চারকোলের কালো ও অ্যাক্রিলিকের আভায়

চিত্রকর্ম ::ইয়ুথ আনলিশড।। শিল্পী ::অনুকূল চন্দ্র মজুমদার

  সঞ্জয় ঘোষ

কী এঁকেছেন, কী নিয়ে এঁকেছেন- এসব ভাবনার চেয়ে 'কীভাবে এঁকেছেন'- এই প্রশ্নই অনেক শিল্পীর ছবি দেখলে প্রথম এবং প্রধান হয়ে ওঠে দর্শক-মনে। শিল্পী অনুকূল চন্দ্র মজুমদারের কাজ ঠিক সেই রকম। তার চলমান একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে তেমনটাই মনে হলো শুরুতে।

গুলশানের এজ গ্যালারিতে উঅডঘ ঙঋ ইখঅঈক শিরোনামের এ প্রদর্শনীতে অনুকূল মজুমদারের কালোকে পাওয়া গেল লাল নীল ধূসর সবুজ এবং আরও কিছু বিচিত্র রঙের জমিনে। যেন বিচিত্র চিন্তাদেশে কালোর সাম্রাজ্য। সব কালোই রেখায়, কিছু কিছু চারকোলের ঘষায় ঘষায়। রেখা ও ছড়ানো ছিটানো ঘষায় সব চিত্রকর্মের বিষয়াবয়ব নির্মিত হয়েছে চারকোলে। সব কাজেই আবার গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহূত হয়েছে অ্যাক্রিলিক। কাগজে অ্যাক্রিলিক ও চারকোলের যুগপৎ উপস্থিতিতেই তৈরি হয়েছে কালো রঙের ভোর, সামার সং, রেড সং, ইয়েলো সং, মা ও শিশু, শীতের সকাল, প্রথম প্রেম, আকাশের গল্প, সময়ের গল্প, কুয়াশার গল্প, ভোর হবার গল্প আর এইসব দিনরাত্রি। আর এইসব বিষয়ের ভেতর দিয়ে শিল্পীর দৃশ্যকল্পনা, করণকৌশল ও আবিস্কার ছাপিয়ে যা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছেম তা হলো আমাদের এই শহর ঢাকা এবং নদী। সামার ইন ঢাকা, উইন্টার ইন ঢাকা, আফটারনুন ইন ঢাকা, ইভিনিং ইন সদরঘাট, বাস্কিং অ্যাট বুড়িগঙ্গা- এমন শিরোনামগুলো তো চোখে পড়ছেই; সেই সাথে ছবিতেও তারা উপস্থিত। শিল্পী নিজেও তার লেখায় বলেছেন এই নদী ও শহরের কথা। বলেছেন, তার মা তাকে এইসব নদী, শহর, পাহাড়-পর্বতের গল্প বলতো। আর বলতো সেইসব প্রাচীন বৃক্ষের কথা, যারা কোনো বিনিময় ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে তাদের ছায়া দেয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। শিল্পী এসবকেই তার নিজস্ব শিল্পভঙ্গিতে প্রক্ষেপণ করেছেন তার কাজে।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ৭৭টি ছবি গত প্রায় এক দশকে অনুকূল মজুমদারের শিল্পপ্রচেষ্টা ও বাংলাদেশের চিত্রসৃজনের সমসাময়িক অভিজ্ঞতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ শিল্পীর চিন্তা ও দক্ষতাকে তুলে ধরছে। দক্ষতা, করণকৌশল ও চিত্রে নবতর নিরীক্ষা আয়োজনের দিক দিয়ে উলেল্গখযোগ্য অনুকূল মজুমদারের কাজ।

প্রদর্শনীর মোট কাজগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মোটা দাগে কিছু ভাগে ভাগ করা যায়। অনেক কাজকে চিত্রতলে অ্যাক্রিলিকে নানামাত্রার একাধিক স্তর নির্মাণ এবং তাদেরকে মৃদু ও স্পষ্ট করে তোলায়, আর চারকোলের টানগুলোর সূক্ষ্ণতা ও অমসৃণতার মিশেলে বিশৃঙ্খলতারই এক ধরনের শৃঙ্খলা তৈরির ভিত্তিতে একদলভুক্ত করে দেখা যায়। এ কাজগুলোর বেশিরভাগেই আধাবিমূর্ত অবয়বের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। শহর ও জীবনযাত্রায় ব্যস্ত মানুষের অবয়ব যেমন আছে, আবার আছে নিছক প্রকৃতি ও পথ-ঘাটের উপস্থিতি। তবে এর সবই চারকোলের সচেতন ডিস্টর্শন এবং কোথাও কোথাও নিরেট রেখার মাধ্যমেই মূর্ত হতে হতে যেন মিলিয়ে যাওয়া। সব ছবিতেই চারকোলে কাগজে অনুকূল মজুমদার নির্মিত জনজীবনের ক্যাওয়াজের নিচে চিত্রতলে টের পাওয়া যায় হালকা ধূসর সাদা অ্যাক্রিলিকের উপস্থিতি। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে, যেখানে শিল্পী চিত্রতলে লাল হলুদ সবুজের মতো তীব্রতাও বিছিয়ে দিয়েছেন চারকোলের কালো আঁচড় অবয়বের নিচে। এসব কাজে আবার সম্পূর্ণ চিত্রতলে যেমন লাল রঙ আছে, বেশ কিছুতে আছে খণ্ডিতভাবেও। অর্থাৎ চিত্রতলের অর্ধাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ এমন প্রয়োজনমতো শিল্পী রঙিন করেছেন তার ছবির জমিনকে। রঙের এই বৈচিত্র্যই আবার চারকোলের আঁচড়ের প্রকাশবৈচিত্র্যকে ত্বরান্বিত করেছে ছবিতে।

'রেড সং' চিত্রমালার ছবিগুলো এক্ষেত্রে অনন্য। আছে 'ইয়েলো সং'-এর প্রথম কাজটি, যেখানে ধূসর চিত্রতলে স্পেস বা শূন্যতার ব্যবহার আছে, যেটুকু অংশে চারকোলে আঁকা বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছে ঠিক সেটুকুজুড়েই হলুদ অ্যাক্রিলিক। শহর, জনজীবন হোক আর সম্পর্কে- অনুকূল মজুমদারের চারকোলের এসব আধাবিমূর্ত মানব অবয়ব বেঢপ। শরীর মোটা, মাথা সেই তুলনার সামঞ্জস্য রক্ষা করেনি। কোনো কোনো অবয়বে মাথা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে সমগ্র প্রদর্শনীর অবয়বগুলোর বৈশিষ্ট্যে সামঞ্জস্য আছে। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য ছাপিয়ে আরও একটি ব্যাপার চোখে পড়ে, যা হলো একই ছবিতে কয়েক রঙের খণ্ড খণ্ড অংশ এবং স্তরের ভেতরেই শিল্পী যে চারকোলের অবয়বগুলো স্থাপন করেছেন তাদের কোনো কোনোটর শরীর চারকোল দিয়ে ভরাট কালো, আবার কোনোটা ঠিক বিপরীত, কেবল রৈখিক। এই সবকিছু মিলিয়েই বড় কাজগুলো অনন্যতা পেয়েছে। অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির আবার উলল্গম্ব। অর্থাৎ '৭৬ সে.মি. বাই ২৪৪ সে.মি.' কাজও আছে। বলা যায়, কাজের ধরন থেকে শুরু করে আকৃতি, রঙ ব্যবহার, অবয়ব চিন্তা ও নির্মাণ, চারকোলের বিশৃঙ্খলার সামঞ্জস্য, বিমূর্ত-আধাবিমূর্তের মিশ্রণ- এমন বহুবিচিত্র উপস্থাপনের অস্থিরতার সৌন্দর্য পাওয়া যায় অনুকূল মজুমদারের কাজে। 'উইন্টার স্টোরি'র এ লম্বা কাজগুলো আবার আরেক রকম, বিমূর্তই। স্পেস, চারকোলের কালো ভরাট এবং তার ভেতরেই আবার স্পেসের ক্ষীণ মুখাবয়ব- যেন এক ধরনের বহুরৈখিকতার উপস্থাপন রেখায় ও চিন্তায়।

প্রকৃতিনির্ভর কাজগুলোর মধ্যে একটি কাজ 'উইন্টার ব্রিজ ২' প্রদর্শনীর আর সব কাজ থেকে আলাদা। বৃক্ষ-পাহাড়বেষ্টিত খোলা মাঠে তৃণভোজী গরু- এমন সচরাচর বিষয়দৃশ্যকে চারকোল আর অ্যাক্রিলিকের মিশ্রণে অনন্য করে তুলেছেন শিল্পী।

আর চারকোল ও অ্যাক্রিলিকের মিশ্রণেই এসব কাজ থেকে অবয়ব ও উপস্থাপনে আলাদা হয়ে উঠেছে যে কাজগুলো তা হলো, 'মাদার অ্যান্ড চাইল্ড' চিত্রমালা। মা ও শিশুর স্নেহাবয়বকে শিল্পী তার এই চিত্রপরিকল্পনার ভেতরেই প্রতিস্থাপিত করেছেন প্রদর্শনীতে বিরাজিত একেবারেই নিজের ভঙ্গিতে। যে ভঙ্গিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পার্থক্য স্পষ্ট না হয়ে বরং দলা পাকিয়ে নতুন উপস্থাপনের দিকে এগিয়েছে। আগামীকাল পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী।


মন্তব্য