সামাজিক অপরাধ ও ন্যায়বিচার

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

  মাহমুদ আহমদ

সারাদেশে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন ও ধর্ষণ হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এসব খুনের বেশিরভাগ ঘটছে পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে। বাবা অথবা মা নিজের শিশুসন্তানকে গলাটিপে হত্যা করছে। বাবা অথবা মাও খুন হচ্ছেন সন্তানের হাতে। রাস্তা বা ডোবা থেকে উদ্ধার হচ্ছে তরুণীর খণ্ডিত লাশ। এতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে সচেতন নাগরিক এমনকি জনসাধারণের মাঝে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পর বরগুনার রিফাত শরীফের হত্যাকাণ্ড বড় ধরনের আলোড়ন তুলল দেশে। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, আর আমরা দর্শকের ভূমিকা পালন করছি। সামাজিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, এ ঘটনা থেকে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। কেন এত সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয়? এর মূল কারণ হচ্ছে ন্যায়বিচারের অভাব। কেননা, দেখা যায় বড় ধরনের অপরাধ করার পরও অপরাধী কোনো না কোনোভাবে শাস্তি থেকে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে, আর অপরাধীকে সার্বিক সহযোগিতাও করছে একটি মহল। অথচ পবিত্র কোরআনের শিক্ষা হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি নিজ পিতা-মাতার বিরুদ্ধেও সাক্ষ্য দিতে হয়, তা যেন দেওয়া হয়। আর আমরা আজ করছি উল্টো। অপরাধী আত্মীয়-স্বজন হলে তাকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই চেষ্টায় রত হই।

আজ যারা সমাজ ও দেশে নানা অপকর্ম করছে, তারা তো কোনো না কোনো পরিবারেরই সদস্য। অপরাধীদের পরিবার যদি প্রথমে সোচ্চার হতো, তাহলে অপরাধের মাত্রা এমনিতেই অনেক কমে যেত, কিন্তু আমরা তা করছি না। এ জন্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইসলাম অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। আল্লাহ হচ্ছেন সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচারক। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যেহেতু আল্লাহরই কাজ, তাই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান ও শাসনকার্যে নিয়োজিত সংশ্নিষ্ট সবাইকে আল্লাহ এ নির্দেশই প্রদান করেন যে, তারা যেন ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিজেদের কর্তব্য পালন করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে যারা ইমান এনেছ, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে তোমরা দৃঢ়ভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও, এমনকি সেই সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে গেলেও। যার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে, সে ধনী হোক বা গরিব; আল্লাহ উভয়েরই সর্বোত্তম অভিভাবক। অতএব তোমরা যাতে ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হও, সে জন্য তোমরা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করো না আর তোমরা যদি পেঁচানো কথা বল অথবা সত্য এড়িয়ে যাও। তবে মনে রেখো, তোমরা যা কর সে বিষয়ে নিশ্চয় আল্লাহ পুরোপুরি অবগত আছেন' (সুরা নিসা :১৩৫)।

এ আয়াতে শুধু সুবিচারের কথাই স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়নি, বরং সুবিচার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্তাবলিও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, শুধু সুবিচার প্রতিষ্ঠাই নয়, বরং সুবিচারের পতাকাকেও সমুন্নত রাখতে হবে। যেখানেই ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হতে দেখা যাবে, সেখানে তা সমুন্নত করাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। মামলায় কোনো পক্ষের হারজিতের জন্য সাক্ষ্য নয়, বরং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই সাক্ষ্য দিতে হবে। কেননা, সত্য সাক্ষ্য ব্যতিরেকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সত্য সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যদি নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগে অথবা নিজ পিতামাতা বা নিকটাত্মীয়-পরিজনের প্রতিকূলেও যদি যায়, তবুও সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে। ন্যায়বিচারের উচ্চ মানদণ্ড ছাড়া সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে একমাত্র সত্যকেই মাধ্যম বানাতে হবে।

মহানবীর (সা.) নির্দেশ হলো- 'তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর, অন্যদের জন্যও তা পছন্দ কর।' আমরা যদি এই হাদিসের ওপর দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত হই, তাহলেই কেবল ন্যায়বিচার করা সম্ভব। সাধারণত আমরা কী দেখি, নিজের অধিকার পুরোপুরি আদায়ের ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর, অথচ অন্যের অধিকার বিষয়ে সামান্যতম চিন্তাও করি না। সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আমাদের যদি আত্মীয়-স্বজন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের অসন্তুষ্টিরও সম্মুখীন হতে হয়, তার পরও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। আমরা নিজেরা যখন ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকব, তখনই আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারি। আজকে ন্যায়বিচারের বড়ই অভাব। এ কারণেই সর্বত্র বিশৃঙ্খলা, সামাজিক অস্থিরতা আর অরাজকতা দেখা দিচ্ছে। শাসনকার্যে নিয়োজিত সবাইকে আল্লাহতায়ালা ন্যায়বিচার করার তৌফিক দান করুন।

ইসলামী গবেষক
masumon83@yahoo.com



মন্তব্য