আয়োজকদের চোখে ঢাকা লিট ফেস্ট

বিশ্বসাহিত্যের তারকারা জড়ো হয়েছেন -কাজী আনিস আহমেদ

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

বিশ্বসাহিত্যের তারকারা জড়ো হয়েছেন -কাজী আনিস আহমেদ

সাদাফ সায্‌, কাজী আনিস আহমেদ এবং আহসান আকবার ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক। ঢাকা আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের শুরু থেকেই তিনজন একসঙ্গে যুক্ত আছেন এর সঙ্গে। এবারের উৎসবের নানা দিক নিয়ে কালের খেয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন দুই পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ এবং সাদাফ সায্‌...


এবার বসেছে ঢাকা লিট ফেস্টের অষ্টম আসর- আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই?

এবার অষ্টমবারের মতো এই আয়োজন হতে যাচ্ছে। গত সাত বছরে আমরা চেষ্টা করেছি সামনে এগিয়ে যাওয়ার এবং আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পেরেছি বলেই আমার বিশ্বাস। এবারের লিট ফেস্টে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ আসছেন। পুলিৎজার ও অন্দাজ্জে, বুকারের মতো সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী লেখকরা থাকবেন। পাকিস্তানি লেখক সাদাত মান্টোকে নিয়ে ভারতে নির্মিত ছবি 'মান্টো'র প্রথম প্রিমিয়ার হবে এই উৎসবে। শুধু প্রিমিয়ারই নয়, একই সঙ্গে নন্দিতা দাস তার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরবেন। বিগত বছরগুলোর ক্রমাগত আয়োজনে এটি যথেষ্ট পরিণত ও পরিপকস্ফ রূপ পেয়েছে। অষ্টমবারের মতো এ আয়োজনের পরিধি বিষয়ে ও বৈচিত্র্যে ঋদ্ধ হয়েছে। এবারও দেশি-বিদেশি প্রচুর সাহিত্যিকের অংশগ্রহণে আয়োজনটি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে।

শিল্পী-সাহিত্যিকের সমাগম ঘটেছে এবারের উৎসবে। দর্শক ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের বিপুল সাড়া ইতোমধ্যে আমাদের মুগ্ধ করেছে। অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় অধিক আশাবাদী আমি। আমরা চাই, আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচিতি বিশ্বের সামনে স্বমহিমায় উপস্থাপিত হোক। নতুন বাংলাদেশকে চিনুক বিশ্ব। এটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে এবং উত্তরোত্তর বড় পরিসরে এটি করা সম্ভব হচ্ছে। উৎসবটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় সাহিত্য আয়োজন হিসেবে সমাদৃত। এ কারণেই ক্যামব্রিজ শর্ট স্টোরি প্রাইজ কর্তৃপক্ষ এই মঞ্চকে তাদের পুরস্কার লঞ্চ করার জন্য বেছে নিয়েছেন। এখানেই প্রথমবারের মতো এই পুরস্কার ঘোষণা দেবেন তারা। আমি আরও উল্লেখ করতে চাই, আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকা গ্রান্টা ম্যাগাজিন একমাত্র বাংলাদেশের এই আয়োজনের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো পার্টনার হিসেবে যুক্ত থাকছে। তাদের চারজন প্রতিনিধি বিশ্বসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার জন্য আসছেন।

আন্তর্জাতিক শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে অনেক অতিথি আসছেন এবার। এ সম্পর্কে কিছু বলুন-

আমরা খুব সচেতনভাবে প্রতি বছরই এটি করছি। এটি হলো শিল্পের বৈচিত্র্যকে উদযাপন করা। এর মধ্য দিয়ে বহুত্ববাদী একটি জায়গা তৈরি হয়। আট বছর এ আয়োজন করার পর আমরা অনেক কিছুই আগের চেয়ে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি। আমাদের দর্শক-শ্রোতারা কী চাচ্ছেন, কোন কোন বিষয় তারা বেশি পছন্দ করছেন- এসব বুঝে নিয়ে সে অনুযায়ী আমরা সাজাতে চেষ্টা করেছি। আর এ পদ্ধতিটা আয়োজনকে শক্তিশালী করে তুলবে বলে আমরা আশাবাদী।

এবার বিশ্বের ২৫টি দেশের দুই শতাধিক সাহিত্যিক, বক্তা, পারফরমার এবং চিন্তাবিদ তিন দিনের এই আয়োজনে অংশ নেবেন। এবারের লিট ফেস্টে আলোচনা, পারফরম্যান্স চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে শতাধিক সেশন থাকছে। এই উৎসবের তিন দিনে ৯০টির বেশি সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে শুধু সাহিত্য নয়, আর্ট, ফটোগ্রাফি, ফিল্ম সবকিছুরই প্রদর্শনী থাকছে। গত আট বছরে ৫০টি দেশের ৩৩০ জন অতিথি এসেছেন ঢাকা লিট ফেস্টে। এবার আমরা নারীকে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছি। নন্দিতা দাশের ছবি, ছয় নারী কবি, রোহিঙ্গা নারীদের কথা, নারী বাউল শিল্পীসহ নারীদের সরব উপস্থিতি থাকবে।

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়োজনকে কীভাবে দেখছেন?

লিট ফেস্টে আমাদের মূল আগ্রহ থাকে বাংলা সাহিত্যকে প্রচার ও প্রসারের। সেটিকে এগিয়ে নিতে এবং বাংলা সাহিত্যের লেখকদের বই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে 'সি গার্ল' নামে একটি ভারতীয় প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা লিট ফেস্ট কর্তৃপক্ষ। লিট ফেস্টে বছরে একবার আমাদের দেখতে পেলেও সারাবছরই বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিলডা সুইন্টন এবারও বাংলাদেশে আসছেন। তিনি বাংলাদেশের বয়স্ক শিক্ষাকে তার একটি চলচ্চিত্রে যুক্ত করছেন। তিনি ছবিটির শুটিংও করবেন বাংলাদেশে।

এখানে একটি বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের লেখক-চিন্তাবিদরা আসছেন। তারা কী ভাবছেন, আমরা জানতে পারছি। অন্য মূল বিষয়টি হচ্ছে, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অন্যদের কাছে তুলে ধরা। আমাদের বিখ্যাত অনেক লেখকের কালজয়ী রচনাবলি বাংলার বাইরে প্রচারিত হয়নি। সোমালিয়া বা আলবেনিয়ার মতো অনেক ছোট বা সংকটময় দেশের লেখকরাও আন্তর্জাতিক মর্যাদা পান। তাহলে বাংলা লেখা উপেক্ষিত থেকে গেল কেন? সাবলীল সহজ অনুবাদ বেশি হওয়া দরকার, যেটা আবার বিদেশি সমঝদারদের হাতেও পৌঁছে দেওয়া দরকার। লিট ফেস্টের মাধ্যমে সেসব কাজ আমরা শুরু করতে পেরেছি বলেই আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু বলুন। নিজেদের সাহিত্যের বিকাশে উল্লেখযোগ্য কী থাকছে?

বাকি পৃথিবীকে আমরা আমাদের মেধার পরিচয় দিতে চাই। আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিভাশীল শিল্পী ও সাহিত্যিকদের এবং তাদের কাজগুলোকে সীমানার বাইরে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করতে চেষ্টা করছি। এবং এটিই এ আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। প্রতি বছরই আমরা বাংলাদেশি সাহিত্যিকের বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করে আসছি। এবার উৎসবে ইমদাদুল হক মিলনের দুটি উপন্যাসের অনুবাদ প্রকাশ করা হবে। বিখ্যাত এবং আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি হেলাল হাফিজ স্বকণ্ঠে নিজের কবিতা আবৃত্তি করবেন এবার। তাছাড়া সাহিত্য ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক-বক্তাবৃন্দ উৎসবের বিভিন্ন পর্বে তাদের মূল্যবান বক্তব্য ও বিতর্ক রাখবেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা

এবারও অংশগ্রহণকারী বিদেশি সাহিত্যিকদের তালিকা অন্যান্যবারের তুলনায় আরও বৈচিত্র্যময়। আমাদের বিশ্বাস, এভাবে এক সময় দেশ-বিদেশের সাহিত্যিকদের এই আদান-প্রদান আরও নিবিড় ও সাবলীল হবে।
  -সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়


মন্তব্য যোগ করুণ