গল্প

বন্দর থেকে বন্দরে

প্রকাশ : ১০ মে ২০১৯

বন্দর থেকে বন্দরে

অলঙ্করণ ::বোরহান আজাদ

  আহমেদ আববাস

ম্যানিলা থেকে জাকার্তা। সাড়ে পনের'শ নটিক্যাল মাইল পথ। সমুদ্র ব্যবধানকে নটিক্যাল মাইল দ্বারা পরিমাপ করা হয় এবং এক নটিক্যাল মাইল দুই হাজার গজের সমান। পাঁচ দিন একটানা সমুদ্রপথে চলার পর জাকার্তার তানজুংপ্রিয়ক বন্দরে আমাদের জাহাজটি ভেড়ে। রোস্টার অনুযায়ী যাদের কর্তব্যে নিয়োজিত থাকার কথা তারা ব্যতীত সবাই ক্লান্তি দূর করার জন্যে বন্দরে নেমে পড়ে।

জেটিতে নামামাত্র দেশ থেকে শিলার ট্রাঙ্ককলে আমার সেলফোন বেজে ওঠে। আগ্রাবাদ বহুতলা কলোনি, চট্টগ্রাম থেকে শিলার কণ্ঠ আমাকে নস্টালজিক করে তোলে। স্বদেশে শিলাই আমার অন্তরঙ্গ যাদুমণি এবং জীবনবল্লভ। আলাপন শেষে তাকে সান্ত্বনা দিই, 'এই তো মাসখানেকের ভেতরই দেশে ফিরবো।'

তানজুংপ্রিয়কে ইন্দোনেশিয়ার বিশ্বখ্যাত হুন্দাই সিমেন্ট কারখানা। তার সামনে থেকেই জাকার্তার প্রধান বিপণি বিতান পাসারবারু মার্কেটের উদ্দেশে বাসে উঠি। ভেতরে প্রবেশ করলে সামনে একটি খালি সিট চোখে পড়ে। জোড় সিটের অপরটিতে জানালা সাথে নিয়ে বসে আছে এশিয়া-ইউরোপ সংমিশ্রণ আদলের চটপটে এক তরুণী। যার পরনে রয়েছে লং জিন্স, টি-শার্ট এবং হাতে ব্রেসলেট। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে নিরীক্ষণ করে এবং স্বতন্ত্র জাতিসত্তার একজন নিউকামার পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
Hi, where do you come from?
Bangladesh.
Is it India?
No, near India.
তারপর তাকে আমার স্বদেশ সম্পর্কে জ্ঞানদান করি। মাত্র সাড়ে বার কিলোমিটার পথ। তবুও জাকার্তা সিটিতে পৌঁছুতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লেগে যায়। আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের মাঝে পরিমিত সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। 'দ্য লাঞ্চন' গল্পে প্রশংসাকারিণী রমণীকে আপ্যায়ন করার জন্যে লেখক সমারসেট মমের পকেট গড়ের মাঠ ছিল। কিন্তু আমার মাথায় সে চিন্তা ছিল না। কেননা, সমুদ্রপথের একজন নাবিকের কাছে সব সময় সম্মানজনক টাকাকড়ি থাকে।

জাকার্তায় নেমে তাকে আতিথ্য প্রদর্শনের জন্য এক দামি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাই, যাতে আরও কিছু সময় রোসার সান্নিধ্যে থাকা যায়। সেখানে আমার আগ্রহে তার ইচ্ছেমতো খাবার পছন্দ করতে বলি। সদ্ভাবের কারণে আমাদের ভেতর সাময়িকভাবে ঐক্য গড়ে ওঠে। খাবার শেষে দুজনের মাঝে কিছুক্ষণ জ্ঞানগর্ভ এবং কৌতূহল উদ্দীপক নির্বিরোধ আলোচনা হয়। আর আমার চিত্তবৃত্তির জন্যেই সেদিন সে তার ক্লাস বাদ দিয়ে ইউনিভার্সিটি চত্বর ঘুরে দেখায়।

পরদিন আবার নির্ধারিত সময়ে নির্বাচিত স্থানে দুজনের সম্মেলন। ঘুরে বেড়ানোর এক পর্যায়ে শপিং করতে চাইলে সে আমাকে পাসারবারু ক্লদিং মার্কেটে নিয়ে যায়। কাপড় কিনতে গিয়ে স্বদেশের মত দামাদামি করতে গেলে তরুণী দোকানি বলে ওঠে, Mariner’s have much money, why do you bargaining time and again.

'টাকা থাকলে কি কেউ দর কষাকষি করে না?'

'এখানে দু'একটা দোকানে দামাদামি করা যেতে পারে, সব দোকানে নয়।'

পরে কেনাকাটার ব্যাপারে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছুলে প্রথমেই সহগামী রোসাকে তার জন্যে জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট চয়েস করতে বলি। কিন্তু সে অনীহা প্রকাশ করে। তবু তার বারবার তীব্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাকে দুই পেয়ার পোশাক কিনে দিতে পারায় মনটা আত্মপ্রসাদে ভরে ওঠে। কেনাকাটার পর শেষতক রোসা আমাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য আহ্বান জানালে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হয়নি।

বাংলো টাইপের দোতলা বাড়ি। দোতলার চিলেকোঠায় বসে গল্পের সিঁড়ি বেয়ে আমরা স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাই এবং ধারাক্রমে আমাদের ভেতর অন্তরঙ্গতার অগ্রগতি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। রোসার অভিব্যক্তি, I am eager to tell my heart’s story, but found none like you.
You are very sincere and beautiful.  তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে বলি।

হয়তো দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ, নির্বান্ধব এবং সহচরহীন থাকায় রোসা মানসিকভাবে একটু অগোছালো, বিভ্রান্ত, বিমূঢ় এবং বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল। সহসা দৈবক্রমে একজন পুরুষসঙ্গী পেয়ে সে তার ভাবাবেগ ধরে রাখতে পারে না। ফলে আমার সামনে সে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বলতে থাকে, 'মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, আমাদের একমাত্র পরিচয় হলো আমরা মানুষ। আমি জানতে চাইনি তোমার দেশ, কালচার, এমনকি তোমার ধর্ম। আমি জন্মগতভাবে জিউ হলেও ওসব আচারে আস্থা নেই। আমি জানি, বিশ্বের সকল মানুষই সমগোত্রীয়। দিবাকর,My friend, You stay here, I will hide you, shelter you.

বলতে বলতে রোসা আবেগে প্রায় আমার সংলগ্ন হয়ে পড়ে এবং চিলেকোঠা থেকে প্রকোষ্ঠমুখো হয়। ঘরে গিয়েও রোসার সাথে লাগামহীন খোশগল্প চলতে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে বলে, To my mind, Muslims also do this early childhood like Jews belief. Because our great religious leader Moses cut his foreskin at an early age. So we have accepted some unity from ancestry.

সময়কে কেউ অতিক্রম করতে পারে না। আমার লিবার্টি টাইম শেষ হয়ে যায়। আমাকে শীঘ্র কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। এজন্যে কালবিলম্ব না করে 'আগামীকাল আবার আমাদের দেখা হবে' বলে সত্বর জাহাজে ফিরি।

ভোর হতে না হতেই মালয়েশিয়ার লুমুট বন্দরের উদ্দেশে জাহাজ সেইল করে। 'মালয়েশিয়ান মেরিটাইম একাডেমি' মালাক্কা থেকেই আমি মেরিন ইঞ্জিনিয়িারিং সম্পন্ন করেছিলাম। লুমুট পৌঁছার পর একঘেয়েমি কাটানোর জন্যে অনতিদূরেই পেরাক প্রদেশের রাজধানী ইপোতে যাই। সেখানে গিয়ে প্রথমেই শিলাকে সেলফোনে স্বদেশ অভিমুখে অগ্রবর্তী হবার সংবাদ জানাই। তারপর গতানুগতিক হালচাল।

মালাক্কাতে অধ্যয়নকালেই তামিল সুহৃদ কৃষ্ণসুন্দরী শিবানির মাধ্যমে টিনার সাথে জানাশোনা। সেসময় মালাক্কাতে সে একটা পেশাগত কাজে নিয়োজিত ছিল। উপরন্তু এই শিবানিই একদিন আমাকে বলেছিল, 'পৃথিবীর সব শুভার্থী তোমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আজন্ম আমার আগল তোমার জন্যে অবারিত থাকবে।'

জানা ছিল, টিনাদের পরিবার ইপোতেই বাস করে। টিনার সাথে দেখা করার জন্যে মনের ভেতর অস্থিরতা শুরু হয়। অন্বেষণের পর সহজেই সাক্ষাৎ মেলে। দেখামাত্র কৈফিয়তের সুরে বলে ওঠে, 'এতদিন পর আমাকে মনে পড়লো।'

তার কথার প্রত্যুত্তরে না গিয়ে বলি, 'তাড়াতাড়ি দেশে ফেরার কথা ভাবছি। অনেকদিন দেশে যাওয়া হয় না তো, তাই।'

'আমাকে আর ভালো লাগে না।' বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইল টিনা।

'কী বলো, তোমাকে ভালো লাগবে না, তো কাকে ভালো লাগবে? ওই কালিনি শিবানিকে! মাই সুইটহার্ট।'

২০০৩ সালের ঘটনা। তখনো সেলফোন প্রসার লাভ করেনি। ফলে দুই বছর চিঠি চালাচালি ছাড়া টিনার সাথে দেখা হয়নি। চিঠিতেই জানতে পারি, তার মা চায়নিজ এবং বাবা অস্ট্রেলিয়ান। তেইশোর্ধ্ব সুন্দরী টিনার অবয়বে উভয়ের ভৌগোলিক ছাপ সুস্পষ্ট। কিছুক্ষণ নীরব থেকে টিনা নরম সুরে আবার বলতে শুরু করে, 'দিবাকর, তুমি আমার বন্ধু হয়েই থেকো, একজন অকৃত্রিম বন্ধু। তোমার সাথে আমার হৃদয়ের বন্ধন কখনো ম্লান হবে না।'

বসা থেকে উঠে দাঁড়াতেই টিনা আমার কাছে এসে ঘাড়ের ওপর দিয়ে তার দু'হাত রাখে, তারপর অন্তরঙ্গ হয়ে আবেগে বলতে থাকে, 'আর মাত্র সপ্তাহখানেক পরেই আমাদের ক্রিসমাস, বড়দিন। তোমার সাথে আমার বন্ধুত্বের কথা বাড়ির সবাই জানে। সুতরাং এ সময় তুমি থেকে যাও, তুমি থাকলে খুব মজা হবে।'

নির্মল দিবালোকে খোলা আকাশের নিচে ঘাড়ে হাত রেখেই মিনিট দুই আগের কথিত বাক্য উপেক্ষা করে টিনা এবার বলে ওঠে, 'আসলে তোমাকে ছাড়তে আমার একদম ইচ্ছে করে না। চিরদিন তুমি এদেশে আমার কাছেই থেকে যাও।'

তখন তার পুষ্পিত কাননের হাওয়া আমার হৃদয়ের গভীরে এবং শরীরের সর্বত্র আলোড়ন তোলে। ফলে তার নৈকট্য, সাহচর্য এবং মায়াজালে আটকে আমার সময়টা গড়িয়ে যেতে থাকে। ভেতরে একসময় অতন্দ্র হলে ফেরার তাগিদ অনুভব করি। তার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তাকে সহিষ্ণু থেকে যেকোন দৈবকে মেনে নেয়ার মন্ত্রণা দিয়ে যথাস্থানে প্রত্যাবর্তন করি।

দেশে ফেরার জন্যে মনটা উতলা হয়ে ওঠে। মনে পড়ে আমার স্কুল সহপাঠী শিলার কথা। কলেজ, কর্মজীবন এবং এখনো সে আমার অপেক্ষায় থাকে। প্রতিবার প্রত্যাবর্তনেই প্রসাধনী নিয়ে তার নৈবেদ্যে নিবেদন করি।

মেরিন লাইফে অতসব চিন্তা করা যাবে না। মেরিনারদের উপার্জনের একটা মানদণ্ড আছে। পোতাশ্রয়ে সময় পার করবার জন্য সহযোগীর ঘাটতি নেই। জীবনে কারো সাথে বন্ধনে আবদ্ধ হলেও মেরিনারদের তাকে সময় দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্যে আমার পূর্বতন জাহাজের বাঙালি ক্যাপ্টেন অনিল বোস সায়েবই মেরিন সাইডের বহুল প্রচলিত সেই বাণীটি আমায় প্রথম শুনিয়েছিলেন, Mariner’s life, without wife. Many many harbor, many many lover.

 মধ্যাহ্ন দুপুর। আমরা পাতংবিচের অদুরে নোঙর করলাম। পাশেই নোঙররত দুটো মার্কিন রণতরী। সামনে সীমাহীন বালুতট তার ওপর অগণিত নর-নারীর সূর্যস্নান। তারা এসেছে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা জাপান থেকে। পুরুষদের পরনে অন্তর্বাস, মেয়েদের অনেকেই প্যান্টি এবং ব্রা পরিহিতা। অনেক মেয়ের নিচে বসন থাকলেও ওপর অনাবৃত। সমুদ্রজলে কেউ কেউ সম্পূর্ণ বিবসনা। যাদের শরীরে এখনো মাধ্যাকর্ষণ বিধির তেমন প্রভাব পড়েনি, বালুকাবৃত বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে তাদের দু'একজনের সাথে উইশ বিনিময় করি।

থাইল্যান্ডের ফুকেট শহরের সন্নিকটেই পাতংবিচ। বিউটি পারলার, ম্যাসাজ পারলার. গো গো বার এসবই এ তটভূমির ঐতিহ্য। সন্ধ্যা নামলেই সমুদ্রপাড়ের বালুতঠে খোলা আকাশের নিচে বারগুলোয় চলতে থাকে উত্তাল নাচের উন্মত্ত আসর।

পরদিন ফুকেট শহর দেখার আগ্রহ জাগে। বাসভ্রমণ সেখানে সহজলভ্য। পাতংবিচ থেকে ফুকেট শহর মাত্র ১৫ কিলোমিটার পথ। আমাদের বাসটি চলেছে রাস্তার দু'পাশের অগম্য বনের বুক চিরে, পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে এবং কদাচিৎ লোকালয়কে বিভাজন করে। অনেক চড়াই-উতরাই পথ।

আমার সাথে গাইড কিম চারাত। টিন এজ। রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিংয়ে ডিপ্লোমার ছাত্রী। প্রাচ্যের মেয়েরা যেমন হয় নাক চ্যাপ্টা, গোলাকার মুখ। ছোট ছোট ভাসা চোখ। উচ্চতা পাঁচ ফিটের মত। দৃশ্যমান রমণীয় শরীর নয়। পেছনে নদীর মত ভাঁজ চোখে পড়ে না। পরনে ব্রা-বিহীন টি-শার্ট, শর্ট জিন্স এবং গোলকাট চুল।

ফুুকেট শহরের দর্শনীয় জায়গার রসাস্বাদন করে পাতংবিচে ফিরতে রাত হয়ে যায়। খাবারের জন্যে বিচের অদূরে একটা ছিমছাম রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ি। হোটেলের সামনেই জীবন্ত খাবারের নমুনা। তাজা ব্যাঙ, সাপ, চিংড়ি ইত্যাদি। খাবার খেয়ে বের হবার সময় এক ইউরোপিয়ানের পছন্দের খাবার দেখে থমকে যাই। সাপ কেটে রক্ত বের করে সে গ্লাসে ঢেলে চুমুক দিয়ে পান করে। পরে সাপকে টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে কাবাব তৈরি করে খায়।

পাতংবিচের বাংলা রোড। শিখ মালিকানাধীন আবাসিক হোটেল। সাময়িক বিশ্রামের জন্যে সকালেই বুকিং দেয়া ছিল। গাইড সর্বক্ষণ সাথেই রয়েছে। আমার পূর্বনির্ধারিত রুমটি তিনতলায়। কলিংবেলে সাড়া দিয়ে বেয়ারা সফ্‌ট ড্রিংক এবং হার্ড ড্রিংক দিয়ে যায়। কিম তার গবলেটে হার্ডড্রিংক ঢালতে ঢালতে আমাকে জিজ্ঞেস করে,Would you like to have a drink with me?

'শিওর' বলে সায় দিয়ে গবলেটটা হাতে নিতেই সেই সাপ খাওয়ার দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গা গুলিয়ে বমির উদ্রেক হয়। শ্যাংকে গিয়ে বমির চেষ্টা করলে মুখ দিয়ে লালা বের হতে থাকে। অসুস্থতাবোধ এবং অস্বস্তিতে শুয়ে পড়ি। কিম সহানুভূতি জানাতে সোফা ছেড়ে আমার বেডে এসে বসে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, 'বি কেয়ারফুল। সত্যি বলতে কি, কারো ডায়রিয়ার কথা শুনলে আমাদের ধর্মাবতার ভগবান বুদ্ধের কথা আমার মনে পড়ে যায়। তিনি তো ডায়রিয়া রোগে মারা গেছেন।'

কিমের হাতের স্পর্শ, সমবেদনা এবং উৎসাহে আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠি। সে টিভির রিমোটে চাপ দেয়। জেনিফার লোপেজের একটা গানের দৃশ্য ভেসে ওঠে। ক্রমাগত শরীরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। কিম ধীরে ধীরে তার দেহের ভাষায় আমার ভেতরের পৌরুষ জাগাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমার মাঝে নিরুৎসাহ, নীরবতা এবং নিশ্চলতা দেখে কিম বলতে থাকে,President Bill Clinton could play such a game easily. Why not you?
I do have a lover and she is waiting for me. So I can’t do it easily. Please forgive me.

এবার কাঙ্ক্ষিত বন্দর চট্টগ্রাম নয়। একই কোম্পানির অন্য একটা জাহাজের ইঞ্জিনে সিভিয়ার ব্রেকডাউন হওয়ায় আমাকে ব্যাংকক থেকে বিমানযোগে মাদাগাস্কার বন্দরে যেতে হয়। আর ওই জাহাজের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারকে পাতংবিচে আসতে নির্দেশনা দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনদিনের ভেতর বিকল ইঞ্জিনটি সফলভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়। পরদিন জাহাজ মরিশাস হয়ে শ্রীলংকার উদ্দেশে সেইল করে। সেখানে অবিরতভাবে লাগাতার তিন দিন ইঞ্জিনরুমে থেকে কাজ করে শরীর ও মন দুই-ই জেরবার হয়ে গেছলো, এ কারণে অর্পিত কাজের ত্রুটি নিরসন সম্পন্ন হলে সন্ধ্যায় বন্দরে নামার সুযোগ হাতছাড়া করিনি।

মাদাগাস্কার ইন্ডিয়ান ওশানের ভেতর আফ্রিকার একটি অনুন্নত দ্বীপ দেশ। সন্ধ্যা নামলেই এখানকার বারগুলো অশান্ত, উতরোল এবং উন্মত্ত হয়ে ওঠে, আর মিউজিকের প্রবল ঝংকারে সরগরম হয়ে পড়ে সারা নগরী। সহযোগী একজনের সাথে পরিভ্রমণে বের হয়ে কিছু পানীয় পান করার জন্যে একটা ক্যাসিনোতে ঢুকে পড়ি। সেখানে দেখা যায় তিনজন আবলুস রঙের মেয়ে নানা ভঙ্গিমায় নিজেদেরকে পরিবেশন করছে। নিঃসন্দেহে তারা মনোহর এবং মনোমুগ্ধকর। কিন্তু পরদিন সেইলের কথা ভেবে অঙ্গনাদের অঙ্গদর্শনে রাত কাবার না করে তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরি।

প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা ক্রুজিং শেষে মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইস বন্দরের নাগাল পাই। ভারত মহাসাগরের বুকে পূর্ব আফ্রিকার একটি চমৎকার দ্বীপ রাষ্ট্র। এখানকার নৈসর্গিক শোভা নিকষিত, মাধুর্যমণ্ডিত এবং চিত্তাকর্ষক। এ সমুদ্রদ্বীপের বিভূষিত সাজ দেখলে যে কেউ বিমোহিত হয়ে পড়বে। আর মরিশাসের মানুষজনও ভারতীয়দের মত মিশেল গাত্রবর্ণের। কালচার অনেকটা ওই রকমই। অধিকাংশ লোকই ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে।

মহাসমুদ্রের তীরভূমিতে প্রকৃতি এবং শিল্পজাত সৌকর্যে গড়ে ওঠা পার্কের এককোণায় বসে সেদিন তাহমিনা একাকীই শাকিরার একটি বিখ্যাত গানের অংশবিশেষ বারবার গাইছিল, Whenever wherever, we are meant together. …. তার সুললিত কণ্ঠ একটু দূর থেকে শুনে সাগ্রহে সখ্য স্থাপনের জন্যে তার দিকে অগ্রবর্তী হই। নিকটবর্তী হলে সে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং জিজ্ঞেস করে, 'এনিথিং রং?'

'নো নাথিং' বলে তাহমিনার গানের প্রশংসা করতে থাকি। তার পরিমিত দেহগত উচ্চতায় সঙ্গীতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সজ্জায় তাকে বেশ সদানন্দ এবং সরস দেখাচ্ছিল। এ সময় তার ঠাসা বুনট শরীর দেখে মানবতাবাদী দেশপ্রেমিক নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার একটি প্রাসঙ্গিক কথা মনে পড়ে যায়। ১৯৭৮ সালে তিনি তার ছোট মেয়ে জিনজিকে লিখেছিলেন, 'মেয়েদের বুক হবে কামানের গোলার মতো।' তাহমিনার সাথে খানিকটা সময় যাপনে সে একটু স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল হলে, তখন তাকে মরিশাসের দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখানোর জন্যে অনুরোধ করলে সে তাতে রাজি হয়।

তাহমিনা এক এক করে বিভিন্ন স্থান দর্শনে নিয়ে যায়। সমুদ্রতটের সারি সারি নারকেল আর পামগাছ পেরিয়ে এক জায়গায় গিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনের সাঁতার প্রদর্শনী দেখায়। বিকেল ঘনিয়ে এলে সাতরঙের দুনিয়া নামে জায়গাটি দেখতে সহযোগিতা করে। যেখানে রঙিন পাথরের শয্যায় সবুজ বনভূমি। সেখানে আমরা সবুজ তরুবীথিকার আড়ালে বসে নিজ নিজ দেশ সম্পর্কে, সামুদ্রিক জীবন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে গল্প করি। দুজন দুজনার ভাব উপস্থাপনের চেষ্টা করি। এবং ক্রমশ চিন্তাপ্রণালির দিক থেকে একটু কাছাকাছি চলে আসি। সন্ধে ঘনিয়ে এলে শহরমুখো হই। ডিনারের জন্যে একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় তাহমিনাকে আহ্বান জানাই। সান্ধ্যভোজ শেষে ভোজনশালার অপর পাশে পানশালায় ঢুকে পড়ি। ফোয়ারায় বসে পানানন্দ চলে কিছুক্ষণ। পরদিন সম্মেলন আরও দীর্ঘায়িত এবং আনন্দঘন করার প্রত্যাশা নিয়ে সেখান থেকে দুজন বিদায় গ্রহণ করি। যাবার সময় একজন আরেকজনের কন্টাক্ট নাম্বার রেখে দিই। কিন্তু সময়াভাবে পরদিন আর উষসী উর্বশী তাহমিনার সান্নিধ্যে ফেরা হয়নি।

ভারত মহাসাগরের বুকে একটানা সাত দিন কার্গো ভেসেলটি চলার পর এক সকালে কলম্বো বন্দরে জেটির পাশে ভেড়ে। উপকূলে নেমেই শিলাকে ট্রাঙ্ককল করি। অনেক কথা হয়, এবার গেলেই নাকি একটা বিহিত করে ছাড়বে। আর দেরি করতে রাজি নয় শিলা। আর আমাকে বলে, 'তোমাদের মত উঠতি বয়সের ছেলেদের একদম বিশ্বাস নেই। তোমার তো এখনো শিবানির সাথে দোস্তি আছে। দেশে থাকতে দেখেছি, শিবানিকে তুমি বেশ ফিল্‌ কর, সুযোগ পেলেই যোগাযোগের চেষ্টা কর। এবার তো মালয়েশিয়াতেও গেছিলা, মালাক্কা না গেলে কী হবে, নিশ্চয়ই শিবানি লুমুটে এসেছিল।' এভাবে অনেকক্ষণ শাসায়।

দেশে কথা বলা শেষ হলে কলম্বোর দেশমির কথা মনে পড়ে যায়। ২০০২ সালে কলম্বোয় এসে আমার মেরিন একাডেমির বন্ধু গুণরত্নের ছোট বোন দেশমির সাথে মিতালি হয়। গুণরত্নের অব্যবহিত পরে জন্ম বলে প্রথম দিন তার সাথে ছোট বোনের মত আচরণ করলে সে মাইন্ড করে। এমনকি বলে, ÔHow am I your sister? Give up your obsolete ideology. No sister. Just friend. ফ্রেন্ড মানে একসাথে ঘুরে বেড়ানো, হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা দেয়া, সিবিচে বসে বাদাম খাওয়া, মনের কথাগুলো শেয়ার করা।'

এক বছর পর আবার কলম্বো এসে তাকে মোবাইল ফোনে কল দিতেই সহজেই সাড়া মেলে। বেলা বাড়তে না বাড়তেই দেশমি আমার কাছে ছুটে আসে। দেশমির খুব ইচ্ছে বাংলাদেশ দেখার। এবার দেখা করেই কথা প্রসঙ্গে বলতে থাকে, 'আমি তোমাদের দেশ দেখতে চাই। বল, কবে নিয়ে যাবে তোমাদের দেশে?'

'সময় হলে অবশ্যই তোমাকে দেশে নিয়ে যাবো। যেতে চাইলেই তো যাওয়া যায় না। দরকার পাসপোর্ট, ভিসা।'

'আমার পাসপোর্ট আছে, তোমাদের দেশে যেতে নাকি অন্‌ অ্যারাভাল ভিসা।' সে এভাবে বলতেই থাকে।

দেশমির দেশান্তরের অভিলাষ খুব একটা কানে নিই না। জবাবে একথা-ওকথা বলে আশ্বাস দিই। তার আগ্রহে অবিলম্বে জাহাজ থেকে বের হয়ে পড়ি। সারাটা দিন ঘোরাফেরা, দেশমির জন্যে কেনাকাটা, আহার-বিহার এবং আর হাসি-আনন্দে পিঙ্গলকন্যা দেশমির সাথে সময় হাওয়া হয়ে যায়।

গৃহকাতরতায় ঘরমুখো থাকার দরুন কলম্বো ত্যাগ করার পর সমুদ্র অস্বস্তির ধকল আর গায়ে লাগে না। চারদিনের মাথায়ই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে যায়। ভেসেলের গতিবিধি এবং আগমন সময় সম্পর্কে শিলার ধারণা ছিল। ওঠানামার সিঁড়ি লাগানোর পরপরই শিলা উন্মুখ ও ক্ষিপ্র হয়ে জাহাজে ওঠে। গ্যাংওয়ে থেকে রিসিভ করে তাকে আমার ব্যক্তিগত কেবিনে নিয়ে যাই।

শিলা তার বিষাদ, কাতরতা, ক্ষোভ, প্রণয়াকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে আমাকে ঝাড়তে থাকে। আমি বলি, 'ঠিক আছে, আমার একজন লোকাল গার্ডিয়ানকে তোমাদের বাড়িতে পাঠাবো।'

'আমার বাবা হয়তো তোমার সাথে বিয়েতে রাজি হতে চাইবে না। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধনের মাধ্যমে কাজ সেরে ফেলতে হবে।'

'তুমি ডাক্তার, আমি মেরিনার; দুজনের কারোই যোগ্য জুড়ির অভাব নেই, এটিই হয়ত তারা বলবে, কিন্তু তোমাকে আমার চাই। সুমনের গানের ভাষায়, প্রথমত, দ্বিতীয়ত, তৃতীয়ত এবং শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই।'

দুদিন পর আমার পক্ষ থেকে স্থানীয় অভিভাবক পর্যায়ের একজন আত্মীয় তাদের বাড়ি যায়। তার বাবার কাছে গিয়ে আমাদের বিয়ের পয়গাম পেশ করে। তিনি বিনয়ের সাথে জানান, 'দিবাকর ছেলে হিসেবে খুবই ভালো। আমিও তাকে পছন্দ করি। কিন্তু একজন ডাক্তার মেয়েকে ডাক্তার ছাড়া বিয়ে দিতে আমার একটু আপত্তি আছে। স্পাউজ ডাক্তার হলে একজন অন্যজনের অনুভূতি বুঝবে। এ ব্যাপারে আমাকে মাফ করতে হবে। ছেলেটাকে বুঝিয়ে বলবেন, যাতে সে আমার অভিমতটাকে অনুধাবন করতে পারে।'

'দিবাকরকে না হয় আমি বুঝিয়ে বলবো, কিন্তু আপনার মেয়েকে! আর একটা কথা, মেরিনারদের স্ত্রী চিকিৎসক হলেই বরং ভালো। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে সে পেশার কাজ করে যেতে পারে। আমার জানামতে, অনেক মেরিনারের স্ত্রীই ডাক্তার এবং তারা নির্বিঘ্নে এবং শান্তিতে ঘর-সংসার করে যাচ্ছে।' প্রতিনিধি হিসেবে পরিজন ব্যক্তিটি এমনভাবে যুক্তি উপস্থাপন করে।

'সে চিন্তা আপনার করতে হবে না।'

আর অতিরিক্ত বাক্যব্যয় না করে হিতাকাঙ্ক্ষী প্রতিনিধি ব্যক্তিটি বিফল মেজাজ নিয়ে আমার কাছে ফেরে।


মন্তব্য