প্রচ্ছদ

লড়ে যায় প্রমিথিউস

প্রকাশ : ১০ মে ২০১৯

লড়ে যায় প্রমিথিউস

ছবি ::আবদুর রাজ্জাক

  মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

কিছু মানুষ আছে, আঁধার পান করে করে আপন দেহে আলোর রোশনাই জ্বেলে নেয়। আঁধার শুষে তারা প্রজাপতির মতো রঙের বিকিরণ এই সৌরলোকে ছড়িয়ে দেয়। আবার আছে কেউ কেউ, পারে না। তারা ভেঙেচুরে, মুচড়িয়ে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে ভস্মের রূপ নেয়!

কেন হচ্ছে এমন? মানুষের ভেতর একটা খেলা চলছে। হরদম ছোটো ছোটো সুখগুলো যখন অল্প অল্প করে একত্রিত হয়ে তাদের মনের এককোণে সুখের ভাণ্ডার গড়তে চায়, অন্ততপক্ষে ওরা একটা স্থিতি নিতে সচেষ্ট হয়; আর ঠিক তক্ষুনি একটা ভীতির গোখরো ফণা তুলে সেই ভাণ্ডারে বসে পড়ে। ছোবলের ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়ে ভিতরটা। তখন যে ছোবল বসাবে! জীবনের সমস্ত গড়ে ওঠার সিঁড়িগুলোকে, সঞ্চয়টাকে তখন অনিরাপদ লাগে।

মানুষের মনের ভিতর সুখ হারানোর এ এক নিরন্তর দ্বন্দ্বের দোলাচল লেগেই রয়েছে। এর কোনো শেষ নাই। একটা ভালো কিছু পেতে চাইছো; চিলের মতো ছোঁ মেরে সেই ভাবনাতে খাঁমচি বসিয়ে দিল হতভাগা অবাধ্য মন। উঁহু, এ বোধহয় কপালে নাই। তারপর মনের সাথে আকাঙ্ক্ষার এক অবুঝ যুদ্ধ। কে কাকে গলাটিপে শেষ করতে পারে, তাই চলতে থাকে সারাক্ষণ।

আমার ভিতর এই কাণ্ডটা প্রতিনিয়ত চলে। চলুক। তবুও আমি আলোর পালক খুঁজে ফেরা পথিক। হার না মানাই আমার স্বভাব, বলা ভালো নিয়তিই হয়তো আমাকে এভাবে গড়েছে। এই যে এখন, নিথর মাংসপিণ্ডের মতো একটা দলা হয়ে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছি। শরীরের ভেতরে কোনো হাড় নাই। একটাও হাড়ের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি না। কোনো এক কালো জাদুতে শরীরের সবকটা হাড় গেছে বাতাসে মিলিয়ে। অথবা ভেতরে গলে গিয়েছে। শরীরে কোনো বল নাই। পুরো দেহটা হাড়বিহীন লেতলেতে। হাত, পা কেউ আমাকে যেন চেনে না। দুটো হাতের একটাও আমার কোনো ইচ্ছের আবেদন শুনছে না। আর দুই পা? নাহ! তারাও শুনছে না। কাউকেই নড়াতে চড়াতে পারি না। মাথা কিছু নড়াতে পারি। অন্তত দু'পাশে বহু কষ্টে হালকা করে ফেরাতে পারি। ব্যাস। অতটুকুই। চোখ দুটো দেখে। মাঝে মাঝে গরম পানি টপটপ করে গড়িয়ে নামে। মুছতে পারি না। হাত ওঠে না। আফরোজ মুছিয়ে দেয়। কিংবা পাশে কেউ থাকা দেখতে পেলে। তাও কিন্তু পরাজিত বোধ করছি না।

চোখ দিয়ে দেখি আশপাশ। বুঝতে পারি কখনো কিছু, কখনো কিছুই বুঝতে পারি না। মাথার ভেতর ধোঁয়াশে সবকিছু। পেছনোর দিনগুলোও সামনে পরিস্কার করে আসছে না। টের পাই কেবল সারা দেহজুড়ে তীব্র ব্যথা। মাথা হতে, কাঁধ, হাত, বুকের মাসল, পেটের মাসল, পায়ের সকল পেশি- কোনোটাই বাদ নাই। ব্যথার একটা ঢেউ আসে। ঘণ্টা খানেক বাদে কিছু কমে। বল্লম বিদ্ধ সাপের মতো হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায় মোচড় খেতে থাকে আমার দেহ। এভাবে লড়তে লড়তে ব্যথা কমতে থাকলে মনে হয়, এবার হয়তো বাঁচলাম। মরবো না। কিন্তু ভাবনাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ব্যথার ঢেউ আবার ধেয়ে আসে। আবারো। পুরো শরীরে তীব্র দাহ, ব্যথা। এ ব্যথা সহ্য করার মতো শক্তি কুলোয় না। মৃত্যু কামনা করি।

কিন্তু মরতে তো আমি চাই না। মরতে তো আমি পারি না। আমাকে বাঁচতে হবেই। বাঁচতে আমাকে হবেই। ভেতরে হিমালয়ের মতো প্রতিজ্ঞা অস্টম্ফুটে সাড়া দেয়। নিজের ভেতরে গুঞ্জন করি আমি জীবনের এক নবীন ডাক শুনবার। এরই ভেতর টিমটিম স্মৃতিতে বাচ্চা দুটোর কথা মনে পড়ে। বাসা থেকে বিদায় নেবার সময় একবার সিঁড়ির দরজার মুখে ছেলে দুটোকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার দুদিকে দুজন, শক্ত করে ধরে আছে। একদিকে আমার অফিস জার্মান দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত হারমান নিকোলাই। অন্যদিকে প্রশাসনের বাঙালি কর্মকর্তা পরিমল ভট্টাচার্য। আমি তখন জার্মান দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা। ফলে আমার অসুস্থতার খবর পেয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছুটে এসেছে। ঘরের ভেতরে আমার বৌ আফরোজকে জড়িয়ে ধরে গানের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ। উনিও এসেছে দেখতে। শুনেছেন, আমি হাঁটতে পারছি না। আর উনার সাথে এসেছে বাম রাজনীতি করা রিপন ভাই, পাথর মুখ করে দাঁড়িয়ে।

তিন নম্বর জিগাতলার বাসার চারতলা থেকে নিচে নামাবে ওরা দুজনে মিলে। হয়তো এ নামানোটাই আমার শেষ নেমে যাওয়া। নিচে নেমে গিয়ে হয়তো একেবারেই অনেক নিচে। যেখান হতে কেউ আর কোনোদিন ওপরে উঠে আসে না। মন কি একটু দুর্বল হয়ে গেল? রাজন্য আর সৌম্যকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আছি। একটা সেকেন্ড। ভাবলাম এ হয়তো আমার শেষ আলিঙ্গন। আর হয়তো কোনোদিন এই ছোট্ট বাসাটায় ফিরব না। আর কোনোদিন ছেলেদের সাথে খেলবো না। হাসবো না। ওদের আদর করবো না। ঘরের মেঝেতে বসে আমার সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্রান্তির সহকর্মীদের নিয়ে গান আর কবিতা পাঠে মত্ত হবো না। ঐ যে জানালার ধারে লেখার টেবিল। সেখানে আর বসবো না কাগজ নিয়ে, কম্পিউটারের কিবোর্ডে কখনোই আর আঙ্গুল চালাবো না। বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকরা টেলিফোন করে আর জিজ্ঞেস করবে না, মুরশেদ ভাই কেমন আছেন? একটা কবিতা দিতে হয় যে। কেউ চেয়ে বসবে, "সময় করে একটা গল্পই দেন মুরশেদ ভাই।" কিংবা ঔপন্যাসিক হরিপদ দত্ত মোবাইলে কল করে বলবে না, "আরে দাদা আমার পয়সা নাই। কল ব্যাক করেন তো। জরুরি কথা আছে। স্যার (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) আপনাকে একটা কথা কইতে কইসে।"

গতকাল বিকেলের দিকে যখন শরীর অনেক খারাপ, তক্ষুনি শমরিতা হাসপাতালে নেয়া হলো আমাকে। নিকোলাই ধানের বস্তার মতো পিঠে করে লিফট ছাড়া বাসার চারতলা থেকে একাই নামিয়ে এখানে এনেছে। এরপরই শুরু হলো সকলের ছোটাছুটি। একে একে আমাদের পরিবারের বড়রাও আসতে শুরু করলো। কোনো কেবিন খালি নাই। না থাকুক। ডাক্তার থেকে শুরু করে সকলেই উদ্বিগ্ন। ওরা সকলেই যেন আমাকে দেখতে পাচ্ছে, আমি ক্রমান্বয়ে ওদের সকলের চোখের সামনে সাদা কাফনের মোড়কে মুড়ে পড়বো। অতএব, আপাতত একখানে রাখলেই চলবে; কিন্তু জলদি করে ইনজেকশন শুরু করতে হবে। না হলে যে কোনো সময়ে আমি কোমায় চলে যেত পারি।

দুই.

শমরিতা হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন ডাক্তার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহমান সিদ্দিকির কাছে কাঠের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া পা টেনে এসেছিলাম দিন দুয়েক আগে, ৫ এপ্রিল। তিনি সব পরীক্ষা করে আমার বৌয়ের সামনেই আমাকে জানিয়েছিলেন, তার সন্দেহ আমি গুলেন ব্যারি সিনড্রোমে আক্রান্ত। এটা শুনে খুশিই হলাম। কেননা, আমার অবস্থা উপলব্ধি করে ভেবেছিলাম, ব্রেইন স্ট্রোক করেছে। ব্রেইন স্ট্রোক করলে হয় মরবো, না হয় মুখ হাত বাঁকা করে পঙ্গু! এটা চাই না। প্রায় বছর এগারো আগে আমার মোজভাই ডাক্তার মাসুদ ব্রেইন স্ট্রোক করেই বিদায় নিয়েছে মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সে। আমিও হয় তো সে পথেই যাত্রা করছি। মূলত ডাক্তারের কাছে আসার আগ পর্যন্তত্ম সে আতঙ্কেই আমার কেটেছে সময়। কিন্তু গুলেন ব্যারি সিনড্রোমের কথা শুনে ভাবলাম, মরছি না। অন্তরে যদিও ঝড়। তবে রোগটা সম্পর্কে জানি। অনেক বছর আগে সাংবাদিক বিভূরঞ্জন সরকারের চার বছরের পুত্র ঋত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে ছিল। দেখতে গিয়েছিলাম বাচ্চাটাকে। পিজির আইসিইউর বেডে কোমায়। আর বাইরে বিভূদা পাথরের মূর্তি। কণ্ঠ স্বাভাবিক রেখে জানতে চাইলাম পরিস্থিতি। বিভূদা কিছুটা অসংলগ্ন করেই উত্তর দিলেন, "এই যে ডাক্তারেরা কী যে বলছে দেখেন! বলছে আড়াই লাখ টাকা লাগবে পাঁচটা ইনজেকশন পরপর পাঁচ দিনে দিতে। একটা ইনজেকশনের দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা। কোথায় পাই এতো টাকা একসঙ্গে আমি!"

প্রথম জানায় চমকে গেলাম গুলেন বারি সিনড্রোম এর কথা শুনে। এ বিরল রোগে অনেক ক্ষেত্রেই বয়সে বড়রা আর ফিরে আসে না। কেউ দীর্ঘ জীবনের জন্যে তারা পঙ্গু হয়ে যায়; অথবা গুডবাই এন্ড ওয়ান ওয়ে টিকিট টু দ্য স্কাই। হবে না কেন? এক লক্ষ মানুষে একজন এ রোগে আক্রান্ত হয়। ১৯১৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গুলেন বারি সিনড্রোম রোগ চিহ্নিত হয় ফরাসি চিকিৎসক জর্জ গুলেন ও জিন আলেকজান্ডার বারির দ্বারা। তবে কেন এ রোগ হয়? একশত বছর পেরিয়ে গেলেও এ রোগের উৎস বিষয়ে এখনো কোনো সঠিক উত্তর তৈরি হয়নি। বলা হয় এটা ভাইরাসজনিত, আবার এর পরেই বলে, এখনো নিশ্চিত নয় এটা। সুতরাং অনিশ্চিত এ যাত্রায় মরণের ডাক আসাটাই পরিণতি। তবে বাচ্চারা বেঁচেই যায়। ঋত পঁয়তাল্লিশ দিন কোমায় ছিল। এরপর কোমা থেকে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।

ঋতের স্মৃতি পুরো চোখের সামনে আমার। দ্রুতই ভাবছি, হয়তো কোমায় চলে যাবো। কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রে বাঁচিয়ে রাখবে আমাকে। ওই যন্ত্র লাগানোর সময় কষ্ট পাবো ঠিকই। কিন্তু মরবো না। কোমা থেকে ঠিকই ফিরে আসবো। আবার স্বাভাবিক জীবন পাবো ফিরে। সাহস সঞ্চয় করে ডাক্তারের দিকে তাকালাম।

ডাক্তার সিদ্দিক বিমর্ষ মুখে জানতে চাইলেন, পরিবারের সচ্ছলতা, সন্তানদের বয়স। আফরোজ সব জানালো। হুম .. . করে একটা গুরুগম্ভীর শব্দে প্রতি-উত্তর। আমি হাসপাতালে থাকতে চাইলে উনি বললেন, যদি অবস্থা খারাপ হয়, তখন উনার হাসপাতালে ভর্তি হলেই চলবে।

তিন.

দু'দিন বাদেই সাত এপ্রিল অবস্থা অনেক খারাপ। এত দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাবে স্বয়ং ডাক্তারও ভাবেননি। আমার চোখে মৃত্যুকে আলিঙ্গনের নেশা। ঘুমে ঢুলছে চোখ। সে ঘোরের ঘুম কাটছে না। আমাকে বাঁচাতে গেলে এখনই ইনজেকশন দরকার। ইন্টারভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন [Intravenous immunoglobulin (IVIG)] ইনজেকশন দেয়া গেলে আমাকে কোমায় চলে যওয়া থেকে হয়তো রক্ষা করা যাবে।

কিন্তু এত টাকা কেউ তো পকেটে নিয়ে ঘুরে না। এই মুহূর্তে ষাট হাজার টাকা লাগবে। আমার দু ব্যাংকে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা। এটিএম কার্ড আছে দুটোর। পাসওয়ার্ড মনে পড়ছে না। ফলে সকলেই আপন আপন পকেট হাতড়ে যে যা পারছে টেবিল জমা করছে। সকলের হাত খরচের টাকা মিলিয়ে হাজার পনেরো। রাত বাড়ছে। হাসপাতালের বেডে আমি ধীরে নিস্তেজ হচ্ছি। টাকা প্রস্তুত করার পাশাপাশি ইন্টারভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনজেকশন কোথায় পাওয়া যাবে, তারও খোঁজ চলছে। প্রতি মুহূর্তে সকলের মোবাইল ফোন বেজে উঠছে।

অনেক সাংবাদিক বন্ধু জেনেছে আমার খবর। তারাও মাঠে নেমেছে ইনজেকশনের খোঁজে। হাসপাতাল থেকে নিকোলাই আর আমার বড় ভাই ডক্টর শহিদ মিলে এক গাড়িতে, অন্য গাড়িতে পরিমল। দুটো দল দুদিকে ছুুটছে। আর হাসপাতালে আমার বৌ আফরোজসহ অন্যরা মিলে টাকা যোগাড়ে ব্যস্ত। এমন অনিশ্চয়তার মাঝেই আমাদের বন্ধু কমা- মেজর মায়াজ আর ওর বৌ আইরিন এলো। টাকার কথা উঠতেই দেবদূতের মতো মায়াজ ব্যাগ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার বের করলো। ওদের বাসার কাজের জন্যে একটু আগেই টাকাটা এটিএম বুথ থেকে তুলেছে। সে টাকা নিয়েই মায়াজ ছুটলো বাইক নিয়ে নিকোলাই আর বড় ভাইয়ের টিমটাকে ধরতে।

মাঝ রাতে অস্ম্ফুটে কানে এলো বিছানার পাশে কয়েকজন কথা বলছে, একটা ইনজেকশন পাওয়া গেছে। পুরান ঢাকায় ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনজেকশন পেয়েছে পঁয়ষট্টি হাজার টাকায়। কিন্তু বাকি চারটা? কালকে দেখা যাবে। এখন তো শুরু হোক প্রথমটা। এসব কথার ভেতরেই ঘুমের অতল তল থেকে টের পেলাম চোখের সীমানায় মানুষজনের মুখ। কোনটা ঝুঁকে। কোনটা দূরে। সাদা পোশাকের মানুষেরাও জমাট কুয়াশার ভেতর হাঁটছে। বোধ হলো হাতের কোথাও কিছু ফুটছে। পঞ্চাশ সিসি ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনজেকশন পাঁচশ সিসি স্যালাইনে মিশিয়ে ধীরে দেয়া শুরু হলো।

সারারাত ধরে স্লো ড্রিবে ইনজেকশন ব্রেইনের ভেতর দিয়ে শরীরে যাচ্ছে। আমার জন্যে এক নতুন সকাল এলো। বেঁচে আছি। জ্ঞান আছে। আশপাশটা বুঝতে পারছি। কোমার হাত থেকে নিস্তার মিলেছে মনে হয়। কিন্তু শরীর আরও অসাড় হচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতেই হাত দুটো আর পায়ের গোড়ালির নড়াচড়াও বন্ধ। বুকের কাছটা ভার লাগছে। ভয়ের একটা হিমপ্রবাহ বোধ করছি।

মনে হলো, যদি এ জীবনে একটা দারুণ করে অন্তত একটা প্যারা কিছু লিখে যেতে পারাতাম। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাটা। কিন্তু বুঝতে পারছি সে আর সম্ভব নয়। আমি আমার মতো করে ভাবছি। আমি আমার ভেতর ডুবে। ঘরভর্তি কাছের মানুষ। শুধু ছেলেরা বাসায়। ওদের আনা হয়নি। এ দৃশ্য ওরা যত না দেখে, ততই মঙ্গল। আর অন্যদের কেউ কেউ ওদের মতো করে পাথর মূর্তি। কেউ আড়াল করে কাঁদছে। সংগঠনের যাদেরকে খুব আদর করতাম সন্তানের মতো, ওরা কোনো হিসেব মানছিল না। কেবিনে ঢুকেই আমার বুকের ওপর আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কান্না। কান্নার ভেতর একটি বাক্যই শুধু ধ্বনিত- '... আল্লাহ! তুমি কেন পঙ্গু হবা?

আমি তো জানি না আমি কেন পঙ্গু হয়ে গেলাম। আমি তো আসলেই জানি না! শুধু বালিশে রাখা মাথা একটু করে ডানে-বামে নড়ানোর যে শক্তি অবশিষ্ট, তাই প্রয়োগ করে সুখ পেতে চাইছিলাম। এ হলো আমার বেঁচে থাকার আর সক্ষমতার প্রকাশ। পরাজিত না হবার একটি ঘোষণা। এ দিয়ে নিজের ভেতর একটি মৌলিক বিশ্বাস স্থাপিত করতে সচেষ্ট হয়েছি, আমি ফিরবোই।

চার.

এর মধ্যেই নিউরো মেডিসিন ডাক্তার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহমান সিদ্দিকী, মেডিসিন প্রফেসর এম এন আলম এবং নিউরো মেডিসিন প্রফেসর কাজী দীন মোহম্মদকে নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ডাক্তারাও আশায় বুক বেঁধে আছে, শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে আবারো ফিরিয়ে আনতে ইনজেকশনগুলো সঠিকভাবে কাজ করবে। না কাজ করলে, আমার শরীর গভীর কোমায় চলে যাবে। এরপর আমাকে আর ফেরানো যাবে না।

জার্মান দূতাবাসের রিজিওনাল ডাক্তার থাকেন জাকার্তায়। সেখান থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হচ্ছেন ঢাকার ডাক্তারদের সাথে। প্রয়োজনে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে বিদেশে নিতে সকল প্রশাসনিক কাজ প্রস্তুত করেছে দূতাবাস। কিন্তু ঢাকার ডাক্তাররা বিশ্বাস করছিলেন, আমি সেইফ সাইডে চলে আসবোই। আমাকে পরীক্ষা করবার সময় উনারা বলাবলি করছিলেন, এ রোগী প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী। এ শক্তিই তাকে এখান থেকে উদ্ধার করবে। যদিও তারা সকলেই এটা জানে, সপ্তাহ দুয়েক আগেই ডাক্তার সিদ্দিকির খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু এ রোগেই ইন্তেকাল করেছে।

আমিও আমাকে বিশ্বাস করছিলাম। কেন জানি মৃত্যুর ভয় বুকের গভীরে খাঁমচে ধরছিল না। প্রমিথিউসের মতো নিজেকে বলশালী করে বাঁচিয়ে রাখছিলাম। প্রমিথিউসের গল্পের মতো। স্বর্গের রাজা জিউসের ক্রোধের শাস্তি ছিল প্রমিথিউসের ওপর, সে তো সবাই জানি। সেই গল্প, প্রমিথিউস কেন স্বর্গ থেকে চুরি করে মানুষদের আগুন এনে দিল? সেই থেকে স্বর্গের রাজা জিউস প্রমিথিউসকে ক্ষমা না করে পাহাড়ের চূড়ায় শিকলবন্দি করে রেখেছে; আর তার ঈগল এসে প্রতিদিন ঠোকর দিয়ে প্রমিথিউসের পাঁজর ভেদ করে কলজে ঠুকরে খায়। সারাদিন খায়। ভর সন্ধ্যায় একটু অবশিষ্ট রেখে চলে যায় পরদিন ফিরে এসে বাকিটুকু খাবে বলে। কিন্তু সারারাত ধরে প্রমিথিউসের এক টুকরো কলজে আবার পুরোটা ফিরে আসে। প্রমিথিউস বারেবারেই তার পুরো কলজে ফিরে পায়। ঈগলের প্রতি ঠোকরে মৃত্যু যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠা প্রমিথিউস মরে না।

বেঁচে থাকে প্রমিথিউস। আমিও বেঁচে থাকি। আমি মরি না। মরতে চাই না। আমার দেহের প্রতিটি বাহ্যিক নার্ভ ধ্বংস হয়ে গেছে। পা থেকে ওপর পর্যন্ত কোনো স্পর্শ অনুভূতি নাই। সারা শরীরজুড়ে বাহ্যিক নার্ভের যে বিন্যাস, সব ধ্বংস। ফলে মাথার ভেতর পা থেকে হাত নাড়ানোর কোনো কমান্ড কাজ করছে না। পুরো দেহ এতটা মাংসপিণ্ডে পরিণত। শ্বাস নিতেও এখন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সে অবস্থাতেই লড়ছি।

এবং একদিন সত্যিই ভোর হলো। বেশ সকাল এখন। আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। অজান্তেই টের পেলাম একটু একটু করে হাতের কব্জি, তারপর কনুই পর্যন্ত নড়াতে পারছি। এমন সময় কেবিনের দরজায় মৃদু টোকা। আফরোজ দরজা খুলে দিল। একগুচ্ছ ফুল হাতে সাংবাদিক, লেখক রাজীব নূর আর ওর সহধর্মিণী তনুজা। দু'হাজার পাঁচ সালের চৌদ্দ এপ্রিল। পহেলা বৈশাখ। ওরা দু'জনে এসেছে আমাকে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানাতে। সারা অন্তরজুড়ে ধ্বনিত হয়ে উঠলো জীবনের স্পন্দন, বৈশাখেরি নবীন দিনে, আমায় রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও। আমায় রাঙিয়ে দিয়ে যাও। া


মন্তব্য