অবদমন, যৌনতা, অবগাহন, শ্নাঘা, চৈতন্যবোধ এবং 'জাতিস্মর লেখক হয়ে একাত্তরের একফালি নীল কেটে আনি'- এ সবই আছে কবিতায়। সরলরৈখিক কবিতাগুলো মানব-অস্তিত্বের আর্তনাদ, বিচিত্র মাত্রা, প্রশ্ন-দীর্ণতা আর প্রস্তাবনা-ভঙ্গিতে ঠাসা। সেই সাথে সমকালমুখরতা, বিক্ষোভ-মত্ততা কবিতাগুলোর শরীরে দেদীপ্যমান। কবির কাব্যবিশ্বের প্রাথমিক বিশুদ্ধতা এই যে, তাঁর লেখা কবিতাগুলো স্বপ্ন আর বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ। পাঠক বুঝবেন, কবিতাগুলো তাদের নিজস্ব ভূমিতেই আত্মচারী, বিস্ময়বোধে নিমগ্ন এবং নিশ্চয়ই স্ববিরোধহীন।

আব্দুল্লাহ শুভ্র নাগরিক কবি। তবে তাঁর কবিতায় ক্লিশে নাগরিকতা নেই, আছে স্বল্প ও নির্বাহুল্য বর্ণনা। সবুজ প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি অদম্য ভালোবাসা ধারণ করেও তিনি চিরন্তন এই নগর-যন্ত্রণাকে আত্মস্থ করেছেন, আপন ভঙ্গিতে- আত্মমগ্নতায়। মাঝে মাঝে নাগরিক কোলাহলে ব্যথিত হন, তবুও মেনে নেন এই রূঢ় বাস্তবতাকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা ব্লেকের মতো কবিতায় ছড়িয়ে দেন নান্দনিক সারল্য। নান্দনিক কৌশলে প্রণীত কাব্যিক সুষমায় বলিষ্ঠ তাঁর কবিতাগুলো।

সামাজিক দায়বদ্ধতা আর রোমান্টিক-মানস নিয়েই তাঁর কবিতা নন্দন-বীক্ষায় উন্মোচিত। শিল্পচেতনা তাঁর প্রার্থিত বিষয়, কিন্তু তা মোটেও বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে নয়। কবি তাঁর ব্যক্তিক উপলব্ধি কিছু পরিচিত দৃশ্যের ভেতর গভীর আঙ্গিকচেতনায় নিজের অস্তিত্বের স্পর্শ রেখেই আলোকিত করেন। কবিতার মাধ্যমে উপস্থাপিত সব বিষয়ই আমাদের খুব পরিচিত- তবুও তা নান্দনিক চেতনার এক প্রাণস্পন্দন তৈরি করে।

কয়েকটি কবিতায় কবি সামাজিক অসম্পূর্ণতাকে আবেগের প্রশ্রয়ে বুনন করে কবিতার শিল্পরূপটিকে নির্ভার করে তোলেন। কবিতার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাকে তুলে ধরলেও কবিতার শিল্পগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে নন্দনচিন্তায়। কখনও সে চিন্তা প্রতিবাদের, কখনও প্রেমের আবার কখনও-বা ফ্রয়েডীয় দার্শনিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ। তাঁর দুটি কবিতায় ফ্রয়েডীয় 'লিবিডো-চেতনা' স্পষ্ট।

'কালো জোছনার লাল তারা' বইয়ের কবিতাগুলো নারী ও নিসর্গ, কবিতা ও মৃত্যু- রোমান্টিকতার সব সড়কেই পদচারণা করেছে। রোমান্টিকতার গুণগুলোর কারণে তাঁর কবিতায় নারী যতটা না শরীরী, তার চেয়েও বেশি কল্পলোকবাসিনী বা অধরা। তাঁর কবিতায় বিচ্ছেদ এক অদ্ভুত নান্দনিকতা নিয়ে উপস্থিত। এখানে বিচ্ছেদ যেন শিল্পের দায়বদ্ধতা। আর সব শেষে, তাঁর কবিতা যেন রোমান্টিক-মানসের সগৌরব উপস্থাপনা।


মন্তব্য