রসসরোবরে সবার নিমন্ত্রণ

বিশ্নেষণ

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

রসসরোবরে সবার নিমন্ত্রণ

  আনিফ রুবেদ

বই পড়ার অনেক রকম আনন্দ আছে। যেমন- কোনো কোনো বই আছে, পড়ে শেষ করতে পারলেই আনন্দ পাওয়া যায়। এ আনন্দ পড়া থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার মুক্তির আনন্দ। আবার কোনো বই পড়তে এত ভালো লাগে যে শেষ হলে মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, এই তো ধরলাম বইটা, এর মধ্যেই শেষ হয়ে গেল।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা গদ্য এবং গদ্যশিল্পের কথা ভাবতে গেলে আমার সামনে এই কয়েকজনের ছবি মনে আসে। নিজেদের সিলমোহর অঙ্কিত করেছেন এই গদ্যকারগণ বাংলা ভাষার গায়ে। বাংলা ভাষার গায়ে ছবি এঁকেছেন মধুরঙে। জানি যে এবং সকলেই জানেন, আরও অনেক মহৎ গদ্যশিল্পীও এই পাঁচজনের সময়ের ভেতরেই রয়ে গেলেন, যাদের নাম নিলাম না। তাদের মধ্যে কেউ দারুণভাবে ক্ল্যাসিক ঘরানার লেখক, কেউ খুবই জনপ্রিয়। তাদের লেখা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা গদ্যের রসপিয়াসীদের রস জুগিয়েছেন সারাটা জীবন ঢেলে দিয়ে, অকৃপণভাবে।

একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং ক্ল্যাসিক শিল্প রচনা এত কঠিন যে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো দশা। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা একটা ছবি 'মোনালিসা'। খুবই উন্নতমানের শিল্পরসে সমৃদ্ধ। পাঁচশ' বছর ধরে এ ছবির বিচার-বিশ্নেষণ চলছে অবিরাম। এখনও শেষ হয়নি। এখনও তার শিল্পগুণ বিস্মিত করে আসছে গুণী শিল্পী এবং শিল্পবোদ্ধাদের। আবার একই সঙ্গে ছবিটি দারুণ জনপ্রিয়। যে লোক ছবির কিছুই বোঝেন না, তিনিও তাকিয়ে থাকেন বিস্মিত চোখে। এই পাঁচশ' বছর পরও এমন লোক পাওয়া কঠিন হবে, যিনি ছবিটি দেখেননি। এমন বাড়িও পাওয়া কঠিন হবে, যে বাড়িতে একবারের জন্য হলেও ছবিটির কপি শোভা পায়নি।

হুমায়ূন আহমেদকে তেমনই একজন শক্তিশালী বা ভাগ্যবান লেখক মনে করি, যিনি একই সঙ্গে একজন চরম জনপ্রিয় এবং ক্ল্যাসিক কথাশিল্পী। মানুষের ভেতরে পৌঁছে যাওয়ার অসাধারণ এক ক্ষমতা তার লেখার ভেতর। এগুলো বারবার পড়লেও ক্লান্তি আসে না। মনে হয় না, থাক আর হুমায়ূন আহমেদ পড়ব না। সহজ গুণ আয়ত্ত করা এত বেশি কঠিন যে সহজভাবে কোনো শিল্প সৃষ্টিকারীকে সহজাত গুণের অধিকারী বলে অনেক সময় মনে হয়। মানে, আবার সেই ভাগ্য। মানে, আবার সেই 'প্রকৃতি-প্রদত্ত ক্ষমতা' বলে নিস্কৃতি পাওয়ার কথা।

হুমায়ূন আহমেদ পাঠের সময় বারবার উচ্ছল, নির্মল, স্বচ্ছ হাসির বন্যার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মৃদু হাসি নয়, একেবারে সশব্দে হাসি। হাসি চেপে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আবার এই হাসিমাখা চোখ কখন যে জলে ভিজে যায়, কখন যে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে শব্দ করে, তা বোঝা যায় না। দূর থেকে কোনো লোক হুমায়ূন আহমেদের পাঠককে খেয়াল করলে নির্ঘাত ভাবতে পারে- লোকটা মনে হয় পাগল হয়ে গেছে, একবার হাসে, একবার চোখ ভরিয়ে তোলে জলে। কান্না-হাসির জীবন। কান্না-হাসির মিলনকেই জীবন বলে। এ মিলনকে খুব কম লেখকই এমন নিখুঁতভাবে পরিবেশন করতে পারেন। এমন গুণের আরেকজন শিল্পীর কথা মনে পড়ে- তিনি চার্লি চ্যাপলিন। চলচ্চিত্রে এমন আশ্চর্য গুণের অধিকারী আর দ্বিতীয়জনের জন্ম হয়নি। হুমায়ূন আহমেদও বাংলা গদ্যের তেমন একজন অদ্বিতীয় শিল্পী।

শুধু হাসি-কান্না কেন! মানুষের চরিত্রের, মনপ্রবাহের এমন সব বিস্ময়কর দিক তিনি উন্মোচিত করেন, যা দেখে বিস্ময়ের ঢেউ জাগে ভেতরে। অথচ এগুলো সবই পরিচিত অভিব্যক্তি; পরিচিত মানুষের আচরণ। হঠাৎ মানুষের উল্টো দিকে চলে যাওয়া আমরা দেখি, কিন্তু অনুভব করি না। হুমায়ূন আহমেদ যখন সেটাই তুলে ধরেন, তখন মনে হয়- মানুষের এ দিকটা আমরা আগেও দেখেছি, কিন্তু তেমন আমলে নিইনি।

দার্শনিকতা প্রত্যেক লেখকের জন্য অপরিহার্য। কারণ, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই দর্শন রয়েছে। হাসি-কান্না তৈরি হয় মানুষের ভেতরের এই দর্শনের কারণেই। ভেতরের দর্শনের গায়ে স্নিগ্ধ পরশ পেলে সুখী হয়, হাসে। আবার দর্শনের গায়ে আঘাত লেগে রক্তাক্ত হলে কেঁদে ওঠে। মানুষের ভেতরের ভেতরে থাকা ওই জায়গাটা ছুঁয়ে দিতে পারাই লেখকের কাজ। হুমায়ূন আহমেদের দার্শনিকতা এত সহজ আর সহজভাব নিয়ে পাঠকের ভেতরকে স্পর্শ করে যে তার লেখার সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে হাসি-কান্না করা ছাড়া উপায় থাকে না। হুমায়ূন আহমেদে সহজ মানুষ থাকে সহজভাবে। তার লেখায় কঠিন মানুষও স্বাভাবিকভাবে কঠিনত্ব নিয়ে থাকে। কিন্তু শেষে সেই কঠিন চরিত্রটিই এমন অমায়িক মানুষ হয়ে ওঠে যে তার জন্যও চোখে জল আসে, তার জন্য সহমর্মিতা জেগে ওঠে। যদি খুব গভীরভাবে মিলিয়ে দেখি, তবে বাস্তব ক্ষেত্রেও এমনটা অনায়াসে দেখতে পাওয়া সম্ভব। এমন চরিত্ররা আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এ লেখাটা হওয়ার কথা ছিল একটা বই নিয়ে মাত্র। কিন্তু তা আর হলো না। পুরো হুমায়ূন আহমেদ উঠে এলেন। লেখাটা চালিত হলো অন্যভাবে। এমন হয় কখনও কখনও। লেখা নিজেই লেখককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। পুরো হুমায়ূন আহমেদকে যেভাবে ভাবি, লেখাটার ভেতর তা বিক্ষিপ্তভাবে কিন্তু সমগ্ররূপ নিয়ে উঠে আসতে চাইল। যদিও এ লেখা দিয়ে পুরো হুমায়ূন আহমেদকে ধরা তো দূরের কথা, আমি নিজে যেভাবে তাকে ভাবি, সেটাও তুলে ধরা অসম্ভব।

এ লেখা লিখতে শুরু করার কিছুক্ষণ আগে পড়লাম 'তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে' বইটি। কমপক্ষে তিনবার পড়া হলো এ বই। তার প্রায় সব বই-ই একাধিকবার পড়া হয়। পড়তে ভালো লাগে।

'তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে' বইতে দেখি এ বইয়ের প্রধান চরিত্র নবনী গাছের সঙ্গে কথা বলছে- 'মিস্টার বটগাছ! আপনি কোত্থেকে এলেন?' অবাক হওয়ার মতো দশা। গাছের সঙ্গে কথা! কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই কি দেখতে পাব না, প্রায় সব মানুষই এমন? গাছের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে কথা বলেছে বা বলে- মনে মনে হলেও- এমন লোক পাওয়া যাবেই। অন্তত শিশুকালে তো বটেই। শিশু থেকে বড় হওয়ার পর সেসব হয়তো ভুলে গেছি। কিন্তু আমরা এও তো জানি- সব বয়স্ক মানুষের ভেতর কিছুটা শিশুকালের শিশুমিও থেকে যায়। বয়সের বাধা পেরিয়ে নিজের ভেতরের কিছু কিছু শিশুত্ব চলে আসে আর বৃদ্ধকাল পর্যন্ত থেকে যায়। যেমনভাবে, একজন শিশুর ভেতরেও কিছু কিছু বড়মানুষি দেখা যায়, কারণ তার ভেতরে কিছুটা ভবিষ্যৎও চলে আসে আগেই। এগুলো ফেলে দেওয়ার নয়, অস্বীকার করার নয়। এগুলো সত্যের চেয়ে সত্য। বিজ্ঞান, দর্শন কী বলে জানি না। কিন্তু এগুলো হয়।

'তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে' বইয়ের কাহিনী সংক্ষেপ বলার কোনো দরকার নেই। শুধু এর ভেতর ভ্রমণের অনুভূতিটা বলা যেতে পারে। মনে হলো, মানুষ বড্ড অসহায় তার নিজের চরিত্রের কাছে, স্বভাবের কাছে। তবে মানুষ মজাদারও খুব, যদি সহানুভূতির চোখে তাকে দেখা যায়। বহু বহু ক্ষমা আর প্রেম জমা রাখতে হবে ভেতরে। হুমায়ূন আহমেদের রচনার আরও একটা বড় গুণ- পড়া শেষ করার পরও আরও অনেকক্ষণ মনের ভেতর ক্রিয়া করতে থাকে স্বাস্থ্যদায়ক ওষুধের মতো।

হুমায়ূন আহমেদের সুর সহজ, বাক্য সহজ। জটিল মানুষকে আঁকার জন্য এমন সহজ ঝরঝরে ভাষায় প্রয়োজন। জটিল ভাষায় জটিল মানুষকে বর্ণনা করা বড়ই জটিল কাজ। তিনি সেই জটিলতার দিকে যাননি।

এবার শেষ হবে লেখা। শুধু ১০ বছর আগের নিজের একটা লেখা থেকে একটা বাক্য তুলে দেব, 'প্রতিদিন প্রতিটি মানুষের একটু করে হলেও হুমায়ূন আহমেদের রচনা পড়া উচিত।' া


মন্তব্য যোগ করুণ