আয়োজকদের চোখে ঢাকা লিট ফেস্ট

এবারের আয়োজন আরও বেশি বৈচিত্র্যময়- সাদাফ সায্‌

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

এবারের আয়োজন আরও বেশি বৈচিত্র্যময়- সাদাফ সায্‌

সাদাফ সায্‌, কাজী আনিস আহমেদ এবং আহসান আকবার ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক। ঢাকা আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের শুরু থেকেই তিনজন একসঙ্গে যুক্ত আছেন এর সঙ্গে। এবারের উৎসবের নানা দিক নিয়ে কালের খেয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন দুই পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ এবং সাদাফ সায্‌...

দেশে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। প্রকৃতিকে তাড়া দিচ্ছে পাতা ঝরা দিন। এই হেমন্ত সকালে বাংলা একাডেমি সেজেছে বসন্ত সাজে। জড়ো হয়েছেন লেখক, প্রকাশক, শিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। দেশের এই পরিস্থিতিতে এমন একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেছেন। কেমন মনে হচ্ছে এবারের আয়োজন?

উৎসবটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় সাহিত্য আয়োজন হিসেবে আলোচিত। আমরা খুবই খুশি যে, বাংলাদেশে এমন একটি আয়োজন সফলভাবে হতে যাচ্ছে। তাও অষ্টমবারের মতো। দুই বছর পেছনে ফিরে তাকালে নিশ্চয় মনে পড়বে দেশে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথা! বিশ্বে বাংলাদেশের ব্যাপারে যে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে উপেক্ষা করে আমরা উৎসব করেছিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় এখন দেশে বইছে নির্বাচনের হাওয়া; এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বরং আগের তুলনায় আরও উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবারের আয়োজন করেছি আমরা। গত সাত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের আয়োজনে যথেষ্ট পরিণত ও পরিপকস্ফতা ফুটে উঠেছে। বেড়েছে এর পরিধিও। এবারের আয়োজন আরও বেশি বৈচিত্র্যময়। আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দেখছে বিশ্ব। দেখছে আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখকদেরও।

বাংলাদেশের সাহিত্যকে ঘিরে সাহিত্যের এমন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কীভাবে দেখছেন বিশ্বসাহিত্য-জগতের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চা?

অনেক বড় একটা স্বপ্ন নিয়ে এই পথে নেমেছি। আসলে আমাদের যে সাহিত্য ইতিহাস, সেটাকে তো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদেরই এবং তা অবশ্যই সময়ের হাত ধরে। আমাদের যেমন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের লেখা পড়তে হবে, তেমনি আমাদের লেখাও তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তাদের এবং আমাদের ভাবনার মিথস্ট্ক্রিয়া ঘটাতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চার এই ধারাবাহিকতাটাও শিখিয়ে যেতে হবে। দিন বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে আমাদের সাহিত্যও। একই সঙ্গে আমরা আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্যের চর্চাও ধরে রাখছি। সব মিলিয়েই আমাদের সাহিত্যিক ভবিষ্যৎ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে সাহিত্যচর্চার জন্য পর্যাপ্ত নয়; আমাদের ছেলেমেয়েদের এত বেশি বিপর্যয়; সেখানে সাহিত্যকে আমরা কীভাবে উৎসাহ দেব, উদযাপন করব? এর একটি উপায় ধরে নিতে পারেন অমর একুশে বইমেলা। অন্যটি হতে পারে এই সাহিত্য উৎসব। মজার বিষয় হচ্ছে, এই উৎসবে আসা শতকরা আশি ভাগই তরুণ। এই তরুণদের নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি!

তরুণরা সব সময়ই পরিবর্তনের পক্ষে। তাছাড়া এখন তারা অনলাইনের বদৌলতে সহজেই পড়তে পারছে বিশ্বসাহিত্য। এই আয়োজনে এসে তারা খুঁজে পাচ্ছে প্রিয় লেখকদের। পেয়েছিল ভি এস নাইপল আর আদোনিসদের। এবার সেই ধারাবাহিকতায় কারা যুক্ত হয়েছেন?

আয়োজক হিসেবে এটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পী-সাহিত্যিকরা আমাদের আয়োজনে বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। আগের ধারাবাহিকতায় এবার প্রায় ১৫টি দেশের দুই শতাধিক আলোচক, শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রকাশক এ অয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। তারা প্রায় ৯০টি অধিবেশনে নিজেদের কর্ম আর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। এবারের উৎসব উদ্বোধন করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পুলিৎজারজয়ী মার্কিন লেখক অ্যাডাম জনসন এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ। এছাড়াও এবারের আসরে এসেছেন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ফিলিপ হেনশের, বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক জেমস মিক, কলকাতার কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সাংবাদিক হুগো স্টেন, প্যাট্রিক উইনসহ আরও অনেকে।

বিভিন্ন দেশের সাহিত্যিকরা এসেছেন উৎসবে। ইউরোপ-আমেরিকাকেন্দ্রিক যে সাহিত্য-ঘরানা, এর বাইরের সাহিত্যিকদের নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? বিশ্বসাহিত্যিকদের আমন্ত্রণের ব্যাপারে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাটা কেমন?

এটি সত্যি, সবই শুধু লন্ডন আর নিউইয়র্ককেন্দ্রিক হলে হবে না। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সাহিত্যিকদেরও তাদের কর্মকাে র সঙ্গেও পরিচিত হতে হবে। এ উৎসব সে সুযোগও করে দিচ্ছে। আমাদের স্বপ্নও আছে এ ব্যাপারে- আমরা আরও বেশি আন্তর্জাতিক করে তুলব এ উৎসবকে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তো অতিথি সাহিত্যিক এনেছি এর আগে। কিউবা, কেনিয়া, ফিলিস্তিন থেকে সাহিত্যিকদের এনেছি। আদোনিস এসেছেন। কবিতা, কথাসাহিত্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র এমন নানা ক্ষেত্রের শিল্পী-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ আয়োজনকে আলোকিত করেছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আরও বড় বড় সাহিত্যিককে আমরা ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করব। তা ছাড়া সাহিত্যের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার ইচ্ছা আছে আমাদের। উৎসবটা তো বছরে একবার তিন দিনের এক আয়োজন। তার পর একে ঘিরে সারাবছরের নানা রকম সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার উদ্যোগও নিচ্ছি।

সমসাময়িক বিষয়-আশয় আর দেশীয় শিল্পী-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণটাকে কীভাবে দেখছেন?

আমাদের মেধার পরিচয় বিশ্বকে দিতে চাই এই উৎসবের মাধ্যমে। আমরা অবশ্যই আমাদের মেধাবী শিল্পী ও সাহিত্যিকদের এবং তাদের কাজগুলোকে সীমানার বাইরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছি। আর এটিই এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। প্রতিবছরই আমরা বাংলাদেশি সাহিত্যিকের বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করে আসছি। তাছাড়া সাহিত্য ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক-আলোচক উৎসবের বিভিন্ন পর্বে তাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরেন। বলেন ভাবনার কথা। বিশ্বে বিশেষ করে সাউথ এশিয়ায় এখন আলোচিত বিষয় 'মিটু'- এই নিয়ে আছে আয়োজন। আমাদের বাউল গানের যে শক্তি বা ক্ষমতা তা জানান দিতে এবার যুক্ত করেছি কাঙ্গালিনী সুফিয়াকে।

সাহিত্যের বাইরে সৃজনশীল মাধ্যমের এমন আর কী কী নতুনত্ব থাকছে এবার?

আমরা ২০১৭ সাল থেকে সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন করে আসছি এবং সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের 'ডিএসসি' পুরস্কার ঘোষণা দিয়ে আসছি। তবে এবারের অন্যতম আলোচিত বিষয় চলচ্চিত্র 'মান্টো'। পাঠকের কাছে মান্টো অতি জনপ্রিয় চরিত্র। সেই মান্টোকে নিয়ে বানানো চলচ্চিত্রের পরিচালক ও অভিনেত্রী নন্দিতা দাস। বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালাও উৎসবে রঙ ছড়াবেন আশা করি। মনীষা ক'দিন আগেও লড়াই করেছেন ক্যান্সারের সঙ্গে। ক্যান্সারজয়ী এই অভিনেত্রী শোনাবেন তার ক্যান্সার জয়ের গল্প। এ ছাড়াও বিশ্ববরেণ্য তারকা শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রকাশক ও সাংবাদিকের পাশাপাশি 'ভবিষ্যতের প্রযুক্তি', 'ভুয়া সংবাদ', 'হাস্যবিনোদনে নারীর ভূমিকা'সহ বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত করেছি। প্রতিদিন থাকছে বিচিত্র অধিবেশন। থাকছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনাও।

ঢাকা লিট ফেস্ট নিয়ে সামনের পরিকল্পনা কী?

সত্যি কথা বলতে কী, শুধু বইমেলা নিয়েই এ যুগের সাহিত্যটা হয় না। আমরা অন্য যে কোনো বিষয় নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি; সাহিত্যেও সে কাজটা চালিয়ে যেতে হবে। সে জন্যই এ উৎসব একটি জায়গা তৈরি করে দেবে। আমাদের বাংলা ভাষায় এত বিশাল কাজ হয়ে গেছে, এত বড় বড় সাহিত্যিক তাদের কিংবদন্তিতুল্য সৃষ্টি রেখে গেছেন; তাহলে কেন শুধু একটি বৈশ্বিক যোগাযোগের অভাবে আমরা পিছিয়ে থাকব! বাংলাদেশের সমসাময়িক লেখকরাই বা কেন 'বাংলাদেশি লেখক' হিসেবে বিশ্বসাহিত্য-জগতে যথাযোগ্যভাবে দাঁড়াতে পারবেন না! ১৫টি দেশের দুই শতাধিক আলোচক, শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রকাশক এ অয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিশ্বের নানা অঞ্চলের সাহিত্যিকদের সঙ্গে এ আদান-প্রদান অব্যাহত থাকবে। সামনে বছরব্যাপী সারাদেশে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজনের চিন্তা আছে। শিশুদের নিয়ে আরও বিচিত্র আয়োজন করতে চাই। তাদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। আট বছরের এ আয়োজন আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে। আগের চেয়ে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি। দর্শক-শ্রোতারা কী চাচ্ছেন, কোন কোন বিষয় তারা বেশি পছন্দ করছেন- এসব বুঝে নিয়ে সে অনুযায়ী আমরাও আয়োজন সাজাতে চেষ্টা করেছি। আর এ পদ্ধতিটা আয়োজনকে শক্তিশালী করে তুলবে বলে আমরা আশাবাদী।

আপনাকে ধন্যবাদ।

কালের খেয়ার পাঠকদের আমন্ত্রণের মাধ্যমে কালের খেয়া এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।
- সাক্ষাৎকার গ্রহণ: আশিক মুস্তাফা


মন্তব্য যোগ করুণ